গোরা – ২৩

২৩

বাবা জগন্নাথ মিশ্র, স্ত্রী লক্ষ্মীদেবীর পিন্ড দিতে গয়ায় যে গোরা গিয়েছিল, পিণ্ডদান অনুষ্ঠান চুকিয়ে বিশ্বরূপের খোঁজে যার দক্ষিণ এবং পশ্চিম ভারতের যত প্রাচীন দেবদেউল, মন্দির, নানা ধর্মীয় শিবির, আখড়া চষে ফেলার কথা, ভ্রমণের সেই কর্মসূচি স্থগিত রেখে দু মাসের মধ্যে সে যখন নবদ্বীপে ফিরল, সে অন্য মানুষ, তাকে দেখে চেনা যায় না। তার অবস্থা দেখে বাড়ির সবাই ঘাবড়ে গেল। তার কী হয়েছে, বিশ্বরূপের খোঁজে কেন সে দক্ষিণ ভারতে গেল না, এসব প্রশ্ন করতে শচী, বিষ্ণুপ্রিয়া, কেউ সাহস পেল না। নবদ্বীপের মানুষ অবাক হয়ে দেখল তাদের ভীষণ চেনা গোরা একদম বদলে গেছে। তার সেই উদ্ধত স্বভাব ঠোঁটে বাঁকা হাসি, পাণ্ডিত্যাভিমান কিছুই নেই, সে বিনয়ে অবনত, না জেনে কিছু অপরাধ করার ম্লানতা তার মুখে ছড়িয়ে রয়েছে। শুকনো দু’ঠোটে মুহূর্তের জন্য হাসি ফুটে উঠে তখনি মিলিয়ে যাচ্ছে। একটু যেন অন্যমনস্ক, দু’একটা কথা অনেক কষ্টে বললেও আগের কথার সঙ্গে পরেরটার বিশেষ যোগাযোগ থাকছে না। অনবরত তার দু’চোখে জল এসে গেলে, চেষ্টা করে সে কান্না সামলাচ্ছে। চোখজোড়া জলে টইটম্বুর হলেও মাজা সোনার মতো শরীর থেকে আলাদা জ্যোতি বেরচ্ছে। বিশাল, মজবুত শরীরের আড়ালে যেন আরো দশাসই আলাদা, অদৃশ্য এক অবয়ব জেগে উঠেছে। পাড়ার গুরুজনরা গোরাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যে ভাষায় আশীর্বাদ করতে থাকল, আগে কখনো তারা সেভাবে তাকে আশীর্বাদ করেনি। গোরার সমবয়সি বন্ধুরা এসে তাকে দেখে চলচ্ছক্তিহীন হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাড়ির উঠোনে, দাওয়ায় দাঁড়িয়ে থাকল। সবাই ভাবতে থাকল, এ কোন্ গোরা? প্রশ্নটা তাদের মনে তোলপাড় করতে থাকল।

আত্মীয়, বন্ধু প্রতিবেশী যখন গোরাকে দেখে একই সঙ্গে বিমোহিত, বিহ্বল, বাড়িতে ছেলের দশা নজর করে শচীদেবী যখন তখন হাউমাউ করে কেঁদে উঠছিল। সতেজ, সপ্রতিভ ছেলেটা কেন এমন আলাভোলা, ছিঁচকাঁদুনে, ননীর পুতুল হয়ে গেল, বুঝতে না পেরে শচীর যত রাগ গিয়ে পড়ল বোনাই, চন্দ্রশেখরের ওপর। যত নষ্টের গোড়া এই চন্দ্রশেখর। গোরার অভিভাবক করে তাকে গয়ায় পাঠানো যে ভুল হয়েছে, তা ভেবে শচীর আক্ষেপের শেষ থাকল না। চন্দ্রশেখর দায়িত্বহীন, অপদার্থ জেনেও তার জিম্মায় গোরাকে গয়া পাঠানোর জন্যে শচীর অপরাধী মনে হল নিজেকে। চন্দ্রশেখরকে জিজ্ঞেস করল, কে আমার এমন সর্বনাশ করল জামাই? গোরাকে বিষ খাইয়ে কে পাগল করল?

ঘাড় হেঁট করে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া চন্দ্রশেখরের কিছু করার ছিল না। গয়া থেকে নবদ্বীপে ফেরার পথে গোরার দশা দেখে চন্দ্রশেখর ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। নবদ্বীপের আত্মীয় পরিজন যে তাকে তুলোধোনা করবে, উঠতে বসতে তার মুণ্ডপাত করবে, অনুমান করে ভয়ে কুঁকড়ে গিয়েছিল। গয়া ছাড়ার আগে থেকেই শচীর কাছে কৈফিয়ত দেওয়ার অবলম্বন খুঁজতে শুরু করেছিল। গদাধরকে একা নির্জনে ডেকে নিয়ে পিণ্ডদানের আগের রাতে ঠিক কী ঘটেছে, তার সঙ্গে গোরার কী কথাবার্তা হয়েছে, বিশদভাবে জানতে কড়া জেরা করেছিল চন্দ্রশেখর। গদাধর যতটা জানে, বলেছিল। রাতে অঘোরে ঘুমনোর জন্যে তার সঙ্গে গোরার বিশেষ কথা হয়নি, জানিয়ে, ভোররাতে তাকে ঘুম থেকে গোরার ডেকে তোলার পর থেকে যা ঘটেছে, চন্দ্রশেখরকে বলেছিল। গদাধরের বিবরণ একাধিকবার শুনে যে ঘটনা চন্দ্রশেখরকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিল, তা হল, গঙ্গার স্রোতে কাপড়ে জড়ানো একটা মোড়ক, গোরার ভাসিয়ে দেওয়ার বৃত্তান্ত। পুঁথি অন্তপ্রাণ গোরা এমন অনুচিত কাজ কীভাবে করল? প্রাণে ধরে গঙ্গায় পুঁথি বিসর্জন দিতে নিশ্চয় মন থেকে সায় পাচ্ছিল না। তাই গদাধরের চোখে কিছুটা ধুলো দিয়ে গোরা কাজটা সেরেছিল। মোড়ক নিয়ে গোরাকে কোনো প্রশ্ন করেনি গদাধর। কাপড় জড়ানো মোড়কে কী ছিল, না দেখেও তার মনে হয়েছে, পাততাড়িতে লেখা পুঁথি হতে পারে!

গদাধরের বিবরণের এ অংশ শুনে চমকে গিয়েছিল চন্দ্রশেখর। সতেরো আঠারো বছর আগে কোনো এক পুঁথি নিয়ে বড়ো ভায়রাভাই জগন্নাথ মিশ্রের সংসারে অশান্তির কিছু আভাস পেয়েছিল সে। পুঁথির বিষয়, পুঁথিটা কার লেখা, এ প্রসঙ্গে কিছু জানতে পারেনি। রগচটা জগন্নাথ মিশ্রের কাছে জানতে চাওয়ার সাহস হয়নি। বাড়ি ছেড়ে বিশ্বরূপ নিরুদ্দেশ হওয়ার পরে, তার অন্তর্ধানের সঙ্গে রহস্যময় সেই পুঁথির যোগাযোগ থাকতে পারে, এ সন্দেহ চন্দ্রশেখরের মনে জেগেছিল। জগন্নাথের জীবদ্দশায়, অথবা তার মৃত্যুর পরে, সেই পুঁথির প্রসঙ্গ আর কখনো শোনা যায়নি। চন্দ্রশেখরের কানে অন্তত পৌঁছোয়নি। জগন্নাথের যত পুঁথি, পৃথিবী ছেড়ে সে চলে যেতে গোরার হস্তগত হয়েছিল। পরিচিতিহীন সেই পুঁথি তাহলে এত বছর গোরার কাছে ছিল। পড়ুয়া ছেলে গোরা। পুঁথির বিষয়বস্তু তার অজানা নয়। এক অথবা একাধিকবার পুঁথিটা সে পড়ে থাকলে সেখানে এমন কিছু গুরুতর আখ্যান পায়নি, যা পরিবারের কাউকে বলা যায়। বালক বিশ্বরূপের পুঁথিতে পাকা মাথার পাণ্ডিত্য, আশা করা যায় না। স্বাধীনভাবে পড়তে লিখতে শেখার পরে বেশিরভাগ বালক গোপনে কালিদাস, ভবভূতির মতো শ্লোক রচনার চেষ্টা করে, মহাকবি হতে চায়। বৈদান্তিক অদ্বৈত আচার্যের ছাত্র, বিশ্বরূপ হয়তো আরো কয়েক পা এগিয়ে ন্যায়শাস্ত্রের ভাষ্য লেখার প্রয়াস চালিয়েছিল। হাসির খোরাক, বালখিল্য রচনার নিদর্শন, সেই পুঁথি গয়ার গঙ্গায় গোরা নিশ্চয় ভাসিয়ে দিয়েছে। সেই ঘটনার সঙ্গে গোরার আচরণের খোল নলচে বদলে যাওয়ার যোগাযোগ থাকতে পারে না। পুঁথি ভাসানোর বিবরণ তাই শচীকে শোনানোর দরকার মনে করেনি চন্দ্রশেখর।

শচীর অভিযোগ, কান্না চুপচাপ হজম করলেও শেষবারের মতো নিজেকে বাঁচাতে ঈশ্বরপুরীর কাছে গোরার দীক্ষা নেওয়ার ঘটনা, বড়ো শালিকে জানিয়ে বোঝাতে চাইল পুরীগোঁসাই-এর দেওয়া ইষ্টমন্ত্রের প্রভাবে গোরার চালচলন বদলে গেছে। মগজ কিঞ্চিৎ বিগড়ে গেলে, অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে তা সাময়িক। মন্ত্র নেওয়ার জের তাড়াতাড়ি কেটে যাবে। সাংসারিক জীবনে স্বস্থানে ফিরে আসবে গোরা। সন্ন্যাসীর মতো সংসার করার ইচ্ছে নিয়ে বেশিরভাগ গৃহকর্তা তখন নির্বাচিত গুরুর কাছে মন্ত্রদীক্ষা নিয়ে থাকত। এ ঘটনাতে কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল না। গৃহকর্তার মন্ত্রদীক্ষা নেওয়ার ইচ্ছে জাগলে গৃহিণীও উৎসাহ জোগাত। জগন্নাথ শচী, দু’জনের দীক্ষাগুরু ছিলেন অদ্বৈত আচার্য। ঈশ্বরপুরীর কাছে গোরার মন্ত্র নেওয়াতে অস্বাভাবিক কিছু না থাকলেও চন্দ্রশেখরের কাছ থেকে সে খবর পেয়ে নতুন করে শচী ফুলে ফুলে কাঁদতে শুরু করেছিল। ঈশ্বরপুরীর মন্ত্র নিয়ে গোরা পাগল হয়ে গেছে, তখনি সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল শচী। ঈশ্বরপুরীকে অভিযুক্ত করে অঝোরে কাঁদতে থাকল। মিশ্রদম্পতি, জগন্নাথ শচী যার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েছিল, সেই অদ্বৈত আচার্যও ছাড় পেল না শচীর অভিযোগ থেকে। অদ্বৈতের টোলে পড়ার সময়ে তার প্ররোচনাতে বিশ্বরূপ যে বিবাগী হয়ে সংসার ছেড়েছিল, শচী ভোলেনি। গুরু অদ্বৈতের দেওয়া মন্ত্র, পঁচিশ বছর ধরে শচী জপ করলেও গুরুর ওপর আস্থা হারিয়েছিল। স্বামী বেঁচে থাকতে তার সামনে গুরু সম্পর্কে কটুকাটব্য করতে ছাড়েনি। পুরনো শোকের সঙ্গে গোরার জন্যে ভয়, ভীতি উদ্বেগে থেকে থেকে শচী ডুকরে কেঁদে উঠতে থাকল। ঘরের আড়ালে তরুণী বধূ বিষ্ণুপ্রিয়ার চোখের জলে বুক ভাসতে থাকলেও বাইরের কেউ নজর করল না।

.

মায়ের অভিযোগ, মায়ের মুখে গুরু নিন্দা শুনেও পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে গোরা বসে থাকল। নিঃশব্দে জপ করতে থাকল ঈশ্বরপুরীর দেওয়া কৃষ্ণকেশব মন্ত্র। কৃষ্ণ মানে, প্রেম, কৃষ্ণ মানে ভালবাসা, ভক্তি, শক্তি, গান, সুর, মানুষ, প্রতিটি মানুষ, সম্মুখিত লক্ষ কোটি মানুষ, ধর্ম, জাতপাত নির্বিশেষে মানব সংঘ। মন্ত্রদীক্ষার পরে গয়ায় গঙ্গার ধারে গাছতলায় বসে ঈশ্বরপুরী সে গল্প তাকে শুনিয়েছে, তার মনে পড়ল। গল্পটা এরকম। দীক্ষা নিতে আগ্রহী দুই ভক্তকে এক সন্ন্যাসী একটা করে বীজধান দিয়ে, সযত্নে কিছুকাল বীজদু’টি রাখতে বলে তীর্থপরিক্রমায় চলে গেল। পরিক্রমা সেরে, পাঁচ বছর পরে দুই ভক্তকে দীক্ষা দিতে গুরু ফিরে এল। দীক্ষা দানের নির্ধারিত দিনে দুই ভক্তের কাছে গচ্ছিত বীজধান দুটো গুরু নিয়ে আসতে বললে, প্রথম জন কারুকাজ করা কাঠের পেটি খুলে, তুলোয় জড়ানো বীজধান বার করতে দেখা গেল, সেটা তুষ হয়ে গেছে। সন্ন্যাসীর হাতে ধানের কণাটি তুলে দেওয়ার আগে ঝুরঝুর করে ধুলোর মতো গুঁড়ো হয়ে সেটা মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল। লজ্জায় হেঁট হয়ে গেল প্রথম জনের মাথা। দ্বিতীয় ভক্ত তার খামারের মধ্যে বড়ো এক মরাই-এর ধারে গুরুকে নিয়ে এসে গোলা ভর্তি ধান দেখিয়ে বলল, এই মরাই-এর হাজার মণ ধানের প্রতিটা আপনার। প্রথম বছরে আপনার আশীর্বাদী বীজধান মাটিতে পুঁতে যে চার মুঠো ধান পেয়েছিলাম, পরের কয়েক বছরে তা আবাদ করে আজ এই গোলা ভরে গেছে।

দীক্ষা নেওয়ার আশা ছেড়ে প্রথম জন সরে পড়লে, দ্বিতীয়জনকে কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষা দিয়ে সন্ন্যাসী বলল, হাজার হাজার মানুষকে কৃষ্ণ নামে মিলিয়ে নাও। তাদের বলো, তুমিই কৃষ্ণ, তুমি যার সঙ্গে কথা বলছ, যাকে দেখছ, সবাই কৃষ্ণ। তাদের সংস্পর্শে যারা আসছে, সকলে কৃষ্ণ। তুমি প্রেম, ভক্তি, শক্তি, মুক্তি, ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার অধিনেতা

অভিভূতের মতো ঈশ্বরপুরীর গল্প শুনে গোরার দু’চোখ দিয়ে জল পড়েছিল। বলেছিল, আমিও হাজার হাজার ধানের গোলা গড়ে তুলব।

তার পিঠে সস্নেহে হাত রেখে ঈশ্বরপুরী বলল, হ্যাঁ, তুমি কৃষ্ণাবতার, স্বয়ং কৃষ্ণ, তোমার গণেদের সঙ্গে দেশবাসী মেনে নেবে তোমাকে। তুমিই পারবে তাদের চোখ খুলে দিতে, জাগিয়ে তুলবে তাদের।

ঈশ্বর পুরী আরো কিছু কথা বলেছিল, যার প্রতিটা শব্দ গোরার মনে রয়েছে। স্মৃতিধর সে। বিশ্বরূপের পুঁথি একবার পড়ে মগজে ভরে নিয়েছে। আদ্যন্ত কণ্ঠস্থ বিশ্বরূপের পুঁথির সঙ্গে দীক্ষাগুরুর কথার প্রচুর মিল পেয়ে গোরা আশ্চর্য হয়েছিল। বিশ্বরূপের পুঁথি পড়ার সুযোগ পুরী গোঁসাই-এর না ঘটলেও কীভাবে দু’জনের আখ্যানে, বাচনে মিল হল, গোরা হদিশ পেল না। বুকের মধ্যে জমে থাকা ভাব বিহ্বলতা, ঘনিষ্ঠ সুহৃদদের জানাতে গোরা যখন ব্যস্ততা বোধ করছে, তখনো দাওয়ায় বসে মনের ক্ষোভ উগড়ে দিচ্ছিল শচী। ঈশ্বরপুরীর দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে গোরাকে কৃষ্ণমন্ত্রে দীক্ষিত করে পাগল বানানোর জন্যে পুরী গোঁসাইকে দায়ী করে শচী থামল না। ঈশ্বরপুরীর গুরুভাই, অদ্বৈত যেভাবে উসকানি দিয়ে বিশ্বরূপকে বিবাগী, ঘরছাড়া করেছে, সে ঘটনাও আওড়ে যাচ্ছিল। তাদের গুরু মাধবেন্দ্র পুরীও দেশের অনেক ভক্ত শিষ্য মা বাবার কোল খালি করে তাদের প্রিয়তম ছেলেকে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠার ফুসমন্তর দিয়ে সংসার থেকে যে ভাগিয়ে নিয়ে গেছে, এমন কথাও তার মুখে আটকাচ্ছিল না।

মায়ের বিষোদ্গার গোরার কানে গেলেও সে মাথা গুঁজে শুনছিল। মনে কষ্ট পেলেও রা কাড়ছিল না। সে শুধু কাঁদছিল আর কৃষ্ণনাম জপ করছিল। তার জীবন থেকে শুকনো পাতার মতো খসে গিয়েছিল ধর্মের অহমিকা, বংশ পরিচয়ের দম্ভ, পাণ্ডিত্যের ঔদ্ধত্য, এমনকী মা ছাড়া পারিবারিক সব সম্পর্ক নিষ্প্রভ ঠেকছিল। গুরু ঈশ্বরপুরীর বিরুদ্ধে মায়ের অভিযোগ শুনে মনে ব্যথা পেলেও নিঃশব্দে অগ্রাহ্য করছিল। নিজের গুরু অদ্বৈত আচার্যকেও শচী তুলোধোনা করছিল। গুরু নিন্দা যে কত বড়ো দোষ, বৈষ্ণবাপরাধ, তা জেনেও মায়ের জন্যে সমবেদনায় গোরা মুখ ফুটে মাকে একটা কথা বলতে পারছিল না। মাথা গরম করার অনুভূতি বিশ্বরূপের পুঁথির সঙ্গে গয়ার গঙ্গায় সে ভাসিয়ে দিয়ে এসেছে। এ জীবনে আর কখনো তার মাথা গরম করার সুযোগ হবে না। পুরনো গোরা মৃত। গয়ার ধর্মশালায় বসন্তের নিস্তব্ধ রাতে প্রদীপের আলোর সামনে যে নতুন গোরার জন্ম হয়েছে, সে মিশ্র পরিবারের কেউ নয়, সে সুনম্র, অন্তর্মুখী স্বভাবের মূর্তিমান বিগ্রহ, এই পৃথিবীর অনধিকারীদের অধিকারী, গোত্রপরিচয়হীন গোপবালক, মানুষকে সে বলবে,

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে।

—দুষ্কৃতি বিনাশ করে শিষ্ট সমাজ, ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে যুগের ডাকে আমি পৃথিবীতে ফিরে আসি।

হ্যাঁ, একথা বলার অধিকার সে পেয়েছে। বিশ্বরূপের পুঁথি থেকে সে জেনেছে, আত্মপরিচয়। আপামর জনসাধারণকে নিজের এই পরিচয় জানানোর অনুমোদন তাকে দিয়েছে, তার গুরু, শূদ্রাধম ঈশ্বরপুরী।

গোরার দু’চোখ জলে ভরে গেল। গুরুর সঙ্গে এ জীবনে তার আর দেখা হবে না। ঈশ্বর পুরী, স্বয়ং সে কথা জানিয়ে গেছে তাকে। মুখোমুখি দেখা না হলেও ভাবজগতে দু’জনের যোগাযোগ ছিন্ন হবে না, পুরী গোঁসাই স্বীকার করে নিয়েছেন। গোরাকে আশ্বস্ত করেছে।

বৈশাখের সকাল রোদে ভেসে যাওয়ার আগে পাশের পাড়ায় সুদরিদ্র ব্রাহ্মণ, পরম বৈষ্ণব শুক্লাম্বর ব্রহ্মচারীর বাড়িতে গোরা পৌঁছে গেল। সেখানে আগে থেকে নির্ধারিত সময় মেনে শ্রীমান পণ্ডিত, মুরারি, শ্রীবাস, মুকুন্দ, গদাধর, শ্রীখণ্ডের নরহরি, সদাশিব পৌঁছে গিয়েছিল। নবদ্বীপে ফিরে, পরের দিন বিশিষ্ট কয়েকজন অনুরাগী বৈষ্ণবভক্তকে নিয়ে এই বৈঠকের আয়োজন করতে মুরারি আর গদাধরকে গোরা লাগিয়ে দিয়েছিল। শুক্লাম্বরের বাড়িতে নানা বয়সের কয়েকজন চেনা বৈষ্ণব ভক্তকে দেখে গোরা ভাবাকুল হয়ে পড়ল। গয়ার অভিজ্ঞতা বলতে শুরু করে দু’চার কথা বলার মধ্যে বিশ্বরূপের পুঁথির কিছু শ্লোক মনে পড়তে তখনই গোরা বেহুঁশ হয়ে গেল। বায়ুরোগাক্রান্ত মানুষ ভিরমি খেয়ে মাটিতে পড়ে গেলে তার শরীরে যে সব লক্ষণ দেখা যায়, গোরার দেহে তেমন কিছু দেখতে পেল না প্রবীণ শ্রীবাস। তার সমবয়সি, শ্রীমান পণ্ডিতও অভিজ্ঞ দৃষ্টিতে গোরাকে খুঁটিয়ে দেখে মৃগীরোগীর বিকার, হাত পায়ের খিঁচুনি, দাঁতে জাঁতি লেগে দুষ বেয়ে গ্যাজলা গড়ানো, মুখে কালসিটে ফুটে ওঠা, এরকম, কিছু নজর করল না। বরং গোরার আদুল বুকে ফর্সা মুখে দিব্য আভা ফুটে উঠতে দেখে অবাক হল গোরার গয়া যাওয়ার তিন সঙ্গী, মুরারি, মুকুন্দ, গদাধর আগে কয়েকবার অচেতন গোরার এই মূর্তি দেখে, কিছুটা সাব্যস্ত হয়ে গিয়েছিল। গয়ার ধর্মশালা, বিষ্ণুমন্দিরে চার, পাঁচ দফায় গোরা জ্ঞান হারানোর পরে তাকে সুখ স্বপ্নে বিভাসিত ধীর, শান্ত, নিদ্রিত মানুষ ছাড়া সঙ্গীদের আর কিছু মনে হয়নি। চেতনাহীন গোরার এই মূর্তি তিনজনের অচেনা নয়। গোরার কানের কাছে মুখ নিয়ে ভাগবতের কৃষ্ণকথার শ্লোক মুরারি নিচু স্বরে সুরেলা গলায় মধুর সংগীতের মতো ঢেলে দিতে থাকল। প্রথম শ্লোক শেষ হতে মুরারিকে থামতে দিল না গদাধর। দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্লোক গান করে, মুরারি বিরতি ঘটাতে তাকে স্তবগান চালিয়ে যেতে বলল মুকুন্দ। মুরারি চুপ। তখনই গোরার হুঁশ ফিরল। গোরা যখন উঠে বসল তার অন্য মূর্তি। গোরার মুখ, সারা শরীর থেকে দ্যুতি বেরোচ্ছে, আয়ত দু’চোখে অপার্থিব চাউনি। বিশ্বরূপের পুঁথির প্রসঙ্গ ভুলে গেছে, অথচ ভোলেনি। তার রক্তে মিশে গেছে বিশ্বরূপের পুঁথির বাচনের সঙ্গে গুরু ঈশ্বরপুরীর কথকতা। সে এমন কিছু কথা বলে চলেছে যা শুনে গৃহকর্তা শুক্লাম্বর সমেত সাতজন শ্রোতার শরীরের লোম খাড়া হয়ে গেছে, বুক, পিঠে কুলকুল করে ঘাম বইতে শুরু করেছে, কাঁপুনি জেগেছে শ্রীবাস, শ্রীমানের শরীরে। ভূতগ্রস্তের মতো গোরা বলছিল, ওরে সংসারী লোক, এবার তোমরা দেখো আমার নাট্যগীত আলেখ্য। আমার কোনো পরিচয় নেই, প্রেম থেকে আমার জন্ম, প্রেম আমার কেনাবেচার হাট, কে কার বাবা, কার মা, স্বামী, স্ত্রী, ছেলে মেয়ে বন্ধু, সখা, সব স্বপ্নে পাওয়া সম্পর্ক, স্বপ্নে দেখা হয় তাদের সঙ্গে, আমরা যা দেখছি সব বাজিকর কৃষ্ণের খেলা, আমাদের জন্যে অনেক বড় ডাক আছে তার তরফ থেকে। বড়ো কাজের ডাক। সব আত্মীয়তা, স্বপ্ন, খেলা বিত্ত সম্পদ যখন সেই বড়ো কাজের হাঁকে মিশে যায়, কথার মাঝখানে নিশ্চুপ হয়ে গোরা ‘বোল কৃষ্ণ বোল, কৃষ্ণ বোল’ এমন এক হুঙ্কার ছাড়ল, যে শুক্লাম্বরের ভিটে পর্যন্ত কেঁপে গেল। রোমাঞ্চিত শ্রীবাস নিঃশব্দে ‘হরেকৃষ্ণ’ মন্ত্র জপ করতে থাকল, শ্রীমান পণ্ডিত প্রহেলিকা দেখতে থাকল। তার মনে হল, সামনে বিশালদেহী শ্রীকৃষ্ণ, ষড়ভুজ মূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। নরহরি দেখল, লক্ষ্মীর কোলে মাথা রেখে অনন্তনাগে নারায়ণ শুয়ে রয়েছে, গোরার গয়াযাত্রার তিন সঙ্গী, মুরারি, মুকুন্দ, গদাধরের চোখ দিয়ে এত জল ঝরতে থাকল যে তারা কিছু ঠাহর করতে পারল না। শুক্লাম্বরের মাটির ভিটের সঙ্গে তাদের শরীর পর্যন্ত কেঁপে গেল। ঐশী ঘোরে পাওয়া মানুষের মতো গোরা তখনো বলে চলেছে, পদ্মপাতায় জলের বিন্দুর মতো টলমল করছে মানুষের জীবন। পাতা থেকে সেই চঞ্চল জল বিন্দু, প্রতি মুহূর্তে খসে পড়ছে। স্ত্রী কাল, পুত্র কাল, ধনজন, ইষ্টমিত্র, কুটুম জ্ঞাতি সব মায়াজাল, আজ আছে, কাল নেই। আম গাছের গা থেকে তার বাকল অচিরে ঝরে যায়, যে শিশুরা এখন পথে ধুলো মেখে খেলা করছে, কাল খেলা ছেড়ে তারা যখন অদৃশ্য হবে, তখন পথের ধুলোয় খেলায় মেতে উঠবে নতুন এক ঝাঁক শিশু। একের পর এক ঢেউয়ের মতো জীবন, মৃত্যু ভেঙে পড়ছে। ‘রমণী জননী হয়, জননী রমণী।’ জলবিন্দুর মতো অল্পায়ু এই জীবন সার্থক করতে কৃষ্ণ নামের মহাসমুদ্রে মিশে যাও। কৃষ্ণ মানে, ঈশ্বর, মাটি, পৃথিবী, সমুদ্র, মহাকাশ, লাখ লাখ মানুষ, তাদের কর্ম, তাদের মুক্তি, গান, হাতে তৈরি ধর্মরাজ্য। ‘বোল কৃষ্ণ, কৃষ্ণ বোল, কৃষ্ণ, কৃষ্ণ বোল’, নামোচ্চারণের মধ্যে গোরা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। শুক্লাম্বরের ঘরে যারা বসে ছিল, তারা দেখল, গোরা তাকিয়ে থাকলেও কাউকে দেখছে না, কিছু দেখছে না, গভীর আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পৃথিবীর ওপারে কোনো এক দৃশ্যে ডুবে রয়েছে। তার শরীর স্থির, শ্বাস পর্যন্ত পড়ছে না। কিছুক্ষণ এভাবে কাটার পরে গোরার নিষ্কম্প দেহ নড়ে উঠল। শ্রীবাস দেখল, স্বাভাবিক হচ্ছে গোরার দৃষ্টি। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তাই ঘটল। ঘুম থেকে মানুষ জেগে উঠে বিছানার পাশে সুহৃদদের দেখলে, যেভাবে তাকায়, গোরা সেভাবে সবাইকে নজর করে লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, আমি যদি কিছু আবোল তাবোল বকে থাকি, তাহলে আমার অপরাধ, তোমরা নিজগুণে মাপ করে দিও। আমার বাচালতার বিবরণ দয়া করে কাউকে জানিও না। গয়াতে যাওয়ার পর থেকে আমি আর আমার মধ্যে নেই। আমার যা ছিল, সব হারিয়ে গেছে। তোমরা কৃপা করে তোমাদের পাশে আমাকে ঠাঁই দিলে আমি কৃষ্ণনামে প্রেমের হাট, খামার গোলা ভরে দেব।

গোরার বলার বিনীত ভঙ্গিতে সুবচনে সকলের চোখ জলে ভরে গেলেও সবচেয়ে বেশি কাঁদছিল প্রবীণ বৈষ্ণবভক্ত শ্রীবাস পণ্ডিত। গোরার বাবা জগন্নাথ মিশ্রের প্রাণের বন্ধু শ্রীবাস, জন্মাতে দেখেছে গোরাকে। তার পুরো শৈশব, বেশিটা বালককাল কেটেছে শ্রীবাসের বাড়ির আঙিনায়, তার চোখের সামনে। শচীর গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর, আঁতুড়ঘরে নবজাতককে দেখে শ্রীবাসের মনে যে বিস্ময় জেগেছিল, পরের বছরগুলোতে তা ক্ৰমাগত বেড়েছে। শ্রীবাস ভেবেছে, কাকের বাসায় কোথা থেকে এল এই কোকিলশাবক? চেহারা চরিত্র আচরণে, নবদ্বীপে অদ্বিতীয় এই সন্তানকে সুহৃদ, জগন্নাথ আগলে রাখতে পারবে? গোরার জন্মের কয়েকদিন পরে নবদ্বীপের কাজির গুপ্তচরেরা সঙ্কীর্তন করার অপরাধে মাঝরাতে শ্রীবাসের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে সপরিবারে তাকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছিল। পরিবারকে শ্রীবাস বাঁচাতে পারলেও তিন ভাইকে নিয়ে চোখের সামনে কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যেতে দেখেছিল। উদ্বাস্তু হয়েছিল গোটা পরিবার। শচী তখনো আঁতুড় ছেড়ে বেরোয়নি। শান্তিপুরে অদ্বৈত আচার্যের বাড়িতে সপরিবারে আশ্রয় নিয়ে, বাস্তু উদ্ধার করে শ্রীবাস সেখানে ফিরল দু’মাস পরে। শচীর অশৌচ কাটাতে মাঝে একদিন এসে জগন্নাথের শিশুসন্তানের মুখ দেখে তাকে আশীর্বাদ করে গিয়েছিল অদ্বৈত। জগন্নাথের নবজাত সন্তানের দিকে শ্রীবাসকে নজর রাখতে বলেছিল। কৃষ্ণাবতার আবির্ভাবে অদ্বৈতের আকুল প্ৰাৰ্থনা, কান্না, হাহাকার, হুঙ্কার নিজের চোখে দু’মাস ধরে দেখে তার বিশ্বাস জন্মেছিল, অদ্বৈতের প্রার্থনা ব্যর্থ হবে না। আচার্যের প্রার্থনা সফল হয়েছে। গোরা যে সেই মহাশক্তি, পরমপুরুষ কৃষ্ণ, এ নিয়ে শ্রীবাসের সন্দেহ থাকল না। শান্তিপুরে অদ্বৈতের কানে খবরটা পৌঁছে দিতে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। অদ্বৈতের উপদেশ শ্রীবাস ভোলেনি। গোরাকে চোখে চোখে রেখেছিল। জগন্নাথের দেহান্ত হওয়ার পর থেকে তার সংসারকে অভিভাবকের মতো সামলে রেখেছিল শ্রীনীবাস। তার পাশে দাঁড়িয়েছিল স্ত্রী মালিনী। গোরা যত বড়ো হচ্ছিল, তাঁকে বৈষ্ণব সমাজে টেনে নেওয়ার ইচ্ছে প্রলুব্ধ করছিল শ্রীবাসকে। গোরাকে সরাসরি নিজের বাড়িতে সঙ্কীর্তনের আসরে আসতে না বললেও, আভাসে ইঙ্গিতে ডাক পাঠিয়েছিল। গোরা বুঝেও না বোঝার ভান করে পাশ কাটিয়ে গেছে। ন্যায়শাস্ত্রী, স্মার্ত, তান্ত্রিক, শাক্ত বৈষ্ণব, হিন্দুধর্মের কোনো শাখা নিয়ে তার আগ্রহ নেই, হাবভাবে গোরা বুঝিয়ে দিত। তবু তাকে দেখলে শ্রীবাসের সুপ্ত ইচ্ছেটা মনের মধ্যে আনচান করত। গোরাকে পেলে বৈষ্ণব মহলে ভক্তির জোয়ার আসবে, এ নিয়ে তার সন্দেহ ছিল না। বৈষ্ণব সমাজের প্রকৃত নেতা হয়ে উঠবে সে। কৃষ্ণাবতারের জন্যে অদ্বৈত আচার্যের অর্ধশতক ধরে আর্তি, গোরাকে ঘিরে সফল হয়ে উঠবে। আকাশ থেকে নেমে আসা এই মহাবার্তা সকলের আগে জানার অধিকার অদ্বৈত আচার্যের। অসম্ভবকে সম্ভব করেছে সেই পরম ভক্ত, আচার্য। সত্যিকথা বলতে কি, গোরাকে সঙ্কীর্তনে টেনে আনার আশা শ্রীবাস প্রায় ছেড়ে দিয়েছিল। মনস্কামনা পূর্ণ হওয়ার বদলে ক্রমশ হতাশ হতে থাকল সে। বৈষ্ণবদের এড়িয়ে ম্লেচ্ছ, শূদ্র লোকসমাজের সঙ্গে গোরা মেলামেশা ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে দিল। ঘরে, বাইরে শাস্ত্রীয় আচার আচরণ মেনে চলার বালাই রাখল না। বৈষ্ণবসমাজের ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেল। গোরার নির্দেশে নিজের বাড়ির উঠোনে লক্ষ্মীকাচ নাটগীতির অনুষ্ঠান করে, আরো নানাভাবে তোয়াজ করে, শেষপর্যন্ত তাকে সম্প্রদায়ভুক্ত করতে না পেরে শ্রীবাস হাল ছেড়ে দিয়েছিল। গোরাকে নিয়ে তার প্রত্যাশা যখন ধূলিসাৎ হতে চলেছে, তখনই শুক্লাম্বর ব্রহ্মচারীর বাড়িতে ভাবাবিষ্ট গোরাকে দেখে আহ্লাদে শ্রীবাসের মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হল। গয়া থেকে গোরা পাগল হয়ে ঘরে ফিরেছে ভেবে তিন দিন ধরে শচী যে ইনিয়ে বিনিয়ে কেঁদে চলেছে, তা একেবারে কাণ্ডজ্ঞানহীন জল্পনা, গোরাকে দেখে শ্রীবাস বুঝে গেল অলৌকিক ভগবদভক্তিতে মন ভরপুর না হলে একজন মানুষ এভাবে বদলে যায় না। গোরা পাগল নয়, সে মহাভাবে আপ্লুত হয়েছে। সঙ্কীর্তনের আসরে তাকে হাজির করে গানের সুরে উজ্জীবিত করে তুলতে হবে। কৃষ্ণাবতারকে জাগানোর সেরা উপকরণ হল গান, নাচ সঙ্কীর্তন।

সেই দুপুরে শ্রীবাস তড়িঘড়ি শান্তিপুরে গিয়ে অদ্বৈত আচার্যকে জানাল, আচার্যের আকুল প্রার্থনা নিষ্ফল হয়নি, মহাভক্তের হুঙ্কারে টলমল করে উঠেছে গোলোকপতির সিংহাসন, কৃষ্ণাবতার ধরাধামে এসে গেছে। মহাভাবে আবিষ্ট গোরার এক জীবনে জন্মান্তর ঘটে যাওয়ার বিবরণ খুঁটিনাটি সমেত অদ্বৈতকে শোনাল শ্রীবাস। আনন্দে হুঙ্কার দিয়ে অদ্বৈত জপ করতে থাকল,

“স ভবান সর্বলোকস্য ভবায় বিভবায় চ।
অবতীর্নোংশভাগেন সাম্প্রতং পতিরাশিযাম।।
নমঃ পরমকল্যাণ নমঃ পরমমঙ্গল।
হে পরম কল্যাণ, পরমমঙ্গল, ভক্তের অভিলাষ
পূরণকারী ঈশ্বরের অবতার, তোমাকে শত কোটি
প্রণাম জানাই।

কৃষ্ণস্তবের জেরে অদ্বৈত ধ্যানস্থ হয়ে যেতে শ্রীবাসের মনে হল, তার সামনে স্বয়ং ব্রহ্মা বসে আছে। অদ্বৈতের পায়ের সামনে সাষ্টাঙ্গে লুটিয়ে তার দু’পা ধরে প্রণাম করল শ্রীবাস।

নবদ্বীপে শ্রীবাস ফেরার আগে তাকে একদিন গোরাকে শান্তিপুরে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসতে বলল অদ্বৈত। দিনক্ষণ পাকা হয়ে গেল। নির্ধারিত তারিখে, দুপুরে দু’জনের মধ্যাহৄভোজের আয়োজন থাকবে, সবিনয়ে অদ্বৈত জানিয়ে দিল শ্রীবাসকে।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *