অধ্যায় ১২
শিকার পর্ব
ঢাকা শহর তখনও খুব ছোটো, জনসংখ্যাও আজকের তুলনায় অনেক কম, তারপরও ইমতিয়াজকে খুঁজে বের করতে না পেরে ক্রমশ হতাশ হয়ে উঠছিলেন হায়দারভাই। নাছোরবান্দার মতো লেগেছিলেন তিনি। এখানে ওখানে বহু জায়গায় খোঁজ করার পর আমরা বুঝে গেলাম ইমতিয়াজ সতর্ক হয়ে উঠেছে। এতে করে হায়দারভাই আরো বেশি নিশ্চিত হয়ে গেলেন, খুনটা সে-ই করেছে, নইলে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়েরের আগে কেন এতো সতর্ক হয়ে উঠলো।
বেশ কয়েকটা দিন নিষ্ফলা কেটে যাবার পর একদিন দেখতে পেলাম বিহারি কাশেম নামের এক লোক থানায় এসে হায়দারভায়ের সাথে কথা বলে গেলো। অন্য একটা কাজে ব্যস্ত ছিলাম বলে তাদের কথাবার্তা তেমন একটা শুনতে পাইনি, তবে হায়দারভাই যে ইমতিয়াজের ব্যাপারে কথা বলছিলেন সেটা বুঝতে পেরেছিলাম।
এর আগেও আমি বিহারি কাশেমকে কয়েকবার দেখেছি। লোকটা ঢাকা শহরের বেশ কয়েকটি থানায় ইনফর্মার হিসেবে কাজ করে। যেমনি ধুর্ত তেমনি ঘাগু। অন্যসব ইনফর্মাররা যেখানে একটি নির্দিষ্ট থানার নাড়িনক্ষত্রের খবর রাখে সেখানে এই লোক বলতে গেলে পুরো ঢাকা শহরের হাড়ির খবর রাখে। এটাই ওর একমাত্র পেশা। যতো খবর ততো ইনকাম
“বিহারি কাশেমকে লাগিয়ে দিলাম, ও ঠিকই ইমতিয়াজের পাত্তা খুঁজে বের করতে পারবে।” ইনফর্মার লোকটা থানা থেকে চলে যাবার পর আমাকে বলেছিলেন এসএম হায়দার। “কতোদিন পালিয়ে থাকবে? ঠ্যালার নাম কাশেমবাবা!” কথাটা বলেই চোখ টিপে দিলেন তিনি।
নড়চড়ে বসলাম আমি। “কাশেম! এই লোকই কি আপনার সেই কাশেমবাবা?”
মাথা নেড়ে সায় দিলেন তিনি। “আমি মজা করে ঠ্যালার নাম বাবাজি না বলে কাশেমবাবা বলি কেন জানো? জীবনে আমি এই শালার মতো ফাঁপড় মারতে কাউকে দেখিনি।”
বিহারি কাশেম কঠিন চিজ। এই ধুরন্ধর লোকটা পুলিশকে ভয় পয় না, মাঝেমধ্যে তাদেরকেও এমন ফাপড় দেয় যে, না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। তবে এসএম হায়দারকে কেনজানি খুবই সমীহ করে।
“কাশেম আপনাকে খুব মানে,” কথাটা না বলে পারলাম না, “এর কারণ কি?”
একটা ভাবনায় ডুবে সিগারেটে টান দিয়ে বললেন তিনি, “যুদ্ধের পর পর ও মুক্তিবাহিনীর হাতে ধরা পড়েছিলো, আমি ওকে বাঁচিয়ে দিয়েছিলাম।”
“ও কি কোলাবরেটর ছিলো?” রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস–জঘন্য নামগুলো কোলাবরেটর শব্দে প্রকাশ করা হতো তখন।
“না।”
“তাহলে?”
“বিহারি ছিলো…শুধুই বিহারি।”
কথাটা শুনতে যেমনই লাগুক, ৭১-এ বাঙালি-বিহারী সম্পর্কটা চিরশত্রুর মতো হয়ে উঠেছিলো। অনেক বিহারি বাঙালি-নিধনে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলো তখন, বিশেষ করে বিহারী অধ্যূষিত এলাকায় বাঙালিদের জন্য আজরাইলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তারা। সব যুদ্ধের মতো আমাদের মুক্তিযুদ্ধও ‘কোলাটেরল ড্যামেজ’ থেকে মুক্ত ছিলো না। অনেক নিরীহ বাঙালি যেমন এর শিকার হয়েছে তেমনি কিছু বিহারীও বেঘোরে মারা পড়েছে শুধুমাত্র বিহারি বলেই। এটা অস্বীকার করা যাবে না।
যাই হোক, বিহারি কাশেম কয়েকদিন পরই তার ‘ঠ্যালা’ বুঝিয়ে দিলো। লেকু মিয়া নামের একজনের হদিস দিলো সে। মিলি খুন হবার আগে এই লেকু মিয়ার সাথেই নাকি ইমতিয়াজকে সব সময় দেখা যেত। ওকে ধরলে হয়তো জানা যাবে ইমতিয়াজ কোথায় আছে। লোকটা এখন তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ধানমণ্ডিতে পাকিস্তানি ব্যবসায়ির পরিত্যক্ত এক বাড়িতে আস্তানা গেঁড়েছে। সরকার দলীয় প্রভাবশালী এক নেতা বাড়িটা নিজের দখলে রাখার উদ্দেশ্যে এটা করেছে। ঐ নেতার হয়েই কাজ করছে লেকু আর তার লোকজন।
খবরটা পাওয়ামাত্রই হায়দারভাই আমাকে নিয়ে রওনা হয়ে গেলেন ধানমণ্ডির ঐ বাড়িতে।
“বুঝেছো, তোমার দলের নেতারা দেশ স্বাধীন করে এখন ভাগ- বাটোয়ারায় ব্যস্ত,” পুলিশের জিপে বসতেই টিপ্পনি কাটলেন তিনি। “পাকিস্তানি ব্যবসায়িদের বাড়িগুলো কে কার আগে দখলে নিতে পারে সেটা নিয়ে কামড়া-কামড়ি লেগে গেছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘ও আমার দেশের মাটি তোমার পরে ঠেকাই মাথা’ বলে কেঁদে ফেলতো তারাও এখন মাটি দখলে নেমে পড়েছে। বাকিদের কথা আর কী বলবো।”
আমি ততোদিনে এরকম টিটকারিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। হায়দারভায়ের এ কথায় কিছু বললাম না।
“সারা দেশেই এমন হচ্ছে,” বলে চললেন তিনি। “এই এক ধানমণ্ডিতে কতো বাড়ি যে ঐ শালার চাটার দল দখল নিয়েছে তার কোনো হিসেব নেই!” ঘেন্নায় একদলা থুতু ফেললেন গাড়ির বাইরে।”
“কিছু লোভি নেতার জন্য পুরো দলকে আপনি দায়ি করতে পারেন না, ‘ আস্তে করে বললাম আমি। যদিও এই যুক্তিটা বহুল ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে পড়েছিলো ততোদিনে।
“ছোটোভাই, এসব কথা বাদ দিয়ে নতুন কিছু থাকলে বলো,” তিক্তমুখে বললেন এসএম হায়দার। “একটা পরিবারে যদি আটজন ভালো মানুষ থাকার পরও দু-জন ইতর, বদমাশ থাকে তাহলে পুরো পরিবারটি বদনামের ভাগিদার হয়। কেন হয়? কারণ তুমি বদমাশকে প্রশ্রয় দিয়েছো। তাকে থামানোর চেষ্টা করছো না। লাখি মেরে তাকে তাড়িয়েও দিচ্ছো না।”
আমি আবারো চুপ থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভালো করেই জানি আজিমপুর থেকে ধানমণ্ডির পথটা খুব অল্প সময়ের। জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকাটাই আমার জন্য ভালো হবে। আমার বোবানীতির কারণে রাজনৈতিক পেচালে সুবিধা করতে পারলেন না হায়দারভাই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা চলে এলাম ধানমণ্ডি লেকের পাশে একটি দোতলা বাড়ির সামনে। গেটে কোনো দারোয়ান নেই। এলাকাটি একদম নির্জন। হায়দারভায়ের মতে এই এলাকায় মোট তিনটি বাড়ি সরকার দলের লোকজন দখল করে রেখেছে।
গাড়ি থেকে নেমে মেইনগেটে জোরে জোরে টোকা মারলেন এসএম হায়দার। অনেকক্ষণ পর রোগাপটকা এক লোক গেট খুলে দিতেই ভিরমি খেলো আমাদের দেখে।
“লেকু মিয়া আছে?” জানতে চাইলেন হায়দারভাই।
“হ” বললো সেই লোক।”
“সর্,” লোকটাকে সরে দাঁড়াতে বলেই হায়দারভাই আমাকে নিয়ে ঢুকে পড়লেন ভেতরে।
বাড়ির সামনে এক চিলতে লন অযত্ন আর অবহেলায় নোংরা হয়ে আছে। দোতলার বারান্দায় দড়ি টানিয়ে লুঙ্গি, আন্ডারওয়্যার, শার্ট, গেঞ্জি ঝুলিয়ে শুকানো হচ্ছে। বাড়ির বর্তমান বাসিন্দাদের সামাজিক অবস্থান এতেই বোঝা গেলো—একদল লোক দখলদারের পক্ষ নিয়ে আসন গেঁড়েছে এখানে।
“ওই কাঞ্চইন্যা…কে রে?” বাড়ির ভেতর থেকে লুঙ্গি পরা গাট্টাগোট্টা এক লোক এসে দাঁড়ালো আমাদের সামনে। তার চোখমুখে অবশ্য ভড়কে যাবার কোন চিহ্ন নেই। বিস্মিত সে। “আপনেরা?”
“তোমার নাম কি লেকু মিয়া?” অনেকটা ধমকের সুরে জানতে চাইলেন হায়দারভাই।
“হ।” তার চোখদুটো ধূর্ত শেয়ালের মতো। একবার আমার দিকে, আরেকবার হায়দারভায়ের দিকে তাকাচ্ছে। “এইটা কইলাম আমাগো লিডারের-”
“জানি জানি,” লেকুর কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলে উঠলেন এসএম হায়দার। “তোর লিডারে পেয়ারের বাড়ি নিয়ে আমাদের কোন মাথাব্যথা নেই।” তিক্তমুখে তুই-তোকারি করা শুরু করলেন তিনি।
“তাইলে?” লেকুর কপালে ভাঁজ পড়লো। লোকটার চোখমুখ দেখে মনে হচ্ছে আমরা দু-জন অনধিকার প্রবেশ করেছি তাদের ‘আস্তানায়।”
“আগে বল্, এখানে তোরা কে কে থাকিস?”
“আ-আমি, কাঞ্চন আর শেখল,” একান্ত অনিচ্ছায় বলে উঠলো সে। বাড়ির চারপাশে চোখ বুলালেন হায়দারভাই। “আর কেউ না?”
“না।” কথাটা বলতে গিয়ে কেমন যেন করলো লেকু। “আপনারা কারে চান, কন তো?”
“ইমতিয়াজ।” বলেই তিনি বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। লেকু আর আমিও তার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে গেলাম।
“ই-ইমতিয়াজ তো এইহানে-”
“থাকে না?” হাটতে হাটতেই আবারো লেকুর কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বললেন হায়দারভাই।
“না, থাকে না,” জোর দিয়ে বললো সে।
“হুম।” বাড়িটার বারান্দার সামনে এসে দাঁড়ালেন এসএম হায়দার। “তাহলে ইমতিয়াজ এখন কোথায় থাকে?”
একেবারে আকাশ থেকে পড়লো যেন লেকু মিয়া। “ও কই থাকে আমি কেমনে জানমু?”
এবার লোকটার দিকে ফিরে তাকালেন তিনি। “ইয়ার-দোস্ত কই থাকে তুই জানিস না?” মুচকি হাসলেন। “নাকি বলবি, ইমতিয়াজ নামের কাউকে চিনিসই না?”
লেকু বুঝে উঠতে পারলো না কী বলবে। ভুরু কুচকে চেয়ে রইলো সে। “ও-ওরে আমি চিনি, কিন্তু ও আমাগো লগে থাকে না।”
“যাক, তাহলে চিনিস,” বললেন হায়দারভাই। “তোরা কোন্ ঘরে থাকিস?”
প্রশ্নটা শুনে লেকু মিয়া একটু অবাক হলো। “দুতলায়,” সংক্ষেপে জানালো সে। আঙুল তুলে দেখিয়ে দিলো।
“আর শেখুল, সে কই?”
“দুতলায়।”
আমার দিকে তাকালেন হায়দারভাই। “চলো।” কথাটা বলেই লেকু মিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন তিনি। আমিও তার পেছন পেছন ছুটলাম।
ডুপ্লেক্স বাড়ির ভেতরটা পুরোপুরি নোংরা। তেমন কোনো আসবাবপত্র চোখে পড়লো না। ফ্লোর আর সিঁড়িটা মোজাইক করা। আমরা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় চলে গেলাম। ছোট্ট একটা হলওয়ে পেরিয়ে দরজা খোলা একটি রুমের সামনে দাঁড়ালেন হায়দারভাই।
“এটা?”
“হ,” বললো লেকু মিয়া।
ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লেন এসএম হায়দার, তার পেছন পেছন আমি। ঘরটা বলতে গেলে ফাঁকা। মেঝেতে একটি পুরনো শীতল পাটি বিছানো, তাতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে তাস। সিগারেটের গন্ধে ভরে আছে ঘরটা। একটা ভাঙা চায়ের কাপ অ্যাস্ট্রে হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কাপ ভর্তি সিগারেটেরে উচ্ছিষ্ট। সম্ভবত আমরা আসার আগে লেকু মিয়ারা তাস খেলছিলো।
লেকুর দিকে ফিরলেন এসএম হায়দার। হোলস্টার থেকে পিস্তলটা বের করে হাতে নিয়ে নিলেন তিনি। দাঁতে দাঁত পিষে লোকটার দিকে তাকালেন। “পুলিশের সাথে ফাজলামি করিস! ইমতিয়াজ কই?”
তার কথা শুনে লেকুর মতো আমিও ভড়কে গেলাম। হায়দারভাই কী করে বুঝলেন এখানে ইমতিয়াজ আছে? নাকি ফাপড় দিয়ে কথা বের করার চেষ্টা করছেন?
“কইলাম না, এইহানে থাকে না।” কথাটা বলেই ঢোক গিললো গাট্টাগোট্টা লোকটি।
“শূয়োরেরবাচ্চা!” বলেই একটা চড় মেরে বসলেন হায়দারভাই।
চড় খেয়ে রীতিমতো বিস্ফারিত চোখে চেয়ে রইলো লেকু।
“চারজনে মিলে তাস খেলছিলি…অন্য একজন কই, অ্যাঁ?”
হায়দারভায়ের কথা শুনে আমি শীতল পাটির দিকে তাকালাম আবার। চারজন মানুষ যে তাস খেলছিলো সেটা এবার চোখে ধরা পড়লো। পাটির চারদিকে চার পেটি তাস, বাটা শেষ করে খেলা শুরু করেছিলো মাত্র।
“কই?”
ঠিক এমন সময় বারান্দা থেকে ঘরের ঢুকলো পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের এক যুবক। বাবরি চুল আর পুরু গোঁফ। চোখদুটো লালচে। আমাদের দেখে আলগোছে ঢোক গিললো সে।
“তুই কে?” ঝাঁঝের সাথে বললেন হায়দারভাই। “আ-আমি শেখুল,” তোতলালো সেই যুবক। “ইমতিয়াজ কই?”
হায়দারভায়ের প্রশ্নটা শুনে ঢোক গিলে লেকু মিয়ার দিকে তাকালো শেখুল।
“আরে শূয়োরেরবাচ্চা, ওর দিকে তাকাস কেন? আমার কথার জবাব দে!” চটে গেলেন তিনি।
“আ-আপনেরা আসার আগেই পলাইছে!”
ভুরু কুচকে তাকালেন এসএম হায়দার। “ও এখানে ছিলো?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো ছেলেটা।
“আমরা যে আসছি ও এখান থেকে কিভাবে বুঝলো, অ্যাঁ?”
“বারিন্দা থেইকা দেখছে।”
হায়দারভাই সঙ্গে সঙ্গে বারান্দায় চলে গেলেন। নিচের দিকে তাকিয়ে মেইনগেটটা দেখতে পেলেন তিনি। বুঝতে পারলেন, এখান থেকে ইমতিয়াজ আমাদের দেখেই ভেগেছে।
“কোন্ দিক দিয়ে পালিয়েছে?” চট করে লেকুর দিকে ফিরে বললেন। পিস্তল উঁচিয়ে ধরলেন লোকটার মুখের কাছে। “বল্!”
“পি-পিছনের দেয়াল দিয়া-
হায়দারভাই আর পুরো কথাটা শোনার জন্য অপেক্ষা করলেন না। আমাকে নিয়ে দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে গেলেন।
বাড়ির পেছনদিকে এক চিলতে খালি জায়গা, সম্ভবত এর মালিক এখানে বাগান করেছিলো কিন্তু এখন সেটা আগাছায় পরিপূর্ণ। প্রচুর ভাঙাচোরা জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ফুলের কোনো গাছ আর অবশিষ্ট নেই, তবে বড় বড় বেশ কয়েকটি নাম না-জানা গাছ দাঁড়িয়ে আছে দেয়াল ঘেষে। আটফুট উঁচু সীমানা প্রাচীর কিন্তু হতাশার সাথেই আমরা আবিষ্কার করলাম, সেটা টপকে যাওয়া তেমন কঠিন কিছু না-একটা পরিত্যক্ত সাদা রঙের টয়োটা কোরোলা পড়ে আছে সেই দেয়াল ঘেঁষে। ওটার ছাদের উপর উঠে দাঁড়ালে যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক লোকের পক্ষে দেয়ালটা টপকানো খুবই সহজ।
হায়দারভাই পিস্তল হাতে গাড়িটার উপরে উঠতেই থমকে গেলেন। আক্ষেপে মাথা দোলালেন তিনি। গাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে দেয়ালের ওপাশটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। আমি তখনও গাড়ির নীচে দাঁড়িয়ে আছি।
“কি হয়েছে?”
আমার প্রশ্নে ফিরে তাকালেন। দাঁতে দাঁত পিষে বললেন, “ভেগেছে!” গাড়ির ছাদ আর বুটের দিকে নজর দিলেন তিনি। শীতকাল বলে ধুলোর আস্তরণ পড়ে আছে তাতে। “দেখো!” বুটের দিকে ইঙ্গিত করলেন।
আমি দেখতে পেলাম ধুলোর আস্তরণে কিছু পায়ের ছাপ। একটু আগে কেউ গাড়িটার উপরে উঠেছিলো।
রেগেমেগে গাড়ি থেকে নেমে এলেন হায়দারভাই। আমার দিকে তাকালেন। তার চোখেমুখে হতাশা দেখতে পেলাম। সত্যি বলতে আমি নিজেও হতাশ হয়েছিলাম খুব। এভাবে হুট করে ইমতিয়াজকে পেয়েও হাতছাড়া করবো সেটা আশা করিনি।
লেকু, কাঞ্চন আর শেখুলকে আরো কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ করে তেমন কিছু জানা গেলো না। একসঙ্গে থাকলেও ইমতিয়াজ সম্পর্কে খুব বেশি কিছু বলতে পারলো না তারা। যতোটুকু বোঝা গেলো, লেকু আর ইমতিয়াজ এক সঙ্গে ঘোরাঘুরি করে। এখানে সেখানে চাঁদাবাজি করে, সম্ভবত রাত-বিরাতে ভাসমান পতিতা নিয়ে এসে মউজ-ফূর্তি করে এখানে।
লেকু আরো জানালো, সপ্তাহ দুয়েক আগে ইমতিয়াজ এসে তাকে বলেছিলো এই বাড়িতে সে কয়েকদিন থাকবে। তার বাড়িতে নাকি কী একটা সমস্যা হয়েছে। এ নিয়ে লেকু কিছু জিজ্ঞেস করেনি। তারা মাত্র তিনজন প্রাণী বাড়িটাতে থাকে, আরেকজন যোগ দিলে ভালোই হবে, তাস খেলার পার্টনার পাওয়া যাবে।
হায়দারভাই আমাকে নিয়ে আবারো চলে গেলেন দোতলায়। তার উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারলাম, ইমতিয়াজ যে ঘরে থাকে সেখানে ভালোমতো তল্লাশি চালাবেন। খুব দ্রুত আর তাড়াহুড়ো করে সে ভেগেছে, নিশ্চয় অনেক কিছু রেখে গেছে ঘরে। ইমতিয়াজের ঘরে ঢুকেই চারপাশে চোখ বুলাতে শুরু করলেন তিনি। তার চোখ ঘরের বিভিন্ন অংশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
একটা সিঙ্গেল খাট, উন্মুক্ত ময়লা ম্যাট্রেস আর বালিশ। যথারীতি এই ঘরটাও নোংরা। ঘরে আর কোনো আসবাব নেই।
পুরো ঘরে তল্লাশি চালালেও তেমন কিছুই পেলাম না। এটা ইমতিয়াজের অস্থায়ি আস্তানা। আপদকালিন আবাস। প্রয়োজনীয় কিছু কাপড়-চোপর ছাড়া ঘরে কিছুই নেই। ইমতিয়াজের দুটো শার্ট, একটা প্যান্ট, স্যান্ডো গেঞ্জি আর আন্ডারওয়্যার দেয়ালে পেরেক গেঁথে হ্যাঙ্গারে টাঙানো আছে।
ঠিত তখনই ঘরের এককোণে কালো রঙের একটি ছাতা দেখতে পেলাম আমি। হায়দারভায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি মাথা নেড়ে সায় দিলেন।
আলামত!
তল্লাশি যখন প্রায় শেষ তখন কী মনে করে যেন ইমতিয়াজের শার্ট আর প্যান্টটা হ্যাঙ্গার থেকে নামিয়ে নিলেন হায়দারভাই। পকেটে হাত ঢুকিয়ে খুঁজে দেখলেন। প্যান্টের বাম পকেট থেকে সিনেমার টিকেটের মতো একটা দোমড়ানো মোচড়ানো কাগজ বের করে আনলেন তিনি। কাগজটা মেলে ধরে দেখলেন ওটা সিনেমার টিকেট নয়। দরজার দিকে ফিরে লেকু মিয়ার দিকে তাকালেন এবার। লোকটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
“ইমতিয়াজ কি ফুটবল খেলা দেখতে গেছিলো কয়েকদিন আগে?”
“হ। নতুন টিম আবাহনীর কুনো খেলা মিস্ করে না। কঠিন সাপোর্টার।”
