কেউ কেউ কথা রাখে – ২৩

অধ্যায় ২৩

বয়স বাড়ছে, স্মৃতি ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। কিছু কিছু ঘটনা চিরতরের জন্য মুছে গেছে আমার স্মৃতিভাণ্ডার থেকে। কিছু ঘটনা, ছবি অস্পষ্ট হয়ে উঠছে দিনকে দিন। এটা খুবই পীড়াদায়ক। বিশেষ করে আমার মতো পঞ্চাশ পেরোনো কোনো নিঃসঙ্গ মানুষের কাছে এটা যেন নিঃস্ব আর রিক্ত হয়ে ওঠার মতো একটি ব্যাপার।

এই বয়সে পুরনো স্মৃতিগুলোই একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠে। যেটা আপনি ভুলে গেছেন সেটা নিয়ে কোনো খেদ থাকবে না কিন্তু অস্পষ্ট স্মৃতির মতো বিভ্রান্তিকর কিছু নেই। এটা যেন অর্ধেক পড়া গল্পের মতো। কিংবা এমন একটা বই পড়ে আবিষ্কার করলেন যার শেষ কয়েকটি পৃষ্ঠা নেই। অথবা মাঝখানের কিছু পাতা ছেঁড়া, কিছু লাইন অস্পষ্ট।

তবে আমার প্রথম মদ্যপানের দু-দিন পরের ঘটনাটা স্পষ্ট মনে আছে এখনও। বিকেলের দিকে হায়দারভাইকে খুবই মনমরা হয়ে থাকতে দেখে ভেবেছিলাম ভাবির সাথে তার ঝগড়া পর্বটি বোধহয় দীর্ঘ হয়েছে।

“না রে ভাই,” কারণটা জিজ্ঞেস করলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিলেন তিনি, “ঝগড়া হয়নি।”

“তাহলে মুখটা এমন করে রেখেছেন কেন? ঘটনা কি?”

আমার মুখের দিকে তাকালেন এসএম হায়দার। “কালকে সিরাজ শিকদারকে পুলিশ গ্রেফতার করেছিলো, জানো তো?”

মাথা নেড়ে সায় দিলাম আমি। এটা আমাদের থানা কেন সারা দেশের মানুষ জেনে গেছে এতক্ষণে। কুখ্যাত বিখ্যাত যেভাবেই দেখা হোক না কেন, সিরাজ শিকদার আর তার সর্বহারা পার্টি তখন বেশ আলোচিত।

“একটু আগে খবর পেলাম ওরা ওকে মেরে ফেলেছে।”

“কি?” আমি বিশ্বাস করতে পারলাম না। “কারা মেরে ফেলেছে?”

“ওরা।”

ওরা বলতে হায়দারভাই যাদের দিকে ইঙ্গিত করছেন সেটা আমি ভালো করেই জানি। সত্যি বলতে দেশের মানুষের কাছে ‘ওরা’ বেশ ভালোভাবেই পরিচিত ছিলো। সরকারের লোকজন। আইনত বৈধ এবং রক্ষাকারী বাহিনী!

“এজন্যে আপনি এরকম মুখ ভার করে রেখেছেন?” আমি একদম নিশ্চিত ছিলাম এটাই একমাত্র কারণ নয়।

“এই ঘটনার পর শেখসাহেব পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে কী বলেছেন, জানো?”

“না,” ছোট্ট করে জবাব দিলাম আমি।” “কোথায় সেই সিরাজ শিকদার! “ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি।

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে আমি যুক্তি হাতরে বেড়ালাম। “দেখেন, শিকদারের পার্টি বঙ্গবন্ধুর দলের অনেককে খুন করেছে, সরকারকে অনেক ডিস্টার্ব করেছে, এটা নিশ্চয় আপনি অস্বীকার করবেন না?”

আমার কথা শুনে মাথা দোলালেন হায়দারভাই। “ব্রাদার, ব্যাপারটা তুমি এভাবে জাস্টিফাই কোরো না। লোকটার এইসব কর্মকাণ্ডের জন্য পুলিশ তো তাকে গ্রেফতার করেছিলোই, চাইলে খুব ভালোভাবেই তার বিচার করা যেতো, সেটা না করে এভাবে?” আক্ষেপে মাথা দোলালেন তিনি। “তাহলে কোর্ট-কাচারি রেখে কী লাভ? আমাদেরই বা কী দরকার? ওরা তো আছেই, ধরে ধরে নিয়ে আসবে আর ঠাস্ ঠাস্ বিচার করে করে দেবে!”

এ কথার বিরুদ্ধে কোনো যুক্তি খাটে না। হায়দারভায়ের দুরদৃষ্টি নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ ছিলো না।

“সিরাজ শিকদারকে যদি জেলে ভরে বিচার করতে শুরু করতো সরকার,” কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর আমি উপযুক্ত যুক্তি পেয়ে গেলাম, “তাহলে তার পার্টির লোকজন আরো অনেক বেশি খুন-খারাবি শুরু করে দিতো, গুরুত্বপূর্ণ কাউকে জিম্মিও করতে পারতো নেতাকে জেল থেকে ছাড়িয়ে নেবার জন্য, সে-কারণেই বোধহয়…”

আবারো মাথা দোলালেন এসএম হায়দার। “এটা তো তোমার আশঙ্কা…ভয়…তাই বলে কি তুমি এরকম কাজ করে ফেলবে? এভাবে যুক্তি দিয়ে সব ধরণের খুন-খারাবি আর অপরাধকেই জাস্টিফাই করা যাবে, ব্রাদার। এসব যুক্তিকে বহু আগে খনাবিবি সুন্দর করে বলে গেছে,” একটু থেমে আবার বললেন, “খলের ছলের অভাব হয় না।” টেবিলের উপর ঘুষি মেরে আবার বললেন তিনি, “এটা স্বাধীন দেশের জন্য মোটেও ঠিক হলো না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে কিচ্ছু হবে না। কোনো মন্ত্র আর তন্ত্র কাজ করবে না। সব মুখ থুবরে পড়বে। আমার শেখসাহেব যতো বড় নেতাই হয়ে থাকুক না কেন, তিনিও পারবেন না।”

“কী পারবেন না?” কথাটা আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলো। “তিনি যেটা চাইছেন সেটা করতে।”

কথাটা আমি মেনে নিতে পারলাম না। “এই সামান্য একটা ঘটনা থেকে আপনি এতো বড় কিছু বলতে পারেন না।”

“এই হলো সমস্যা,” বলে উঠলেন হায়দারভাই, “তোমরা ভাবো আলুর বস্তা ফুটো করে একটা আলু বের করে নিলে কী আর এমন ক্ষতি!” মাথা দোলালেন আবারো। যেন নাদান আর অবুঝদের মাঝে আছেন তিনি। “একটা আলু বের করে নেয়া মানে সব আলু বের করার রাস্তাটা তৈরি হয়ে গেলো। এটা বুঝতে হবে।”

আমি আর যুক্তি দিলাম না। দিলেও কাজ হবে না জানতাম।

আবারো ঐ সময়কার স্মৃতিগুলো হাতরাতে শুরু করলাম। বেশ বেগ পেতে হচ্ছে আমাকে। হল্ফ করে বলতে পারছি না যেটুকু মনে আছে সেটুকু ঠিক তখনকার ঘটনা নাকি তার আগের।

ঠিক এমন সময় আমার ফোনটা বেজে উঠলে যারপরনাই বিরক্ত হলাম। সাধারণত আমাকে কেউ সকালের দিকে ফোন করে না, আর যদি কেউ করে সেটা তপুই করবে। এই তপু হলো আমার প্রকাশক সালসাবিল আহমেদ। সমবয়সি বলে কাজ করতে করতে আমাদের বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে একদমই সময় লাগেনি।

স্মৃতি হাতরানো বাদ দিয়ে ফোনটা তুল নিলাম। রিডিংগ্লাস ছাড়া আমার আন-স্মার্ট ফোনের ছোট্ট ডিসপ্লেতে ভেসে ওঠা কলার আইডি পড়তে গিয়ে হিমশিম খেলাম। ফোনটা একটু দূরে নিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম আমি।

রামজিয়া!

সঙ্গে সঙ্গে কলটা রিসিভ করলাম। “হ্যালো?” আমার মুখে যে চওড়া হাসি ফুটে উঠলো সেটা ফোনের ওপাশে যে আছে সে দেখতে পাচ্ছে না, তারপরও কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিলো হাসিটা চেপে যাই।

“গুড মর্নিং…কখন উঠেছো? ব্রেকফাস্ট করেছো?”

“এই তো…একটু আগে করলাম। তুমি?”

“আমি আর্লি রাইজার। ছ-টার মধ্যে বিছানা ছাড়ি, তারপর হালকা ইয়োগা করে ব্রেকফাস্ট করে নেই। তুমি নিশ্চয় দেরি করে ওঠো?”

“ঠিক তা না। আসলে আমার কোনো রুটিন নেই। কখনও খুব সকালে উঠে পড়ি, আবার লিখতে লিখতে বেশি রাত হয়ে গেলে পরদিন দেরি করে উঠি।”

“লাস্ট নাইট কি লিখেছো?”

“না। লেখালেখি আপাতত বন্ধ। তোমাকে যেটা পড়তে দিয়েছি ওটা রিটার্ন পেলে ঠিকঠাক করবো।”

“চিন্তা কোরো না, খুব জলদিই শেষ করবো। লেখাটা পড়ে খুবই ভালো লাগছে,” আমাকে আশ্বস্ত করে বললো রামজিয়া। “কাল রাত দুটো পর্যন্ত পড়েছি। অনেকদিন পর একটানা এতোক্ষণ পড়লাম।” একটু বিরতি দিলো সে। “আসলে লেখাটা না পড়ে থাকতে পারিনি। নিজেদের গল্প বলেই হয়তো…” কথাটা শেষ করলো না।

“এতো তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই,” বললাম তাকে, “আস্তে ধীরে পড়ো।”

“তিন-চারদিন পর দিলে হবে তো?”

“এক সপ্তাহ পর দিলেও হবে,” হেসে বললাম আমি।

“ওকে,” তারপর আবারো বিরতি। “যে জন্যে ফোন করেছিলাম…মিলির এক আত্মীয়কে বলেছি মিনহাজের ঠিকানা জোগাড় করে দিতে। ও নাকি সেলফান ব্যবহার করে না, ভাবা যায়? এ যুগে একটা মানুষ ফোন ছাড়া থাকে কী করে। কারো সাথে খুব একটা যোগাযোগও নেই। ঢাকায় খুব কম আসে।”

“ফোন নাম্বার যদি না থাকে তাহলে তো কিছু করার নেই, ঠিকানাটা পেলেও কাজ হবে।”

“আশা করি দুয়েকদিনের মধ্যেই জোগাড় করে দিতে পারবো।”

“অফিসে যাবে কখন?” জিজ্ঞেস করলাম তাকে।

“দশটার পর যাই। তুমি কি করো সারাদিন? ঘরেই থাকো নাকি বাইরে যাও-টাও?”

“ঘরেই বসে লিখি। সপ্তাহে দুয়েকবার সন্ধ্যার পর কখনও আড্ডা দিতে যাই…এই তো।” নিজের কাছেই কথাটা কেমন একাকিত্বের হাহাকার বলে মনে হলো।

“তাহলে কাল বিকেলের পর বাসায় চলে আসো। চা খেতে খেতে আড্ডা দেয়া যাবে। আজকে সন্ধ্যার পর আমাকে আবার একটা প্রোগ্রামে যেতে হবে।”

ভালো করেই জানি, তার কাছ থেকে এমন আমন্ত্রণ পেলে আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো না। “ঠিক আছে।” ছোট্ট করে বললাম।

“আচ্ছা,” যেন কোনো কথা মনে পড়ে গেছে তার, “আমি যদি তোমার লেখায় কোনো মিস-ইনফর্মেশন পাই…আফটার অল অনেক আগের কথা…তোমার মেমোরিও খুব উইক।”

“বুঝতে পারছি কি বলতে চাইছে,” বললাম তাকে। “এরকম কিছু পেলে নির্দ্বিধায় তুমি কারেকশান করে দিও। এ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভোগার কোনো দরকার নেই। ঠিক আছে?”

“থ্যাঙ্কস,” আমি নিশ্চিত সে হেসেই বলেছে কথাটা। “কারেকশানটা করবো কিভাবে? আমি তো এডিটর না, ওরা কিভাবে কারেকশান করে সেটা তো জানি না।”

“সমস্যা নেই। যে শব্দ বা লাইন কারেকশান করতে হবে সেটার নীচে আন্ডারলাইন করে দিও, তারপর লেখার বামদিকে যে একটু স্পেস আছে ওখানে ফুটনোটের মতো কারেকশানটা লিখে দিলেই হবে।”

“তাই?” মনে হলো বিস্মিত হয়েছে। “এতো সহজ?”

“হুম…এতোটাই সহজ।”

“ওকে। তাহলে কাল বিকেলে চলে এসো, কেমন?”

“আচ্ছা।”

“বাই।”

একেবারে উচ্ছ্বল তরুণীদের মতো করেই বললো কথাটা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *