অধ্যায় ১
দশ-পনেরো মিনিট পায়চারি করেও দরজাটা দিয়ে ঢুকতে পারিনি। ওখানে যাবার আগে বুঝতে পারিনি এরকম দ্বিধায় পড়ে যাবো, আর সেটা ঠিক দরজার সামনে এসেই। জানি না কেন, তবে নিশ্চিতভাবেই সময় এখানে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। সবাই বলে সময় সবকিছু সারিয়ে তোলে, কিন্তু ঐদিন মনে হচ্ছিলো সময় শুধু সারিয়েই তোলে না, জড়তা আর দ্বিধার স্তুপও বাড়িয়ে দেয়। ঐ মুহূর্তে আমি সেই স্তুপের তলে তলিয়ে গেছিলাম।
জ্ঞান হবার পর থেকেই জানি সাহসিদের মধ্যে আমি পড়ি না, কিন্তু সামান্য একটি খোলা দরজা দিয়ে ঢোকার মতো সাহস নিশ্চয় আমার আছে, তাই এরকম দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকার কোনো মানেই ছিলো না, তারপরও সেই খোলা দরজাটি কোনো দূর্গের বিশাল আর ভারি ফটকের মতোই পথরোধ করে দাঁড়িয়ে ছিলো আমার সামনে। ভাগ্য ভালো, সমস্ত দ্বিধা আর সংকোচ থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছিলাম অপরিচিত একজনের হস্তক্ষেপে। লেখালেখি করে যে টুকটাক পরিচিতি পেয়েছি সেটা আবারও টের পেলাম।
ঐ খোলা দরজা দিয়ে এক যুবক বেরিয়ে আসার সময় আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। আগ বাড়িয়ে জানায় সে আমার বইয়ের একজন পাঠক। ভক্তদের সাথে এরকম আকস্মিক দেখা-সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা আমার জন্য অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা নয়। তাদের আচরণ, কথাবার্তা, উচ্ছাসের সাথে আমি পরিচিত।
করমর্দন করতে করতেই পঁচিশ-ছাব্বিশ বছরের ঐ যুবক অনেক কিছু বললো, তারপর যখন জানতে পারলো আমি কেন এখানে দাঁড়িয়ে আছি সঙ্গে সঙ্গে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলো সে। কার সাথে দেখা করতে যাচ্ছি আমি?-তার সঙ্গত প্রশ্নের জবাবে সেই নামটি উচ্চারণ করলাম যে নামটি আমার হৃদয়ের গহীনে দীর্ঘস্থায়ী আস্তানা গেঁড়ে আছে দুই যুগ ধরে।
খুবই আন্তরিকভাবে আমাকে লিফট পর্যন্ত পৌঁছে দিলো সেই তরুণ, সেই সাথে কতো তলায় যেতে হবে সেটাও বলে দিলো। এমনকি লিফটে করে আমাকে নির্দিষ্ট সেই অফিসে পৌঁছে দেবার আগ্রহও দেখিয়েছিলো তবে আমি তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিরত করি।
লিফটের ইন্ডিকেটরের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে ভাবছিলাম সময় আর কী করতে পারে! সারিয়ে তোলে। দ্বিধার স্তুপ তৈরি করে। ভুলিয়ে দেয়। বিস্মৃত করে দেয়?
সময় আসলে সব কিছুই করে। আমরা নিতান্তই সময়ের সন্তান!
আমার বামহাতে একটি চামড়ার ব্যাগ। একদলা কাগজ ছাড়া ওর ভেতরে কিছু নেই। অথচ ব্যাগটাকে বেশ ভারি বলে মনে হচ্ছিলো। লিফটের ভেতরে একটু পর পর ডান-বাম করছিলাম কিন্তু হাত বদলের এই খেলায় তেমন ফল পাচ্ছিলাম না। আমার নাজুক হৃদপিণ্ডটা লাফাচ্ছিলো অনেকটা প্রথমবার প্রেমে পড়ার মতো অনুভূতিতে!
লিফটের দরজা খোলার আগে আরেকটা প্রশ্ন আমার দ্বিধার স্তুপ ভারাক্রান্ত করে তুললো : ও কি আমাকে চিনতে পারবে?
লিফটের দরজা খুলে গেলে বুক ভরে দম নিয়ে বের হলাম আমি। খুব বেশি খুঁজতে হলো না, কয়েক পা এগোতেই চোখে পড়লো একটি দরজায় সুন্দর করে ইংরেজিতে লেখা নামফলকটির দিকে। খুব বেশিদিন হয়নি লেখা হয়েছে ওটা। এখনও এর কালি চকচক করছে। টের পেলাম আবারো আমার মধ্যে দ্বিধা এসে ভর করেছে, কিন্তু এই দরজার সামনে এসে দ্বিধার হাতে ক্রীড়নক হতে রাজি নই, তাই অনেকটা যন্ত্রের মতো দরজায় নক্ করলাম।
আলতো করে পর পর তিনটি টোকা।
ভেতর থেকে এক তরুণ দরজা খুলে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। আমি কোনো কিছু বলছি না দেখে সে নিজেই জানতে চাইলো কি চাই। তাকে জানালাম এখানে আসার উদ্দেশ্য।
“আপনার কি অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?”
“না,” ছোট্ট করে বললাম যুবককে। “আমি তার পূর্বপরিচিত। ব্যক্তিগত একটা কাজে এসেছি।”
“তাহলে সোজা বামদিকে চলে যান। উনি বাইরের অফিসেই আছেন।”
আমি একটা প্যাসেজ দিয়ে চলে এলাম বিরাট বড় ঘরে। তিন-চারটা ডেস্ক, কয়েকজন লোক, কম্পিউটার আর কাগজপত্রের সমাহার। কাজে ডুবে থাকা লোকগুলো আমার উপস্থিতি টেরই পেলো না, যে যার মতো কাজ করে যাচ্ছে। আমি হাতের ব্যাগটা নিয়ে অযাচিত অতিথির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক মুহূর্ত, তারপরই দৃষ্টি আটকে গেলো ঘরের বামদিকের এককোণে।
সেগুন কাঠের বিশাল একটি ডেস্ক, অভিজাত ভঙ্গিতে এক নারী দখল করে আছে। রিডিংগ্লাসের ভেতর দিয়ে গভীর মনোযোগের সাথে হাতেধরা একটি কাগজ পড়ছে সে। তার পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা চুল, মেনিকিউর করা নখ, ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক, চোখে চিকন করে দেয়া কাজল আর কানের দুল দুই যুগ আগের একটি ছবির মতোই স্থির হয়ে আছে! যেন বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভেংচি কাটছে বয়সটাকে।
টের পেলাম দম বন্ধ হয়ে আসছে, আর আমি তার দিকে নিষ্পলক চেয়ে আছি।
বামহাতে কাগজটা ধরে রেখেছে সে, ডানহাতে একটি কলম। সেই কলমটি আলতো করে ফাঁক হয়ে থাকা ঠোঁটে মৃদু টোকা মারছে, ঠিক যেন
তার পেছনে, দেয়ালে টাঙানো অ্যান্টিক ঘড়িটার টিকটিক ছন্দের তালে তালে। তারপর হঠাৎ করে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে তার হাতের কলমটি স্থির হয়ে গেলো। রিডিংগ্লাসের উপর দিয়ে দৃষ্টি হানলো আমার দিকে। তার ভুরু আর কপালের কুচকে যাওয়া দেখতে পেলাম, আরো দেখতে পেলাম তার চোখের পাপড়িগুলো।
চোখাচোখির মুহূর্তটায় আমি কেমন অভিব্যক্তি দিয়েছিলাম জানি না, সম্ভবত তারও নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছিলো। নিজের অভিজাত ব্যক্তিত্বকে পুণরুদ্ধার করে খুব ধীরে হাতের কাগজটা নামিয়ে রাখলো সে, সেই সাথে কলমটি। তারপর চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে আস্তে করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেই আমার সমস্ত দ্বিধা, জড়তা তিরোহিত হলো।
আমাকে চিনতে পেরেছে।
*
কফি আমর পছন্দের নয়, আমি চায়ের মানুষ, তবে অনেকদিন পর কফির পেয়ালায় চুমুক দিতে মোটেও খারাপ লাগেনি।
একটা বয়সে এসে মানুষ অতীতে ফিরে যেতে চায় বার বার, আর আমি তো সেখানেই বসবাস করছি দীর্ঘদিন থেকে!
“তোমাকে দেখেই কিন্তু চিনতে পেরেছি।” কফির কাপে চুমুক না দিয়েই বললো সে।
আমরা বসেছি তার প্রাইভেট চেম্বারে। একটু আগে এক কর্মচারি এসে দু-কাপ কফি দিয়ে গেছে। সেই কফি খেতে খেতে আলাপ করছি এখন।
কথাটা যদি সৌজন্যতা-ভদ্রতা না-হয়ে থাকে তাহলে অবাক করার মতোই বটে। আমার মতো স্বল্প পরিচিত একজন মানুষকে দীর্ঘদিন পর দেখে চেনার কথা নয়।
“আমার ভাগ্য…” আস্তে করে বললাম মুচকি হেসে।
প্রচ্ছন্ন এই টিটকারিটা আমলে না নিয়ে তার ঠোঁটজোড়া নড়ে উঠলো। “যদিও তুমি অনেকটাই বদলে গেছো।”
“হুম,” আবারও হাসলাম। “ডিপ্লোমেটিক হবার দরকার নেই। বলো, বুড়ো হয়ে গেছি।”
“আমাদের বয়স তো আর কম হলো না,” চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিতে সতর্ক চুমুক দিলো সে।
“তোমার বেলায় এটা বলার কোনো উপায় নেই। তুমি এখনও পয়ত্রিশে আটকে আছো।”
ভুরু নাচিয়ে মুচকি হাসলো সে। “আগে তো তোমার মেয়ে পটানোর স্বভাব ছিলো না…এই বয়সে এসে শিখে গেছো দেখছি।”
হেসে মাথা দোলালাম কেবল।
“গত বছর আগে পঞ্চাশতম জন্মদিন সেলিব্রেট করেছি।”
“আমি জানতাম মেয়েরা তাদের বয়সের কথা বলে না… মানে, সত্যিকারের বয়স।”
“বুড়ি হয়ে গেলে বলে।”
হা-হা করে হেসে উঠলাম আমি।
“তোমার কতো হলো?”
“বাহান্ন পেরিয়ে গেছি চার মাস আগে, অবশ্য দেখতে ষাটের মতো লাগে।”
ঠিক দুই যুগ আগের মতোই মোহনীয় কণ্ঠে বলে উঠলো সে, “অতোটা লাগে না, তবে শরীরের যত্ন নাও না সেটা বোঝা যায়।”
এ কথার কোনো জবাব না দিয়ে নিঃশব্দে হেসে গেলাম। “আমি যে ঢাকায়…কার কাছ থেকে জানলে?”
“বিখ্যাত মানুষের খবর পত্রিকায় হরহামেশাই পাওয়া যায়।”
কথাটা সত্যি। গত মাসের শেষের দিকে একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে তার এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত সংস্থা আর প্রধানের উপরে ইন্টারভিউ ছাপা হয়েছিলো। ওটা পড়ার পরই আমি জানতে পারি সে এখন ঢাকায়। আইনজীবি হিসেবে তার পেশাটা আমাকে বেশ অবাক করেছিলো। দুই যুগ আগে তার মুখ থেকে কখনও এরকম কিছুর কথা শুনিনি। অবশ্য, খুব বেশি কথাও শোনা হয়নি তার মুখ থেকে। যাই হোক, এরপরই দেখা করার সিদ্ধান্ত নেই।
মুচকি হেসে মাথা দুলিয়ে গেলো সে। “তোমার চেয়ে বেশি বিখ্যাত নিশ্চয় হইনি এখনও?”
“আমি যেকোনো উঠতি অভিনেতার চেয়েও কম বিখ্যাত। একটু খোলামেলা পোজ দেয়া মডেল আর উঠতি গায়ক-নায়করাও আমার চেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এখনও যারা বই পড়ে তাদের কেউ কেউ আমার লেখার পাঠক…এই যা।”
মুচকি হাসলো সে। “আমি স্টেট্সে থাকার সময়েই শুনেছিলাম তুমি বেশ বিখ্যাত লেখক হয়ে উঠেছো কিন্তু ওখানে থেকে তোমার কোনো বই জোগাড় করতে পারিনি,” একটু থেমে আবার বললো, “অবশ্য আমি এখন বই-টই খুব একটা পড়িও না…আই মিন, সময় পাই না।”
বই পড়ার সময় পায় না-এ কথাটাও আমাকে বিশ্বাস করতে হলো, কারণ ঐ সময়। সে-ই সবকিছুর নিয়ন্ত্রক। সবকিছু বদলে দেয়ার ক্ষমতা রাখে। আর আমি সেটা অনেক আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম।
“পত্রিকায় যখন দেখলাম তুমি একজন ল-ইয়ার তখন খুব অবাক হয়েছিলাম,” বললাম তাকে।
“হুম,” সায় দিলো। “স্টেট্সে গিয়ে সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম,” একটু থেমে আবার বললো, “ওখানে তো সবাই কাজ করে…আমিও সিদ্ধান্ত নিলাম জব করবো। কিন্তু ওড জব করার কোন ইচ্ছে ছিলো না। আবার ক্রেডিট ট্রান্সফার করারও ব্যবস্থা ছিলো না তখন। তাই নতুন করে গ্র্যাজুয়েশন করতে হলো।”
“আইনের উপরে কেন করলে? ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রি ছিলে…ল পড়ার ইচ্ছে হলো কেন?”
একটু হাসলো সে। “আমি আসলে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। সেজন্যে এখানে অনার্স শেষ করেও মাস্টার্স করিনি। কিন্তু ওখানে গিয়ে মনে হলো, এটাই করবো। মানুষ ন্যায়বিচার পাবে আর আমি তাতে সামান্য ভূমিকা রাখতে পারবো।”
চুপচাপ তার কথা শুনে গেলাম। আমার মন বললো, তার এমন সিদ্ধান্তের পেছনে দুই যুগ আগের ঘটনাটির নিশ্চয় বড় কোন ভূমিকা রেখেছে।
“কি ভাবছো?”
“কিছু না।”
সে একটু চুপ করে থেকে আবার বললো, “তুমি এসেছো বলে আমি অনেক খুশি হয়েছি। থ্যাঙ্ক ইউ ভেরি মাচ।”
আমি নিঃশব্দই রইলাম।
“দেশে ফিরে আসার পর আমার উচিত ছিলো তোমার সাথে যোগাযোগ করা, কিন্তু এটা স্ট্যাবলিশ করতে গিয়ে এতো ব্যস্ত হয়ে পড়লাম…” সে তার নতুন অফিসটির দিকে ইঙ্গিত করলো।
“আমি কিন্তু আশা করিনি তুমি আমাকে খুঁজে বের করবে…দেখা করবে,” অবশেষে বললাম। “তাছাড়া দেশে ফিরে এসেছো খুব বেশিদিন হয়নি। কতো দিন হলো? তিন মাস?”
“উমম…প্রায় চারমাস।”
মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “তুমি অবশ্য চেষ্টা করলেও আমাকে খুঁজে পেতে কি-না সন্দেহ।
ভুরু আর চোখজোড়া কেমন তরঙ্গায়িত করে বলে উঠলো সে। “কেন, তোমার পাবলিশারের কাছ থেকে অ্যাড্রেস আর কন্ট্যাক্ট নাম্বার কালেক্ট করতাম?”
বুঝতে পারলাম, কথা না-বলে তার দিকে চেয়ে আছি। সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে ফিরে পাবার চেষ্টা করলাম। “সে তোমাকে ওসব দিতো না।”
“কেন?”
“আমার নিষেধ আছে।” এবার বোকার মতো হেসে ফেললাম। “আমি একটু একা থাকতে পছন্দ করি, লোকজন-হৈ-হল্লা ভালো লাগে না।”
নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো। কোনো কথা বলতে গিয়ে সঙ্কোচে ভুগছে। গভীর করে দম নিয়ে বললো সে, “বিয়ে করোনি কেন?” তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো এজন্যে নিজেকে দায়ি মনে করছে।
কাঁধ তুললাম। “জানি না।” যদিও খুব বলতে ইচ্ছে করছিলো, তোমার মতো কাউকে পাইনি বলে!
“গুণমুগ্ধ ফিমেল-ফ্যানদের সাথে প্রেমও করো নি?” মুখ টিপে রহস্য করে বললো সে। “শুনেছি, লেখকদের সাথে ফিমেল ফ্যানদের প্রেম-ট্রেম হয়ে থাকে।”
মুচকি হাসলাম। “কী জানি। আমার সাথে তো সে-রকম কিছু হয়নি।”
“নাকি বলতে চাইছো না?”
“কয়েকজনের সাথে বেশ কথা-টথা হতো। তবে প্রেম?” মাথা দোলালাম। “না, সে-রকম কিছু হয়নি।”
“এখন হয় না?”
“কি?”
“কথা-টথা?”
কপাল চুলকে আত্মসমপর্ণের ভঙ্গি করলাম। “হয়… দুয়েকজনের সাথে…মাঝেমধ্যে।”
“থাক, এসব তোমাদের লেখক-ভক্তের সিক্রেট ব্যাপার, আমাকে বলতে হবে না।”
“বাঁচালে।”
হা-হা-হা করে হেসে উঠলো রামজিয়া শেরিন।
“আমি যে বিয়ে করিনি এটা কি তুমি ওখানে থাকতেই জেনেছিলে?” প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করলাম।
মাথা নেড়ে জবাব দিলো সে। “না। দেশে আসার পর জেনেছি আমাদের অফিসের এক ছেলের কাছ থেকে। ও তোমার বই পড়ে। ওয়ান অব ইউর ডাই-হার্ড ফ্যান্স।”
“ও।” সম্ভবত এই ছেলেটার সাথেই একটু আগে নীচে দেখা হয়েছিলো। কয়েক মুহূর্ত কেটে গেলো অযাচিত নীরবতায়। সম্ভবত আমাদের দু- জনের বলার মতো আর কোনো কথা নেই কিংবা অনেক বেশি কথা জমে আছে দীর্ঘদিন থেকে, সেগুলো বের হতে গিয়ে হুড়োহুড়ি করছে, এক ধরণের জট লেগে গেছে। পানিভর্তি বোতলের খোলামুখ আচমকা নীচু করে ধরলে যেমনটি হয়।
“তোমার হাতে ওটা কি?”
তার প্রশ্নে নীরবতা ভাঙলো। হঠাৎ করেই আবিষ্কার করলাম এখানে আসার আসল কারণটি। “ও, এটা…একটা বই।”
“কার, তোমার?” আগ্রহি হয়ে উঠলো সে, অনেকটা চপলা কিশোরির মতো।
“হুম।”
“আমার জন্যে এনেছো?”
মাথা নেড়ে সায় দিলাম
“ওয়াও।”
খুশি এবং বিস্ময় দুটোই দেখা গেলো তার চোখেমুখে, তবে আমার মনে হলো না এর মধ্যে কোন কৃত্রিমতা আছে।
“নতুন বই?”
“হুম।” ঢোক গিললাম আমি। বুঝতে পারলাম না কী বলবো। “এটা এখনও প্রকাশিত হয়নি।”
“তুমি তোমার আনপাবলিশ বই নিয়ে এসেছো আমার জন্য?”
আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিলাম।
“ওয়াও…গ্রেট!”
“সত্যি বলতে বইটা তোমাকে গিফট করার জন্য আনিনি।”
তার চোখেমুখে কৌতুহল। “সরি টু সে…আই ডিডেন্ট গেট ইট… বুঝতে পারছি না?”
আর কোনো কথা না বলে চামড়ার ব্যাগ থেকে পাণ্ডুলিপিটা বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। প্রচণ্ড আগ্রহ আর বিস্ময় তাকে যেন জমিয়ে দিয়েছে। আস্তে করে হাত বাড়িয়ে পাণ্ডুলিপিটা তুলে নিলো।
আমি লেখক মানুষ, লিখে অনেক কিছুই বলতে পারি কিন্তু কথায় তেমন পারদর্শি নই। আমার সামনে যে বসে আছে তাকে মানুষটিকে অতো কিছু ব্যাখ্যা করার চেয়ে লেখাটা দেখিয়ে দেয়াই ভালো।
কয়েক মুহূর্ত এ-ফোর সাইজের কাগজের স্তুপটা হাতে ধরে প্রথম পৃষ্ঠায় চোখ বুলিয়ে নিলো তারপর ডেস্কের উপর ওটা রেখে গলায় ঝুলিয়ে রাখা রিডিংগ্লাসটা আবারো চাপালো নাকের উপরে। বইটির শিরোনাম পড়ে গেলো বেশ কিছুক্ষণ ধরে। “কেউ কথা রাখে নি?!” অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলো সে। রিডিংগ্লাসের উপর দিয়ে আহত দৃষ্টিতে তাকালো আমার দিকে। যেন বইয়ের শিরোনামটি তাকে সারসরি অভিযুক্ত করছে!
আমি কিছু বলছি না দেখে আবারও নজর দিলো পাণ্ডুলিপির দিকে। আলতো করে প্রথম পৃষ্ঠাটি উল্টে দিলো। আমি দেখলাম তার কাজল দেয়া চোখের মণি দুটো নড়াচড়া করছে দ্রুত। কয়েক মুহূর্ত পর রিডিংগ্লাসের উপর দিয়ে আমার দিকে তাকালো। আমি কিছুই বললাম না। বুঝতে পারছি তার মনে কি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।
“এটা কি…মিলির খুনটা নিয়ে?”
