অধ্যায় ৭
সন্দেহভাজন
“ইমতিয়াজ!”
সিগারেটে জোরে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ার পর পর দাঁতে দাঁত পিষে বললেন এসএম হায়দার। নাক দিয়ে যেন ধোঁয়া নয়, বের হচ্ছে উত্তপ্ত ক্রোধ! চোখের সামনে ধরে রেখেছেন একটি সাদা-কালো ছবি।
আমি রামজিয়ার বাসা থেকে সোজা থানায় ফিরে এসে দেখি হায়দারভাই অস্থির হয়ে পায়চারি করছেন। আমাকে দেখেই তিনি প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে শুরু করবেন, অমনি তাকে একগাদা নতুন তথ্য দিয়ে বোবা করে দেই ক্ষণিকের জন্য।
মিলির স্বামি মিনহাজের সাথে আমার কথোপকথন, ছবিতে ইমতিয়াজের অমন চানি, রামজিয়ার কাছ থেকে ইমতিয়াজ সম্পর্কে যতোটুকু জেনেছি, সব বলার পর আমার হাত থেকে ছবিটা নিয়ে তিনি রাগে ফুঁসতে থাকেন।
“ছবির এই চাহনি দেখে অবশ্য নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না, তবে খতিয়ে দেখতে হবে,” আমি বললাম। “খুনি হিসেবে এই লোকের সম্ভাবনা আছে। আপনি কি বলেন?”
“তা তো আছেই, কেউই সন্দেহের বাইরে নয়। সবাইকে বাজিয়ে দেখতে হবে।” তার দৃষ্টি ছবিতেই নিবদ্ধ।
“আপনি এতো দেরি করলেন কেন? কোথায় গেছিলেন?”
মুখ তুলে তাকালেন হায়দারভাই। ছবিটা ডেস্কের উপরে রেখে বললেন, “আর বোলো না, একটা মামলায় কোর্টে গেছিলাম…শালার ম্যাজিস্ট্রেটের আসার কোনো নামগন্ধ নেই। আসার কথা দশটার দিকে, হারামজাদা নবাব সলিমুল্লাহ এসেছে সাড়ে বারোটায়।” রাগেক্ষোভে মুখ বিকৃত করে ফেললেন তিনি। “নবাবসাহেব একটা মামলা শেষ করেই চলে গেলো লাঞ্চে, ফিরে এলো দু-টার পর। আমি খালাস পেলাম তিনটায়। সারাটা দিনই গেলো কোর্টের বারান্দায়।”
পুলিশের চাকরি অল্পদিন ধরে করলেও ততোদিনে অনেক কলিগকে এরকম অভিজ্ঞতা অর্জন করতে দেখেছি। দ্রুতই বুঝতে পেরেছি, কোনো মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে কোর্টে হাজিরা দেয়ার মতো বিড়ম্বনার কাজ আর নেই।
“মনে হয় দেশটা এদের জন্যই স্বাধীন হয়েছে।” ক্ষোভের সাথে বললেন হায়দারভাই। “কোনো কিছু যদি ঠিকমতো চলতো! সবখানে একই অবস্থা। পাবলিক তো এখনই বলা শুরু করে দিয়েছে, পাকিস্তান আমলই ভালো ছিলো।”
আমি চুপ থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। অন্য কোনো সময় হলে হায়দারভায়ের সাথে একচোট তর্কাতর্কি করতাম, যেমনটা সব সময় করি। উনি আওয়ামী লীগের কড়া সমালোচক আর আমি কট্টর সমর্থক। স্বাধীনতার পর থেকেই উনার স্বপ্নভঙ্গ হতে শুরু করেছে। সরকারী দলটির অনেক কর্মকাণ্ড আর নীতি তার পছন্দ নয়। আমি এর বিপরীত। তখনও আশায় ছিলাম, অচিরেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু ঠিকই সব গুছিয়ে নিতে পারবেন। তার স্বপ্নের সোনারবাংলা হবেই হবে।
এই একটা বিষয়ই আছে যা আমাদের সম্পর্ককে পুরোপুরি মিষ্টি হতে দেয়নি, কিছুটা টক-ঝাল করে রেখেছে। এতে অবশ্য আমাদের আন্তরিকতায়, সম্পর্কে কোনো চিড় ধরেনি। বরং আমার মনে হয়, এর ফলে আমাদের ঘনিষ্ঠতা আরো বেড়ে গেছে। দু-জনেই দু-জনের মনের কথা খোলাখুলিভাবে বলতে পারি, রাগ-ক্ষোভ, হতাশা প্রকাশ করতে পারি। আমার ধারণা, সম্পর্ক বেশি মিষ্টি হলে ডায়বিটিসের মতো ভয়ঙ্কর কিছু ঢুকে পড়ে!
“আর আমাদের জাতিরপিতা! তোমার বঙ্গবন্ধু!” ঝাঁঝের সাথে বললেন, “আবেগমার্কা কথাবার্তাই শুধু বলে যাচ্ছেন। উনার চারপাশে নাকি সব চোর! চাটার দল নাকি সব চেটেপুটে খাচ্ছে! তা, আপনি কী করছেন? আপনি তো সৈয়দ মোহাম্মদ হায়দার নন, কোনো ঠুটা জগন্নাথও নন। আপনি জাতির পিতা! দেশটার মালিক! সমস্ত ক্ষমতা আপনার হাতে। চোরবাটপারগুলোকে পাছায় লাথি মেরে বঙ্গপোসাগরে ফেলে দিচ্ছেন না কেন! চাটার দলের জিহ্বা কেটে কুকুর দিয়ে খাইয়ে দেন! আপনার আশেপাশেই তো ওরা ঘোরাঘুরি করে। ওদেরকে আপনি ভালো করেই চেনেন। আপনি মামা না- হয়ে, বাবা না-হয়ে, মুজিবভাই না-হয়ে, দলের নেতা না-হয়ে আমাদের শেখসাহেব হয়ে যান না আবার!
আমার চুপ মেরে থাকাটা যেন হায়দারভাইকে আরো ক্ষেপিয়ে তুললো।
“এখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছো কেন? চোপাবাজি করো? তোমার নেতাকে ডিফেন্ড করো? কিছু যুক্তি দাও?”
“আমি যা-ই বলবো সেটাই আপনার কাছে কু-যুক্তি মনে হবে, তাই কিছু না বলাই ভালো,” মুচকি হেসে বললাম।
“বাহ্, দারুণ পরিবর্তন হয়েছে তো তোমার!” নাটকিয় ভঙ্গিতে বললেন তিনি। “কয়েক দিন আগেও তো খুব চোপাবাজি করতে, আজ দেখি অন্য সুর! তলে তলে আবার ঐ বালের জাসদে নাম লিখিয়েছো নাকি?”
আমি হেসে ফেললাম। “আমি জাসদে যোগ দেবো? কী যে বলেন!”
“তাহলে হঠাৎ এই পরিবর্তন, ঘটনা কি?”
“আশ্চর্য! ঘটনা আবার কি, ঐ লোকটার ঠিকানা জোগাড় করেছি, চলেন তার খবর লাগাই। সব সময় রাজনীতি নিয়ে তর্কা করতে ভালো লাগে না।”
“আরে ব্রাদার, সাধে কি করি? আমাদের সবকিছু জড়িয়ে আছে এই রাজনীতির সাথে। সবকিছু।”
মুচকি হাসলাম আমি। “হুম, বুঝতে পেরেছি। আমাদের এই কেসেও রাজনীতি আছে!”
আমার টিটকারিসুলভ কথাটা আমলে নিলেন না হায়দারভাই, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন শুধু। “না থাকলেই ভালো।” তারপর একটু চুপ থেকে আবার বললেন, “রাজনীতি ঠিক না হলে কোনো কিছুই ঠিকমতো চলবে না। এমনকি আমাদের এই যে তদন্ত, এটাও ঠিকমতো করতে পারবো না।”
ঐ মুহূর্তে কথাটার গুরুত্ব আমি পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিলাম, যেন সবটাই আমার কাছে পরিস্কার। “সবই বুঝি, বড়ভাই,” বলেছিলাম তাকে, “কিন্তু এখানে বসে বসে কারোর চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করলে কি রাজনীতি ঠিক করতে পারবেন?”
হায়দারভায়ের ক্ষুব্ধ চোখে হঠাৎ করেই বিষন্ন এক হতাশা নেমে এলো যেন। আর সেই বিষন্ন চোখজোড়া সরাসরি আমার দিকেই নিক্ষিপ্ত। “কী করবো, বলো, এখন তো যুদ্ধ চলছে না…গুলি করে শেষ করে দেবো সব ক-টাকে।” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুকের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভ নির্গত করে বললেন, “এসব বলি কেন জানো?”
আমি ভেতরে ভেতরে লজ্জায় কুকড়ে গেলাম। আমার এভাবে কথা বলা ঠিক হয়নি।
“অনেক ক্ষোভ…সারাক্ষণ দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে। তুমি বুঝবে না, ব্রাদার। এসব বলে বলে আগুনের তেজ কমাই।”
হায়দারভাই জীবনবাজি রেখে, মা-বাবা, ভাই-বোন এমনকি নতুন বউকে ফেলে যুদ্ধে চলে গেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন এমন একটি সমাজ যেখানে একটু-আধটু অভাব থাকলেও অন্যায় যেন না থাকে। সেটা যখন পাননি তখন তার হতাশা আন্দাজ করা আমার মতো একজনের পক্ষে বোঝা সত্যি কঠিন। আমি, যে কি-না যথেষ্ট উপযুক্ত বয়স থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধে যাবার সাহস দেখাতে পারিনি। ভীরু কাপুরুষের মতো পালিয়ে বেড়িয়েছি নিজের জীবন নিয়ে। বেঁচে থাকাটাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে আমার কাছে। এই যে যুদ্ধে না-যাওয়া, এটা আমার আজন্ম আক্ষেপ হয়ে আছে। যদিও হায়দারভাই কখনও চূড়ান্ত রাগের সময়ও বলতেন না-তুমি কিভাবে বুঝবে, তুমি তো যুদ্ধ করোনি! তিনি জানতেন, যুদ্ধে না-যাবার অপরাধবোধ আমার ভেতরে রয়েছে। এটা বলে আমাকে কখনও লজ্জা দিতে চাইতেন না। কিন্তু উনি না বললেও আমি ঠিকই কথাটা শুনতে পেতাম! যেন মগজের ভেতরে কেউ চিৎকার করে বলে উঠতো, আমাকে যারপরনাই বিব্রত করে তুলতো।
“চলো, ঐ শালার ইমতিয়াজের পাত্তা লাগাই।”
হায়দারভায়ের কথায় মুখ তুলে তাকালাম। উনি ডেস্ক থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
“চলো?”
আমি হায়দারভায়ের পেছন পেছন থানা থেকে বের হয়ে গেলাম। যে জিপটায় করে রামজিয়াদের বাড়িতে গেছিলাম ওটা নিয়েই চলে গেলাম ইমতিয়াজের খোঁজে কাঠালবাগানে। তখন ওসব এলাকা খুব নিরিবিলি ছিলো, অনেকটা মফশ্বলের মতো। পথেঘাটে যানজট বলতে কিছুই ছিলো না। আজিমপুর থেকে কাঠালবাগানে চলে গেলাম কয়েক মিনিটের মধ্যেই। পথে আমাদের মধ্যে তেমন কোনো কথা হলো না। হায়দারভাই চুপচাপ সিগারেট টেনে গেলেন। আমি অবশ্য সিগারেট ধরালাম না। ইচ্ছে করছিলো না। কখন যে কাঠালবাগানের বড় মসজিদের সামনে চলে এলাম টেরই পাইনি।
হায়দারভাই একটা চুল কাটার সেলুনের সামনে গাড়ি থামিয়ে বয়স্ক নাপিতকে ইমতিয়াজের কথা জিজ্ঞেস করতেই লোকটা হাত তুলে দেখিয়ে দিলো একটু দূরেই ইলেক্ট্রিক পোস্টের পাশে রঙচটা দেয়ালের একতলার বাড়িটা।
পুলিশের গাড়ি দেখে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা অনেকেই সটকে পড়লো। কেউ কেউ উৎসুক হয়ে ঘাড় উঁচু করে দেখতে লাগলো ঘটনা কি।
ইমতিয়াজদের বাড়িতে ঢোকার জন্য কোনো দরজা নেই। তখনকার দিনে অনেক বাড়িই এমন ছিলো।
বাড়িটার দিকে তাকালাম। খুবই মলিন আর পুরনো। ভেতরে ঢোকার পর কাঁচামাটির একটি আঙিনা, তারপর দু-তিনটে ঘর। চারদিকে পাকা দেয়াল হলেও ছাদ টিনের। পুলিশের পোশাকে দু-জন লোককে ঢুকতে দেখে বয়স্ক এক মহিলা ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। তার চোখেমুখে আতঙ্ক।
“এটা কি ইমতিয়াজদের বাসা?” হায়দারভাই বেশ রাশভারি কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন।
মাথা নেড়ে সায় দিলেন মহিলা।
“আপনি কে?”
“ওর মা।”
“ইমতিয়াজ বাড়িতে আছে?”
“না।”
“কখন আসবে?”
মহিলা ঢোক গিললেন। “ও তো কাইল রাইতে বাড়িতে আসে নাই।”
হায়দারভাই ভুরু কুচকে চেয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। “আসে নাই মানে?”
মহিলা একটু কাচুমাচু খেলেন। “মাজেমইদ্যেই রাইতে বাড়িতে আসে না।” কথাটা বলেই মাথা নীচু করে ফেললেন ইতমিয়াজের মা।
“রাতে বাসায় না এসে কোথায় থাকে জানেন না?”
মাথা দোলালেন বৃদ্ধা।
হায়দারভাই বাড়ির চারপাশটা দেখে নিলেন। “ইমতিয়াজের বাবা আছেন?”
“অফিসে গেছে।”
“কি করেন উনি?”
“ঢাকা ভারসিটির রেজিস্টার বিল্ডিংয়ে কাজ করে।”
“আর কেউ নেই? ভাই-বোন?”
“আমার এক মেয়ে আছে…বিয়া হইয়া গেছে, বাবা।” মহিলাকে আরো ভয়ার্ত দেখালো।
“আপনার ছেলে করে কি?”
মহিলা ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে ঢোক গিলে বললেন, “আ-আমি জানি না।”
“ছেলে কি করে আপনি জানেন না?” হায়দারভাই একটু চটে গেলেন।
আবারো ঢোক গিললেন মহিলা। “পলিটিক্স করে। কিন্তু কাম-কাজ কি করে তা তো জানি না, বাবা।”
“হুম,” দাঁতে দাঁত পিষে আবারো আমার দিকে তাকালেন তিনি। “পলিটিক্স করলে তো আর কিছু করা লাগে না। দারুণ একখান পেশা।”
মহিলা ফ্যাল ফ্যাল চোখে চেয়ে রইলেন আমাদের দিকে
“ওর কোনো বন্ধুবান্ধব আছে? মানে যাকে জিজ্ঞেস করলে জানা যাবে ও কোথায় থাকে?”
ইমতিয়াজের মা মাথা দোলালেন। “আমি তো এমুন কাউরে চিনি না। একটু চুপ থেকে গম্ভীরভাবে বললেন, “মিলি যে খুন হয়েছে এটা আপনারা জানেন?”
“জানুম না কেন, ওরা তো আমাগো আত্মীয় হয়।”
“হুম।”
মহিলা ঢোক গিলে জানতে চাইলেন, “ইমতিয়াজ কি করছে, বাবা?”
হায়দারভাই বাঁকাহাসি দিলেন। “কিছু করে নাই। পাসপোর্ট করতে দিয়েছে। পাসপোর্ট করতে দিলে পুলিশ বাসায় এসে খোঁজখবর নিয়ে দেখে ঠিকানাসহ সব ঠিকঠাক আছে কি-না, বুঝলেন?”
মনে হলো মহিলা খুব অবাকই হলেন কথাটা শুনে। “ও পাসপোর্ট করতে দিসে?”
“হুম।”
“বিদেশ যাইবো নি?”
“তাই তো মনে হচ্ছে।” হায়দারভাই আমার দিকে ফিরলেন। “চলো। এখানে কাজ শেষ।”
ইমতিয়াজের বাড়ি থেকে বের হয়ে হায়দারভাই যেন আরো বেশি নিশ্চিত হয়ে গেলেন মিলির খুনটা সে-ই করেছে। গাড়িতে করে থানায় ফিরে আসার সময় আমার পিঠ চাপড়ে দিয়েছিলেন। মানে, সত্যি সত্যি পিঠে চাপড় মেরে যেভাবে বাহবা দেয়া হয় সে-রকম কিছু।
“তুমি দারুণ কাজ করেছো। অসাধারণ!”
হায়দারভায়ের মুখ থেকে কথাটা শুনে গর্বে বুক ফুলে যাবার কথা, কিন্তু আমি লজ্জায় কুকড়ে গেলাম।
“আমি ভাবতেই পারিনি এভাবে ছবি দেখে সাসপেক্ট বের করা যেতে পারে।” আমার দিকে তাকালেন। “এরজন্যে তুমি আমার কাছ থেকে আপাতত একটা সিগারেট পেতেই পারো। পরে তোমাকে বড় কিছু দেবো।” কথাটা শেষ করেই একটা সিগারেট বাড়িয়ে দিলেন তিনি। “এটা তোমার প্রাইজ।”
আমি সিগারেটটা হাতে নিয়ে রীতিমতো আবেগতাড়িত হয়ে পড়লাম। হোক না সামান্য একটা সিগারেট, হায়দারভায়ের কাছ থেকে একটা শব্দ- বাক্য উপহার পেলেও আমি খুশিতে সারারাত ঘুমাতাম না।
“আমি খুব খুশি হয়েছি।”
লজ্জায় আরো কুকড়ে গেলাম। সেটা কাটিয়ে ওঠার জন্য বললাম, “ইমতিয়াজই যে করেছে তা কিন্তু নিশ্চিত না, ভাই।”
“আলবৎ ও করেছে। আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর। ফ্যামিলি থেকে ডিটাচ্ড লোকজনই এরকম জঘন্য খুন-ধর্ষণ করে। এগুলো স্বাভাবিক মানুষের কাজ না,” বেশ জোর দিয়ে বললেন। “বুড়ো মা-বাবা রেখে বাড়ির বাইরে থাকে, কাজকর্ম কিছু করে না, বিয়েশাদিও করেনি। একদম খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে, বুঝলে?”
“দেখা যাক…ইমতিয়াজকে ধরতে পারলেই সব জানা যাবে।”
“ওকে আমি ধরবোই। যেখানেই থাকুক, আমি ওকে ধরবো। আমার হাত থেকে ও পালাতে পারবে না।”
পরদিন খুব সকালে আবারো ইমতিয়াজের বাসায় গেলাম আমরা। আমাদের দেখে ইমতিয়াজের মা বেশ ভড়কে গেলেন। জানালেন তার ছেলে বাসায় নেই। গতকাল রাতেও বাসায় আসেনি।
হায়দারভাই এবার আর নিছক কথা বলে চলে এলেন না। ইমতিয়াজের ঘরটা তল্লাশি করলেন তিনি। কিছুই পাওয়া গেলো না। দশ-বাই-দশ ফুটের ছোট্ট একটা ঘর। সস্তা আমকাঠের খাট। জামাকাপড় রাখার একটি আলনা। একটা চেয়ার আর টেবিল। ঘরের দেয়ালভর্তি বাংলা সিনেমার নায়ক- নায়িকাদের রঙ্গিন ছবি লাগানো। দেখেই বুঝতে পারলাম, সিনে-পত্রিকা চিত্রালী আর রূপবাণী’র পৃষ্ঠাগুলো কেটে কেটে লাগানো হয়েছে।
হায়দারভাই অবশ্য দেয়ালের দিকে নজর না দিয়ে প্রায় ফাঁকা আলনার দিকে চেয়ে রইলেন।
“ও কাল বাড়িতে এসেছিলো,” আস্তে করে বললেন তিনি।
কথাটা শুনে অবাক হলাম। “তাই নাকি?”
মাথা নেড়ে সায় দিলেন। “ওর মা মিথ্যে বলছে।”
হায়দারভাই কেন এমন সিদ্ধান্তে এলেন সেটা বুঝতে পারলাম আলনায় কোন জামা-কাপড় নেই দেখে।
ঘর থেকে বের হয়ে ইমতিয়াজের মাকে ধমক দিয়ে জানতে চাইলেন এসএম হায়দার, “মিথ্যে বললেন কেন, আপনার ছেলে তো কাল বাড়িতে এসেছিলো?”
মহিলা আমতা আমতা করে ঢোক গিললেন।
বয়স্ক মহিলা বলে খুব বেশি ধমকাধমকি না করে আমাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন তিনি।
“এখন আমরা কি করবো তাহলে? ওকে কোথায় খুঁজবো?” বাড়ির বাইরে এসে জানতে চাইলাম আমি।”
সিগারেট ধরিয়ে আমাকেও ইশারা করলেন ধরাবার জন্য, তারপর প্রথম টান দিয়ে উদাস হয়ে কিছুক্ষণ ভেবে গেলেন, “তুমি ঐ মেয়েটার সাথে দেখা করবে…যার কাছ থেকে ইমতিয়াজের পরিচয় জেনেছো…ভিক্টিমের বান্ধবি।”
আমি সিগারেটে খুব আস্তে করে টান দিয়ে মনোযোগী শ্রোতার মতো চেয়ে রইলাম, যেন ফলাফল ভালো করার পর আরো বেশি মনোনিবেশ করা কোনো ছাত্র! “ঠিক আছে।”
“ওই মেয়েকে বলবে, সে যার কাছ থেকে ইমতিয়াজের বাড়ির ঠিকানাটা জোগাড় করেছে তার নাম-ঠিকানা দিতে…তার সাথে আমাদের কথা বলতে হবে।”
“ঠিক আছে, আমি কালই ফোন করবো।”
“না, না…ফোনটোন করার দরকার নেই। সরাসরি দেখা করবে, হায়দারভাই দিকনির্দেশনা দেবার ভঙ্গিতে বললেন। “ফোনে এড়িয়ে যাওয়া, না-করা অনেক সহজ হয়, বুঝলে? সামনাসামনি অতোটা সহজ হয় না। মেয়েটা হয়তো উটকো ঝামেলা মনে করে আর বেশি হেল্প না-ও করতে পারে। ভালো হয় দেখা করে বললে। তখন চক্ষুলজ্জার খাতিরে না করতে পারবে না।”
আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। যদিও আমার নিশ্চিত বিশ্বাস ছিলো রামজিয়া সাহায্য করবে। মিলি ছিলো তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবি।
**
ঐদিন বিকেলে দ্বিতীয়বারের মতো আবারো গেলাম রামজিয়াদের বাসায়। ফোন করে যাইনি বলে সে আমাকে দেখে অবাকই হলো। বাড়ির সামনে এক চিলতে বাগানে কী যেন করছিলো। হাতে কাঁচামাটি লেগে আছে। পরনে গতকালকের মতোই বেলবটম প্যান্ট, তবে আজকে পরেছে শার্ট। হালকা গোলাপি শার্টটা রোদে লাল হওয়া ত্বকের সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে যেন।
“এনিথিং রং?” আমাকে দেখেই বললো সে।
“না, তা নয়। একটা দরকারে এসেছিলাম,” বললাম আমি।
“ফোন করে আসলেই পারতেন, এরকম সময়ে আমি সাধারণত বাড়িতে থাকি না। আজ বাগানে কিছু নতুন গাছ লাগাচ্ছিলাম বলে বাইরে যাইনি।”
“আসলে থানার সবগুলো ফোন সকাল থেকে নষ্ট…ফোনের লাইন ঠিক করা হচ্ছে,” একটা মিথ্যে বানিয়ে দ্রুত বলে দিলাম তাকে। সময়টা অ্যানালগ টেলিফোনের। ঘনঘন লাইন খারাপ হওয়াটা একেবারেই সাধারণ ঘটনা ছিলো।
“ও,” বলেই দু-হাতের আলগা মাটি ঝেড়ে ফেললো। “ড্রইংরুমে গিয়ে বসুন, আমি হাত ধুয়ে আসছি।”
“দরকার নেই, খুব বেশি সময় লাগবে না। আমি এক্ষুণি চলে যাবো।”
“তাই?” মুখের সামনে থেকে অবাধ্য চুলগুলো ডানহাতের তালুর উল্টোপিঠ দিয়ে সরিয়ে দিলো সে।
আশ্বস্ত করার হাসি দিলাম। “আসলে একটা ছোট্ট ইনফর্মেশনের জন্য এসেছি।”
“বলুন?”
আমার দিকে আগ্রহি হয়ে তাকালো সে। সঙ্গে সঙ্গে টের পেলাম তার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে হিমশিম খাচ্ছি। ছোট্ট বাগানের দিকে তাকালাম। “খুব সুন্দর।”
“কি?” বুঝতে না পেরে বললো সে।
আমি আরো বেশি নার্ভাস হয়ে পড়লাম। “আপনার বাগানটা খুব সুন্দর।”
“নতুন কিছু গাছ নার্সারি থেকে নিয়ে এসেছি,” একেবারে সৌজন্যমূলক হাসি দিলো। মাপা, নিঃশব্দ আর ক্ষণস্থায়ি। “হ্যা, কী যেন জানতে চেয়েছিলেন?”
আমি বাগান থেকে চোখ সরিয়ে আবার তাকালাম ওর দিকে। “ওই যে, ইমতিয়াজের ঠিকানা যিনি আপনাকে দিয়েছিলেন, উনার ঠিকানাটা দরকার। ফোন নাম্বার হলেও চলবে।
তার দুই ভুরু কিছুটা কাছাকাছি চলে এলো। হালকা ভাঁজ পড়লো কপালে। “পারভেজের সাথে কথা বলতে চান? কেন?”
“ইমতিয়াজকে খুঁজে পাচ্ছি না। আমরা ওর বাসায় গেছিলাম, পাইনি। পারভেজসাহেবের সাথে দেখা করে ইমতিয়াজের ব্যাপারে কিছু জেনে নিতে চাইছি।”
“বাসায় নেই মানে?” বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলো সে। “ও কি বুঝে গেছে ওকে সাসপেক্ট করা হচ্ছে?”
“আমরা দু-দিন ওর বাড়িতে গেছিলাম। প্রথমদিন যাওয়ার পরই সে বাড়ি ছেড়েছে মনে হয়।”
“ও।” মাথা নেড়ে সায় দিলো রামজিয়া। “ঠিক আছে, ভেতরে চলুন। আমি পারভেজকে ফোন করে জিজ্ঞেস করে নেই। ওর অনুমতি ছাড়া ফোন নাম্বার পুলিশকে দেয়া ঠিক হবে না।”
আমি কিছু বললাম না।
দ্বিতীয়বারের মতো রামজিয়াদের ড্রইংরুমে ঢুকে ঠিক গতকাল যে সোফায় বসেছিলাম সেটাতেই বসলাম। ও চলে গেলো ভেতরে। খামোখা বসে না থেকে সামনের টেবিল থেকে ঐ দিনের ইত্তেফাক পত্রিকাটি তুলে নিলাম, যদিও এটা থানায় বসে পড়েছি একটু আগে।
প্রায় পাঁচ-সাত মিনিট পর রামজিয়া ফিরে এলো হাত-মুখ ধুয়ে। আমি দেখতে পেলাম পরনের শার্ট আর প্যান্ট পাল্টে ফেলেছে। মুখটা ভেঁজা। বিশেষ করে ভুরু দুটো। তাকে শিশিরে ভেজা গোলাপ ফুলের মতো লাগছে।
“পারভেজকে ফোন দিয়েছিলাম, ও বললো ওর সাথে ফোনে যোগাযোগ করতে পারেন। ওর নাম্বারটা লিখে রাখুন।”
আমি পকেট থেকে কলম বের করে ছোট্ট নোটবুকে টুকে নিলাম। “আমার মনে হয় ইমতিয়াজের ব্যাপারে ও খুব বেশি কিছু জানে না। মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “হুম। ওর মা-ও তেমন কিছু বলতে পারলো না।”
“ওর ব্যাপারে আপনারা কতোটুকু নিশ্চিত? মানে, ক্রাইমটা কি ও-ই করেছে?”
“আমার সিনিয়র এসএম হায়দার মনে করছেন ইমতিয়াজই কাজটা করেছে কিন্তু ওকে ধরা না গেলে, ইন্টেরোগেট করতে না পারলে নিশ্চিত হওয়া যাবে না।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। “আমারও মন বলছে এটা ইমতিয়াজেরই কাজ, বাট উই নিড প্রুফ, তাই না?”
আমি সায় দিলাম। আমাদের প্রমাণের দরকার—কথাটা শুনে অন্যরকম ভালো লাগার অনুভূতিতে আচ্ছন্ন হলাম ক্ষণিকের জন্যে। মনে হলো আমরা দু-জন যেন একই টিমে কাজ করছি।
“ঠিক আছে,” উঠে দাঁড়ালাম। “আপনাকে আবারো অনেক অনেক থ্যাঙ্কস।”
“বসুন, চা খেয়ে যান?” সে-ও উঠে দাঁড়ালো।
“না, না। আজ সময় নেই। অনেক কাজ,” কথাটা বললাম নিতান্তই সৌজন্যতাবশত। আসলে আমার ইচ্ছে করছিলো আরেক কাপ চা খেতে, আরেকটু বসতে।
“ও,” বললো সে। “ঠিক আছে।
আমি মুচকি হেসে দরজার দিকে পা বাড়াবো অমনি পেছন থেকে বলে উঠলো
“আমাকে ডেভেলপমেন্টটা জানাবেন কিন্তু।”
আমি পেছন ফিরে মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “শিওর।”
