কেউ কেউ কথা রাখে – ৩৬

অধ্যায় ৩৬

সময় সব কিছু বদলে দেয়। দুই যুগ মহাকালের গর্ভে তুচ্ছ হলেও একজন মানুষের জীবনে বিরাট একটি অংশ। এই সময়ের মধ্যে কতো উত্থান-পতন ঘটে যায়, কতো কিছুর আগমণ ঘটে। আবার অনেক কিছুই যায় হারিয়ে।

আমি মিনহাজের মুখটা কল্পনা করলাম। অমায়িক আর সজ্জন একজন মানুষ। চেহারার মধ্যে নিরীহ একটি ভাব আছে। অন্তত দুই যুগ আগে তা-ই ছিলো। কিন্তু এখন, আজ এতগুলো বছর পর তার চেহারায় নিশ্চয় অনেক পরিবর্তন হয়েছে। সেই বিষন্ন চোখজোড়া, রেগে গেলে নীচের ঠোঁটের মৃদু কাঁপন, কপালের উপর হামলে পড়া চুলের গোছা, মার্জিত ভঙ্গি-সব কি অটুট আছে? নাকি সময়ের চাবুক পড়ে বদলে গেছে!

দীর্ঘ বাসযাত্রায় এসব ভাবছিলাম আমি। বিরাশি সালের দিকে একবার কী একটা কাজে ঢাকায় এসেছিলাম। তখন মিনহাজের ব্যাঙ্কে গেছিলাম দেখা করার জন্য। তার পুরনো কলিগদের কেউই সেখানে ছিলো না। নতুন যারা ছিলো তারা আমাকে বলতে পারেনি মিনহাজ কোথায় বদলি হয়ে গেছে, কিংবা আদৌ চাকরি করে কি-না। ব্যাঙ্কের এক পুরনো পিয়ন শুধু বলতে পারলো, পঁচাত্তরের শেষের দিকেই মিনহাজ ঢাকার বাইরে বদলি হয়ে গেছিলো। এরপর তার কোন খোঁজ সে জানে না। নব্বইর আগে দিয়ে লেখালেখির কারণে আবারো ঢাকায় ফিরে আসার পর থেকে আজ পর্যন্ত মিনহাজের কোন খবর আমি জানতে পারিনি। যেন দুনিয়ার বুক থেকে উধাও হয়ে গেছে সে। ঠিক ইমতিয়াজের মতোই!

আজ দুই যুগ পর নিভৃত এক গ্রামে বসবাস করা মিনহাজের সাথে দেখা করতে যাচ্ছি।

গতকাল সকালে আমার ঘুম ভেঙেছিলো রামজিয়ার ফোনকলে। রাত জেগে একটু লেখার চেষ্টা করেছিলাম, তাই সকাল নটা পর্যন্ত ঘুমিয়েছিলাম আমি। সে- ই আমাকে জানালো মিনহাজের ঠিকানা জোগাড় করা গেছে। ও কোনো ফোন ব্যবহার করে না। আত্মীয়-স্বজনদের সাথেও খুব একটা যোগাযোগ রাখে না। নিজগ্রামের কাছাকাছি একটি মফশ্বল শহরে তার ব্যাঙ্কের একটি শাখায় বদলি হয়ে চলে গেছিলো। বাপ-দাদার বিশাল ভিটেয় থাকে এখন

লেখাটা দ্রুত শেষ করার তাগিদ অনুভব করছিলাম আমি, সেই সাথে মিনহাজের সঙ্গে দেখা করার জন্যও মুখিয়ে ছিলাম, তাই দেরি না করে পরদিন সকাল সকাল রওনা হয়ে যাই অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপিটার একটি কপি নিয়ে।

বাসের জানালা দিয়ে দূরের ধানক্ষেত আর গুচ্ছ গুচ্ছ গ্রামগুলোর দিকে উদাস হয়ে চেয়ে থেকে ভাবলাম, আজ এতদিন পর আমাকে দেখে মিনহাজ চিনতে পারবে তো? আমার ধারণা, পারবে না। তবে পরিচয় দিলে অবশ্যই মনে পড়ে যাবে, দুই যুগ আগে আমার মতো এক অক্ষম পুলিশ অফিসারের সাথে তার অল্প-বিস্তর পরিচয় ছিলো।

কয়েক ঘণ্টার ক্লান্তিকর বাসযাত্রার অবসান হলো দুপুরের পর পরই। চামড়ার ব্যাগটা নিয়ে পা বাড়ালাম মিনহাজের পৈতৃক ভিটার দিকে। বাসস্টেশনেই এক লোককে ঠিকানাটা দেখালে সে বলে দিলো কিভাবে যেতে হবে ওখানে। রিক্সায় করে গেলে পনেরো মিনিটের মতো পথ।

আমি একটা রিক্সা নিয়ে রওনা হয়ে গেলাম। সাপের মতো এঁকেবকে কাঁচা-পাকা রাস্তা মাড়িয়ে ঢুকে পড়লাম বিশুদ্ধ এক গ্রামে। বিশাল একটি কাঠবাদাম গাছের সামনে এসে রিক্সাওয়ালা হাত তুলে দেখিয়ে দিলো উঁচু বেড়া আর কাঠের গেটের একটি বাড়ির দিকে। স্থানীয়রা একে খামারবাড়ি বলেই ডাকে।

বাড়ির সামনে বিশাল একটি পুকুর। দেখেই বোঝা যায় মাছচাষ করা হয়। পুকুরের চারপাশে বড় বড় গাছ আর আগাছায় পরিপূর্ণ একটি জায়গা। দু-পাশে ছোটোবড় ডোবায় কচুরিপানায় ভরে উঠেছে। প্রায় জঙ্গলের মতো রুপ নিয়েছে যেন পুরো জায়গাটি। সেই জঙ্গলময় জায়গার ভেতর দিয়ে সরু একটা রাস্তা চলে গেছে। একদম নিরিবিলি আর সুনসান। দেখে মনে হয় না কোন মানুষ থাকে এখানে। আমি সেই সরুপথ দিয়ে এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম পুরনো দিনের তৈরি ছোটোখাটো একটি একতলা বাড়ি। এমন বাড়ি গ্রামে প্রায়ই দেখা যায়। তিন-চারটা ঘর হবে। সামনে টানা বারান্দা। একটা পুরনো চেয়ার আর আরামকেদারা আছে সেখানে। আরো আছে আগাছা সাফ করার কাস্তে, নিড়ানি, কোদাল আর দড়ি। বামদিকের ঝোঁপের সামনে বিভিন্ন সাইজের কিছু বাঁশ স্তুপ করে রাখা।

বাড়ির সামনে এক চিলতে ফাঁকা জায়গা আগাছায় পরিপূর্ণ। বোঝা গেলো খুব বেশি মানুষজন এখানে যাতায়াত করে না। বাড়ির ডানদিকে একটি মেঠোপথ চলে গেছে। আর বামদিকটা ঝোঁপঝাঁড়ে পরিপূর্ণ। নাকে টের পেলাম অতিপরিচিত সেই গন্ধটা।

গরু। গোবর।

দূর থেকে একটা হাম্বা ডাক ভেসে এলে বুঝতে পারলাম বাড়ির পেছনে গো-খামার আছে। সেজন্যেই এলাকার লোকজন এটাকে খামারবাড়ি বলে ডাকে।

বাড়ির সামনে গিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। ঘরের দরজাগুলো খোলা থাকলেও ভেতরে কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না।

“কেউ কি আছেন?” কিছুক্ষণ পর ডেকে উঠলাম আমি। কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে আবারো ডালাম। “কেউ আছেন?”

একটু পর শুকনো ঘাসে পা মাড়ানোর শব্দ শুনতে পেলাম। বাড়িটার ডানদিকে যে মেঠোপথ চলে গেছে সেখানে দেখলাম ভারি কাঁচের চমশা চোখে এক লোক দাঁড়িয়ে আছে খাবারের ট্রে হাতে নিয়ে। মাথার চুল পাতলা আর সাদা। একটু কুঁজোও মনে হলো। পাজামা আর ফতুয়া গায়ে। বেশ পরিপাটি।

আমার দিকে ভুরু কুচকে তাকালো ভদ্রলোক। আমি দুয়েক পা এগিয়ে গেলাম তার দিকে।

“মিনহাজসাহেব…?”

“আ-আপনি…কে?” আমার প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বেশ সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালো সে।

চশমার আড়ালে থাকা চোখদুটো চিনতে আমার বেগ পেতে হলো না। “কোত্থেকে এসেছেন?” তার কণ্ঠ আগের তুলনায় ভারি। তাতে মিশে আছে উদ্বেগ।

“অনেক দিন আগের কথা… চিনতে না পারটাই স্বাভাবিক,” মুচকি হেসে বললাম, “মিনহাজসাহেব…আমি আজিমপুর থানার এএসআই-”

“ও,” আমার কথা শেষ হবার আগেই বিস্ময়ে বলে উঠলো সে, “আপনি?!” যেন আকাশ থেকে পড়লো। চোখেমুখে বিস্ময় তার। “আমি আপনাকে দেখে চিনতেই পারিনি।”

“সেটাই স্বাভাবিক,” হেসে বললাম আমি, “কতো দিন পর দেখা হলো।” প্রসন্নভাবে হেসে মাথা নেড়ে সায় দিলো সে।

দুই যুগ পর আমার মতো স্বল্পপরিচিত একজন মানুষ বলা নেই কওয়া নেই হুট করে তার বাড়িতে হাজির হয়েছি সুতরাং তার দিক থেকে অবাক হবার যথেষ্ট কারণ আছে।

হাতের ট্রে-টা বারান্দায় রাখা একটা চেয়ারের উপর রেখে আমার দিকে এগিয়ে এলো। জোর করে সৌজন্যমূলক হাসি দেবার চেষ্টা করলো একটু।

তাতে অবশ্য আমার আগমণে যে পুরোপুরি খুশি হতে পারেনি সেটা ঢাকা পড়ে গেলো না।

“এতদিন পর…” বললো মিনহাজ, “কি মনে করে?” তারপর আমি কিছু বলার আগেই হাতটা বাড়িয়ে দিলো।

করমর্দন করলাম তার সাথে। “কেমন আছেন?”

হাসিটা মিইয়ে গেলো তার, স্থিরচোখে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত আমার দিকে। “এই তো, চলে যাচ্ছে।” একটু থেমে আবার বললো, “আপনার কি খবর? রিটায়ার করেছেন?”

মাথা দোলালাম আমি। “অনেকদিন আগেই পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়েছি।”

“তাই নাকি?”

“আপনি ঢাকা ছাড়ার আগে,” একটু থেমে আবার বললাম, “পঁচাত্তর সালেই।”

মিনহাজের কপালে ভাঁজ পড়লো। “তখনই? মানে, আপনার ঐ কলিগ…কী যেন নাম?”

“এসএম হায়দার।”

“হ্যা, হ্যা। ঐ ভদ্রলোক মারা যাবার পর?”

মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

“আমার এখানে?…কী মনে করে?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইলো মিনহাজ। “একটা দরকারে এসেছি,” বললাম তাকে।

সৌজন্যতার খাতিরেই যেন আমাকে ঘরে আসতে বললো সে। আমি তার পেছন পেছন ঢুকে পড়লাম। ঘরে ঢুকেই মিনহাজ একটা বড় জানালার পর্দা টেনে দিলো। ওটা দিয়ে বাড়ির পেছনে থাকা বিশাল খামারটা দেখা যায়। তারপর আমাকে বসার ইশারা করলো সে। আমি সোফায় বসে পড়লে মিনহাজ আমার বিপরীতে একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো।”

এক সেট পুরনো আমলের সোফা, ময়লা আর তেল চিটচিটে হয়ে গেছে, পড়ার টেবিল, দুটো চেয়ার, একটা বুকসেল্ফ আর আলমিরা ছাড়া ঘরটা বলতে গেলে ফাঁকা। বুকশেলফে অনেক বই। বেশিরভাগই মেডিকেলের। আমি জানতাম, মিনহাজ এখানে হোমিওপ্যাথি প্র্যাকটিস করে। তাছাড়া, খামার করে সে-গবাদিপশুর রোগ-বালাই সম্পর্কেও তাকে সচেতন থাকতে হয়। তবে বইগুলোর দিকে মনোযোগ দেবার আগেই আমার চোখ আটকে গেলো একটা ছবিতে।

সেই চোখ! সেই মায়াভরা মুখ!

দুই যুগ আগে মিনহাজের ঘরে মিলির এই ছবিটাই আমি দেখেছিলাম।

“দুপুরের খাবার খেয়েছেন?”

মিনহাজের কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে তাকালাম। “হ্যা” মিথ্যেটা অবলীলায় বলে দিলাম তাকে।

“তাহলে চা বানাই?”

“আরে না, তার কোন দরকার নেই,” বললাম তাকে। সত্যি হলো চা সিগারেট দুটোই খাওয়ার তেষ্টা পেয়ে বসেছে।

“সিগারেটের অভ্যাস এখনও আছে?”

মুচকি হেসে মাথা দোলালাম।

“আমি অবশ্য ছেড়ে দিয়েছি…শরীরে আর কুলোয় না।” একটু থেমে আবার বললো, “আপনি কিন্তু সিগারেট খেতে পারেন, কোন সমস্যা নেই।”

“এখন খেতে ইচ্ছে করছে না.” আবারো মিথ্যে বললাম। ঘরের চারপাশটা দেখে জিজ্ঞেস করলাম, “মনে হচ্ছে একাই থাকেন?”

মলিন হাসি দিলো সে। “সঙ্গি পাবো কোথায়?”

“কেন, আর বিয়ে করেন নি?”

মাথা দুলিয়ে জবাব দিলো। “সংসার করার ইচ্ছে আর হয়নি।”

কথাটা শুনে একটু অবাকই হলাম। যারা বিয়ে করে সুখি হয় তারা স্ত্রী বিয়োগ হবার পর খুব বেশি দিন একা থাকতে পারে না। আবার বিয়ে করে বসে। কারণ, দ্বৈতজীবনে যে সুখি হওয়া যায় সে অভিজ্ঞতা তার আছে। আর যে মানুষটি বৈবাহিক জীবনে অসুখি, সে স্ত্রী বিয়োগের পর আর ও পথে পা বাড়ায় না। দ্বিতীয়বার অসুখি হবার ঝুঁকি নিতে চায় না সে।

তাহলে কি মিনহাজও সে-রকম অসুখি ছিলো?

অসম্ভব। এটা আমার বিশ্বাস করতেও কষ্ট হলো। মিলির প্রতি ওর যে প্রেম আর ভালোবাসা আমি দেখেছি সেটা অতুলনীয়। ঈর্ষনীয়। অসুখি হলে এত ভালোবাসা জন্মালো কী করে?

“আপনার কি খবর? বাচ্চা-কাচ্চা ক-জন?”

বিব্রতকর হাসি দিয়ে মাথা দোলালাম আমি। দীর্ঘদিন পর দেখা হলে

আমার পরিচিত সবাই এই প্রশ্নটা করে। “বিয়ে করিনি।”

অবাক হলো মিনহাজ। “বলেন কি!”

আমি কিছু না বলে নিঃশব্দে হাসি দিলাম শুধু।

কয়েক মুহূর্ত পর মিনহাজ বললো, “আমি যে এখানে থাকি সেটা কিভাবে জানলেন?”

মিনহাজের অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো, তার গোপন আস্তানার খবরটা চাউর হওয়ায় একটু হতাশ হয়েছে সে।

“রামজিয়ার কাছ থেকে।” ছোট্ট করে বললাম।

তার কপালে ভাঁজ পড়লো। “ও কি দেশে…?”

“হ্যা। তিন-চারমাস হয় এসেছে, আর বোধহয় ফিরে যাবে না।”

“কিন্তু ও তো আমার এখানকার ঠিকানা জানে না।” আবারো সন্দিগ্ধ দেখালো মিনহাজকে।

“আমি যখন বললাম আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই তখন আপনার কোন এক রিলেটিভের সাথে যোগাযোগ করে এখানকার ঠিকানাটা জোগাড় করে দিয়েছে।”

আমি দেখতে পেলাম মিনহাজের চেহারায় অজ্ঞাত এক ভয় জেঁকে বসেছে। কেমন চিন্তিত দেখাচ্ছে তাকে। ভেবে পেলাম না, তার এমন আচরণের কারণ কি।

“আ-আপনি আমার সাথে দেখা করতে চাইছেন কেন?”

“একটা কাজে…” কথাটা বলেই চামড়ার ব্যাগের ভেতর থেকে পাণ্ডুলিপিটা বের করে আনলাম।

“কি এটা?” তার চোখেমুখে যতো না কৌতুহল তার চেয়ে বেশি উদ্বেগ।

“আমার লেখা,” বলেই পাণ্ডুলিপিটা তার দিকে বাড়িয়ে দিলাম। “পুলিশের চাকরি ছাড়ার পর আমি লেখালেখি করতে শুরু করি।”

“তাই নাকি?”

ভালো করেই জানি অবাক হয়েছে। পুলিশ থেকে লেখক-এর চেয়ে বেমানান আর কী হয় এ দেশে! “

“তেমন সিরিয়াস কিছু না, গল্প-উপন্যাস লিখি… গাল-গল্প বলতে পারেন, বলেই হেসে ফেললাম।

“কি ধরণের গল্প, রোমান্টিক?” আমার পাণ্ডুলিপিটা হাতে নিয়ে বললো সে। মুচকি হেসে মাথা দোলালাম। সম্ভবত শিরোনামটা দেখে তার এমন ধারণা করেছে : কেউ কথা রাখেনি।

“না। মার্ডার মিস্ট্রি। ক্রাইম-ফিকশন…খুন-খারাবির গল্প।” কথাটা বলার পরই বুঝতে পারলাম খুন-খারাবি শব্দটা ব্যবহার না করলেই ভালো হতো। অন্তত যে মানুষটার জীবন একটা খুনের কারণে এলোমেলো হয়ে গেছে তার সামনে এটার ব্যবহার সব সময়ই অপ্রীতিকর স্মৃতি জাগিয়ে তুলবে নিশ্চয়।

মিনহাজের চেহারা দেখে মনে হলো না আমার লেখালেখি নিয়ে তার কোন আগ্রহ আছে। “আপনি বলছিলেন, একটা কাজে এসেছেন আমার কাছে?” মনে করিয়ে দিলো সে।

মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “হ্যা। এই বইটার ব্যাপারে আর কি।” একটু থেমে কথাগুলো গুছিয়ে নিলাম। “এটা মিলির ঘটনাটা নিয়ে।”

মিনহাজ আমার দিকে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত।

“আমার মনে হলো, যেহেতু এটা মিলিকে নিয়ে, আপনিও আছেন এখানে, তাই আপনার কাছ থেকে মৌখিকভাবে অনুমতি নেয়া উচিত। অন্তত প্ৰকাশ করার আগে জানা দরকার কোন বিষয়ে আপনার আপত্তি আছে কি-না।”

সন্দেহের সুরে বললো মিনহাজ, “শুধু এজন্যে আমাকে খুঁজে বের করে এখানে চলে এসেছেন?”

গভীর করে নিঃশ্বাস নিয়ে নিলাম আমি। মিথ্যে বলে প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার চিন্তা বাদ দিলাম। “না। আরেকটা কারণও আছে।”

“কি?” মিনহাজকে আবারো সন্দিগ্ধ দেখালো।

“আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে, আপনি আসলে কেন ঢাকা ছাড়লেন।”

“আপনার কি মনে হয়?” মিনহাজ পাল্টা জানতে চাইলো।

সমস্ত দ্বিধা ঝেড়ে বলেই ফেললাম, “ইমতিয়াজের কারণে।”

আমার দিকে চেয়ে মুচকি হাসি দিলো সে। হাসিটার অর্থ আমি বুঝতে পারলাম না।

“সে হয়তো আপনার কোন ক্ষতি করতে পারে এই ভয়ে ঢাকা ছেড়েছেন। হায়দারভায়ের খুন হবার খবরটা শোনার পর সম্ভবত আপনি এমন ভয় পেতে শুরু করেন।”

মাথা দোলালো মিনহাজ। “আমি ইমতিয়াজকে মোটেও ভয় পেতাম না। একটুও না।”

“তাহলে?”

কাঁধ তুললো সে। “আপনি তো সাহিত্যিক, আপনার মতো গুছিয়ে বলতে পারবো না। সত্যি বলতে, ঢাকা শহরে থাকতে ইচ্ছে করছিলো না। শহরটার উপরেই আমার অভিমান জন্মে গেছিলো। কেন, সেটা নিশ্চয় আপনি আন্দাজ করে নিতে পারছেন।”

আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

“একটু নিরিবিলি থাকতে চেয়েছিলাম। এরকম শান্ত আর নিরিবিলি গ্রামিন পরিবেশে।” আমাকে চুপ থাকতে দেখে আবারো বলতে শুরু করলো, “এটা আমার পৈতৃক বাড়ি। থাকার মতো কেউ ছিলো না বলে খালিই পড়ে ছিলো। ঐ ঘটনার পর ভাবলাম, বাকি জীবনটা এখানেই কাটিয়ে দেই।”

আমি চুপ মেরে রইলাম।

“তাছাড়া এখান থেকে খুব কাছেই, টাউনে আমার ব্যাঙ্কের একটি ব্র্যাঞ্চ আছে। কোন ভালো অফিসার বদলি হয়ে এখানে আসতে চাইতো না। প্রমোশনের লোভ দেখালেও না। তো, আমি সুযোগটা নিয়ে নিলাম। এক ঢিলে দুই পাখি মারলাম আর কি।” একটু থেমে আবার বললো সে, “প্রমোশনও পেলাম, সেইসাথে যেটা চাচ্ছিলাম সেটাও পেয়ে গেলাম।” কথাটা শেষ করে মুখে হাসি ধরে রাখলো মিনহাজ। সেই হাসি একদম কৃত্রিম।

আমি তার এরকম হাসির কারণটা ধরতে না পারলেও এটা বুঝতে পারছিলাম, আমার মতোনই ঢাকা শহরে দম বন্ধ হয়ে পড়ছিলো মিনহাজ। তাকে আর সে-কথা বললাম না আমিও তার মতোই ঢাকা ছেড়েছিলাম।

“আপনি কি জানেন, ইমতিয়াজের কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি?”

আমার মনে হলো কথাটা শুনে একটু চমকে উঠলো সে। “তাই নাকি?”

“হুম।”

বাঁকাহাসি দিলো এবার। “এরকম জঘন্য লোকজন সব সময়ই পার পেয়ে যায়। হয়তো বিদেশে চলে গেছে। বিয়েশাদি করে সংসারি হয়েছে।”

“আমারও সে-রকম মনে হয় মাঝেমাঝে,” একমত পোষণ করে বললাম। “বছরখানেক ধরে ওকে আমি খুঁজে বেরিয়েছি…আশ্চর্যের ব্যাপার কি জানেন, কেউ তার খোঁজ জানে না। এমন কি সে বিদেশে গেছে কি-না তা-ও জানে না।”

মিনহাজ কৌতূহলভরে চেয়ে রইলো আমার দিকে।

“অনেক খোঁজাখুঁজি করে ওর এক বোনকে খুঁজে পেয়েছিলাম…ওই মহিলাও ইমতিয়াজের কোন খবর জানে না।”

“কে জানে, হয়তো মারা গেছে।”

মিনহাজের কথার সাথে আবারো সায় দিলাম আমি। “তা হতে পারে। কিন্তু কিভাবে মারা গেলো, কবে মারা গেলো সেটাও কেউ জানবে না, ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত না?”

“অদ্ভুত কেন হবে,” বললো মিনহাজ, “ওর মতো লোকজন যেকোন সময় বেঘোরে মরতেই পারে।”

কথাটায় যুক্তি আছে। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের পর পর ইমতিয়াজ নিশ্চয় ঢাকা ছেড়েছিলো কিংবা আত্মগোপনে চলে গেছিলো। সেই সম্ভাবনাই বেশি। তখনই হয়তো কোনভাবে মারা পড়েছে সে।

“দুই যুগ পার হয়ে গেছে, অনেক কিছুই বদলে গেছে। এখন এসব নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী লাভ।”

মিনহাজের কথায় স্থিরচেখে চেয়ে রইলাম আমি। “কিন্তু আপনি নিশ্চয় ভুলতে পারেন নি?”

আবারো মুচকি হাসলো সে। “আমি আমার কথা বলছি না।”

সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম তার দিকে।

“আপনার কথা বলছি।” আক্ষেপে মাথা দোলালো মিনহাজ। “আমি নিজেই ইমতিয়াজের কী হলো না হলো সে-সব নিয়ে মাথা ঘামানো বাদ দিয়ে দিয়েছি, আপনারও সেটা করা উচিত। এত বছর পর এসব জেনে আপনি কী করবেন? ইমতিয়াজ যদি বেঁচে থাকে তাহলেই বা কি করবেন, বলেন?”

“আপনি রাজি থাকলে কেসটা আবার রি-ওপেন করা কিন্তু সম্ভব।”

আমার দিকে বিস্ময়ে চেয়ে রইলো মিনহাজ। “আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে? এত বছর পর এরকম কোন কেস নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে?” আক্ষেপে মাথা দোলালো। “আসামিরই তো কোন খবর নেই।”

“কেসটা রি-ওপেন করা হলে পুলিশ খুঁজে বের করতে পারবে ইমতিয়াজ বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে। বেঁচে থাকলে কোথায়-”

হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিলো মিনহাজ। “প্লিজ। এসব কথা আমাকে বলবেন না। এত বছর পর আমি এসব নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে চাই না। যা হবার তা হয়ে গেছে।”

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললাম, “আমি চাই মিলির স্মৃতিটা বেঁচে থাক। ওর সাথে যা হয়েছে-”

“মিলির স্মৃতি একান্তই আমার ব্যক্তিগত একটি বিষয়।” আমার কথার মাঝখানে আবারো বাধা দিয়ে বলে উঠলো মিনহাজ। “ওটা আমৃত্যু আমার সাথে থাকবে।”

“আপনি চান না আমি বইটা প্রকাশ করি?” উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইলাম।

“আমার মনে হয়, এর কোন দরকার নেই,” দৃঢ়ভাবে বললো সে। “দুই যুগ আগের ক্ষত এতদিনে মুছে না গেলেও শুকিয়ে গেছে। আপনি সেটাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আবার জাগাতে চাইছেন কেন?”

হতাশ হয়ে চেয়ে রইলাম আমি। কী বলবো বুঝতে পারলাম না।

“এসব বাদ দিন, অন্য কোন গল্প লিখুন। সেটাই ভালো হয়।” একটু থেমে আবার বললো তবে অনেকটা বিড়বিড় করে, “আমাদের দু-জনের জন্যই।”

আমার মুখ দিয়ে কোন কথা বের হলো না। যদিও এরকম পরিস্থিতির জন্য আমি মনে মনে প্রস্তত ছিলাম, ভেবে রেখেছিলাম, মিনহাজ রাজি না হলে গল্পটার চরিত্রগুলোর নাম পাল্টে দেবো।

“‘কেউ কথা রাখেনি’ মানে কি?” জানতে চাইলো আমার কাছে। “কে কথা রাখেনি?” তার কণ্ঠে অসন্তোষ।

মিনহাজের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে বইয়ের শিরোনামটি যেন সরাসরি তাকে উদ্দেশ্য করেই দিয়েছি!

আমি ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলাম, “আপাতত একটা নাম দেবার দরকার তাই দিয়েছি। এটাই যে শেষ পর্যন্ত থাকবে তা কিন্তু নয়।”

মনে হলো বইয়ের শিরোনাম নিয়েও তার খুব একটা আগ্রহ নেই আর। পাণ্ডুলিপিটা ফিরিয়ে দিলো আমাকে। “এসব পড়ার কোন ইচ্ছে নেই। আমি যেটা ভুলে যেতে চাই, আপনি সেটা মনে করিয়ে দিতে চাচ্ছেন।

আমি লেখক মানুষ, প্রত্যাখান আমার কাছে অভিনব কিছু নয়। প্রকাশকের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়াটা নতুন লেখকের জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। আর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে যে প্রত্যাখ্যান পর্বের সমাপ্তি ঘটে তা-ও নয়। তখন আবার পাঠকের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হবার সম্ভাবনা তৈরি হয় প্রতিটি লেখা প্রকাশের পর পর। কিন্তু মিনহাজের কাছ থেকে বিমুখ হয়ে মুষড়ে পড়লাম। আমি চেয়েছিলাম মিলির ঘটনাটা যেহেতু সত্যি, তাই সেটা সাহিত্যের মধ্য দিয়ে হলেও বেঁচে থাকুক।

আমি আমার পাণ্ডুলিপিটা ব্যাগে ভরে উঠে দাঁড়ালাম।

“সরি,” মিনহাজও উঠে দাঁড়ালো। “আশা করি কিছু মনে করেননি।”

“না, ঠিক আছে,” ভদ্রতা দেখিয়ে বললাম তাকে। দরজা দিয়ে বের হতেই আমার মনে হলো একটা কথা মিনহাজকে না বললে অনুচিত হবে। ঘুরে দাঁড়ালাম আমি। “আপনার নাম, মিলির নাম… সব নাম বদলে দিয়ে যদি বইটা প্রকাশ করি তাহলে নিশ্চয় কোন আপত্তি থাকবে না?”

আমার এ কথা শুনে মিনহাজ একটু ভেবে নিলো। নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো সে।

“আসলে মিলির খুনটা আমি ভুলতে পারিনি আজো। এত বছর পরও আমি এসব নিয়ে ভাবি। এই একটা ঘটনা আপনার, আমার অনেকের জীবনই পাল্টে দিয়েছে। এটা আপনার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার নয়, মিনহাজসাহেব। এই ঘটনায় হায়দারভায়ের মতো মানুষও খুন হয়েছেন। এরকম একটি ঘটনা না লিখে আমি থাকতে পারিনি,” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অবশেষে বলে ফেললাম, “এই বই আমি প্রকাশ করবোই। ইমতিয়াজকেও খুঁজে বের করবো। যতোক্ষণ না জানতে পারছি সে মারা গেছে। পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন।”

কথাটা বলেই পা বাড়ালাম সামনের দিকে।

“দাঁড়ান।”

আমাকে চমকে দিয়ে মিনহাজ বলে উঠলো পেছন থেকে। ঘুরে তাকালাম আমি। ঘরে ঢোকার জন্য ইশারা করলো সে।

“ভেতরে আসুন। আপনাকে একটা কথা বলার আছে আমার।”

সত্যি বলতে, কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিলো মিনহাজের ভাবভঙ্গি কেমনজানি রহস্যময়। একটা অজানা আশঙ্কাও জেঁকে বসলো আমার মধ্যে, তবে সেটা মাথা থেকে ঝেড়ে আমি আবার ঘরে ঢুকে পড়লাম। একটু আগে যেখানে বসেছিলাম সেখানেই বসলাম আমরা দু-জন।

মিনহাজ কপালের বামপাশটা ঘষলো হাত দিয়ে। “আপনার এবং হায়দারসাহেবের কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ। আপনারা মিলির হত্যাকারীকে ধরেছিলেন, অনেক বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে তাকে উপযুক্ত শাস্তি দেবার চেষ্টা করেছিলেন। এ কাজ করতে গিয়ে হায়দারসাহেব অকালে প্ৰাণ হারিয়েছেন। আপনার দুঃখটা আমি বুঝি। কিন্তু তার পরও আমি বলবো, এসব বাদ দিতে। ইমতিয়াজকে খুঁজে কোন লাভ নেই।”

আমি হতাশ আর বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। এ কথা বলার জন্য আবারো আমাকে ঘরে ডেকে এনেছে মিনহাজ?!

“কেন বলছি জানেন?”

আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম তার দিকে। “কারণ ইমতিয়াজ বেঁচে নেই!”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *