গোরা – ১০

১০

বাড়ির দক্ষিণ-পুবে চারটে বিশাল শোয়ার ঘরের যেটাতে ত্রিদিবনাথ ঘুমোয়, সেখানে তার একানে খাটের বিছানা ছাড়া আরও তিনটে খাট রয়েছে। তিনটে ‘সিঙ্গল’ খাটে বিছানা পাতা ‘সিরিয়াল’ তৈরির দিনগুলোতে সেজকাকার সঙ্গে অভিনেতা, কলাকুশলীদের তিন জন, রাতে এই ঘরে শোয়, বিছানার পরিচ্ছন্ন ঢাকা দেখে গোরা টের পেল। তার জন্যে নির্ধারিত বিছানা দেখিয়ে দিয়ে অফিসঘর থেকে কলকাতায় ফোন করে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ত্রিদিবনাথ ঘরে ফিরতে তার দু’চোখে মজাদার হাসি চিকচিক করতে দেখল গোরা। ফোন করে অফিসঘরে যাওয়ার আগে গোরাকে সঙ্গী করতে চেয়েছিল ত্রিদিবনাথ। গোরা যায়নি। সকালের ইংরেজি সংবাদপত্র নিয়ে নিজের বিছানায় পড়তে বসেছিল।

কলকাতায় বাবার সঙ্গে টেলিফোনে সেজকাকার কী কথা হল, জানতে ইচ্ছে করলেও গোরা মুখ খুলল না। কোনও আগ্রহ না দেখিয়ে খবরের কাগজে চোখ রাখল। ত্রিদিবনাথ নিজে থেকে বলল, তোর বাবা টেলিফোনে কী বলল শুনবি?

আমি জানি।

গোরার জবাব শুনে ঈষৎ থতমত খেয়ে পরের মুহূর্তে মুচকি হেসে ত্রিদিবনাথ বলল, আমিও তাই আঁচ করেছিলাম, তুই জানিস। টেলিফোনে মেজদার সঙ্গে আমি কথা বলতে যাচ্ছি শুনেও, অফিসঘরে তুই যাসনি। কথা শোনার আগ্রহ দেখাসনি। ‘গোরা’’মেগাসিরিয়ালে’ তোকে কাজ করানো নিয়ে, মেজদা মানে তোর বাবা, প্রমথনাথ রায় কীভাবে সাড়া দেবে, তুই জানতিস। তুই যা ভেবেছিলি, তাই ঘটেছে।

পরের কথাটা ত্রিদিবনাথ বলার আগে গোরা বলল, ছেলেটা যাতে মানুষ হয়, বাবা নিশ্চয় তেমন ব্যবস্থা করতে বলল।

ঠিক এই কথাটা যে কলকাতা থেকে প্রমথনাথ বলেছে, তা গোরাকে শোনানোর আগে সেজকাকা যখন মিটিমিটি হাসছে, গোরা বলল, বাবার কথার পিঠে তুমি নিশ্চয় মানুষ হওয়া মানে কি’ জানতে চেয়ে শুনেছ, ‘তোর মতো বিজ্ঞানীরাই তো প্রকৃত মানুষ।

মাপা হাসি মুখে নিয়ে গোরার দিকে তাকিয়ে থাকলেও ত্রিদিবনাথের বুকের ভেতরের লাবডুব ধ্বনি দ্রুততর হচ্ছে। তার সন্দেহ হল, টেলিফোনে তার বলা কথাগুলো, কাছাকাছি কোথাও গোরা আড়ি পেতে দাঁড়িয়ে শুনেছে। কিন্তু কলকাতা থেকে দূরভাষে ভেসে আসা প্রমথনাথের কথা, গোরার কানে গেল কী করে? সবচেয়ে বড় কথা, আড়ি পেতে অন্যের কথা শোনার মতো ছেলে, গোরা নয়।

সেজকাকার নিস্তব্ধ মুখের ওপর চোখ রেখে, শিশুর হাসি ঠোঁটে ছড়িয়ে গোরা বলল, আইনজীবী প্রমথনাথের কথা শুনে আইনমাফিক সৌজন্য মেনে তুমি বললে, ব্যবহারজীবীরা-ই কী এমন কম দরের মানুষ?

তোমাকে থামিয়ে দিয়ে বাবা বলল, আমার পেশাকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করে আমার ছেলে, গোরা।

প্রাপ্তবয়সি দু’জন মানুষের টেলিফোন কথোপকথন না শুনে, চব্বিশ বছরের একটা ছেলে, কীভাবে গড়গড় করে তা বলে চলেছে, ত্রিদিবনাথ ঠাহর করতে না পেরে ধাঁধা খেয়ে গেল। হেঁয়ালির মীমাংসা করল গোরা। বলল, মামা, কাকা, পিসে, মেসোদের সঙ্গে হরবক্ত বাবার এই ‘ডায়ালগ’ শুনে আমার কান পচে গেছে। মা বাবার বিশ্বাস ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অথবা তোমার মতো বিজ্ঞানী না হলে কাউকে উঁচু দরের মানুষ বলা যায় না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্যে দ্বিতীয়বার, ‘জয়েন্ট এন্ট্রান্স’ পরীক্ষায় আমি গাড়ু মারতে বাবার ‘হার্টফেল’ করার দশা হয়েছিল। চোখের জলে, থেকে থেকে ভিজে উঠছিল মায়ের শাড়ির আঁচল। উঠতে বসতে শুরু হল তৃতীয়বার ‘জয়েন্টে’ বসার চাপ। ‘ধ্যুত্তারি’ বলে ‘সায়েন্স’ পড়া ছেড়ে কমার্স পড়তে ভর্তি হয়ে গেলাম।

নিজের পরিবারের কাহিনী, সহোদর-ভাই এর তরুণ ছেলের মুখ থেকে তার জীবনবৃত্তান্ত শুনতে, রূপকথার গল্পের মতো লাগছিল ত্রিদিবনাথের কানে। সে যখন আরও শুনতে চাইছে, গোরা চুপ হয়ে গেল। তাকে আর খোঁচালো না ত্রিদিবনাথ। কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে নিজের বিছানায় বসে গোরাকে জিজ্ঞেস করল, দুপুরে ঘুমোবি নাকি?

তুমি কি ‘টায়ার্ড’, ক্লান্ত?

গোরার প্রশ্নে ত্রিদিবনাথ বলল, এক ফোঁটা নয়।

তাহলে তোমার সিরিয়ালের বাকি গল্পটা বলো।

ত্রিদিবনাথ নড়েচড়ে বসে শুরু করল।

স্বামী জগন্নাথ মিশ্র হঠাৎ নিদারুণ অসুখে বিছানা নিতে স্ত্রী শচীঠাকরুণ ভয় পেয়ে গেল। যজমান বাড়িতে নিয়ম করে যাওয়া, পুজো, হোম, দানদক্ষিণা নিয়ে যে সবল মানুষটা রোজ ঊষাকাল থেকে ব্যস্ত হয়ে পড়ত, শরতের মাঝামাঝি তাকে প্রায় চলচ্ছক্তিহীন হতে দেখে, আতঙ্কিত শচীর হাত পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাওয়ার উপক্রম হল। শরীরে যার রোগব্যাধির বালাই নেই, কোন্ কঠিন ব্যামো ধরল তাকে? সকালের দিকে এখন সিরসিরে বাতাস বইলেও তা শীতের হাওয়া নয়। তবে সময়টা ভালো নয়। ঘরে ঘরে জ্বরজারি। বাবার অসুস্থতায় মায়ের মতো বিশ্বরূপও বেদম ঘাবড়ে গেল। পথে-বাজারে বিস্তর মানুষ সর্দি কাশিতে জেরবার হচ্ছে, তার নজর এড়ায়নি। জগন্নাথের অসুস্থতা সেরকম নয়। আরও বেশি, তবে অন্যরকম। জগন্নাথের শরীরের তাপ স্বাভাবিক, নাড়ির গতিতে চাঞ্চল্য নেই। জ্বর, কম্পজ্বরের লক্ষণ, তাকে পরীক্ষা করে মুরারি কবিরাজ পায়নি। অগ্নিমান্দ্য, দাস্তের গোলমাল নেই, জগন্নাথ নিজে বলেছে মুরারিকে। রোগটা অন্যরকম। তা নির্ণয় করতে না পেরে গম্ভীর হয়েছে পাড়ার কবিরাজ, মুরারির মুখ। মধুতে অর্জুন ছালের গুঁড়ো মেড়ে খাওয়ার নিদান দিয়েছে সে। মুরারির ওষুধ খেয়ে জগন্নাথের নিরাময়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মানুষটা বাস্তবিক অসুস্থ, তার মুখ দেখে বিশ্বরূপ বুঝতে পারলেও, তার কিছু করার নেই। অসহায়ের মতো সে শুধু তাকিয়ে থাকে। কয়েকদিনের মধ্যে জগন্নাথের চোয়াল ভেঙে, মুখ তুবড়ে গেল। কোটরে ঢুকে গেল দু’চোখ। চোখের তলায় ঘন হল কালির আস্তরণ। হঠাৎ কোনও কারণে মানুষ ভয় পেলে, সে যেমন গুটিয়ে যায়, রক্তহীন হয়ে পড়ে, জগন্নাথের তাই ঘটল। বিছানায় শুয়ে, দাওয়ায় বসে, উঠোনে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে দু’চোখ বুজে, দৃষ্টির আড়ালে বিশ্বসংসার রেখে কী যেন ভাবে! বিশ্বরূপের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে কখনও সখনও মুরারির গুরু, কবিরাজ সদানন্দ ভট্টাচার্যকে বিশ্বরূপ ডেকে আনতে চাইলেও সেই আয়ুর্বেদশাস্ত্রীর চিকিৎসা নিতে জগন্নাথ রাজি হয়নি। চোখের সামনে বাবাকে ক্রমশ শীর্ণ, ক্লান্ত, ভঙ্গুর হয়ে বিছানায় মিশে যেতে দেখে বিশ্বরূপের ভয় বাড়ছিল। জগন্নাথের অসুখ শুধু শরীরের নয়, তার মনের গভীরে ছড়িয়ে গেছে, এমন সন্দেহ করতে শুরু করেছিল সে।

বাবার অসুস্থতা নিয়ে ছ’বছরের গোরার মাথাব্যথা ছিল না। তার দুরন্তপনা, পাড়াবেড়ানো, ছত্রিশ জাতের ঘরে ঢুকে খাদ্য, অখাদ্য খেয়ে লাফঝাঁপ করা বাড়ছিল। রামচন্দ্রপুর আর আশপাশের মানুষ জানছিল, শূদ্র, ম্লেচ্ছ, যবনের ঘরে ঢুকে পাত পেতে গোরার খেতে বসে পড়ার কাহিনী। জাতপাতের বোধ নেই, ঘেন্নাপিত্তি নেই, ধরাকে সরা জ্ঞান করে জগন্নাথের ছেলেটা কুলধর্ম নষ্ট করে যে উশৃঙ্খলা চালাচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে তা পরিবারকে বিপদে ফেলবে, এ নিয়ে তাদের সন্দেহ ছিল না। বাড়িতে গোরার যে যথাযথ শিক্ষা হচ্ছে না, আড়ালে আবডালে পড়শিরা তা আলোচনা করত। জগন্নাথকে সরাসরি তাদের কেউ অনুযোগ না করলেও কানাঘুষোয় তাদের কটু মন্তব্য, জগন্নাথের কানে আসত। ছোট ছেলের জন্যে দুশ্চিন্তায় জগন্নাথ অসুস্থ হয়ে পড়েছে, পল্লীর বয়স্ক দু’একজন এমন অভিমত দিলে ও বিশ্বরূপের কাছে তা বিশ্বাসযোগ্য ঠেকেনি। জগন্নাথের অসুস্থতা হেঁয়ালির মতো লাগছিল বিশ্বরূপের। বাবার রোগটা যে মনের, শচীকে একান্তে ডেকে তা জানিয়েও দিল।

বিশ্বরূপের কথাটা অবাক করল শচীকে। বড় ছেলের অভিমত রাতে স্বামীকে শচী যখন বলল, শয্যাশায়ী জগন্নাথের দু’চোখ জলে ভরে গেল। চাপা গলায় বলল, তোমার বড় ছেলে ভুল কিছু বলেনি।

শচীকে তারপর জগন্নাথ এমন কিছু কথা শোনাল, যা শচী ভাবতে পারেনি। পরের দিন সকালে বিশ্বরূপকে একা ডেকে নিয়ে শচী বলল, নাতির মুখ দেখার সুযোগ না পেলে তোমার বাবার রোগ সারবে না। পৃথিবী ছেড়ে তার চলে যাওয়ার মতো দুর্ঘটনাও ঘটে যেতে পারে।

কথাটা শুনে বিশ্বরূপ আঁতকে উঠল। তাকে সংসারী করার চিন্তাতে বাবা যে মুমূর্ষু হতে পারে, এ তার কল্পনায় ছিল না। ষোলো বছরের ছেলেকে যে কোনও বাবা, বিয়ের পিঁড়িতে ঘাড় ধরে বসিয়ে অনায়াসে ঘরে পুত্রবধূ নিয়ে আসতে পারে। সামাজিক রীতি তাই। গৃহকর্তার হুকুম, এ ব্যাপারে শেষকথা। তা অমান্য করার মতো বুকের পাটা সন্তানের নেই। মাকে বিশ্বরূপ জিজ্ঞেস করল, আমাকে কী করতে হবে?

ছেলের প্রশ্নের উত্তর শচী জানলেও নিজের মুখে কথাটা না বলে বিশ্বরূপকে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল জগন্নাথের সামনে। বিশ্বরূপকে খোলসা করে জগন্নাথ জানাল, তার জন্যে সুলক্ষণা, অতীব সুন্দরী কন্যা পছন্দ করা হয়েছে। উত্তর নবদ্বীপে, বাগোয়ান পরগণার শ্রীনাথপুর গ্রামের সর্বজনশ্রদ্ধেয়, পরমব্রাক্ষ্মণ, যদুনাথ তর্কাচার্যের এগারো বছরের মেয়ে, কল্যাণীকে পুত্রবধূ করে সংসারে আনতে জগন্নাথ মনস্থ করেছে। জগন্নাথের বিশ্বাস, পুত্রবধূ এলে তার ব্যাধি নিরাময় হবে। তাড়াতাড়ি নাতির মুখ দেখার সৌভাগ্য হলে আরোগ্য লাভের সঙ্গে পরমায়ু বেড়ে যেতে পারে। নাতির মুখ না দেখে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে সে নড়তে পারবে না। বিয়ের জন্যে বিশ্বরূপকে তৈরি থাকার সঙ্গে জীবিকানির্বাহের চিন্তা করতেও জগন্নাথ পরামর্শ দিল।

জগন্নাথের কথা শুনে বিশ্বরূপের মাথায় বাজ পড়ল। তার বয়সি বিবাহিত এক ঝাঁক সহপাঠী থাকলেও নিজের বিয়ের চিন্তা ঘুণাক্ষরে তার মনে মুহূর্তের জন্যে উদয় হয়নি। পাথরের মূর্তির মতো বাবার সামনে বাক্যহীন সে দাঁড়িয়ে থাকল। কথা বলার ক্ষমতা লোপ পেয়েছিল। বাড়ির বাইরে সদরের পথ দিয়ে অনেক ব্রাক্ষ্মণ, ছাত্রকুল পরিবৃত দিগ্‌গজ শিক্ষকরা তুমুল আলোচনায় পাড়া মাথায় করে গঙ্গাস্নানে চলেছে। ন্যায়শাস্ত্র নিয়ে উঁচু গলায় তারা বিতণ্ডা করছে। একজন জিজ্ঞেস করল, মাঝরাতে বহ্নিমান লোকালয়ের আগুনে অন্ধকার আকাশ আলোকিত দেখালে, আমরা কি এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছোতে পারি যে ভোর হয়েছে?

ঘুমন্ত মানুষকে সকাল হয়েছে জানিয়ে ঘুম থেকে তুলতে পারি?

প্রশ্নের জবাবে অনেকগুলো গলা হৈ হৈ করে উঠতে জবাবটা বিশ্বরূপ শুনতে না পেলেও ‘অপ্রমা’ শব্দটা তার কানে গেল। সংশয়জড়িত জ্ঞান, প্রকৃত জ্ঞান নয়, তা ‘অপ্রমা’, বিশ্বরূপ জানে।

বিতণ্ডাকারীদের মধ্যে সে থাকলে ‘অপ্রমা’ নিয়ে বিশদ করে বলতে পারত, তা সম্ভব নয়। স্নানার্থীরা বাড়ির সামনে থেকে অনেকটা পথ চলে গিয়েছে। স্মার্ত সম্প্রদায়ের জ্ঞানী কোনও শিক্ষক বলছে, স্মৃতিশাস্ত্রে যা নেই, পৃথিবীতে তার সন্ধান পাওয়া অসম্ভব। সুতরাং স্মৃতিশাস্ত্রচর্চার মহাকেন্দ্র নবদ্বীপ হল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ পুণ্যভূমি

রাস্তায় পথচারীর বিরাম নেই, পায়ের শব্দ, হাঁচি-কাশির আওয়াজ, মন্ত্রোচ্চারণ; স্রোতের মতো গঙ্গার ঘাটের দিকে বয়ে চলেছে। ভোর থেকে ভরদুপুর পর্যন্ত মানুষের প্রবাহ চলবে এই পথে। দুপুরে কিছুক্ষণ বিরতির পরে আবার শুরু হবে অসংখ্য মানুষের গতায়াত, গঙ্গার ঘাটে সন্ধ্যাহ্নিকের পালা তখন শুরু হয়। রাস্তা থেকে ভেসে আসা ন্যায় আর স্মৃতিশাস্ত্রের টিকাটিপ্পনিতে কান দেওয়ার মতো মনের অবস্থা বিশ্বরূপের ছিল না। শয্যাশায়ী বাবার বিছানার পাশ থেকে তাড়াতাড়ি পালাতে চাইছিল সে। ভোঁ ভোঁ করছে মাথা। তার মুখের দিকে কাতর চোখে মা তাকিয়ে আছে টের পেয়ে বাবাকে ‘যথা আজ্ঞা’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এল বিশ্বরূপ। তার শরীর কাঁপছিল, বুক কাঁপছিল, মাথার মধ্যে বাতাসের ভেতরকার শব্দপুঞ্জ ঢুকে জগাখিচুড়ি পাকাচ্ছিল। এত তাড়াতাড়ি সংসারে ঢুকতে সে চায়নি। জ্ঞানতপস্বী হতে চেয়েছিল। অদ্বৈত আচার্যের চতুষ্পাঠীর শিক্ষা শেষ করে বাসুদেব সার্বভৌমের শিষ্য হয়ে ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়নের প্রবল আগ্রহ ছিল তার। বাসুদেব সার্বভৌমের মতো পণ্ডিত গৌড়বঙ্গে দ্বিতীয় নেই। মিখিলা লেকে ন্যায়শাস্ত্রের লিখিত পুঁথি, স্থানান্তর করাতে নিষেধ থাকায়, সেখানে ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়নরত ছাত্র বাসুদেব গোটা পুঁথি কণ্ঠস্থ করে নবদ্বীপে ফিরে এসে তা লিপিবদ্ধ করেছিল। হু হু করে ছড়িয়ে পড়েছিল তার পাণ্ডিত্যের খ্যাতি। তার চতুষ্পাঠীতে একটু বসতে পাওয়ার জন্যে দেশের নানা জায়গা থেকে ফি বছর শ’য়ে শ’য়ে ছাত্র নবদ্বীপে এসে ভিড় করত। মহাপণ্ডিত বাসুদেব সার্বভৌমকে নিজের রাজ্যে পাকাপাকিভাবে নিয়ে যেতে উড়িষ্যার অধিপতি, রাজা প্রতাপ রুদ্রের আমন্ত্রণপত্র নিয়ে নবদ্বীপে ঘনঘন দূত আসছে তখন। নবদ্বীপ ছেড়ে তাঁর পুরী চলে যাওয়ার গুজব নানা আকারে রোজ যত ছড়াচ্ছিল, বিশ্বরূপের মনে তত বাড়ছিল, সেই মহান শিক্ষকের ছাত্র হওয়ার সাধ। সেই সাধ তার অপূর্ণ থেকে যাবে। সংসার পেতে, জীবিকা অর্জনের জন্যে শুরু হবে দৌড়ঝাঁপ। পিতৃআজ্ঞা অমান্য করার মতো মহাপাপ সে করতে পারবে না। বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে গঙ্গার ঘাটে পৌঁছে, ঘাট ছেড়ে অনেকটা দূরে নিমগাছের নির্জন ছায়ায় বিশ্বরূপ বসল। গঙ্গায় কটালের জোয়ার। পুব-দক্ষিণে তীর বেগে ছুটে চলেছে জলস্রোত। বড় বড় ঢেউ ভেঙে পড়ছে নদীর পাড়ে। বিশ্বরূপের মাথায় দুশ্চিন্তার পাহাড়। কল্যাণী নামে তরুণী এক মেয়ে ঘরে বউ হয়ে এলে তার শাস্ত্রপাঠ চিরকালের মতো চুকে যাবে। সংসার প্রতিপালনের গুরুভার চাপবে মাথার ওপর বাবার মতো যজমানী বৃত্তি নিয়ে পূজা-অর্চনার কাজে নেমে পড়া ছাড়া তখন উপায় নেই। সংসার ক্রমশ বাড়বে। জীবিকা নির্বাহের চাপ বাড়বে সেই সঙ্গে। সার্বভৌম আচার্যের কাছে ন্যায়শাস্ত্র অধ্যয়নের স্বপ্ন শূন্যে মিলিয়ে যাবে। অথচ শিক্ষাগুরু অদ্বৈত আচার্যের অভিলাষ, ন্যায়শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে সার্বভৌম আচার্যের চতুষ্পাঠীতে তার কিছুকাল শিক্ষা নেওয়া উচিত। অদ্বৈতের মেধাবী উচ্চশিক্ষার্থী ছাত্রদের গ্রহণ করতে সার্বভৌম আচার্য সদাসর্বদা উন্মুখ। অদ্বৈতের কাছ থেকে এত তথ্য বিশ্বরূপ জেনেছে।

শিশু গোরাকে দেখার পর থেকে বিশ্বরূপকে উচ্চশিক্ষার জন্যে সার্বভৌমের কাছে পাঠানোর আগ্রহ অদ্বৈতের বেড়েছে। বাল্যবন্ধু জগন্নাথ মিশ্রের দুই ছেলে যে সাধারণ মানুষ নয়, এমন এক প্রচ্ছন্ন বিশ্বাস অদ্বৈতের মনে শেকড় গেড়েছে। কলিযুগে তারা বলরাম, কৃষ্ণের অবতার, পরমভাগবত, অদ্বৈত গোপনে এই ধারণা হৃদয়ে লালন করছে। আভাসে জানিয়েছে নবদ্বীপবাসী পরম বন্ধু শ্রীনিবাসকে। নিজের চতুষ্পাঠীতে ভাগবদ অনুষ্ঠানের সময়ে বিশ্বরূপের মুখের দিকে অদ্বৈত মাঝে মাঝে এমন ভক্তি গদ গদ চোখে তাকিয়ে থাকে, যে তখন গুরু, শিষ্যের চার চোখের মিলন হলে, বিশ্বরূপ অবনতমস্তক হয়ে যায়। তার বুক ধড়ফড় করে। কুশাসনে উপবিষ্ট অদ্বৈতের মুখের দিকে বিশ্বরূপ তখন তাকাতে পারে না। তার ধারণা, দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন করতে ধর্মরক্ষার জন্যে অদ্বৈতের কৃয়াবতারের প্রার্থনা, বিশ্বস্রষ্টা পরমেশ্বর অর্ধেক মঞ্জুর করেছে। ধর্মের পরিত্রাতা, কৃষ্ণ ভূমিষ্ট হলেও বলরামের আবির্ভাব ঘটেনি। কলিযুগে একা কৃষ্ণের উপস্থিতি যথেষ্ট। বলরামের সেখানে জায়গা নেই। সে বলরাম নয়। মহাবীর, ধর্মাচার্য বলরাম হওয়ার যোগ্যতা তার নেই। সে সামান্য জীব। অবতার-ই জোগাড় করে নেবে নিজের পার্ষদগোষ্ঠী। বুরহানউদ্দিন দরগার ভেতরে, ঝড়বৃষ্টির সেই রহস্যময় রাতের তেরো মাস ব্যবধানে, নবদ্বীপে জগন্নাথ মিশ্রের ঘরে তার যে অনুজ ভূমিষ্ঠ হল, সে যে দৈবপ্রেরিত শিশু, এ নিয়ে তার সন্দেহ নেই। গত ছ’বছরে এ বিশ্বাস তার দৃঢ় হয়েছে। দেশের মানুষের জন্যে সেই শিশু সুদিন নিয়ে আসছে। গানের ওপর সুলতানি নিষেধাজ্ঞা সুরের স্রোতে ভাসিয়ে দেবে। শৃঙ্খলিত, পরাধীন জীবন থেকে মুক্তি পাবে ভয়ার্ত, হতগরীব মানুষ। সেই শিশু, তার ছোট ভাই গোরা। নেচে খেয়ে প্রেমে ভালবাসায় দেশের মানুষকে সে ভাসিয়ে নিযে যাবে, তাদের একাত্ম করে দেবে।

গোরার নামে শচীর কাছে গচ্ছিত নিজের লেখা পুঁথিতে ভবিষ্যতের নানা ঘটনা, গোরার ভূমিকা নিয়ে, যতটা সম্ভব আভাস সে দিয়েছে। ‘রাম না হতে রামায়ণ’ লেখার মতো যে কাজ সে করেছে, তার পরিণাম কী হবে, সে জানে না। গোরার ভবিষ্যতের কিছু পথনির্দেশ পুঁথিতে আছে। বলরামের অবতার পৃথিবীতে না এলেও গোরার যোগ্য সহধর্মিণী, তার আনন্দস্বরূপ রাধার আবির্ভাবের অবশ্যম্ভাবিতা সে জোর দিয়ে বিবৃত করেছে। দশ বছর বয়সে যে অকল্পনীয় শক্তির অভিব্যক্তি তাকে ভর করেছিল, ষোলো বছর বয়সে তা অনুভব করলেও সেই মগ্নতায় পৌঁছে ও রকম দ্বিতীয় পুঁথি, এখন হাজার চেষ্টা করেও সে লিখতে পারবে না।

গঙ্গায় জোয়ারের জলোচ্ছ্বাসের দিকে তাকিয়ে বিশ্বরূপের মাথায় নতুন চিন্তা এল। তার জ্ঞানতপস্বী হওয়ার সঙ্কল্পে একমাত্র অদ্বৈত আচার্য, তার পরমশ্রদ্ধাস্পদ শিক্ষক, তাকে সাহায্য করতে পারে। তাকে এই সঙ্কট থেকে বাঁচাতে পারে। বিয়ে করা থেকে তার অব্যাহতি প্রার্থনার আবেদন অদ্বৈতের কানে গেলে, সে বার্তা জগন্নাথকে পৌঁছে দিতে অদ্বৈত পিছপা হবে না। জ্ঞানপিপাসু, স্নেহের ছাত্র বিশ্বরূপের হয়ে অদ্বৈত কোনও অনুরোধ করলে, জগন্নাথ অনিচ্ছে থাকলেও মেনে নেবে।

বিশ্বরূপের মনের গভীরে আরও এক প্রশ্ন জেগেছিল। তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাতে জগন্নাথ কেন এত ব্যস্ত হল? তার মাথার মধ্যে আবছা এক সন্দেহ জাগতে গঙ্গার নির্জন গাছতলা ছেড়ে সে বাড়ির দিকে পা বাড়াল। মায়ের তোরঙ্গে লুকোনো তার পুঁথি কি জগন্নাথের হাতে পড়েছে? পুঁথিটা পড়েই জগন্নাথ সম্ভবত অসুস্থ হয়ে বিছানা নিয়েছে। পুঁথি পড়ে জগন্নাথ এমন কিছু অনুমান করেছে, যার জন্যে বড় ছেলেকে এখনই বিয়ে দিয়ে সংসারী করতে চায়। সাংঘাতিক কোনও অঘটন হয়তো আশঙ্কা করছে সে। আবছা সন্দেহটা মনের মধ্যে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠতে তা যাচাই করতে তখনই সে বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিল। মায়ের তোরঙ্গের নির্দিষ্ট খোপে পুরনো কাপড়চোপড়ের তলায় যেখানে পুঁথি রয়েছে, তোরঙ্গ খুলে সেই জায়গাটা নিজের চোখে সে একবার দেখতে চায়। ঝড়ের গতিতে বাড়ি ফিরে যে ঘরে তোরঙ্গ রয়েছে, নিঃশব্দে সেখানে ঢুকল বিশ্বরূপ। ঘরের একপাশে তক্তপোশে গলা পর্যন্ত চাদরে ঢেকে দু’চোখ বুজে শুয়ে থাকা জগন্নাথকে একবার আড়চোখে দেখে, সে ঘুমোচ্ছে, না জেগে আছে, বিশ্বরূপ বুঝতে পারল না। কোনও সাড়াশব্দ না করে তোরঙ্গ খুলে, ভেতরের নির্দিষ্ট খুপরিতে পুঁথি না পেয়ে, পুরো তোরঙ্গ আতিপাঁতি করে সে যখন তল্লাশি চালাচ্ছে, বিছানা থেকে ভাঙা গলায় জগন্নাথ বলল, তোমার লেখা পুঁথি আমি পেয়েছি। পুঁথি পড়ে পুড়িয়ে ফেলেছি। তোমার মতো মেধাবী সন্তান কীভাবে পরিবারের মুখে কলঙ্ক লেপন করার মতো এমন সব্বোনেশে পুঁথি লিখল, তা আমার বোধগম্য হয়নি। পুঁথিটা পড়ার সময়ে আমার মৃত্যু ঘটতে পারত। এখন আমি জীবস্মৃত। যে কোনও মুহূর্তে, আমার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তার আগে তোমার বিবাহ দেখে যেতে চাই, দেখতে চাই নাতিনাতনির মুখ। সংসারী হও তুমি। পুঁথির কথা ভুলে গিয়ে মন দিয়ে সংসারধর্ম পালন করো।

এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে জগন্নাথ বলল, তোমাকে শ্রীহট্টে নিয়ে যাওয়া যে বিরাট ভুল হয়েছে, এখন বুঝতে পারি। কে তোমায় বলল যে আমার দুই ছেলের একজন অবশ্যই সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসী হবে? তোমার এ ধারণা অমূলক। তোমরা দু’ভাই-ই পরম আনন্দে দীর্ঘকাল সংসার করবে, শতায়ু হবে, পুত্র, পৌত্রাদির মুখ দেখে স্বর্গত পিতৃপুরুষের প্রত্যাশা পূরণ করবে।

কথা বলার ক্লেশে জগন্নাথ হিক্কা তুলে কাঁদতে শুরু করতে, মহাগুরুনিপাতের আশঙ্কায় বিশ্বরূপের দু’চোখ থেকে টসটস করে জল পড়তে থাকল। জ্বরবিকারের রোগীর মতো জগন্নাথ বকতে থাকল, পারিবারিক জীবনে শিক্ষা যে এমন সমূহ সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে, আগে জানলে অদ্বৈত আচার্যের চতুষ্পাঠীতে তোমাকে পাঠাতাম না। পিতৃপুরুষের সংস্কার থেকে জানতাম, শিক্ষা ছাড়া ব্রাহ্মণের পরিচয় সম্পূর্ণ হয় না। ব্রাহ্মণ্যশক্তি অধঃপতিত হয়। এখন টের পাচ্ছি, বহু পুরুষ ধরে অর্জিত সংস্কার, সবটা ভ্রান্ত। পরিবারে সুখ, শান্তি বজায় রাখতে শাস্ত্রবিশারদ পণ্ডিত, অথবা সংসারবিমুখ সন্তানের চেয়ে সংসার সম্পর্কে দায়িত্ববান, মূর্খ সন্তান অনেক ভালো।

জগন্নাথের কান্নাভেজা কথাগুলোর সঙ্গে বিশ্বরূপ যখন সমানে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে, ঘরের দরজার বাইরে তখন গোরা এসে দাঁড়িয়েছিল। বিশ্বরূপকে জগন্নাথ ভর্ৎসনা করার শুরু থেকে বাবার প্রত্যেকটা কথা শুনছিল। তার পড়ার জন্যে দাদার লেখা একটা পুঁথি মায়ের জিম্মায় রাখা আছে, এমন একটা কথা কোনও সময়ে গোরার কানে এলেও খেলাধুলোয় মেতে থাকা ছ’বছরের বালক তা গ্রাহ্য করেনি। পুঁথি সম্পর্কে কোনও ঔৎসুক্য জাগেনি তার মনে। সেই পুঁথি পড়ে, বাবা সেটা পুড়িয়ে ফেলেছে শুনে ঘরের দাওয়া ছেড়ে চুপচাপ উঠোনে এসে দাঁড়াল সে। তার জন্যে লেখা দাদার পুঁথিতে কি ছিল, জানার আগ্রহে আলোড়িত হতে থাকল তার মন। অদূরে রান্নাঘরে গেরস্থালি কাজে শচী ব্যস্ত। দাওয়ার ওপর ঘরে, অসুস্থ স্বামী আর বড় ছেলের মধ্যে যে নাটক চলছে, কিছুই সে জানে না। কুয়াশার মতো নানা প্রশ্নের রহস্য গোরার মগজের অন্ধিসন্ধিতে ঢুকে পড়ছিল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সদর দরজার পাশে রাস্তার ওপরে বিশ্বরূপের জন্যে সে অপেক্ষা করতে থাকল। পুঁথির বিষয় শুধু দাদার কাছ থেকে জানা সম্ভব। জগন্নাথের ধমক খেয়ে ঘরের বাইরে দাওয়ায় এসে বিশ্বরূপ যখন দাঁড়াল, তার দু’চোখের জল তখনও শুকোয়নি। পনেরো দিন পরে, পাঁচই অঘ্রাণ নির্ধারিত হয়েছে তার শুভবিবাহের দিন। তার আগেই সংসার ছেড়ে চলে গিয়ে সে সন্ন্যাসে দীক্ষা নেবে। এ জীবনে তার বিয়ে করা ঘটবে না। পিতৃহত্যার কলঙ্ক গায়ে লাগার আগে সংসার ছেড়ে সে চলে যাবে। পিতৃআজ্ঞা লঙ্ঘনের পাপ, সন্ন্যাসীকে স্পর্শ করে না। মনে গভীর বৈরাগ্য জাগতে সংসারে থেকেও বিশ্বরূপ একা হয়ে গেল। পুঁথির বিষয়ে গোরা একাধিকবার ঔৎসুক্য প্রকাশ করলেও বিশ্বরূপ মুখে কুলুপ এঁটে থাকল। ছ’বছর আগে লেখা পুঁথি, যা আপাতত পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, তার অন্তর্বস্তু, ষোলো বছর বয়সে পৌঁছে, মুখে বলা সম্ভব নয়, ছোটভাইকে তা জানাতে সঙ্কোচ লাগল। সারাক্ষণ অনুভব করতে থাকল, তার চারপাশে উড়ছে দগ্ধ পুঁথির ছাই। প্রাণের চেয়ে প্রিয় ছোটভাই-এর পুঁথি নিয়ে কৌতূহল মেটাতে অনেক কথা বলতে বুক ফাটলেও মুখ খুলল না। সংসারের সঙ্গে তার সম্পর্ক শেষ হতে চলেছে, সে টের পেল। মা, বাবা, ছোটভাই, এই ঘরসংসার ছেড়ে চলে যাওয়ার ডাক এসেছে। সে ডাকে সাড়া না দিয়ে তার উপায় নেই। তার অনুপস্থিতিতে পরিবারের দুর্দশার কথা চিন্তা করে, সে মর্মযন্ত্রণায় ভুগলেও সন্ন্যাস নেওয়ার সঙ্কল্পে অটল থাকল। পরিবারের কেউ সন্ন্যাস নিলে সেই পরিবারের মুখোজ্জ্বল হয়, কল্যাণ হয়, সংসারে শ্রী, সমৃদ্ধি বাড়ে, গৃহস্থের সচ্ছলতা প্রাণের আরাম ছড়িয়ে যায়, এ নিয়ে কারও সন্দেহ নেই। নিজে গার্হস্থ্যধর্ম পালন না করলেও সন্ন্যাস ব্রত গ্রহণ করে পরিবারের মর্যাদা বিশ্বরূপ বাড়িয়ে দিতে চায়। ব্রত পালন যত কঠিন হোক, মা, বাবা, ভাইয়ের কল্যাণের জন্য সেখান থেকে তিলমাত্র সে বিচ্যুত হবে না।

সাত দিনের মধ্যে যৎসামান্য সুস্থ হয়ে বিশ্বরূপের বিয়ের তোড়জোড় করতে নেমে পড়ল জগন্নাথ। বিয়ের দিন এগোতে থাকলেও অদ্বৈতের চতুষ্পাঠীতে যাওয়া বিশ্বরূপ থামাল না। চতুষ্পাঠীতে ছুটির পরে, এক সকালে বাড়ি ফেরার বদলে বেলপুকুরিয়ায় মামাবাড়িতে দাদামশাই নীলাম্বর চক্রবর্তীর ভদ্রাসনে এসে হাজির হল বিশ্বরূপ। মনের মধ্যে চেপে রাখা গোপন কথাগুলো কাছের একজন মানুষকে শুনিয়ে উদ্বেগের ভার নামাতে চাইছিল সে। মামাবাড়িতে তার সবচেয়ে প্রিয় মামাতো ভাই, লোকনাথ, বড়মামা যজ্ঞেশ্বর চক্রবর্তীর সেজ ছেলে সে, তাকে বলা যায় সব প্রাণের কথা। বিশ্বরূপকে অন্ধের মতো সে ভালবাসে। বিশ্বরূপের অতি অনুগত, ছায়ার ছায়া হয়ে থাকতে চায়। দাদামশাই, দিদিমা, মামা, মামি, ভাইবোনদের সঙ্গে এক প্রস্থ কথা, হাসি, মজার রঙ্গরসিকতা করে লোকনাথকে বাড়ির বাইরে পুকুরের উল্টোদিকে অশ্বত্থ গাছের তলায় চুপিসারে ডেকে নিল বিশ্বরূপ। দু’চারটে মামুলি কথা বলার পরে শোনাল সংসার ছেড়ে তার সন্ন্যাসী হওয়ার সঙ্কল্প। বিশ্বরূপের চেয়ে মোটামুটি দু’বছরের ছোট, বয়স চোদ্দো, লোকনাথ, তার অভিন্নহৃদয় দাদা, বিশ্বরূপের কথা শুনে শিশুর মতো ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলল। অঝোরে জল পড়তে থাকল তার দু’চোখ থেকে লোকনাথের গলা জড়িয়ে ধরে তাকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে সস্নেহে সান্ত্বনা দিতে থাকল বিশ্বরূপ। চোখের জল মুছে লোকনাথ সামান্য সুস্থির হলেও শোকের তড়াসে মাঝে মাঝে ফুঁপিয়ে উঠতে থাকল। বিশ্বরূপের সঙ্কল্প লোকনাথ মেনে নিয়ে নতুন গোঁ ধরল, সে-ও দাদার সঙ্গে সন্ন্যাসী হবে। বিশ্বরূপ যেখানে থাকুক, তার অনুগামী হবে। বিশ্বরূপের লোটা-কম্বল, দণ্ড বহন করবে।

হেমন্তের ফসল মাঠে পেকে উঠেছে। ধানের গর্ভের দুধ ক্রমশ ঘন হয়ে জমাট বাঁধছে। খামারে ধান ওঠার দিন গুনছে চাষী। ঝাঁকড়া অশ্বত্থ গাছের পাতায় বিলি কেটে ফুরফুরে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে লাগছিল বিশ্বরূপের শরীরে। তার সঙ্গে লোকনাথও সন্ন্যাস নিতে চায় শুনে সে চমকে গেল। অনুজ ভাই, হোক সে মামাতো ভাই, দাদামশাই, নীলাম্বর চক্রবর্তীর সংসার থেকে লোকনাথকে উপড়ে নিয়ে তাকে নিজের সঙ্গী করার চিন্তা সে করতে পারে না। লোকনাথকে এরকম কথা মুখে আনতে সে নিষেধ করল। সন্ন্যাসী হওয়া কত কঠিন, কত কষ্টের সেই জীবন, লোকনাথকে বোঝাতে থাকল। জেদ ছাড়ল না লোকনাথ। বিশ্বরূপকে সেই মুহূর্ত থেকে আর চোখের আড়াল করবে না, সাফ জানিয়ে দিল। লোকনাথের করুণ আকুতি আর জেদের কাছে শেষপর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হল বিশ্বরূপ। সে বুঝেছিল, লোকনাথকে সঙ্গী না করলে, সে নিজেই সন্ন্যাস নিয়ে দাদার খোঁজে বেরিয়ে পড়বে। তাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না। লোকনাথকে সন্ন্যাসের সঙ্গী করতে রাজি হওয়ার পরে বাড়ি ছাড়ার দিনক্ষণ নিয়ে শলাপরামর্শ করে দু’জন ঠিক করল, পরের রাতে, বাড়ির সকলে যখন ঘুমিয়ে পড়বে, নবদ্বীপের পথঘাট জনশূন্য, ফাঁকা হয়ে যাবে, তখন ঊষালগ্নের দু’দণ্ড আগে সংসার ছেড়ে চিরদিনের মতো তারা বেরিয়ে পড়বে। লোকনাথ আজ বিশ্বরূপের সঙ্গে রামচন্দ্রপুরে পিসির বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে দু’রাত সেখানে কাটিয়ে দেবে। কাকপক্ষি জানবে না তাদের সন্ন্যাস নেওয়ার সঙ্কল্প।

সন্ন্যাসের ছক পাকা করে, সন্ধের পর মামাবাড়ি থেকে লোকনাথকে নিয়ে বিশ্বরূপ যখন নিজের বাড়িতে ফিরল, তখন তার পাশে লোকনাথকে দেখে খুশি হয়ে ভাইপোকে শচী বলল, ভালো সময়ে এসেছিস। দাদার বিয়ে পর্যন্ত এখানে থেকে যা।

পিসির কথাতে বিশ্বরূপের মুখের দিকে তাকিয়ে লোকনাথ দেখল, তার মেধাবী অগ্রজ ঠোঁট টিপে হাসছে।

পরের দিন, সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত গোরার সঙ্গে গল্প, খেলায় মেতে থাকল বিশ্বরূপ। লোকনাথও ছায়ার মতো লেগে থাকল বিশ্বরূপের সঙ্গে। তিন বালক, কিশোরের হাসি, হল্লা, খুনসুটির আওয়াজ, শচীর মতো জগন্নাথও উপভোগ করল। প্রথম রাতে, দুই দাদার মাঝখানে শুয়ে গোরা ঘুমোলেও, পরের রাতে তাকে কাছছাড়া করতে চাইল না শচী। গোরাকে বুকের কাছে নিয়ে রোজ রাতে সে ঘুমোয়। বিশ্বরূপ একই ঘরে আলাদা বিছানায় শোয়। অন্য ঘরটা ফাঁকা থাকে। আত্মীয়স্বজন এলে তাদের জন্যে খালি ঘরে বিছানা পেতে রাতে শোয়ার ব্যবস্থা হয়। লোকনাথের মতো ভাইপোরা এলে সেখানে রাতের মতো ঢুকে পড়ে বিশ্বরূপ। মাকে ছেড়ে গোরা যায় না। গেল রাতে বিশ্বরূপ, লোকনাথের সঙ্গে গোরা রাত কাটাতে খাঁ খাঁ বিছানায় শচীর একরকম না ঘুমিয়ে কেটেছে। আলতো করে দু’চোখে ঘুম আসলে শূন্যতার ঝাঁকানিতে জেগে উঠেছে। দ্বিতীয় রাতেও বুকের কাছে গোরাকে না পেলে যে দু’চোখের পাতা বোজানো সম্ভব হবে না, এমন ভয় থেকে গোরাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এক বিছানায় শুতে মা রাজি করাল। মায়ের সঙ্গে গোরা শুতে রাজি হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল বিশ্বরূপ। রাতের এক প্রহর বাকি থাকতে ফাঁকা ঘরে ঘুমন্ত গোরাকে একা ফেলে লোকনাথকে নিয়ে সে গৃহত্যাগ করলে, ছোটভাই-এর বিপদ ঘটতে পারে। ঘরের মধ্যে কোনওভাবে একটা বাঘরোল, খাটাশ, বনবেড়াল ঢুকে পড়লে গোরার জীবন বিপন্ন হওয়া অসম্ভব নয়। মায়ের কাছে রাতের মতো গোরা ঘুমোতে রাজি হওয়ায় বিশ্বরূপ নিশ্চিন্ত হল। জীবনে শেষবার সারাদিন ছোটভাই-এর সঙ্গে তার যত প্রিয় খেলা, সে আর লোকনাথ খেলেছে। খেলার মধ্যে ছোটভাইকে উজাড় করে দিয়েছে বুকভরা ভালবাসা। অন্তত একশ’টা চুমু খেয়েছে তাকে। চোর চোর খেলতে শুরু করে, ইচ্ছে করে নিজে চোর বনে গিয়ে গোরাকে খুঁজেছে। গোরার হদিশ পেলেও তাকে ছুঁয়ে চোর না বানিয়ে, না দেখার ভান করে সরে গেছে। তাকে হুবহু অনুকরণ করেছে লোকনাথ।

সংসার ছাড়ার সঙ্কল্প নিয়ে গত দুদিন চলনে-বলনে বিশ্বরূপ শান্ত স্বাভাবিক থাকলেও ভাই-এর জন্যে লেখা পুঁথি পুড়ে ছাই হওয়ার খবরে তার বুকের মধ্যে ক্রমাগত হাহাকার উঠেছে। প্রায় ভূতাবিষ্ট হয়ে পুঁথি লিখেছিল সে। কঠোর পরিশ্রম করেছিল, যাতে তার লেখা পুঁথি পড়ে গোরার আত্মদীপ প্রজ্জ্বলিত হয়। রাতের খাওয়া শেষ করে মা-বাবার ঘরের পাশে খড়ের ওপর কম্বল পেতে লোকনাথকে পাশে নিয়ে বিশ্বরূপ বিছানায় শরীর এলিয়ে দিল। অন্ধকার ঘর, কোথাও ছিটেফোঁটা আলো নেই। নিঃশব্দ রাস্তায় দু’একটা কুকুর মাঝে মাঝে ডেকে উঠছে। আঁতুড়ঘরের পাশের নিমগাছ থেকে টুপটুপ করে খসে পড়ছে দু’একটা শুকনো পাতা। হেমন্তের শেষে নিসর্গপ্রকৃতির দরজায় শুরু হয়েছে শীতের কড়া নাড়া। পাশের ঘরে গোরাকে বুকে জড়িয়ে মা ঘুমিয়ে পড়লেও জগন্নাথ খুকখুক করে কাশছে। ঘুমের মধ্যে সম্ভবত কাশছে। বিশ্বরূপের দু’চোখে ঘুম নেই। রাতে সে ঘুমোতে চায় না। লোকনাথ যে ঘুমিয়ে পড়েছে, তার নিঃশ্বাসের আওয়াজ শুনে বিশ্বরূপ বুঝতে পারল। গভীর মমতায় ভরে গেল তার বুক। পরম নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে লোকনাথ। তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে ঘরছাড়া করছে ভেবে বিশ্বরূপের চোখে জল এল। অন্ধকারে হাতের পাতায় চোখের জল মুছতে গিয়ে তার কান্নার বেগ আরও প্রবল হল। গোরার কথা ভেবে, সন্তান নিখোঁজের শোকে কান্নায় ভেঙে পড়া মায়ের করুণ মুখের ছবি অনুমান করে, অসুস্থ জগন্নাথের জন্যে দুশ্চিন্তায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে সে কাঁদতে থাকল। কান্নার আওয়াজে লোকনাথের ঘুম ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কায় বালিশে মুখ গুঁজে দিল। গাঢ় ঘুমে রয়েছে লোকনাথ। বিশ্বরূপের ফোঁপানিতে সে জাগল না। রাতের তৃতীয় প্রহরে বিশ্বরূপ বিছানায় উঠে বসল। বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্ধারিত সময় এসে গেছে। লোকনাথকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে গিয়েও বিশ্বরূপ থমকে গেল। স্নেহের ভাইকে জাগাতে কষ্ট হল। লোকনাথ ঘুমোক। সংসারে থাকুক সে। ঘুম থেকে তাকে বিশ্বরূপ তুলবে না। দাদা, সন্ন্যাস নিলে ছোটভাইকেও সেপথে যেতে হবে, এমন কথা নেই। লোকনাথকে নিজের সন্ন্যাস নেওয়ার অভিপ্রায় বিশ্বরূপ না জানালে, এই ভাইটির মাথায় সন্ন্যাসী হওয়ার ইচ্ছে জাগত না পাঁচজন গৃহীর মতো শান্তিতে সংসার করত। সন্ন্যাস নেওয়ার ইচ্ছে, লোকনাথকে বলা ভুল হয়েছে। অনেক চেষ্টা করেও ঘুমন্ত লোকনাথের মুখ অন্ধকারে দেখতে পেল না বিশ্বরূপ লোকনাথের ঘুম যাতে না ভাঙে, তাই সতর্কভাবে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। লোকনাথকে সঙ্গী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তাকে ফেলে চলে যেতে তীব্র মনঃকষ্ট হলেও তাড়াতাড়ি বাড়ির বাইরে গিয়ে দাঁড়াতে চাইছিল সে। লোকনাথ জেগে ওঠার আগে তার চোখের আড়ালে চলে যেতে চায় বিশ্বরূপ। লোকনাথকে সঙ্গী করলে দাদামশাই-এর পরিবারের চোখে অপরাধী হয়ে থাকবে সে। আত্মীয়পরিজন মনে মনে ক্ষমা করবে না তাকে। সকলে জানে, বিশ্বরূপ বলতে লোকনাথ অজ্ঞান। দু’বছরের বড় দাদার এত অনুরাগী, তার সমাধ্যায়ী ভাই হতে পারে, কারও ধারণা ছিল না। লোকনাথের অন্ধ আনুগত্যে বিশ্বরূপের মনে চাপা গর্ব থাকলেও কিছুটা বিব্রত বোধ করত সে। আবার, লোকনাথকে কয়েকদিন না দেখলে চঞ্চল হতো তার মন। গোরার মতো, লোকনাথের সঙ্গে সারা জীবনের সম্পর্ক চুকিয়ে রাতের শেষ প্রহরে নিঃশব্দে ঘরের দরজা খুলে খোলা পাল্লা আরও নিঃশব্দে বন্ধ করে, ঘরের বাইরে মাটির দাওয়ায় এসে দাঁড়াল। তার প্রিয় গ্রন্থের পুঁথি, ‘ভাগবত’ তার হাতে। কলাপাতায় পুঁথি মুড়ে সুতলি দিয়ে বেঁধে নিয়েছে। কৃষ্ণপক্ষের রাত। আকাশের পশ্চিমকোণে কৃষ্ণাচতুর্থীর চাঁদ। ঈষৎ ঘোলাটে নীল আকাশে ছড়িয়ে রয়েছে অগুনতি তারা। দূর আকাশের নক্ষত্রমণ্ডলীর ম্যাড়মেড়ে আলো, পৃথিবীতে যতটা পৌঁছেছে, তার ছোঁয়ায় ধোঁয়ার মতো দেখাচ্ছে সামনে ডালপালা মেলে দাঁড়ানো বুড়ো নিমগাছ, গাছের নিচে খড়ের ছাউনি দেওয়া সেই আঁতুড়ঘর, যেখানে ভূমিষ্ঠ শচীর দশ ছেলেমেয়ের মধ্যে আট কন্যাসন্তানের সকলে মৃত। বেঁচে রয়েছে শুধু দুই ছেলে—বিশ্বরূপ ও গোরা। তুলোট কাগজে আঁকা অস্পষ্ট ছবির মতো আঁতুড়ঘরটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল বিশ্বরূপ। তার মৃত আট দিদি ওই ঘরে যেন ছায়ার মতো বসে আছে। আদরের ছোটভাই ঘুমোচ্ছে মাকে জড়িয়ে ধরে। লোকনাথ জেগে ওঠার ভয়ে বেশিক্ষণ উঠোনে দাঁড়াতে বিশ্বরূপ ভরসা পেল না। লোকনাথকে ফাঁকি দিয়ে পালাতে চায় সে। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে লোকনাথের ঘুম ভাঙলে, পাশে কেউ নেই দেখে সে কী করবে? ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে তাকে খুঁজে না পেয়ে সে নিশ্চয় পাশের ঘর থেকে শচী, মানে তার পিসিকে ডাকবে। শচীকে নিশ্চয় সে তখনই বিশ্বরূপের সন্ন্যাস নেওয়ার সঙ্কল্প জানাবে না। অমানুষিক আঘাতে প্রথমে পাথর হয়ে যাবে। প্রাণের চেয়ে যাকে বেশি ভালবাসে, সে এভাবে চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে যেতে পারে, লোকনাথ প্রথমে বিশ্বাস করবে না। কয়েক দণ্ড পরে অনুভব করবে পৃথিবীতে কোনও ঘটনা অসম্ভব নয়। অসম্ভব বলে কিছু নেই। ঘটে যা, তা সব অসম্ভবের গর্ভ থেকেই জন্ম নেয়। বিশ্বরূপের ওপর অভিমানে লোকনাথের আত্মঘাতী হওয়া অসম্ভব নয়।

পাঁচবার পৈতৃক বাস্তু প্রদক্ষিণ করে, সদর দরজা খুলে বাড়ির সামনের সড়কে এসে দাঁড়াল বিশ্বরূপ। ঘুমন্ত নবদ্বীপ শহর। দ্রুত হেঁটে নাগরিয়া ঘাটে পৌঁছে গেল সে। খাঁ খাঁ করছে ইট বাঁধানো স্নানের ঘাট। রাতের চতুর্থ প্রহরের মাঝামাঝি থেকে দু’একজন করে সাধু, যোগী স্নান করতে গঙ্গার ঘাটে আসতে শুরু করে। তারপর আসতে থাকে নবদ্বীপের ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের দল, নানা ধরনের স্নানার্থী, সকলেই ব্রাহ্মণ। চারপাশ ভালো করে দেখে, ভাগবতের পুঁথি দু’হাতে সযত্নে ধরে, ঘাটের চাতালে শুয়ে দেবী ভাগীরথী গঙ্গাকে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করল বিশ্বরূপ সিঁড়ি ধরে ধীরে ধীরে গঙ্গার জলে নামল। জনপ্রাণী ঘাটে আসার আগে, সাঁতার কেটে গঙ্গার উল্টোদিকে কাটোয়ায় চলে যেতে চায়। পাকা সাঁতারু সে। বর্ষার দিনে ভরা জোয়ারের সময়ে সাঁতার কেটে কতবার গঙ্গা পারাপার করেছে, হিসেব নেই। কনকনে ঠাণ্ডা বুকজলে গিয়ে সে দাঁড়াল। সামনে দিগন্ত পর্যন্ত কুচকুচে কালো জল। কাটোয়ার তীর তরল অন্ধকারে মিশে গেছে। বিশ্বস্রষ্টা, মহাশক্তিকে স্মরণ করে সাঁতার শুরু করল বিশ্বরূপ। ডান হাতের মুঠোয় ভাগবতের পুঁথি জলের ওপর তুলে ধরে, শুধু এক হাতে জল কেটে, অশেষ ক্লেশে সাঁতার কেটে চলেছে সে। সামনে কোথাও একটা নৌকো নেই। খেয়া পারাপার শুরু হতে আরও এক ঘণ্টা। মাঝগঙ্গায় এসে বিশ্বরূপ খেয়াল করল, তার পেছনে সমান তালে জল কেটে কেউ আসছে। জনমানুষহীন নিস্তব্ধ মাঝগঙ্গায় পেছন ফিরে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেলেও, সাঁতার কাটার একটানা ছপছপ আওয়াজে ভয় পেল সে। কুমির লাগল নাকি পেছনে? অথবা হাঙরের মতো কোনও জীব? হাতে ভাগবত থাকাতে ডুব সাঁতার দিয়ে অন্ধকার জলস্রোতের অন্য কোথাও সরে যাবে, সে উপায় নেই। সাঁতারের গতি বাড়িয়ে তার বাঁহাত যখন আড়ষ্ট হয়ে আসছে, ভাগবত সমেত ডান হাত মাথার ওপর থেকে ক্রমশ নেমে আসছে কানের পাশে কেউ বলল, দাদা, পুঁথিটা আমাকে দাও।

অন্ধকার মাঝগঙ্গার প্রবহমান গর্ভে মানুষের গলা শুনে জলের ওপর ঘাড় উঁচু করে লোকনাথকে দেখে খুব বেশি চমকালো না বিশ্বরূপ। এরকম কোনও ঘটনার জন্যে সে অপেক্ষা করছিল। তার হাত থেকে ভাগবত নিতে জলের ওপর হাত তুলে দিয়েছে লোকনাথ কলাপাতায় মোড়া ভাগবত নিঃশব্দে লোকনাথের হাতে পাচার করে বিশ্বরূপের মনে হল, তার হাত থেকে গোবর্ধন পাহাড় নামল। পাশাপাশি সাঁতার কেটে দু’ভাই যখন কাটোয়ার ঘাটে এসে পৌঁছোল, রাতের অন্ধকার ফিকে হয়ে এসেছে। রাতের এই চতুর্থ প্রহরেও ঘাটে পৌঁছে গেছে দুই স্নানার্থী। তাদের একজন কোমর পর্যন্ত জলে দাঁড়িয়ে মন্ত্র জপ করছে, আর নিজের নাভিতে তেলমর্দনরত দ্বিতীয়জন জলের দিকে তাকিয়ে জলের শীতলতা মাপছে। জল থেকে উঠে আসা দুই তরুণকে দু’জনের কেউ-ই ভালো করে খেয়াল করল না। ঘাটে স্নানার্থীর ভিড় জমতে দেরি নেই অনুমান করে ঘাট ছেড়ে খানিকটা দূরে সরে গেল বিশ্বরূপ। লোকনাথ অনুসরণ করল তাকে। উত্তুরে হাওয়ায় ভিজে সপসপে পোশাক গায়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল চোদ্দো বছরের কিশোর লোকনাথ। তাকে দেখে বিশ্বরূপের কষ্ট হলেও বাড়ি ফিরে যেতে বলতে লজ্জা পাচ্ছিল। কথাটা সে বললে, লোকনাথ বলতে পারে, বিশ্বরূপের সঙ্গে সে আসেনি। স্বেচ্ছায় একা এসেছে সে। লোকনাথ জানতে চাইতে পারে, তাকে না নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বিশ্বরূপ কেন চলে এল? শীতে কাঁপলেও লোকনাথের মুখ-চোখে কাতরতা নেই। তাকে ফেলে চলে আসার জন্যে বিশ্বরূপের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া দূরের কথা, চালচলনে লোকনাথ এমন ভাব দেখাল, যেন আদপে সে ঘটনা ঘটেনি। ভিজে ধুতি, অঙ্গবস্ত্র, শীতের হাওয়ায় গা কামড়ে বিশ্বরূপের বুকের রক্ত জল হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও সে রা কাড়ল না। শীত ঠেকাতে গঙ্গার ধার থেকে খোলা মাঠের দিকে হাঁটতে থাকল। সমান ঠাণ্ডা সেখানে থাকলেও উত্তরের হাওয়ার দাপট নেই। কাঠকুটো জড়ো করে রাস্তার ধারে কোথাও আগুন জ্বেলে হাত-পা সেঁকে নিলে আরাম হত। ভিজে পোশাক শুকিয়ে যেত আগুনের আঁচে। তা সম্ভব নয়। আগুন জ্বালানোর চকমকি নেই সঙ্গে। থাকার কথা নয়। সন্ন্যাস নিতে এক কাপড়ে যে বাড়ি ছাড়ে, তাকে খালি হাতে বেরোতে হয়। আরাম করা, সাধ-আহ্লাদ মেটানোর উপকরণের চিন্তা দূরের কথা, সেদিকে সন্ন্যাসীর তাকানো পর্যন্ত নিষেধ। জীবনের দুঃসহ কষ্ট গায়ে না মাখা প্রকৃত বৈরাগ্য, ষোলোআনা শাস্ত্রবেত্তা পণ্ডিত না হয়েও বিশ্বরূপ তা জানে। সে কষ্ট পাচ্ছিল লোকনাথকে দেখে। লোকনাথকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে পারলে বিবেকের দংশন থেকে সে মুক্তি পেত! এত কাণ্ডের পরে কথাটা সে ফের বলল লোকনাথকে। লোকনাথকে সংসারে ফিরে যাওয়ার জন্যে করুণ গলায় মিনতি করল, অনেক শাস্ত্রবাক্য শোনাল, বিস্তর বোঝাল। তার সব অনুরোধ, উপরোধ নিষ্ফল হল।

বিশ্বরূপ কথা বাড়াল না। সে ভাবছিল, তার লেখা পুঁথি জগন্নাথ পুড়িয়ে না ফেললে সংসার ছেড়ে সে কি চলে আসত? প্রশ্নটা বাড়িতে থাকতে মাথায় এলেও বিশদভাবে চিন্তা করার সময় পায়নি। প্রবল অভিমানে তার বুক যখন ফেটে যাচ্ছে, সেই বহ্নিতে তখন ঘি আহুতি দিয়েছিল জগন্নাথ। পুঁথি পোড়ানোর ঘটনা না ঘটলে, সেটা গোরা পড়া পর্যন্ত সংসারে হয়তো আবদ্ধ থাকত বিশ্বরূপ। সেরকম সঙ্কল্প ছিল তার। পুঁথিটা গোরা পড়ে ফেলার পরে সে সন্ন্যাস নিত। সংসারে থাকলেও সে দারপরিগ্রহ করত না। গোরার জন্যে নির্দিষ্ট বধূকে খুঁজে বার করে, তাকে সংসারী করে সে সন্ন্যাস নিত। সে জেনে গেছে, পৃথিবীর মহৎ মানুষেরা, সকলেই ঈশ্বরের অবতার, দেবশিশু। সেই ঈশ্বর কখনও দেবরাজ ইন্দ্র, কখনও বরুণদেব, পবনদেব, অথবা বিধাতার বিধাতা স্বয়ং বিষ্ণু। মুজাভিরের শরীরেও তিনি পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন।

বাবার রোষে তার যে পুঁথি আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে, সেখানে গোরার জন্যে এই বার্তা লিখিত হয়েছিল। তার জন্মবিবরণ বিস্তৃত লিখে তাকে জানানো হয়েছিল সে যে-সে মানুষ নয়, পৃথিবীর মহামানবদের সে একজন। অনেক বড় কাজ করতে সে ভূমিষ্ঠ হয়েছে।

গোরাকে পাঠানো তার বার্তা তার কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা অঙ্কুরে মরে যাওয়ার সঙ্গে আরও আতঙ্কজনক, যা ঘটতে চলেছিল, তা হল তার বিয়ের অনুষ্ঠান। অখণ্ডনীয়ভাবে অসম্ভব, সেই ঘটনা সে মেনে নিতে পারে না। সাত বছর আগে তার পুঁথি রচনার মাঝপথে, তার ত্রিকালজ্ঞ জ্যোতিষী, দাদামশাই নীলাম্বর চক্রবর্তী, এক দুপুরে তাকে একান্তে ডেকে বলেছিল, জগন্নাথের কোষ্ঠিতে রয়েছে, তার দুই ছেলের একজন সন্ন্যাসী হবে, অন্যজন সংসার করবে। দাদামশাই-এর এই অমোঘ উক্তি জগন্নাথের কানে না গেলেও তা শুনেই বিশ্বরূপ ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ঠিক করে নিয়েছিল।

অতঃপর সংসার না করে গোরার উপায় নেই, এই ভেবে, পরিতৃপ্তিতে লোকনাথকে নিয়ে বিশ্বরূপ যখন ফাঁকা মাঠের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে, সকালের প্রথম রোদ পড়ল বিশ্বরূপের শরীরে। সে দেখল লোকনাথের গায়েও লেগে রয়েছে ভোরের মিঠে রোদ। শীতে কুঁকড়ে যাওয়া লোকনাথকে বিশ্বরূপ বলল, সূর্য উঠছে, আমাদের ভিজে ধুতি, চাদর এবার শুকিয়ে যাবে।

বিশ্বরূপের ডানহাত দুহাতে জড়িয়ে ধরল লোকনাথ। ফাঁকা মাঠে জানু পেতে, পুব আকাশের দিকে তাকিয়ে দু’জনে করজোড়ে সূর্যবন্দনা শুরু করল, ‘জবাকুসুম সঙ্কাশং।’

নবদ্বীপে জগন্নাথের বাড়িতে বিশ্বরূপের খোঁজে তখন হুলস্থূল শুরু হয়েছে। লোকনাথের সঙ্গে সে বেলপুখুরিয়াতে মামাবাড়িতে যেতে পারে, অনুমান করে সেখানে গৃহভৃত্য ঈশানকে পাঠিয়ে দিয়েছে জগন্নাথ। মুখ চুন করে দাওয়ায় বসে আছে শচীঠাকরুণ। তখনও গোরা ঘুম থেকে জাগেনি।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *