অধ্যায় ৫
রামজিয়া গাড়ি চালাচ্ছে আর আমি বসে আছি তার পাশে। রাস্তার লোকজনের তাকানোর ভঙ্গি দেখে বুঝতে পারলাম এ শহরের লোকজন এখনও কোনো মেয়েকে গাড়ি চালাতে দেখলে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। অনেকে আবার আমার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে যেন আমি কোনো পুরুষই না! ব্যাটা মানুষ হয়ে গাড়ি না চালিয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে, আর গাড়িটা চালাচ্ছে কি-না এক বেটি!
আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, তাদের মনে এ-কথাগুলোই প্রতিধ্বণিত হচ্ছে। ব্যাপারটা বেশ উপভোগ্য আমার কাছে। রামজিয়া কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাকে জানি না। জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনও মনে করিনি। আজ এতো বছর পর দেখা, একটুখানি সময় কাটাতে পারলে মন্দ কি!
“গল্পটা কি মিলির খুন নিয়েই? মানে শুধুই ওই ঘটনাটা নিয়ে লিখেছো?” রাস্তা থেকে চোখ সরিয়ে চকিতে আমার দিকে তাকালো সে।
“ঠিক তা নয়।”
“তাহলে? তোমার অটো-বায়োগ্রাফি?”
হেসে মাথা দোলালাম। “না, তা-ও নয়।”
“বাট দিস ইজ নট অ্যা ফিকশন, আই গেস?” রাস্তায় চোখ রেখেই বললো সে।
“অবশ্যই ফিকশন। আমি এখন পর্যন্ত নন-ফিকশন কিছু লিখিনি, লিখতেও পারি না।” একটু থেমে আবার বললাম, “এটাকে বলতে পারো সত্যি ঘটনা অবলম্বনে লেখা ফিকশন।”
পাশ ফিরে আমার দিকে তাকালো সে। তার বাম ভুরুটা একটু উপরে উঠে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে আবার নজর দিলো সামনের রাস্তার দিকে। “সবটাই কি সত্যি ঘটনা নাকি কিছু ফিকশনও রয়েছে?”
কয়েক মুহূর্ত চুপ মেরে রইলাম। এ প্রশ্নের জবাব দেয়াটা একটু কঠিনই। যা লিখেছি সবটাই সত্যি কিন্তু সেগুলোর সবই আমার নিজের চোখে দেখা ঘটনা। আমি যেভাবে দেখেছি, অনুভব করেছি, বুঝেছি তা-ই লিখেছি। এরমধ্যে অনেক কিছুই আছে যা একান্তই আমার নিজস্ব ভাবনা। অনেক কিছুই আছে আমার নিজস্ব বোধ থেকে উৎসারিত। আমি ছাড়াও এ গল্পে অনেক চরিত্র আছে-তাদেরকে আমি আমার দৃষ্টিতেই চিত্রিত করেছি। তাদের মনোভাবের বিষয়টা সত্যি বলতে আমার নিজেরই।
“কঠিন প্রশ্ন করে ফেললাম নাকি?”
রামজিয়ার কথায় একটু চমকে উঠলাম। “না। ভাবছি, কী বলবো। আসলে আমি সজ্ঞানে ফিকশনাল কিছু লিখিনি, সত্যি ঘটনাটাই লিখেছি। তবে সেটা আমার চোখ দিয়ে, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে। এর সবটা হয়তো সত্যি নয়, কিছু কল্পনাও আছে।”
“হুম, বুঝেছি,” রাস্তার দিকে চোখ রেখেই বললো সে।
আমি জানি না সে কি বুঝতে পেরেছে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকলাম আবারো।
“আমাকে কিভাবে প্রেজেন্ট করেছো?” জানতাম এই প্রশ্নটা সে করবেই।
“আমি কি তোমার এই লেখায় পুরোপুরি ফ্যাকচুয়াল নাকি ফিকশনাল?” রাস্তা থেকে চোখ না সরালেও আমি তার মুখের বাঁকাহাসিটা ঠিকই দেখতে পেলাম। যে মানুষটার সাথে সর্বসাকুল্যে মাত্র কয়েক মাসের পরিচয়, হাতেগোনা কয়েকবার দেখা-কথাবার্তা, তারপর দীর্ঘ দুই যুগ কোনো যোগাযোগ না থাকা তাকে আর যাই-ই হোক বাস্তব বলার কোনো উপায় নেই। সে তো গল্প-উপন্যাসের চরিত্রের চেয়েও দূরবর্তি!
অবশেষে আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম, “পড়লেই বুঝতে পারবে।”
“পড়বো তো অবশ্যই, জাস্ট জানতে ইচ্ছে করছে, না বলতে চাইলে ইনজিস্ট করবো না।”
আনমনেই মাথা নেড়ে সায় দিলাম। চকিতে আমার দিকে তাকালো সে কিন্তু চোখে চোখ পড়ার আগেই রাস্তার দিকে ফিরে গেলো।
“আমি আগে তোমার কোনো লেখা পড়িনি, শুনেছি তুমি ক্রাইম-ফিকশন লেখো। এটাও কি সে রকম কিছু?”
“উমমম…বুঝতে পারছি না।”
আমার দিকে চোখ গোল গোল করে তাকালো সে। এরকম চাহনি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াদেরই বেশি মানায়। “তুমি নিজেই বুঝতে পারছো না, তাহলে পাঠক কী বুঝবে?”
মুচকি হাসলাম। সঙ্গত প্রশ্নই করেছে। “আসলে, যে-রকম ক্রাইম- ফিকশন আগে লিখেছি এটা ঠিক সে রকম নয়। এখানে কোনো টুইস্ট নেই,
নাটকিয় উপাদানও নেই। শুধুই ট্র্যাজেডি।” একটু থেমে যোগ করলাম, “আর সন্দেহ।”
কয়েক মুহূর্ত ভেবে বললো, “ইনভেস্টিগেশনটা…আই মিন, মিলির কেসটা নিয়ে যে তদন্ত করেছিলে তোমরা সেটা ডিটেইল আছে তো এখানে?”
“হ্যা।” ছোট্ট করেই বললাম।
“দেন আ’ড লাভ টু রিড ইট।” মুচকি হাসলাম আমি।
“স্টেট্সে কিন্তু ক্রিমিনাল ল-ই প্র্যাকটিস করতাম।”
আমি তার ইন্টারভিউ পড়ে এটা জেনেছি। “তা, ক-জন ক্রিমিনালকে বাঁচিয়েছো এ পর্যন্ত?” হালকাচালে বললাম।
আমার দিকে না তাকিয়েই ভুরু কুচকে ফেললো সে। “হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট?”
“ক্রিমিনাল ল-ইয়ার ছিলে, নিশ্চয় ক্রিমিনালরাই আসতো তোমার কাছে। কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলে বলতো, ম্যাম, সেভ মাই অ্যাজ!”
হি-হি-হি করে হেসে উঠলো রামজিয়া। তার অট্টহাসিটাও আগের মতোই আছে। “ইয়েস, আই ইউস্ড টু সেভ্ লটস অব অ্যাজেস!”
মাথা নেড়ে সায় দিলাম আমি।
গাড়িটা ধানমণ্ডির একটি বাড়ির সামনে থামলে আমি অবাক হয়ে দেখলাম সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে আমার চোখের সামনে।
***
পুলিশের জিপ থেকে নেমে রামজিয়াদের দোতলা বাড়িটার দিকে তাকালাম। অভিজাত পাড়ার অভিজাত একটি বাড়ি।
সদ্যস্বাধীন হওয়া দেশ। চারদিকে হাহাকার। কিন্তু এই বিক্ষুব্ধ সময় আর বঞ্চনা সারাদেশ গ্রাস করলেও এ শহরের কিছু এলাকায় প্রবেশ করতে পারেনি। তারা যেন বানের জলে ডুবে থাকা অঞ্চলের মধ্যে ভাসমান কিছু গেরস্থ বাড়ি! কিংবা চারপাশের পঙ্কিলতা থেকে বিচ্ছিন্ন নিরাপদ কোনো ঘেট্টো!
মিনহাজের বাসা থেকে আমি চলে এসেছিলাম আজিমপুর থানায়। হায়দারভাই যে কোথায় গেছে কে জানে। শুনলাম তখনও থানায় আসেননি দুপুরের খাওয়ার পর হাতে তেমন কোনো কাজ না থাকায় আমি মিনহাজের দেয়া নাম্বারে ডায়াল করি। যাকে খুঁজছিলাম সে-ই ফোনটা ধরে। তার ছবি দেখে মুগ্ধ ছিলাম, কণ্ঠ শুনে একেবারে কুপোকাত হয়ে গেলাম। এমন কণ্ঠের নারীর জন্যই তো যুবকেরা অপেক্ষা করে।
তাকে সংক্ষেপে বললাম তার তোলা গায়েহলুদের ছবিগুলোর মধ্যে একজনের নাম-পরিচয় জানতে চাইছি। আমার বর্ণনা শুনে সে চিনতে পারলো না। সেটাই স্বাভাবিক। ছবিতে একজন মিলির দিকে তাকিয়ে ছিলো? কে হতে পারে? ছবিটা দেখলে হয়তো চিনতে পারবে। রামজিয়া নামের মেয়েটি যখন বুঝতে পারলো আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াসটি তার বান্ধবির হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ তখন প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাড়া দিয়ে তার বাড়িতে চলে আসতে বললো আমাকে। বিকেলে সে ফ্রি আছে। সমস্যা না থাকলে আজই চলে আসতে পারি তার বাসায়।
পুলিশের জিপটা ওদের ধানমণ্ডির বাড়ির বাইরে রেখেই আমি মেইন দরজায় গিয়ে দারোয়ানকে বললাম রামজিয়ার কথা। পুলিশের ইউনিফর্ম দেখে দারোয়ান আমাকে সমীহ করলেও বলামাত্রই ভেতরে ঢুকতে দিলো না, ভেতরে গিয়ে অনুমতি নিয়ে ফিরে এলো, সঙ্গে করে নিয়ে এলো এক কাজের লোককে। ঐ কাজের লোকের সাথে আমি চলে গেলাম নীচতলার ড্রইংরুমে, তবে সেখানে খুব বেশিক্ষণ বসে থাকতে হলো না আমাকে।
বেলবটম ফুলপ্যান্ট আর শর্ট-কামিজ পরা মোহনীয় এক তরুণী ড্রইংরুমে ঢুকতেই বুঝতে পারলাম এই সেই কিন্নরীকণ্ঠী। সত্যি বলতে, আগে এমন আপ-টু-ডেট মেয়ে পথেঘাটে দেখলেও তাদের সাথে কখনও আমার কথা হয়নি।
হ্যা, আপ-টু-ডেট! তখন স্মার্ট আর আধুনিক মেয়েদেরকে লোকজন এটাই বলতো।
“একটু আগে কি আপনার সাথেই আমার কথা হয়েছিলো?”
আমি টের পেলাম টেলিফোনের চেয়েও বাস্তবে তার কণ্ঠ অনেক বেশি মোহনীয়। “জি।” ছোট্ট করে বললাম।
“ফোনে আপনার গলা শুনে মনে হয়েছিলো খুব বয়স্ক একজন,” বলেই আলতো করে হাসলো।
এটাকে আমার প্রশংসা হিসেবেই দেখা উচিত ছিলো কিন্তু সত্যি বলতে, ঐ সময় আমি একটু অন্য ভাবনায় ডুবে ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটি হয়তো ভাবছে টেলিফোনে যার সাথে কথা বলেছে সে আমি নই।
আমার পাশে একটা সোফায় বসে পড়লো সে। ধনী আর অভিজাত পরিবারের অন্দরমহলে ঢুকে একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। এরকম অস্বস্তি এখনও আমাকে পেয়ে বসে। বিশেষ করে যার বাসায় যাই সে যদি সহজ ব্যবহার না করে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, ধনীরা সাধারণত নিজেদের আচার-ব্যবহার দ্রুত বদলায় না। হয় এটা করার প্রয়োজনই মনে করে না তারা কিংবা এ কাজটা করতে চায় না। তাদের অর্থনৈতিক ভিত্তিটা যেমন মজবুত তেমনি তাদের এই আলগা ইমেজটিও শক্তপোক্ত থাকে। আর মধ্যবিত্ত অনেক চেষ্টা করে, তিলে তিলে তার আলগা ইমেজ গড়ে তুললেও সেটা ডিমের খোসার মতোই ভঙ্গুর। দরকার শুধু একটা চাপের! তবে নিম্নবিত্ত তার শরীরের মতোই নগ্ন-আলগা ইমেজহীন।
অবশ্য ধনাঢ্য পরিবারের মেয়ে রামজিয়াকে দেখে আমার মনে হলো, তার কোনো আলগা ইমেজ নেই। মুখোশ নেই।
“ছবিটা কি নিয়ে এসছেন?”
রামজিয়ার কথায় নড়েচড়ে বসলাম। আমি এখানে এসেছি ভয়ঙ্কর একটি হত্যা-ধর্ষণের তদন্ত কাজে অথচ মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে রোমান্টিক সব চিন্তা-ভাবনা। নিজেকে আমার চাঁদের সামনে বসে থাকা বামন বলে মনে হলো।
“জি,” আবারো একই শব্দ আওড়ালাম।
“মিলির কাজিনের গায়েহলুদের যে ছবিগুলো আছে তার বেশিরভাগই আমার নিজের ক্যামেরায় তোলা, সেজন্যে আমার খুব কম ছবিই আছে, ‘ সহজভাবে বলে যেতে লাগলো মেয়েটি। “আমার অবশ্য ফটোগ্রাফি করতে ভালো লাগলেও নিজের ছবি তুলতে একদম বিশ্রী লাগে।”
সমস্ত মুগ্ধতা স্থগিত করে আমি বুকপকেট থেকে ছবিটা বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। “এই যে, পেছনের ডানদিকের এই লোকটা…” মিলিকে আড়চোখে দেখতে থাকা তরুণকে দেখিয়ে বললাম।
রামজিয়া স্থিরচোখে কয়েক মুহূর্ত ছবিটার দিকে চেয়ে রইলো। আস্তে করে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলেও সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক অভিব্যক্তি দেবার চেষ্টা করলো সে।
“আপনার বান্ধবির মতো মেয়ের দিকে যেকোনো পুরুষই তাকাবে কিন্তু,” একটু থেমে আবার বললাম, “এই লোক বেশ কয়েকটি ছবিতেই এভাবে চোরাচোখে চেয়ে আছে। ব্যাপারটা সন্দেহজনক মনে হচ্ছে আমার কাছে।”
মুখ তুলে তাকালো রামজিয়া। “শুধু এ কারণেই ওকে সন্দেহ করছেন নাকি আরো কোনো কারণ আছে?”
একটু ভেবে বললাম, “আমাদের ধারণা, খুনি ভিক্টিমের পরিচিত।”
রামজিয়া চেয়ে রইলো আমার দিকে। সে আরো কিছু শুনতে চায় নাকি এমনি চেয়ে আছে বুঝতে পারলাম না।
“তাছাড়া লোকটার চাহনির মধ্যে কিছু একটা আছে…চাহনিটা ঠিক স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।”
“আপনি বলতে চাইছেন চাহনিটা স্বাভাবিক নয়?”
“হুম।”
আমার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে ছবির দিকে তাকালো। যেন সে নিজেও চাহনির মধ্যে ওরকম কিছু খুঁজে পেতে চাইছে। সে-ও একজন নারী। পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি ভালো করেই বোঝার কথা। তবে সম্ভবত সে আমার কাছ থেকেই জানতে চাইছে। হয়তো পরিস্কার হতে চাইছে।
এমন সময় চা-বিস্কিট নিয়ে এক কাজের লোক চলে এলো।
“প্লিজ, নিন।”
কথাটা বলেই রামজিয়া আবার ছবির দিকে চেয়ে রইলো, তারপর নিজের কাপটা তুলে নিয়ে আলতো করে নিঃশব্দে চুমুক দিলো তাতে। তার দৃষ্টি আটকে আছে ছবিতে।
তাকে চা খেতে দেখে আমার ভালো লাগলো। তাহলে আমি উটকো মেহমান নই!
চায়ের কাপ তুলে আমিও চুমুক দিলাম বেশ সাবধানে। ভালো করেই জানতাম, শব্দ করে চুমুক দেয়াটাকে অভিজাতরা ছোটোলোকি স্বভাবের বলে মনে করে। কিন্তু নিজেকে বিব্রত করে দিয়ে আস্তে করে একটা শব্দ করে ফেললাম। হয়তো এই প্রথম চায়ে চুমুক দেবার সময় আমি শব্দহীন থাকার চেষ্টা করেছি বলে, কিংবা ভেতরে ভেতরে নার্ভাস ছিলাম—কারণ যাই হোক, নিজের কাছেই আমার চুমুক দেবার ছোট্ট আর মৃদু শব্দটি খুব জঘন্য লাগলো প্রথমবারের মতো! দ্বিতীয় চুমুক দেবার সাহস হলো না আমার। স্থির চোখে চেয়ে রইলাম রামজিয়ার দিকে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ছবি দেখে যাচ্ছে সে। আমার চুমুকের শব্দ তার মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে এক ধরণের স্বস্তি পেলাম। কিন্তু সেটা মাত্র কয়েক মুহূর্তের জন্য।
“আমার বাবা বলেন, শব্দ করে চা না খেলে নাকি চায়ের মজাটাই নষ্ট হয়ে যায়,” বেশ শান্তকণ্ঠে ছবির দিকে চোখ রেখেই বলে গেলো সে।
আমি ঝিম মেরে গেলাম। কথাটা শেষ করে চকিতে আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসি দিয়ে আবার ফিরে গেলো ছবিতে।
“আপনি কিন্তু চা খাচ্ছেন না,” এবারও আমার দিকে না তাকিয়ে বললো।
“না, এই তো…খাচ্ছি,” এবার আর চুমুক না দিয়ে উপায় রইলো না। রামজিয়ার চোখ যেমন ছবিতে নিবদ্ধ তেমনি আমার চোখ তার উপরে নিপতিত।
“আপনার কথাই ঠিক,” ছবি থেকে চোখ তুলে বললো সে, “ওর চোখের চাহনি অন্যরকম।”
আমি আর কিছু বললাম না।
“আমিও একজন মেয়ে। পুরুষের দৃষ্টিতে কি থাকে ভালো করেই জানি।”
আনমনেই ঢোক গিলে ফেললাম। কথাটা কি আমাকে উদ্দেশ্য করে? চোরের মন তো পুলিশ-পুলিশ। এদিকে আমি আবার স্বয়ং পুলিশ! নিজেকে চোর মনে করতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। “লোকটা কে?” আমি কাজের কথায় ফিরে যেতে চাইলাম। চোর থেকে পুলিশ হতে চাইলাম আর কি!
দীর্ঘশ্বাস ফেললো রামজিয়া। “ওর নাম ইমতিয়াজ…ইমতিয়াজ শফিক।”
“মিলির কি হয়?”
“কেমন জানি আত্মীয় হয়, আমি ঠিক বলতে পারছি না। তবে মিলিদের পরিবারের সাথে ওদের সম্পর্ক বেশ ভালো।” কাপ আর ছবি দুটোই নামিয়ে রাখলো সে। “অনেকদিন পর গায়েহলুদে তার সাথে আবার দেখা হয়ে গেলো।”
“অনেক দিন পর দেখা হলো মানে? আপনি কি মিলির এই আত্মীয়কে আগে থেকে চিনতেন?” মোক্ষম প্রশ্নটাই করলাম আমি।
নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো সে। “মিলি আর আমি একই স্কুল-কলেজ আর ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি। ওর পরিবারের সবাইকে আমি চিনি। অনেক আত্মীয়স্বজনকেও চিনি।”
“এই ইমতিয়াজ লোকটার সাথে মিলির কি কোনো সম্পর্ক ছিলো?” প্রশ্নটা করার পরই বুঝতে পারলাম এতোটা সরাসরি না বললেও পারতাম। কিন্তু কিছু করার নেই, বন্দুক থেকে গুলি বের হয়ে গেছে।
একটু চুপ মেরে গেলো রামজিয়া। আস্তে করে নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো আবার। “অনেক আগের কথা, তেমন কিছু না আসলে। ইউ নো, অল্প বয়সে যা হয়।”
আমি অপেক্ষা করলাম পুরোটা শোনার জন্য।
“আমরা যখন কলেজে পড়তাম তখন একবার মিলিকে প্রেমপত্র দিয়েছিলো ইমতিয়াজ। এ নিয়ে আমরা বান্ধবিরা খুব মজা করেছিলাম।”
“তারপর?” আমি আরো কিছু জানার জন্য উদগ্রিব।
“তারপর আর কি…এই তো।”
আমার মনে হলো রামজিয়া এই বিষয়টা নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে চাইছে না। “আপনি একটু খুলে বললে আমাদের জন্য সুবিধা হয়। এটা মিলির খুনের তদন্তে সাহায্য করবে।”
স্থিরদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইলো রামজিয়া। “এসব তেমন কোনো ঘটনা নয়। এগুলো প্রায় সব মেয়ের জীবনেই ঘটে।”
“আমি আসলে জানতে চাইছি, প্রেমপত্র দেবার পর কি হলো।”
গভীর করে দম নিয়ে নিলো সে। “মিলির মতো মেয়ে ইমতিয়াজের মতো ছেলের সাথে কোনো সম্পর্কে জড়াবে না এটাই স্বাভাবিক। ওদের মধ্যে অনেক অনেক ডিফারেন্স ছিলো। কোনো কিছুই ম্যাচ করতো না। করার কথাও নয়।”
“স্ট্যাটাসের কথা বলছেন?”
আমার কথাটা শুনে মাথা দোলালো আস্তে করে। “না, ঠিক তা নয়। আসলে দেখতে-শুনতে, আচার-ব্যবহার, পড়ালেখা কিংবা পারিবারিক অবস্থা…কোনো দিক থেকেই মিলির যোগ্য ছিলো না ইমতিয়াজ। ওদের দুই ফ্যামিলির সখ্যতার সুযোগ নিয়ে সে এ কাজটা করেছিলো বলে মনে হয়।”
মাথা নেড়ে সায় দিলাম আমি। “তাহলে মিলি তাকে রিফিউজ করে দিয়েছিলো?”
“সঙ্গে সঙ্গে করেনি অবশ্য।”
আমি স্থির চোখে চেয়ে রইলাম।
মলিন হাসি দিলো সে। “একটু নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছে আর কি।” আমি অবাক হলাম কথাটা শুনে।
“অবাক হবার কিছু নেই, এরকম কাজ অল্পবয়েসি মেয়েরা করেই থাকে।”
“তারপর কি হলো?”
“কি আর হবে, কয়েকদিন পর মিলি জানিয়ে দিলো ওর মনোভাব।”
“ইমতিয়াজ এটা কিভাবে নিলো?”
“সেটা তো আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। ধরে নিতে পারি একটু মন খারাপ হয়েছিলো। এর বেশি কিছু না। গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে দেখা হবার পর স্বাভাবিক আচরণই করেছে সে। যেচে যেচে আমাদের সাথে কথা বলেছে।”
“আপনাদের সাথে নাকি শুধু মিলির সাথে?”
গভীর করে নিশ্বাস নিয়ে বললো, “শুধু মিলির সাথে।”
“আগেও কি এই লোকটা এরকম করতো? মানে, গায়ে পড়ে মিলির সাথে কথা বলার চেষ্টা করতো?”
“মিলি না করে দেবার পর আর ঘুরঘুর করেনি। আসলে মিলির পেছনে কে ঘুরঘুর করলো সেটাকে আমরা সিরিয়াসলি নিতাম না। আফটার অল, মিলি দেখতে খুব সুন্দর ছিলো। অনেকেই তার পেছনে ঘুরঘুর করতো।”
“কখনও এর বেশি কিছু করে নি?”
স্থিরচোখে আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলো রামজিয়া। “বাড়াবাড়ি করার কথা বলছেন?”
মাথা নেড়ে সায় দিলাম আমি।
“যুদ্ধের পর একবার জোর করে মিলির সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেও মিলি পাত্তা দেয়নি। সে-ও আর এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করেনি।”
“আপনি বলতে চাইছেন মিলি ওর সাথে কথা বলেনি?”
“হ্যা।”
“আপনি শিওর?”
একটু ভেবে বললো, “পুরোপুরি শিওর কিভাবে হবো? আমার সামনে কথা হয়নি। আমার অগোচরে কিছু হয়ে থাকলে মিলি সেটা আমাকে বলতো।” একটু থেমে আবার বললো, “ও আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বান্ধবি ছিলো, সব কথা আমার সাথে শেয়ার করতো।”
আমি দেখতে পেলাম তার চোখেমুখে বান্ধবি হারানোর দৃশ্যমান শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
“ইমতিয়াজ স্টুডেন্ট পলিটিক্স করতো,” কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আস্তে করে বললো রামজিয়া। “যুদ্ধের পর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এলেও আমাদের সাথে কথাবার্তা হয়নি। আমি আর মিলি ওকে দূর থেকে দেখেছি কয়েকবার।”
“ইমতিয়াজ কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তো?”
“না। ইন্টারমিডিয়েটের পর সে ড্রপ-আউট করে। ক্যাম্পাসে যেত পলিটিক্স করতো বলে।”
একটু চুপ থেকে আবারো প্রশ্ন করলাম তাকে, “আচ্ছা, গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে মিলির সাথে তার কি ধরণের কথাবার্তা হয়েছে সে সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে?”
“একদম ফর্মাল কথাবার্তা। অনেকদিন পর দেখা হলে যা হয়। মিলির বিয়ে হয়েছে এটা সে জানতো। কেমন আছে, কি করে, এইসব। তেমন কিছু না।”
“মিলি কোথায় থাকে, ওর স্বামি কি করে এইসব জানতে চেয়েছিলো?”
“আমার সামনে করেনি। তবে কোন এক ফাঁকে করে থাকতে পারে। আ’ম নট শিওর অ্যাবাউট দ্যাট।”
মাথা নেড়ে সায় দিলাম আমি।
“ইমতিয়াজ কিন্তু খুব স্বাভাবিক আচরণ করেছিলো। তার মধ্যে আমি কোনো অস্বাভাবিক কিছু দেখিনি। তবে…”
“কি?”
“এখন ছবিতে তার চাহনি দেখে মনে হচ্ছে না তার আচরণ পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিলো।”
“বেশিরভাগ ছবি তো আপনিই তুলেছেন, ছবি তোলার সময় এটা খেয়াল করেন নি?”
মাথা দোলালো রামজিয়া। “ও ছিলো ফ্রেমের একেবারে কোণায়। গ্রুপ ছবি তোলার সময় ফোকাস থাকে মাঝাখানে। ডানে-বামে হয়তো খেয়াল রাখবেন কিন্তু সেটা ফ্রেমের কারণে, কে কোথায় চেয়ে আছে, কিভাবে তাকাচ্ছে সেটা খেয়াল করা তখন অসম্ভব।”
“তা ঠিক,” আমি বললাম।
“আপনারা কি ইমতিয়াজকেই প্রাইম সাসপেক্ট মনে করছেন?”
তার এ প্রশ্নে আমি একটু বুঝেশুনে জবাব দিলাম। সত্যি বলতে, ইমতিয়াজ তখনও কোন সন্দেহভাজন নয়। মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে এটা আমার নজরে এসেছে। তাকে সাসপেক্ট হিসেবে গন্য করতে গেলে আরো অনেক কিছু লাগবে। সবচাইতে বড় কথা হায়দারভায়ের কাছে এটা গ্রহণযোগ্য হতে হবে নইলে কথাটা তোলামাত্রই তিনি খারিজ করে দিতে পারেন। ছবিতে এক যুবক হা-করে মেয়েমানুষ দেখছে-এটা কোনো ফৌজদারি অপরাধের মধ্যে পড়ে না। খুনখারাবি আর ধর্ষণের মতো ঘটনার আসামি হিসেবে তাকে সন্দেহ করার উপায় নেই। আমি যেটা করছি তার সবটাই আমার নিজস্ব মূল্যায়ন। অনুভূতির ব্যাপার।
“ঠিক তা নয়,” গাল চুলকে বললাম। “একটু খতিয়ে দেখতে চাইছি আর কি।”
“আমার কিন্তু মনে হচ্ছে ও-ই জঘন্য কাজটা করেছে,” রামজিয়া জোর দিয়ে বললো। “ওর চোখদুটো আসলেই কেমনজানি। আপনি বোধহয় ঠিকই ধরতে পেরেছেন।”
“দেখা যাক, কি হয় শেষ পর্যন্ত।”
আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিলো রামজিয়া।
“এই লোকটা কোথায় থাকে বলতে পারেন?”
আমাকে হতাশ করে দিয়ে মাথা দোলালো সে। “আমি ওর সম্পর্কে একদমই কিছু জানি না। কোথায় থাকে কি করে, নো আইডিয়া। তবে পারভেজ নামে মিলির এক কাজিন আছে, ও আবার বিয়ে করেছে আমাদের আরেক বান্ধবি পারুলকে। পারভেজের সাথে আমি ইমতিয়াজকে কথা বলতে দেখেছি গায়েহলুদের প্রোগ্রামে। সম্ভবত পারভেজ জানে ইমতিয়াজের ঠিকানা।” উঠে দাঁড়ালো সে, “ওয়েট অ্যা মিনিট…আমি আসছি।” বলেই পাশের ঘরে চলে গেলো।
আমি ড্রইংরুমের চারপাশটা দেখতে লাগলাম। এরা শুধু ধনীই নয়, বেশ শিক্ষিতও বটে। দেয়ালে কিছু পেইন্টিং টাঙানো আছে, টিভি সেটের পাশে একটা লং-প্লেয়ারও-তখনকার দিনে যা খুব কম বাড়িতেই ছিলো। প্লেয়ারটার পাশে একগাদা লং-প্লে ডিস্ক। এটাকে সবাই এল.পি নামে ডাকতো। সবার উপরে থাকা লং-প্লেটা চিনতে পারলাম গায়কের ছবি দেখে-ক্লিফ রিচার্ড। ভদ্রলোককে চেনার কারণ যুদ্ধের পর পর এ দেশে এসেছিলেন তিনি। টিভিতে তার গাওয়া ‘কংগ্রাচুলেশন্স’ গানটা আমিও দেখেছি। দীর্ঘদিন এই গানটা প্রচার করতো বিটিভি। আমার মতো ইংরেজি গান না-শোনাদেরও মুখস্ত হয়ে গেছিলো ভদ্রলোকের চেহারা!
আমি রুমের বামদিকে তাকালাম। বড় বড় জানালা দিয়ে বাইরে ছোট্ট একটি বাগান দেখা যাচ্ছে। ঘরের বড় জানালার পাশে একটা রকিং চেয়ার। কেউ হয়তো আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে এই চেয়ারে বসে বই পড়ে, গান শোনে আর বাগানের হরেক রকম ফুল দেখে। একেবারে সিনেমায় দেখা বড়লোকদের মতোই!
তবে ঘরে বিশাল একটি বুকসেলফই আমার মনোযোগ বেশি আকর্ষণ করলো। এরকম বুকসেফের স্বপ্নই আমি দেখতাম। ব্যাচেলরের জীবন যেমন এলোমেলো হয় তেমনি তার বইগুলোও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে ঘরে। আমিও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। তবে অন্যদের তুলনায় সামান্য একটু গুছিয়ে রাখতাম।
যাই হোক, বুকসেলফে থাকা বইগুলো বলে দিচ্ছিলো এ বাড়িতে কমপক্ষে একজন পড়ুয়া আছে। সে কে হতে পারে? এই মেয়েটা? সম্ভবত।
আমি বইগুলো দেখে গেলাম এক এক করে। আমি যে এতো বই পড়ি তারপরও অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম সেফের একটা বইও আমার পড়া নেই! কালেকশানে থাকার তো প্রশ্নই ওঠে না!
বইগুলো সব ইংরেজি ভাষার।
ঢাকায় আসার পর পুরনো ইংরেজি বইয়ের কিছু দোকান দেখে ঢু মেরেছিলাম। সেই সময় ঢাকায় খুব বেশি ইংরেজি বই পাওয়াও যেতো না, আর পাওয়া গেলেও দাম পড়তো খুব বেশি। তবে স্টেডিয়ামের একটা দোকানে পুরনো বইয় বিক্রি করা হতো, ওখান থেকে কম দামে দুটো ইংরেজি নভেল কিনে পড়ার চেষ্টা করেছিলাম, বার বার ডিকশনারি দেখে বই পড়া যে কী যন্ত্রণাদায়ক সেটা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেয়েছিলাম আমি। তিনদিনে বিশ পৃষ্ঠা পড়ে ক্ষান্ত দিয়েছিলাম অবশেষে।
বুকসেলফে একমাত্র বাঙালি লেখক নিরদচন্দ্র চৌধুরি, কিন্তু তার বইটা যথারীতি ইংরেজিতে লেখা-অ্যান অটো-বায়োগ্রাফি অব অ্যান আননোন ইন্ডিয়ান। এই বাদামি সাহেবের দুটো বাঙলা বই আমি পড়েছি, কোন ইংরেজি বই পড়া হয়নি। আনমনেই অটো-বায়োগ্রাফি বইটা হাতে তুলে নিয়ে পাতা ওল্টাতে শুরু করলাম।
“আব্বা দেশের বাইরে গেলেই আমার জন্য বই নিয়ে আসেন,” ঘরে ঢুকেই রামজিয়া বলে উঠলো।
আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বইটা জায়গামতো রেখে দিলাম। “মনে হচ্ছে খুব বই পড়েন?”
“না, মানে…একটু আধটু।” আমি যে ইংরেজি বই পড়ি না, পড়তে গিয়ে ঘেমে উঠি সেটা আর তাকে বললাম না।
“নিরদ চৌধুরির লেখা ভালো তবে ভাষা খুবই কঠিন। একেবারে রয়্যাল-ইংলিশে লেখেন।”
“আমি অবশ্য উনার দুটো বাঙলা বই পড়েছি,” বললাম তাকে।
“উনি বাঙলা বই-ও লেখেন নাকি?” অবাকই হলো। “আব্বু বলেন, উনি নাকি কিছুটা বাঙালি বিদ্বেষি। আমার তো ধারণা ছিলো উনি বাঙলায় লেখেন না।”
“উনার একটা বইয়ের নাম আত্মঘাতী বাঙালী, সেজন্যে হয়তো মনে করা হয় উনি বাঙালি বিদ্বেষি।”
“বিদ্বেষি না-হলে কেউ পুরো জাতিকে আত্মঘাতী বলতে পারে,
বলেন?” আমি সৌজন্যমূলক হাসি দিলাম। “হতে পারে। তবে উনার বাঙালীর জীবনে রমণী বইটা বেশ ভালো। আমার খুব ভালো লেগেছে।”
“তাই?”
“হুম।” একটু থেমে আবার বললাম, “এসব বই কে পড়ে, আপনি?”
“আমি আর আব্বা।” ছোট্ট করে জবাব দিলো। তারপর কিছু একটা মনে পড়তেই বলে উঠলো, “আপনার ভাগ্য ভালো, পারভেজকে ফোনে পেয়েছি।”
আমি কৃত্রিম হাসি দিলাম।
“দু-দিন ধরে ওর চোখ উঠেছে তাই অফিসে যায়নি, বাসায়ই আছে।”
এই চোখ ওঠা রোগটি তখন বেশ পরিচিত ছিলো। যুদ্ধের সময় লক্ষ- লক্ষ শরণার্থি কোলকাতায় আশ্রয় নিলে রোগটা এ দেশ থেকে সেখানেও চলে যায়। ওরা এটাকে ‘জয়বাংলা রোগ’ বলে ডাকতো।
আবার নিজের জায়গায় বসে পড়লো সে। “এই নিন, ইমতিয়াজের ঠিকানা।”
বাড়িয়ে দেয়া এক টুকরো কাগজটি হাতে নিলাম।
“পারভেজ আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো ইমতিয়াজের ঠিকানা চাচ্ছি কেন, আমি বলেছি একটা দরকার আছে। ওকে এসব বলা ঠিক হতো না, তাই না?”
“জি। না বলে ভালোই করেছেন।”
কাগজে চোখ বোলালাম : কাঠালবাগানের বড় মসজিদের পাশে।
“পারভেজ বলেছে, ওখানে গিয়ে ইমতিয়াজের নাম বললেই লোকজন ওর বাড়িটা দেখিয়ে দেবে,” রামজিয়া বললো।
“থ্যাঙ্ক ইউ,” কথাটা বলার পরই আমার মনে হলো অযথাই বোকার মতো ইংরেজি বললাম কেন! ধনীর বাড়িতে এসে তাদের অনুকরণে কথা বলে নিজের কাছেই কেমন ছোট হয়ে গেলাম যেন। আস্তে করে উঠে দাঁড়ালাম।
রামজিয়াও আমার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো। “আমার ফোননাম্বারটা তো আপনার কাছে আছেই…মিলির কেসটার আপডেট আমাকে জানাবেন।”
“জি, অবশ্যই জানবো।”
হঠাৎ করেই মনে হলো, রামজিয়ার মুখটা কেমনজানি চেনা চেনা লাগছে। কোথায় যেন দেখেছি।
আহ্! রোমান হলিডে…অড্রে হেপবার্ন!
কয়েক বছর আগে মধুমিতা’য় গিয়ে এই সিনেমা দেখে রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছিলো।
“কিছু বলবেন?”
তার কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম। “না।”
বাড়ি থেকে বের হয়ে আসার সময় আমার শুধু এটাই মনে হলো, খুন- খারাবির তদন্ত করাটা সব সময় নিরস আর বিরক্তিকর হয় না!
