১২. আক্রান্ত

১২. আক্রান্ত

আগ্রার কোনও এক হাসপাতাল। উত্তরপ্রদেশ। মার্চ, ২০১

চারটি মেয়েকে নিয়ে ওয়েটিং রুমের বেঞ্চে বসেছিল অমৃতা সেনয়। এই চারটি মেয়েকে পুলিশের সাহায্যে উদ্ধার করে আনা হয়েছে যৌনপল্লি থেকে।

কোভিডের গ্রাসে সব কিছু থমকে গেলেও হিউম্যান ট্র্যাফিকিং কিন্তু থেমে নেই। বরং লকডাউন ওঠার পর থেকে সেই ট্র্যাফিকিংয়ের মাত্রা যেন আরও বেড়ে গিয়েছে।

কোভিডের প্রথম ধাক্কা কাটিয়ে উঠে মানুষ চেষ্টা করছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে। আর এই স্বাভাবিক জীবনের একটা অঙ্গই যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে নারী পাচার।

‘উই কেয়ার’ বলে একটা ছোট এনজিও আছে অমৃতার। যে এনজিও লড়াই করে পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েদের বাঁচানোর লক্ষ্যে। ২০২০ সালের শুরু থেকে কোভিডের করাল গ্রাসে যখন বিপর্যস্ত পৃথিবী, তখন অমৃতাকেও আটকে থাকতে হয়েছিল ঘরে।

তারপরে একটু একটু করে স্বাভাবিক হতে শুরু করে জনজীবন। মারণ রোগের বিরুদ্ধে লড়াই চালানোর পাশাপাশি চেষ্টা শুরু হয় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার। অমৃতার কাছে এই স্বাভাবিক জীবনের অর্থ হল, পঙ্কিল দুনিয়া থেকে পাচার হয়ে যাওয়া মেয়েগুলোকে বাঁচিয়ে আনা। সেই কাজটাই আবার শুরু করে দিল সে।

দিনকয়েক আগে সোর্সের মাধ্যমে অমৃতা খবর পায়, কয়েক জন মেয়েকে পাচার করে নিয়ে আসা হয়েছে স্থানীয় যৌনপল্লিতে। তার পরে পুলিশের সাহায্যে ওই যৌনপল্লিতে রেড করে চারটে মেয়েকে বাঁচানো গিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী তাদের নিয়ে আসতে হয়েছে হাসপাতালে। যেখানে মেডিক্যাল পরীক্ষা হবে মেয়েগুলোর।

মোবাইল বার করে একবার সময়টা দেখে নিল অমৃতা। আধঘণ্টা হয়ে গিয়েছে। আরও কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে, কে জানে।

এই হাসপাতালে তাকে মাঝেমাঝেই আসতে হয়। অনেকেই তাকে চেনে। আরও একটা ব্যাপার আছে। এই হাসপাতালে তার বেশ কয়েকজন সোর্সও আছে। যাদের মাধ্যমে টুকটাক খবর পেয়ে যায় অমৃতা

মোবাইলে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজগুলো এক বার দেখে নিয়ে মুখটা তুলতেই ছেলেটাকে দেখতে পেল অমৃতা। এই হাসপাতালের ওয়ার্ড বয়। তার সঙ্গে ভালই আলাপ আছে। ছেলেটাকে সে মাঝেমাঝে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করে। ছেলেটাও দু’একটা টুকটাক খবর দেয়। যদিও তাতে বিশেষ লাভ হয়নি অমৃতার

ছেলেটার চোখে চোখ পড়তেই অমৃতা বুঝে গেল, কিছু একটা বলতে চায় প্রদীপ।

এ দিক-ও দিক এক বার দেখে নিল অমৃতা। মেয়েগুলো বেঞ্চিতে গুঁটিসুটি মেরে বসে আছে। দু’জন পুলিশকর্মী একটু দূরে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। এই পুলিশকর্মী দু’জন তার সঙ্গেই এসেছে হাসপাতালে।

বেঞ্চ থেকে উঠে ধীরে ধীরে বারান্দার কোণের দিকে এগিয়ে গেল অমৃতা। যেখানে দাঁড়িয়ে ছেলেটা।

‘কিছু বলবি প্রদীপ?’ গলাটা নামিয়ে প্রশ্ন করল অমৃতা।

প্রদীপ একবার এ দিক-ও দিক দেখে নিল চট করে। ছেলেটার চোখেমুখে কীসের যেন অস্থিরতা। দেখে মনে হচ্ছে, প্রদীপ ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছে। এই রকম তো সে আগে দেখেনি।

আর এক পা এগিয়ে গিয়ে অমৃতা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কী রে, কী হয়েছে? কী বলবি, বল না?’

কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থাকল প্রদীপ। যেন কথাটা বলা ঠিক হবে কি না, বুঝতে পারছে না। তার পরে গলাটা একেবারে খাদে নামিয়ে বলল, ‘দিদি, একটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার ঘটছে এই হাসপাতালে।’

‘কী ব্যাপার?’ অমৃতাও এবার উৎসুক হয়ে উঠল। প্রদীপের কথায় এমন কিছু আছে, যা অমৃতাকেও টেনশনে ফেলে দিল। কী বলতে চায় ছেলেটা?

‘শোনো দিদি, খুব বড় একটা চক্র কাজ করছে এখানে। ভয়ঙ্কর চক্র।’

‘তুই ঘাবড়াস না প্রদীপ। আমাকে সব বল। ‘

অমৃতার কথায় একটু শান্ত হল প্রদীপ। তার পরে হড়হড় করে বলতে শুরু করল— ‘গত কয়েক মাস ধরে এখানে প্রচুর বাচ্চাকে নিয়ে আসা হচ্ছে। যাদের আলাদা করে রাখা হচ্ছে কোভিড সেকশনে। বলা হচ্ছে, ওদের কোভিড হয়েছে।

প্রদীপ একটু থামল। অমৃতা চুপ করে তাকিয়ে রইল ছেলেটার দিকে।

প্রদীপ একটা ঢোঁক গিলে আবার বলতে শুরু করল, ‘দিদি, ওই বাচ্চাগুলোর বেশিরভাগেরই কিন্তু কোভিড হয়নি। ওদের মিথ্যে মিথ্যে ভয় দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে।’

‘মানে?’ অবাকই হয়ে গেল অমৃতা, ‘কোভিড হয়নি, তা হলে কেন নিয়ে আসা হয়েছে? এমনিতেই কোভিড পেশেন্ট সামলানো যাচ্ছে না। তার উপরে মিথ্যে কেস এনে কী করবে? এতে তো চাপ আরও বেড়ে যাবে!’

প্রদীপের চোখ বড় বড় হয়ে উঠল। শ্বাস-প্রশ্বাস বেড়ে গেল। তারপরে উত্তেজনা সামলে কোনওমতে বলতে পারল—

‘দিদি, ওই বাচ্চাগুলোর পেট কেটে কিডনি বার করে নেওয়া হচ্ছে। লিভার কেটে নেওয়া হচ্ছে। অনেক বাচ্চাকে তো স্রেফ মেরেই ফেলছে। তার পরে শরীর থেকে অর্গ্যানগুলো বার করে নিচ্ছে। চোখ তুলে নিচ্ছে।’

বিস্ফারিত দৃষ্টিতে প্রদীপের দিকে তাকিয়ে রইল অমৃতা। সে এতটাই ধাক্কা খেয়েছে, যে কথা পর্যন্ত বলতে পারছিল না।

প্রদীপ চাপা স্বরে বলে চলল, ‘এখনও এই হাসপাতালের একটা ওয়ার্ডে বেশ কিছু বাচ্চা আছে। যাদের শরীর থেকে কিডনি বার করে নেওয়া হয়েছে। আর যাদের মেরে ফেলা হয়েছে, তাদের শরীরটাই পাচার করে দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, কোভিডে মারা গিয়েছে। বডি দেওয়া যাবে না। বডি আমরাই সৎকার করে দেব।’

প্রদীপের কথা শুনতে শুনতে আতঙ্কে যেন পাথর হয়ে গিয়েছিল অমৃতা। এ তো ভয়ঙ্কর কথা বলছে প্রদীপ। ছেলেটাকে অবিশ্বাসও করতে পারছে না অমৃতা। এত সব কথা বানিয়ে বানিয়ে বলার মতো বুদ্ধি প্রদীপের নেই। আর বানিয়ে বলবেই বা কেন? অমৃতার থেকে টাকা-পয়সা আদায়ের জন্য? অমৃতার মনে হচ্ছিল, টাকার ব্যাপার মাথাতেই নেই প্রদীপের।

অমৃতার মাথাটা পুরো গুলিয়ে গিয়েছিল। একটু পরে কোনও মতে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলতে পারল, ‘প্রদীপ, ওই বাচ্চাগুলোর ছবি তুলে আমাকে দিতে পারবি?’

‘কী বলছ দিদি!’ ভয়ে কেঁপে গেল প্রদীপের গলা, ‘ওরা দেখতে পেলেই আমাকে মেরে ফেলবে। দিদি, তুমি কিন্তু এই সব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি কোরো না। তুমি জানো না, ওরা কত ভয়ঙ্কর। ওরা জানতে পারলে আমাদের বেঁচে থাকা মুস্কিল হয়ে যাবে।’

প্রদীপের চোখ দু’টো সত্যিই আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গিয়েছিল। অমৃতা বুঝতে পারল, ছেলেটা মারাত্মক ভয় পেয়েছে।

‘দিদি, আমি এখন যাই। তুমি কিন্তু ভুলেও কাউকে বোলো না যে আমি এই সব কথা বলেছি তোমাকে।

কথা শেষ করেই হাসপাতালের ভিতরে মিলিয়ে গেল প্রদীপ।

অমৃতা যখন আবার বেঞ্চে এসে বসল, তখন তার মাথাটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। প্রদীপ যা বলল, তা যদি সত্যি হয়, তা হলে এর চেয়ে ঘৃণ্য কাজ আর কিছু হয় না। মানুষ কতটা নীচে নামলে এই ধরনের কাজ করতে পারে, তা ভাবতেও পারছিল না অমৃতা।

আরও একটা ভাবনা তাঁর অন্তরাত্মাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সে বুঝেছে এই লেভেলের চক্র চালাতে গেলে অনেক উপর মহল পর্যন্ত কানেকশন থাকা দরকার। অনেক অনেক বড় যোগাযোগ থাকতে হবে। সেই যোগাযোগের মাত্রাটা যে কী হতে পারে, ভাবতেই কেঁপে উঠল বছর আঠাশের মেয়েটি।

.

এক সপ্তাহ পরে।

লখনউয়ের কোনও এক ঠিকানায়…

যে বাড়িটায় লোকগুলো বসে ছিল, সেটা এলাকায় বেশ বনেদি বাড়ি বলেই পরিচিত। বাড়ির মালিক কয়েক পুরুষের বড়লোক। অনেক ব্যবসা-ট্যাবসা আছে বলে জানে স্থানীয় বাসিন্দারা।

প্রথমে কথা বললেন বাড়ির মালিক—

‘কী রকম কাজ হচ্ছে?’

জবাব দিল সামনে বসে থাকা লম্বা মতো লোকটা, ‘ঠিক যে রকম আমরা আশা করেছিলাম, জনাব। অর্গ্যানগুলো প্রচুর টাকায় বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। ধনকুবেররা বসে আছে টাকার থলি নিয়ে। উত্তরপ্রদেশ নিয়ে কোনও চিন্তা নেই।’

মাথা নাড়লেন বাড়ির মালিক। তারপরে আর একজনের দিকে ফিরে বললেন, ‘দেশের বাকি জায়গার খবর কী?’

‘নর্থ-ইস্টে ভাল ব্যবসা হচ্ছে। বাচ্চাগুলোকে সরিয়ে আনতে সমস্যা হচ্ছে না। তার পরে অর্গ্যানগুলো বার করে দ্রুত ট্র্যান্সপ্লান্টের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।’

‘সেটা তো করতেই হবে। না হলে অর্গ্যানগুলো সরিয়ে আর কী হবে!’ কথাটা শেষ করে একটা সিগারেট ধরালেন ভদ্রলোক।

তাদের এই অপারেশনটা দু’ভাগে ভাগ করা। এক, যাদের শরীর থেকে অর্গ্যান সরিয়ে নেওয়া হবে, তাদের জোগাড় করা। দুই, কাছাকাছি উচ্চমানের প্রাইভেট নার্সিংহোম বা হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ট্রান্সপ্লান্টগুলো করতে না পারলে আর কোনও লাভ থাকে না। অর্গ্যান নষ্ট হয়ে যায়। তাই পুরো প্রক্রিয়াটাই মসৃণ ভাবে করতে হয়। এবং, দ্রুতগতিতে।

কোভিডের সময় যখন কাজকর্ম প্রায় বন্ধ হয়ে যেতে বসেছিল, তখন এই পরিকল্পনার জন্ম। এই পরিকল্পনা অবশ্য বাড়ির মালিকের মাথা থেকে আসেনি। কার মাথা থেকে এসেছে, সেটাও তিনি জানেন না। শুধু জানেন, দেশজুড়ে এই জালটা হঠাৎ করেই বিছানো হয়েছে। এক একজনকে এক একটা জোনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সবার মাথার উপরে আবার এক জন। আর তাদের মাথার উপরে কে, সেটা তাঁর জানা নেই। তবে দু’টো ব্যাপার ভাল করেই জানেন নৌশাদ মির্জা। কোটি কোটি টাকা আয় হচ্ছে এই ব্যবসা থেকে। আর সেই টাকা কিন্তু শুধু কয়েকজনের পকেটেই ঢুকছে না, সেই টাকা লাগানো হচ্ছে অন্য কাজেও। সেটা ঠিক কী কাজ, তা পুরোটা না জানলেও একটু আঁচ পেয়েছেন নৌশাদ। তাঁর সামনে যে লোকগুলো বসে আছে, তাদের দু’জনের আসল পরিচয় যথেষ্ট ইঙ্গিতবাহী।

ইরশাদ এবং সিরাজ নামের এই দু’টো ছেলে জড়িয়ে আছে ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের (আইএম) সঙ্গে। শুধু জড়িয়ে থাকা বললে ভুল হবে, আইএম-এর নেতৃবর্গের সঙ্গে এই ছেলে দু’টোর সরাসরি যোগ আছে। নৌশাদ বুঝতে পারছেন, এই টাকাটা আইএম বা আরও কোনও জঙ্গিগোষ্ঠীর ফান্ডিংয়ে যাচ্ছে। হয়তো ওরা কোনও বড় পরিকল্পনা করছে। সেটা কী, জানতে চান না নৌশাদ। তার ভাগের টাকাটা পেয়ে গেলেই তিনি খুশি। তবে তাঁকে বলে দেওয়া হয়েছে, কোনও সমস্যা হলেই ইরশাদদের জানাতে। ওরা তখন যা করার করবে।

প্রথমে যখন অপারেশনটার প্রস্তাব দেওয়া হয় নৌশাদকে, তিনি চমকে উঠেছিলেন। হিউম্যান এবং অর্গ্যান ট্র্যাফিকিংয়ের সঙ্গে তার অনেক দিনের যোগ। উত্তরভারতের এই চেনটা তিনিই নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু এই রকম পরিকল্পনা তাঁর মাথাতেও আসেনি।

পরিকল্পনটা খুবই সহজ। টার্গেট করতে হবে গরিব, না-খেতে পাওয়া মানুষদের। বস্তিতে বস্তিতে এখন মারাত্মক একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেখান থেকে তুলে আনতে হবে বাচ্চাদের। পরীক্ষার নাম করে বলতে হবে, কোভিড হয়েছে। তার পরে ভর্তি করে দেওয়া হবে কোনও সরকারি হাসপাতালে। যেখানে তাঁদের চেনটা আছে। অর্গ্যান ট্রান্সপ্লান্টের প্রথম ধাপটা শুরু হবে সেখান থেকেই।

বার করে নিয়ে আসা হবে বাচ্চাগুলোর শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। কিডনি, লিভার, হার্ট, চোখ। প্রয়োজনে বোন ম্যারোও। দ্রুত নিয়ে যাওয়া হবে আর একটি জায়গায়। যেখানে ভর্তি আছে পেশেন্ট। অর্গ্যান বসিয়ে দেওয়া হবে সেই সব পেশেন্টের শরীরে। ব্যাস, কাজ শেষ। বাচ্চাদের অর্গ্যানের চাহিদা অনেক বেশি। শুধু ম্যাচিংটা আগে দেখে নিতে হবে। তার জন্য ডাক্তার আছে। তারা লিস্ট পাঠিয়ে দেবে ডিলারদের কাছে। এর পরে বাচ্চাগুলোকে পরীক্ষা করে দেখে, ডোনার-রিসিভারের মিল বার করে ট্রান্সপ্লান্টটা করে দিলেই হল।

নৌশাদ জানেন, প্রতিটা ব্যবসা দাঁড়িয়ে থাকে একটা নীতির উপরে

ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই!

সাপ্লাইটা না হয় ম্যানেজ করা গেল। কিন্তু এই কোভিডের বাজারে কি এত ডিমান্ড হবে অর্গ্যানের? নৌশাদ চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরে অবাক হয়ে যান ডিমান্ডের বহর দেখে। কোভিড যেন এই ডিমান্ড আরও বাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছে। ধনকুবেররা বসে আছে টাকার থলি নিয়ে। শুধু ধনকুবেররাই বা কেন, মোটামুটি উচ্চবিত্তের মানুষও প্রয়োজনে টাকা জোগাড় করে ফেলছে অর্গ্যান ট্রান্সপ্লান্টের জন্য। বাঁচার উদগ্র বাসনায়।

ব্যবসা কমার বদলে ডানা মেলতে থাকল। নৌশাদ আরও খবর পেয়েছেন যে, সীমান্ত পার করে বিদেশিরাও গোপনে এই দেশে চলে আসছে অপারেশনের জন্য। শরীরে নতুন অঙ্গ বসিয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে নিজের দেশে। পুরোটাই হচ্ছে অর্গানাইজড একটা চক্রের মাধ্যমে। যে চক্র ছড়িয়ে আছে দেশের নানা শহরে।

ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কোভিড পজিটিভের নাম করে তুলে আনা হচ্ছে বাচ্চাদের। এর মধ্যে কেউ কেউ হয়তো সত্যি পজিটিভ, বাকিরা নয়। কাজ শেষে যারা বেঁচে থাকছে, তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিছু টাকা ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে মুখের উপরে। গরিব মানুষগুলো আর কী বলবে! আর যে সব বাচ্চাকে মেরে ফেলা হচ্ছে, তাদের শরীরটা দেওয়াও হচ্ছে না। বলে দেওয়া হচ্ছে, কোভিড বলে বডি দেওয়া যাবে না।

কারও কিছু করার থাকছে না। সবই হচ্ছে প্ল্যানমাফিক।

পাশাপাশি আরও একটা প্ল্যান চালু হয়ে গিয়েছে।

লক্ষ লক্ষ লোক মারা যাচ্ছে কোভিডে। যাদের শরীর দেওয়া হচ্ছে না কাউকে। বলে দেওয়া হচ্ছে, দাহ করে দেওয়া হচ্ছে সে সব শরীর

নৌশাদ জানেন, দাহ করা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ শরীর নয়। সৎকারের আগে বার করে নেওয়া হচ্ছে কিছু কিছু অঙ্গ। বিশেষ করে চোখ। তার পরে তা চলে যাচ্ছে পার্টির কাছে। এখানেও হাজার হাজার কোটি টাকার লেনদেন। নৌশাদ বুঝেছেন, যে অঙ্কের টাকা আসছে এই ব্যবসা থেকে, তা সবার পকেট ভরানোর পরেও থেকে যাচ্ছে বিশাল পরিমাণে। আর সেই অংশটা চলে যাচ্ছে আইএম বা লস্কর গ্রুপের তহবিলে। যে টাকায় তৈরি হচ্ছে সন্ত্রাসবাদীরা। কোনও বড় অপারেশনে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য।

এই ব্যবসাটার সঙ্গেও জড়িত আছেন নৌশাদ। উত্তরপ্রদেশের ভারটা তার উপরে। এখানেও শুরুতে একটা প্রশ্ন জেগেছিল নৌশাদের মনে। কোভিড পজিটিভে মৃত্যু হওয়া বডির অর্গ্যান পেশেন্ট পার্টি নেবে কি না।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, পেশেন্ট পার্টি অতসব দেখছেই না। তাদের বলাও হচ্ছে না। তারা শুধু বাঁচতে চাইছে। একটা সুস্থ জীবন চাইছে। সে জীবন সাময়িক হলেও ক্ষতি নেই। তাই কারও মাথাব্যথা নেই, কোথা থেকে আসছে এই সব অর্গ্যান। মোদ্দা কথা, এলেই হল। সাপ্লাই চালু থাকলেই হল।

কারও মৃত্যু কাউকে জীবন দিয়ে যাচ্ছে। শুধু মাঝখান থেকে মোটা অঙ্কের টাকা লুটে নিয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ নামের শয়তান।

নৌশাদ মনে মনে হাসলেন। ভাগ্যিস তিনি এই লাইনে এসেছিলেন। না হলে কোভিড হয়তো তাঁর জীবনেও থাবা বসাত।

সামনে বসা চার সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে নৌশাদ বলে উঠলেন, ‘তা হলে সব কিছুই ঠিকঠাক এগোচ্ছে। ভাল কথা। কিন্তু একটা ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে।’

চারজনেই নীরবে তাকিয়ে রইল প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দিকে।

‘কেউ যেন কিছু জানতে না পারে। বিশেষ করে এই বাচ্চাগুলোর ব্যাপারটা। তোমরা চোখকান খোলা রেখো। আমিও রাখব। এই অপারেশনের কথা পুরোপুরি গোপন রাখতে হবে।’

‘আর জেনে গেলে?’ ঠান্ডা গলায় প্রশ্নটা করল ইরশাদ। আইএমের অপারেটিভ। নৌশাদ জানত, ইরশাদ কোন দিকে ইঙ্গিত করছে। তিনি আন্দাজ করেছেন, ইরশাদের দায়িত্ব হল অপারেশনের পথে কোনও কাঁটা এলে সেটা সরিয়ে দেওয়া।

সোফা থেকে উঠে দাঁড়ালেন নৌশাদ। তার পরে ইরশাদের প্রশ্নের জবাবটা দিলেন— ‘কেউ জেনে গেলে তাকে সরিয়ে দিতে হবে। চিরতরে। সে যে-ই হোক না কেন।’

ইরশাদ হাসল। সে জানে। অপারেশনের পথে যে আসবে, তাকেই সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ আগে থেকেই দেওয়া আছে। তার মতো অপারেটিভরা ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন গ্যাংয়ে। সবাইকেই একটা কথা বলা আছে। যে করে হোক অপারেশনের গোপনীয়তা রক্ষা করতেই হবে।

পাঞ্জাবির পকেটে রাখা খুরটায় এক বার হাত বুলিয়ে নিল ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের অপারেটিভ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *