কেউ কেউ কথা রাখে – ১৬

অধ্যায় ১৬

“আরেক কাপ চা খাবে?”

রামজিয়ার দিকে তাকিয়ে মাথা দোলালাম। এতোদিন পর দেখা হতেই সোজা তার বাসায় চলে এসেছি। নিরিবিলি বাসায় বসে আড্ডা দিচ্ছি অথচ ব্যাপারটাকে মোটেও অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। বয়স শুধু আক্ষেপই বাড়ায় না, এরকম কিছু সুবিধাও নিয়ে আসে। মাঝবয়সি দু-জন নারী-পুরুষ বিরাণ বাড়িতে বসে গল্প করলে কেউ কিছু মনে করে না। এটা যেন প্রাকৃতিকভাবেই স্বাভাবিক আর নিরাপদ একটি ব্যাপার!

“না, আজ উঠি,” বললাম তাকে। “তুমি ওটা পড়া শেষ করে আমাকে জানিও।”

“খুব তাড়া আছে নাকি?”

“ঘরে ফিরে একটু বিশ্রাম নেবো। লিখতেও পারি…ইচ্ছে করলে।”

“এখন কি লিখছো? নতুন কোনো উপন্যাস?”

“নতুন কিছু না। পুরনো একটা উপন্যাসের নতুন সংস্করণ হবে, ওটার কিছু অংশ নতুন করে লিখবো।”

“ও,” কপালে ভুরু তুলে সে বললো। “এ কাজ প্রায়ই করো মনে হয়?”

“হুম। পুরনো লেখাগুলো দেখলে নতুন করে আবার কিছু অংশ লিখতে ইচ্ছে করে। মনে হয় অনেক কিছু বাদ দিয়েছি, যেভাবে চেয়েছি সেভাবে লিখতে পারিনি।”

আমার দিকে স্থিরচোখে চেয়ে রইলো। “জীবনটা যদি এভাবে রি-রাইট করা যেতো!”

মুচকি হাসলাম আমি। “জীবনটা রি-রাইট করা যায় না দেখেই তো গল্পগুলো বার বার রি-রাইট করি।”

মনে হলো রামজিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো আস্তে করে।

“মিনহাজ কোথায় থাকে, জানো?” কাজের কথায় চলে এলাম আমি। মাথা দোলালো সে। “না। তবে তার ঠিকানা জোগাড় করে দিতে পারবো। ওর ঘনিষ্ঠ কিছু লোকজনকে আমি চিনি। শুনেছি, কয়েকদিন আগে নাকি রিটায়ার করেছে। বিয়ে-টিয়ে আর করেনি।”

কথাটা শুনে অবাক হলাম। আমার ধারণা ছিলো সে পুণরায় বিয়ে করেছে। বয়স কম ছিলো ওর। মাত্র তিনমাসের সংসার। ধরেই নিয়েছিলাম মিলির শোক কেটে যাবে বছর না ঘুরতেই, তারপর হয়তো আবার বিয়ে করে সংসারি হবে।

“অবাক হলে নাকি?”

“হুম।”

“অবাক হওয়ার কি আছে,” আস্তে করে বললো সে, “তুমিও তো একই কাজ করেছো।”

মুচকি হাসলাম আমি। এ প্রসঙ্গটা উঠলে কখনওই স্বস্তি বোধ করি না। রামজিয়ার সঙ্গে তো আরো বেশি অস্বস্তি লাগলো। “আমি কখনও সংসার করিনি, কিন্তু মিনহাজ করেছে…অল্পদিনের হলেও করেছে। একজন লেখক বলেছিলেন, যারা একবার দ্বৈত জীবন-যাপন করে ফেলে আর সেই জীবনে সুখি থাকে, তাদের পক্ষে খুব বেশিদিন একা থাকা সম্ভব হয় না। ভালোবাসা যতোই গাঢ় থাকুক, স্বামি কিংবা স্ত্রী বিয়োগ হলে তারা দ্রুত একাকীত্ব ঘোচাতে চায়।” একটু থেমে আবার বললাম, “আমার মনে হয়েছিলো মিনহাজ আবার বিয়ে করে সংসারি হয়েছে।

“আমারও সে-রকম ধারণা ছিলো, কিন্তু কয়েক বছর আগে আমেরিকাতে ওর এক আত্মীয়ের সাথে দেখা হয়েছিলো, তখনই জানলাম ও আর বিয়ে করেনি।”

“আত্মীয়-স্বজনদের সাথে একদমই যোগাযোগ রাখে না?”

“খুব একটা রাখে না। একা থাকতেই বেশি পছন্দ করে। পরিচিতরাও ওকে বিরক্ত করে না। এরকমটিই শুনেছি।” একটু থেমে আবার বললো, “আচ্ছা, তুমিও তো গ্রামে চলে গেছিলে, তাহলে ঢাকায় আবার ফিরে এলে যে?”

“আসতে বাধ্য হয়েছি।”

“কেন? ওখানে থেকে কি লেখালেখি করা যেতো না?”

“ঠিক তা নয়। আমার প্রথম তিনটা বই গ্রামে থাকতেই পাবলিশ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হয়েছিলো অন্য জায়গায়।”

সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালো সে।

“গ্রামের বাড়িতে কয়েকটা বছর ভালোই ছিলাম। ভিলেজ পলিটিক্সের ব্যাপারটা আমি জানতাম, তাই ওসবের ধারেকাছেও যাইনি। স্কুলে পড়াতাম, লেখালেখি করতাম, বই পড়তাম, টুকটাক মাছ চাষও শুরু করেছিলাম, বলেই বিব্রতকর হাসি দিলাম আমি। “সমস্যা বাধলো একটা পাঠাগার করতে গিয়ে।”

“লাইব্রেরি করতে গিয়ে সমস্যা হলো?” বিস্ময়ে বলে উঠলো রামজিয়া। “স্ট্রেইঞ্জ।”

“শহীদস্মৃতি পাঠাগার নাম দিয়েছিলাম… ব্যস, শুরু হয়ে গেলো ঝামেলা। স্থানীয় এমপি চাইলেন তারা মরহুম বাবার নামে নাম করা হোক ওটা, আমি কোনভাবেই রাজি হলাম না।”

“কেন?”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। “এমপির বাবা একাত্তরে রাজাকার ছিলো।”

“ও,” আস্তে করে বললো রামজিয়া।

“ভিলেজ পলিটিক্স কতোটা নোংরা হতে পারে তোমার ধারণা নেই। এমপির মতো ক্ষমতাবান লোক আমার পেছনে লেগে গেলো। এদিকে ততোদিনে আমার দু-তিনটা বই বেরিয়ে গেছে, রেসপন্সও ভালো পাচ্ছিলাম। প্রকাশক চাইছিলো আমি নিয়মিত লিখি, ঢাকায় থাকি। তাই আবারো গ্রাম ছেড়ে চলে এলাম। প্রথমে একটা পত্রিকায় কিছুদিন কাজ করেছি, পরে আর চাকরিটা কন্টিনিউ করিনি, পুরোদমে লেখক হয়ে যাই।”

“ভালোই করেছো। তোমাকে লেখক হিসেবেই বেশি মানায়।”

কথাটা শোনামাত্রই দুই যুগ আগের একজন মানুষের একটি কথা মনে পড়ে গেলো। হায়দারভাই-ই প্রথম আমাকে বলেছিলেন। আমার বেশ স্পষ্ট মনে আছে। একদিন দু-জনে বসে সিগারেট খাচ্ছি, একটা কেস নিয়ে কথা বলছি, এমন সময় হুট করেই তিনি বলে উঠলেন, পুলিশ হিসেবে নাকি আমাকে ঠিক মানায় না। আমিও পাল্টা জানতে চাইলাম, তাহলে কি হিসেবে মানায়। উনি কোনোরকম সময়ক্ষেপন না করেই বলে দিলেন, আমাকে লেখক হিসেবে বেশি মানায়। কথাটা শুনে খুব অবাক হয়েছিলাম। সত্যি বলতে, বই পড়ার নেশা ছোটোবেলা থেকেই, কিন্তু লেখক হবার কথা কখনও মাথায় আসেনি। অন্তত হায়দারভাই বলার আগপর্যন্ত তো নয়-ই স্বীকার করতেই হয়, কথাটা শোনার পর থেকে আমার মনের গহীনে লেখক হবার সুপ্ত বাসনা জন্মেছিলো।

“কি হলো, ভুল কিছু বললাম নাকি?”

রামজিয়ার কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম। “না। মানে, মিনহাজের ঠিকানাটা জোগাড় করে দিলে ভালো হয়।” আমি প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে ফেললাম।

“এ নিয়ে চিন্তা কোরো না। দুয়েকদিনের মধ্যেই জোগাড় করে দিতে পারবো।”

“থ্যাঙ্কস।”

“আচ্ছা, একটা কথা আমাকে বলবে?’

“কি?”

“মিনহাজের সাথে কি কেসটা রি-ওপেন করার জন্য দেখা করতে চাইছো নাকি আরো কিছু আছে?”

“তা আছে,” বললাম আমি। “মিলির খুনাটা নিয়ে বই লিখেছি, মিনহাজের জানার অধিকার আছে না, কি লিখেছি?”

আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। “আই মিন, ওর কোনো অবজেকশান আছে কি-না জেনে নিতে চাইছো?”

“হুম।”

“ধরো, ও যদি কোনো কারণে আপত্তি জানায়?”

আমি এটা আগে থেকেই ভেবে দেখেছি। কাঁধ তুলে বললাম, “তাহলে আর কি, আসল নামগুলো পাল্টে শুধু কাহিনীটা ঠিক রাখবো। তাতে মনে হয় না কারোর আপত্তি থাকবে। আইনগতও বাধা থাকবে না তখন।”

“ধরো, মিনহাজ তোমাকে এ বইটা পাবলিশ না করার জন্য অনুরোধ করলো, তখন কি করবে?”

একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। এমন অনুরোধ আমার পক্ষে রাখা সম্ভব হবে না। কারণ আমি চাই মিলির গল্পটা সবাই জানুক। তার প্রতি যে নির্মম আচরণ করা হয়েছে সেটার কোনো বিচার হয়নি। অন্তত তার কাহিনীটা লোকে জানুক। একটা গল্পের মধ্যে সে বেঁচে থাকুক। পুরোপুরি বিস্মৃতির অতল গহ্বরে তলিয়ে না গিয়ে পাঠকের কোমল হৃদয়ে তার একটু ঠাঁই হোক।

“মিনহাজ যদি এমন অনুরোধ করে তাহলে বোধহয় আমি সেটা রাখতে পারবো না। ঐ যে বললাম, নামগুলো শুধু বদলে দেবো।”

“আমার নামও?” কৌতুহলভরে জানতে চাইলো রামজিয়া শেহরিন। “যদি তোমার আপত্তি না থাকে তাহলে বদলাবো না।”

“আমার কোনো অবজেকশ নেই। ইউ মাস্ট ফিল ফ্রি টু ইউজ মাই নেম।”

হেসে ফেললাম আমি। “আগে লেখাটা পুরোপুরি পড়ো, তারপর সিদ্ধান্ত নিও। বলা তো যায় না, পুরোটা পড়ার পর মত বদলেও ফেলতে পারো।”

“তাই নাকি?” কৃত্রিম অবাক হবার ভান করলো সে। “ওরকম কিছু থাকতে পারে?”

কাঁধ তুললাম। “থাকতেই পারে।”

হা-হা করে হেসে উঠলো রামজিয়া। তার সঙ্গে যোগ দিলাম আমিও। একটু বিরতি দিয়ে আবার বললাম, “মিনহাজ কেন ঢাকা ছেড়ে চলে গেলো; মিলির ঘটনাটা এখন সে কিভাবে দেখে; ঐ ঘটনাটা তাকে কিভাবে বদলে দিলো; খুনির যে বিচার হলো না, এটা তাকে এখনও কতোটা যন্ত্রণা দেয়। মাত্র তিনমাসের সম্পর্কটাকে সে এখনও কিভাবে লালন করে, এসব জানার খুব ইচ্ছে আমার। ঠিক করেছি, বইটা শেষ করবো মিনহাজকে দিয়ে।”

আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। “যখন শুনলাম তোমরা ইমতিয়াজকে ধরেছো তখন কী যে ভালো লেগেছিলো আমার! ঐ দিনের কথা এখনও আমার স্পষ্ট মনে আছে।”

একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো আমার ভেতর থেকে। দুই যুগ আগের দগদগে ঘায়ের মতো এখনও উপশম না-হওয়া স্মৃতিগুলো ভেসে উঠলো মনের পর্দায়। ইমতিয়াজের কাছ থেকে সুকৌশলে খুনের কথা স্বীকার করিয়ে নেবার পর হায়দারভাই কতোটা খুশি হয়েছিলেন সেটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। তাকে যারা চেনে তারা ভালো করেই জানে, এসএম হায়দার সমস্ত খুশি একভাবেই উদযাপন করতেন!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *