১. ভ্যাটিকান সিটি, ৪ মে, ১৯৯৮

১. ভ্যাটিকান সিটি, ৪ মে, ১৯৯৮

সিগ সাওয়ার পি ২২০ নাইন এম এম সার্ভিস পিস্তলের নলটা স্থির ভাবে তাক করা ছিল সামনে বসে থাকা দুই মূর্তির দিকে।

দু’জনের একজন সুইস গার্ডের সদ্য দায়িত্ব পাওয়া কমান্ডার, অন্যজন তাঁর স্ত্রী। ইটালিতে খুব বেশি গরম না থাকলেও দু’জনেই তখন রীতিমতো ঘামছেন। সাইলেন্সর লাগানো পিস্তলের নলটার দিকে এক বার তাকিয়ে নিয়ে কমান্ডার ধীরে ধীরে বলে উঠলেন, ‘তুমি কেন এই রকম করছ? কী চাও তুমি?’

জায়গাটা ভ্যাটিকান সিটির মূল ফটকের কাছে। পোর্টা স্যান্টানার পাশে। সুইস কমান্ডারের অ্যাপার্টমেন্ট। সাধারণত সুইস গার্ডদের জন্য ব্যারাকই নির্দিষ্ট করা থাকে। তার পরে পদোন্নতি হলে এক বা দু’কামরার ফ্ল্যাট পাওয়া যায়। আর একটু বড় অ্যাপার্টমেন্ট বরাদ্দ করা থাকে যারা গার্ডের কাজ করতে করতে বিবাহ করেছে, তাদের জন্য। যেমন এই কমান্ডার।

পিস্তলধারী ব্যক্তিটি নিজে এক সাধারণ সুইস গার্ড। সে ব্যারাকেই থাকে। তবে এই অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়া-আসা আছে। তাই কমান্ডার বা তাঁর স্ত্রী অবাক হননি সেড্রিক রেপন্ডকে আসতে দেখে। কিন্তু এই মুহূর্তে তাঁরা বিস্ময়ে পাথর হয়ে গিয়েছেন। শুধু বিস্ময়ে বললে ভুল হবে, আতঙ্কেও। সেড্রিকের এই মুখটা তাঁরা আগে দেখেননি। আক্রোশ যেন ঝরে পড়ছে ওই চোখ দু’টোয়।

.

‘কেন এ রকম করছ, সেড্রিক?’ আবার প্রশ্নটা করলেন কমান্ডার।

‘কারণটা আপনি ভালই জানেন কমান্ডার। আপনার লজ্জা লাগে না? পোপকে রক্ষা করার, ভ্যাটিকান সিটিকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করে এই ভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন?’ স্থির দৃষ্টিতে সেড্রিকের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন কমান্ডার। তার পরে বললেন, ‘কী আবোলতাবোল বকছ তুমি? তোমার মাথার ঠিক আছে?’

সেড্রিক একটু হাসল। ডান হাতে ধরা পিস্তলটা সামান্য কেঁপে উঠল। তার পরে আবার লক্ষ্যে স্থির হয়ে গেল। লক্ষ্যটা কমান্ডারের দু’চোখের মাঝের জায়গাটা।

‘ওয়ের্ডার কোডনেমটা চেনা চেনা লাগছে, কমান্ডার?’ তাঁর প্রশ্নে কমান্ডার একটু চমকে উঠলেন কি না, ঠিক বুঝতে পারল না সেড্রিক। ঘরের আলোর তেজটা বেশ কম। ‘সেড্রিক, তুমি এ সব কী বলছ? ওয়ের্ডার কোডনেমের মানেটা কী?’ পাশ থেকে আতঙ্কিত গলায় বলে উঠলেন কমান্ডারের স্ত্রী।

‘সেটা আপনার স্বামী ভাল বলতে পারবেন,’ কমান্ডারের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বলে উঠল সেড্রিক। কয়েক মুহূর্তের নীরবতা। তার পরে বছর পঁচিশেকের যুবক ফের মুখ খুলল, ‘কেন করলেন এই সব? টাকার জন্য? প্রথমে ইস্ট জার্মানির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি আর এখন চিনের হয়ে? যে ধর্মকে, যে রাষ্ট্র আর তার নেতাকে রক্ষা করার শপথ নিয়েছেন, টাকার জন্য তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন?’

সেড্রিকের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় লাফিয়ে উঠতে যাচ্ছিলেন কমান্ডার। হুঙ্কার দিয়ে উঠল সেড্রিক, ‘চেয়ার ছেড়ে ওঠার চেষ্টা করলে মাথাটা ফুটো করে দেব।’

সেড্রিকের আগুনঝরা চোখের দিকে তাকিয়ে নিজেকে শান্ত করলেন কমান্ডার। তার পরে একবার স্ত্রীর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলতে লাগলেন, ‘সেড্রিক, মাথাটা একটু ঠান্ডা করো। কেউ তোমাকে ভুল বুঝিয়েছে। জার্মানি বা চিনের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই।’ ‘আপনি অস্বীকার করতে পারেন, পূর্ব জার্মানির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করার সময় আপনার কোডনেম ওয়ের্ডার ছিল না?’

‘কোডনেমের প্রসঙ্গ আসছে কী করে? আমি তো গুপ্তচর নই।’ কথা বলতে বলতে কমান্ডার একবার নিজের পরিস্থিতিটা যাচাই করে নিলেন। তাঁর থেকে হাত দশেক দূরে দাঁড়িয়ে সেড্রিক। এই দূরত্বটা পার করে সেড্রিকের দিকে ঝাঁপানোর কোনও সুযোগ তিনি পাবেন না। এই সুইস গার্ডকে তিনি নিজের হাতে ট্রেনিং দিয়েছেন। কমান্ডার জানেন, সেড্রিকের নিশানা অভ্রান্ত। এই সামান্য দূরত্ব থেকে নিশানা ভুল হবে না। রাস্তা একটাই। সেড্রিককে বুঝিয়ে নিরস্ত করা। কিন্তু কমান্ডার মুখ খোলার আগেই কথা বলল সেড্রিক—

‘আমি থাকতে পোপ বা ভ্যাটিকানের কোনও ক্ষতি হতে দেব না। তার জন্য যা করতে হয়, আমি করব।’

অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এল ঘরের মধ্যে। ওই কয়েক সেকেন্ডে কমান্ডার বুঝে গেলেন, তাঁদের আর সূর্যের আলো দেখা হবে না। স্ত্রীর দিকে একবার তাকাতে গেলেন তিনি। কিন্তু সেই সুযোগ আর পেলেন না।

ট্রিগারে চাপ দিল সেড্রিক। মিলি সেকেন্ডের মধ্যে ওই সামান্য দূরত্ব পার হয়ে কমান্ডারের কপালের ডানদিকে ঢুকে গেল সিগ সাওয়ারের বুলেট। তাঁর স্ত্রী আর্তনাদ করে ওঠার একটা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু আর্তনাদটা আর মুখ থেকে বার হল না। সেড্রিক ততক্ষণে দ্বিতীয় বার ট্রিগারে চাপ দিয়েছে।

.

সেকেন্ড পনেরো অপেক্ষা করল সেড্রিক। তার পরে এগিয়ে গেল সামনে পড়ে থাকা দু’টো দেহের দিকে। বুঝতে সমস্যা হল না, দেহ দু’টোয় আর প্রাণ নেই।

চোখটা ছলছল করে উঠল সেড্রিকের। দুঃস্বপ্নেও সে ভাবেনি কোনওদিন তাকে এই কাজটা করতে হবে। কিন্তু কর্তব্য বড় নিষ্ঠুর। আর সেই কর্তব্য যদি তাকে ভ্যাটিকান সিটি রক্ষা করতে বলে, তা হলে সেটা সে নির্দ্বিধায় পালন করবে। তা সেই কর্তব্য তাকে যতই যন্ত্রণা দিক না কেন।

আরও একবার কমান্ডার আর তাঁর স্ত্রীর পড়ে থাকা শরীর দু’টোর দিকে তাকিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল সেড্রিক। দরজা খুলে দিতেই ঘরের মধ্যে ঢুকে এল দু’টো ছায়ামূর্তি। দরজার বাইরে থেকে তারা সব কিছুই শুনতে পেয়েছে। এমনকী, সাইলেন্সর লাগানো সত্ত্বেও চাবুক চালানোর মতো যে শব্দটা বেরিয়েছিল সিগ সাওয়ার থেকে, সেই শব্দও কান এড়ায়নি তাদের। তাই ঘরের দৃশ্যটা অবাক করল না দু’জনকে।

লম্বা-চওড়া ব্যক্তিটি গ্লাভস পরা হাত বাড়িয়ে দিল সেড্রিকের দিকে। বিনা বাক্যব্যয়ে লোকটার হাতে পিস্তলটা তুলে দিল সেড্রিক। দ্বিতীয় লোকটা ততক্ষণে নিচু হয়ে এক বার পরীক্ষা করে নিল দেহ দু’টোকে। তার পরে প্রথম লোকটার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। প্রথম লোকটা পিস্তলটা এক বার দেখে নিল ভাল করে। তার পরে সেড্রিকের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কমান্ডার কিছু স্বীকার করেছে?’

‘না,’ সেড্রিকের মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গিয়েছে, ‘আপনাদের ইনফর্মেশন ঠিক ছিল তো?’

লোকটা হাসল, ‘আমাদের ইনফর্মেশনে কোনও ভুল হয় না। তুমি তো জানো আমাদের।’ সেটা জানে সেড্রিক। জানে, ভ্যাটিকানের অভ্যন্তরেই শুধু নয়, বহির্বিশ্বেও এদের ক্ষমতা কতটা। প্রথমে অবিশ্বাস্য ঠেকলেও পরে এদের কথা তাই বিশ্বাস করেছিল সেড্রিক। এবং, এদের নির্দেশে কাজ করতেও রাজি হয়ে যায়। কিন্তু একটা কথা সে তখনও বোঝেনি, এখনও নয়। লোকগুলোও পরিষ্কার করে কিছু বলেনি। শুধু বলেছিল, কাজটা হয়ে গেলে সব কিছু খুলে বলবে। তাই প্রশ্নটা আরও এক বার করে ফেলল সেড্রিক-

‘কিন্তু আমাকে দিয়ে এই কাজটা কেন করালেন? কমান্ডারকে গ্রেফতার করলে তো অনেক তথ্য সামনে আসত।’

লম্বা লোকটা একটু হাসল। তার পরে ধীরে ধীরে বলল, ‘সমস্যা ছিল। ভেবে দেখো, সুইস গার্ডের এক কমান্ডারকে চিনের গুপ্তচর সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে, এই খবরটা ছড়িয়ে পড়লে পোপ এবং ভ্যাটিকানের ভাবমূর্তির পক্ষে তা কতটা ক্ষতিকারক হত। কোনও দেশ আর আমাদের উপরে ভরসা রাখতে পারত না।’

এই যুক্তি লোকটা আগেও দিয়েছে। সেড্রিক এবার পরের প্রশ্নটা করল, ‘কিন্তু ওরা দু’জন তো খুন হয়ে গেল। এটা নিয়েও তো কেলেঙ্কারি হবে। সেটা সামলাবেন কী করে?’

লোকটা সামান্য ভাবল। তার পরে জবাব দিল, ‘এটা সামলানো যাবে। আমাদের একটা পরিকল্পনা আছে। কিন্তু গুপ্তচরবৃত্তির ব্যাপারটা সামনে এলে চূড়ান্ত কেলেঙ্কারি হত।’

বলতে বলতে লোকটা চলে এল সেড্রিকের ডান দিকে। ঠিক ওই সময় সামনে থাকা দ্বিতীয় লোকটা ডাক দিল, ‘সেড্রিক।’

সেড্রিক মাথা ঘুরিয়ে তাকাল লোকটার দিকে। সুইস গার্ডটি দেখতেও পেল না ডান পাশে দাঁড়ানো লোকটার হাতে ধরা সিগ সাওয়ার পিস্তলের নলটা উঠে এসেছে তার মাথার রগ বরাবর। পিস্তলের নলটা একটু নীচ থেকে উপরের দিকে ধরা। লোকটা যখন ট্রিগারে চাপ দিল, নলটা সেড্রিকের মাথার থেকে আধ ইঞ্চিও দূরে নয়। গুলিটা সেড্রিকের মাথা ফুঁড়ে বেরিয়ে গিয়ে দেওয়ালের উপরের অংশে বিঁধে গেল।

সেড্রিকের দেহটা মাটিতে পড়ার আগেই অবশ্য প্রাণবায়ু বেরিয়ে গিয়েছিল। তাও ভাল করে এক বার দেখে নিল লোকটা। তার পরে নিচু হয়ে পিস্তলটা ধরিয়ে দিল সেড্রিকের হাতে। দ্বিতীয় লোকটাও ভাল করে দেখে নিল ঘরটা। তার পরে স্বস্তির শ্বাস ফেলল। তাদের কাজ ঠিকঠাক হয়ে গিয়েছে। পারফেক্ট ক্রাইম অবশ্যই নয়। ভাল করে তদন্ত করলে হয়তো বোঝা যাবে, সেড্রিক আত্মহত্যা করেনি। তাকে খুন করা হয়েছে। কিন্তু তদন্তটা করবে কে! লোক দু’টো জানে, এই রাস্তাটা না নিলে কোনও উপায় ছিল না। একজনকে বলির পাঁঠা করতেই হত। মারাত্মক ঝুঁকি নিয়েই কাজটা করতে হয়েছে।

এটাও বিশাল স্ক্যান্ডাল হবে। ভ্যাটিকান সিটিতে এই ধরনের অপরাধ আগে কখনও হয়নি। একসঙ্গে তিনটি মৃত্যু! তিনটে দেহ উদ্ধার! লোকটা মানসচক্ষে পরের দিনের কাগজগুলোর হেডলাইন দেখতে পাচ্ছিল-

সুইস কমান্ডার এবং তার স্ত্রীকে খুন করে আত্মঘাতী সুইস গার্ড!

লোক দু’টো ভালই জানে, এই ভয়ঙ্কর কাণ্ডের কারণ খুঁজে বার করার জন্য ঝড় তুলে দেবে মিডিয়া। নানা কন্সপিরেসি থিয়োরি উঠে আসবে। মিডিয়ার কাছে একটা কারণ ফাঁসও করে দেওয়া হবে। কিন্তু আসল কারণটা গোপন রাখতেই হবে। এবং, এই রাতের কাহিনিটা। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশ আছে তাদের উপরে।

লোক দু’টো ভ্যাটিকানের এক গোপন উইংয়ের সদস্য। যে উইংয়ের কথা বাইরের দুনিয়ার প্রায় কেউ জানেই না। আর যারা জানে, তারা এই উইংকে ডাকে ‘দ্য হোলি অ্যালায়ান্স’ বা ‘দ্য এনটিটি’ বলে!

আদতে এই উইং হল ভ্যাটিকানের সিক্রেট সার্ভিস! বেসরকারিভাবে ভ্যাটিকানের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে আছে যারা। যাদের কাছে খবর ছিল, এই কমান্ডার বেঁচে থাকলে ভ্যাটিকানের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তাই তাকে সরিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। বাকি দু’জন পরিস্থিতির শিকার! কোল্যাটেরাল ড্যামেজ!

আরও এক বার ঘরের মধ্যে চোখ বুলিয়ে বেরিয়ে গেল লোক দু’টো। ঘরের দরজা ভেজানো থাকলেও কোনও সমস্যা নেই। এর পরে সব কিছুই প্ল্যান মাফিক এগোবে।

ঘড়িতে রাত তখন পৌনে ন’টা।

ঘুমোতে যাওয়ার আগেই এই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা জেনে গেলেন পোপ। রাত বারোটা নাগাদ পোপের অফিস থেকে একটি প্রেস বিবৃতি জারি করা হল মিডিয়ার জন্য। যা ঝড় তুলে দিল সাংবাদিক মহলে। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হল—

রাত ন’টা নাগাদ এক নান তার প্রতিবেশীর ফ্ল্যাট থেকে অদ্ভুত আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন। তিন তলার অ্যাপার্টমেন্টের ওই প্রতিবেশী দম্পতিকে তিনি ভাল করেই চিনতেন। খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন, ঘরের দরজা ভেজানো। তার পরেই চোখে পড়ে রক্ত এবং তিনটে শরীর। যাদের মধ্যে এক জন সদ্য দায়িত্ব পাওয়া সুইস কমান্ডার!

.

পরের দিন ঝড় উঠে গেল ভ্যাটিকান, ইটালি এবং বহির্বিশ্বে।

ভ্যাটিকানে এই রকম ভয়ঙ্কর অপরাধ দেখাই যায় না। তার উপরে মারাত্মক এই ঘটনা ঘটেছে সুইস কমান্ডারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের ঠিক এক দিন আগে।

একটা প্রশ্নই ঝড় তুলে দিল গোটা দুনিয়ায়। কেন এই হত্যাকাণ্ড?

তার পরে প্রকাশ্যে এল সরকারি রিপোর্ট— সুইস কমান্ডার এবং তাঁর ভেনেজুয়েলান স্ত্রীকে হত্যা করে আত্মঘাতী হয়েছে সেড্রিক নামের ওই সুইস গার্ড। বলা হতে লাগল, কোনও কারণে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েই এই কাজটা করেছে ওই তরুণ।

কিন্তু সবাই এত সহজে মেনে নিতে পারল না এই ব্যাখ্যাটা। প্রশ্ন উঠতেই লাগল। কিন্তু প্রশ্নের উত্তরে আর কিছু জানা গেল না। ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এল ঝড়ের প্রকোপ। লোকে ভুলে যেতে লাগল ৪ মে-র ওই রক্তাক্ত রাতকে।

এক জন বাদে। সে জানত, সেড্রিক আত্মহত্যা করেনি। করতে পারে না। কারণ, এই কমান্ডারকে মারতে যাওয়ার আগে সব কিছু তাকে খুলে বলেছিল সেড্রিক। তার প্রেমিক!

ঘটনার দিন কয়েক আগে বিছানায় শুয়ে প্রেমিকের বুকে মাথা রেখে সব কিছু শুনেছিল সে। সেড্রিক বলেছিল, ‘আমাকে এই কাজটা করতেই হবে। ওরা বলেছে, পোপের জীবন বিপন্ন। ভ্যাটিকানের অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়বে লোকটা বেঁচে থাকলে। ওর স্ত্রীও জড়িয়ে এর মধ্যে। অতীতে ইস্ট জার্মানির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছে ওই লোকটা। এখন চিনের হয়ে করে। ভাবতে পারছ! চিনের হয়ে।’

সেড্রিকের কথা শুনতে শুনতে তার বুকের মধ্যে একটা ভয়ের চোরাস্রোত বইতে লাগল। এই রকম কাজ সেড্রিক করতে পারবে? ওর বয়স তো অল্প। তারা প্রায় সমবয়সি। আর ছেলেটা ভীষণ নরমসরম। সেড্রিকের অনাবৃত শরীরটা জড়িয়ে ধরে সে বলে উঠেছিল, ‘কিন্তু তুমি কেন? আর কেউ নেই? ওরা নিজেরা করছে না কেন?’

সেড্রিক তার শয্যাসঙ্গীর সোনালি চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলেছিল, ‘অত্যন্ত গোপনীয় ব্যাপার এটা। কেউ জানতে পারবে না। ওরা এমন কাউকে খুঁজছিল, যাকে বিশ্বাস করতে পারবে।’ এর পরেই ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসে সেড্রিক বলেছিল, ‘ওরা আমায় বলেছে, স্বয়ং পোপ নাকি আমার কথা বলেছেন। আমি তো ভাবতেই পারছি না। পোপ আমাকে চেনেন! এই বিশ্বাসের মর্যাদা আমাকে দিতেই হবে।’

এর পরে সঙ্গীর শরীরটা নিজের বুকে টেনে এনে সেড্রিক ফিসফিস করে বলেছিল, ‘তুমি কিছু ভেবো না সোনা। আমি সব সামলে দেব। আমি থাকতে ভ্যাটিকান, পোপ আর আমাদের ধর্মের কোনও ক্ষতি হতে দেব না।’

কিন্তু তার মন মানছিল না। সে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তুমি ওদের বিশ্বাস করো?’

‘অবশ্যই করি। তোমাকে আগে বলা হয়নি। যারা আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল, তাদের মধ্যে আমার এক ছোটবেলার বন্ধু আছে। ও এখন সিক্রেট সার্ভিসের হয়ে কাজ করে। ওর নাম ব্রুনো আর্মানি। ওকে আমি প্রাণ দিয়ে বিশ্বাস করি। ও বলাতেই তো রাজি হয়ে গেলাম।’

এর পরে আর কথা হয়নি। প্রেমিকের আদর খেতে খেতে সে-ও ডুবে গিয়েছিল এক সুখের সাগরে। ভেবেছিল, সেড্রিক ‘যাদের বিশ্বাস করে এই কাজটা করবে, তারা মহান লোক, শক্তিশালী লোক। কোনও ক্ষতি হতে দেবে না ছেলেটার! তা ছাড়া যখন ওর বন্ধুও জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে, তখন তো চিন্তার কিছু নেই।

.

মাস ছয়েক পরে নিজের ছোট্ট ঘরটার মধ্যে বসে তার মনে পড়ছিল সেড্রিকের শেষ কথাগুলো। ‘আমি থাকতে পোপ, ভ্যাটিকানের কোনও ক্ষতি হতে দেব না।’

কথাগুলো মনে পড়তেই অদ্ভুত বিষণ্ণ এক হাসি খেলে গেল তার মুখে। না, সেড্রিক তার জীবন দিয়ে কথা রেখেছে। কিন্তু ছেলেটাকে যারা কাজে লাগিয়ে ছুড়ে ফেলে দিল, তাদের কী হবে? ওই সিক্রেট সার্ভিসের? ওই বন্ধুটার, যার নাম আর্মানি? আর ভ্যাটিকানের?

সে জানে, সেড্রিককে খুন করা হয়েছে। এও জানে, সেই খুনের শাস্তি কেউ পাবে না। কেউ না। কারও ক্ষমতা নেই এই লোকগুলোকে ছোঁয়ার। ভ্যাটিকানকে ছোঁয়ার। পোপকে ছোঁয়ার!

বিছানায় শুয়ে থাকা শরীরটা ফুলে ফুলে উঠতে লাগল কান্নার দমকে। এক ভয়ঙ্কর যন্ত্রণা তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে খাচ্ছে। সে জানে, এই যন্ত্রণা থেকে তার মুক্তি নেই।

‘ঈশ্বর, এটাই কি তোমার ন্যায়বিচার?’

হাহাকার করে উঠল সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *