কেউ কেউ কথা রাখে – ২৯

অধ্যায় ২৯

বই দেয়া-নেয়ার সুবাদে রামজিয়ার সাথে আমার আরো দুয়েকবার সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দেখা হয়েছিলো। আর প্রতিবারই আমি গিয়েছিলাম সাদা পোশাকে। সম্ভবত এর কারণ, সে বলেছিলো সাধারণ পোশাকে আমাকে বেশি মানায়। আমার অবচেতন মন আর পুলিশ ইউনিফর্ম নিয়ে তার সামনে যেতে চায়নি হয়তো।

যাই হোক, আমাদের মতো মিলির মামলাটা নিয়ে সে-ও খুব উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিলো। সময় বয়ে গেলেও আমি তাকে নতুন কোন আশার বাণী শোনাতে পারিনি। কবে তাকে আদালতে গিয়ে সাক্ষি দিতে হবে জানতে চাইলে বলেছিলাম, মামলা কোর্টে উঠলেই জানাতে পারবো।

এপ্রিলের দিকে রামজিয়া একদিন ফোন করে আমাকে দেখা করার কথা বললো। যথারীতি চলে গেলাম নিউ মার্কেটের ঐ কফি শপে। কফি খেতে খেতে সে জানালো গত দু-তিন ধরে ইমতিয়াজকে নাকি তার বাড়ির সামনে ঘোরাফেরা করতে দেখছে।

কথাটা শুনে আমার বুক কেঁপে উঠেছিলো। অবিশ্বাস্য ব্যাপার! দিন দিন ঐ খুনির সাহস বেড়েই চলেছে। সে এখন নিজেকে ধরা ছোঁয়ার বাইরে একজন বলে মনে করছে! কতো বড় আস্পর্ধা, রামজিয়ার বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করে!

সত্যি বলতে রাগে আমার গা রি রি করে উঠছিলো। বুঝতে পারছিলাম না কী বলবো। তবে কিছু একটা যে করা উচিত সে ব্যাপারে আমার মনে কোন সন্দেহ ছিলো না।

“আমি যে সাক্ষি দেবো এ কথা কি ইমতিয়াজ জানে?”

“আরে, না,” এই সম্ভাবনা একদম নাকচ করে দিলাম। রামজিয়া যে মিলির কেসে সাক্ষি দেবে সে-কথা আমি হায়দারভাইকেই বলিনি। আমি বরং বলেছি, সাক্ষি দিতে সে রাজি হয়নি। “এটা আমি আর হায়দারভাই ছাড়া আর কেউ জানে না এখন পর্যন্ত।”

“তাহলে?”

“বুঝতে পারছি না।” কথাটা বললাম বটে কিন্তু ইমতিয়াজের উদ্দেশ্য কি সেটা নিয়ে ভাবতে গিয়ে অন্য একটা অশঙ্কা জেঁকে বসলো আমার মধ্যে। ওর মতো খুনি-ধর্ষক কি তাহলে রামজিয়ার দিকে কু-নজর ফেলেছে?

“আমার কি জিডি করা উচিত?”

তার কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখি কফিতে চুমুক দিচ্ছে। “জিডি?” পুণরুক্তি করলাম।

“হুম।”

“শুধুই ঘুরঘুর করছে নাকি আরো কিছু করেছে?”

“আরো কিছু মানে?”

“কথা বলতে চেয়েছে আপনার সাথে? বাড়ি থেকে বের হবার সময় ফলো করেছে?”

“না। দু-তিন ধরে দেখি বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করছে। ওর সঙ্গে আরেকটা ছেলেও থাকে, হ্যাংলা মতোন।”

একটু ভেবে জবাব দিলাম, “আজকে দেখেছেন?”

“না।”

“আচ্ছা, আরো কয়েকটা দিন দেখেন, তারপর আমাকে জানান। এমনও হতে পারে ওখানে সে কোন কাজে গেছিলো। ঐ এলাকায় একটা বাড়ি দখল করেছে ওরা। হয়তো সেজন্যেই ওখানে দেখতে পাচ্ছেন।” রামজিয়াকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম।

“বাড়ি দখল করেছে?!” কথাটা শুনে বিস্মিত হলো সে। “ওর মতো একটা স্কাউড্রেল!”

“ও দখল করেনি,” পরিস্কার করে দেবার জন্য বললাম, “এক নেতা দখল করেছে। ওরা কয়েকজন সেই নেতার হয়ে বাড়িটা দখল করে রেখেছে।”

“ঐ নেতাই কি মিলির কেসটা নিয়ে ইন্টারফেয়ার করছে?”

মাথা নেড়ে সায় দিলাম আমি।

“মাই গুডনেস।”

তার বিস্মিত হবার কারণটা যতোই অপ্রীতিকর হোক না কেন, অভিব্যক্তিটা ছিলো হৃদয়হরণকারি! তার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে না থেকে পারিনি।

কফি শেষ করে নিউ মার্কেট থেকে বের হবার সময় সাহস করে বলে ফেললাম, তাকে যদি বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দেই তাহলে কিছু মনে করবে কি-না।

“আপনি আমার বডিগার্ড হতে চাইছেন?” বলেই মুখচাপা দিয়ে হেসে ফেলেছিলো সে।

তার এমন কথায় আমি কিছুটা বিব্রত হয়ে পড়ি। সম্ভবত সেটা রামজিয়াও বুঝতে পেরেছিলো।

“ওয়েল, তার কোন দরকার নেই, তবে…”

আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালাম।

“আপনি যদি চান তাহলে পৌঁছে দিতে পারেন।”

তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে একটা রিক্সা ডেকে বসলো সে। আমি অবশ্য পাশাপাশি হাটার চেয়ে বেশি কিছু ভাবিনি।

পছন্দের কারো সাথে এক রিক্সায় পাশপাশি বসলে কী রকম অনুভূতি হতে পারে সেটা নিশ্চয় ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। লোকজন আমার দিকে ঈর্ষার চোখে তাকাচ্ছে সেটা বুঝতে পেরে আরো বেশি ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি হলো!

রিক্সা চলতে শুরু করলে আমি তার চুলের গন্ধ পেতে শুরু করলাম। রামজিয়া শেহরিন নামের অধরার পাশে বসে আমি যেন পুরোপুরি মোহগ্রস্ত হয়ে পড়লাম সেই মুহূর্তে। নিউ মার্কেট থেকে ওদের বাড়ি বড়জোর পাঁচ মিনিটের পথ, কিন্তু সেই পাঁচ মিনিট চলে গেলো এক লহমায়!

সেই সাথে আমার সুখকর মুহূর্তটি!

“দেখেন!” তাদের বাড়ির সামনে রিক্সাটা চলে আসতেই আমার বাহুটা খপ্ করে ধরে বলে উঠলো রামজিয়া।

আমি অবিশ্বাস্য চোখে দেখতে পেলাম ইমতিয়াজ দাঁড়িয়ে আছে আমাদের রিক্সা থেকে কয়েক হাত দূরে। তার চোখেমুখে কেমন এক লাম্পট্য। মনে হলো অজ্ঞাত কারণে বেশ ক্ষুব্ধও সে!

আমরা রিক্সা থেকে নামার আগেই হেলেদুলে আমাদের কাছে এসে দাঁড়ালো।

“কি ব্যাপার, রামজিয়া, সব সময় পুলিশ নিয়ে ঘুরে বেড়াও নাকি?” আমার দিকে তাচ্ছিল্যভরে তাকালো।

“হাউ ডেয়ার ইউ আর! আমি কার সাথে ঘুরে বেড়াবো না বেড়াবো সেটা তোমাকে বলে কয়ে করতে হবে নাকি?” চটে গেলো সে।

নিজেকে আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলাম না। “ইমতিয়াজ-!”

“অ্যাই!” আমার কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে বলে উঠলো মিলির খুনি। “ওর সাথে আমি কথা বলছি, আপনার সাথে না। ঠিক আছে? ওকে আমি বহুদিন ধরে চিনি, আপনার মতো দু-দিন ধরে খাতির জমানো লোক আমি না।”

“ইমতিয়াজ, আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছি না। ওকে? লিভ আস অ্যালোন!” অনেকটা চেঁচিয়ে বলে উঠলো রামজিয়া।

“লে হালুয়া! আমার সাথে কথা বলবে না কেন? আমি কী করেছি?” কষ্ট পাবার কপট ভঙ্গি করলো সে।

রেগেমেগে মুখ সরিয়ে নিলো রামজিয়া। রাগে আমার গা পুড়ে যেতে লাগলো। সাদা পোশাকে আছি, সঙ্গে ওয়েম্বলি অ্যান্ড স্কট রিভলবারটাও নেই। আর কারো সঙ্গে আগ বাড়িয়ে মারামারি করাও আমার স্বভাব ছিলো না। অনেকটা অসহায়ের মতো রিক্সায় বসে ছিলাম ঐ মুহূর্তে।

“তুমি বুকে হাত দিয়ে বলো তো, আমি মিলির সাথে ওরকম কাজ করতে পারি?” কথাটা বলার সময় রামজিয়ার বুকের দিকে তার লম্পট দৃষ্টি হানলো। ঠোঁট দুটো কেমন লম্পটের মতো সংকুচিত করে ‘বুক’ শব্দটা উচ্চারণ করলো সে। “বলো না…বুকে হাত দিয়ে বলো!”

আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। রিক্সা থেকে নেমে ইমতিয়াজের কলার চেপে ধরলাম।

শূয়োরের বাচ্চা! তোর কতো বড় আস্পর্ধা! তুই-”

সঙ্গে সঙ্গে আমার বুকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিলো খুনি। রামজিয়ার চিৎকারটা আমার কানে গেলেও সেদিকে না তাকিয়ে আবারো ঝাঁপিয়ে পড়তে যাবো ইমতিয়াজের উপর তার আগেই সে কোমর থেকে পিস্তল বের করে আমার বুকে তাক্ করে ফেললো! জমে গেলাম আমি।

“এক্কেবারে ফুটা কইরা দিমু!” দাঁতে দাঁত খিচে বলে উঠলো ইমতিয়াজ। রাগে কাঁপছে এখন। মুখ থেকে প্রমিত ভাষাও উধাও হয়ে গেছে। কেমন উন্মাদগ্রস্ত বলে মনে হলো তাকে। “তোর পুলিশগিরি গোয়া দিয়া ভইরা দিমু, চুতমারানির পোলা!”

আমি হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলাম খুনির দিকে। দু-বছর ধরে পুলিশে চাকরি করছি, দুয়েকবার পিস্তল বের করে আসামির দিকে তাক করলেও আমার দিকে কেউ কখনও এ জিনিস তাক্ করেনি।

“মাইয়া মানুষের সামনে বাহাদুরি দেখাইতে আইছোস!”

পিস্তলের নল দিয়ে আমার বুকে একটা গুঁতো দিলো সে। আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হবার উপক্রম হলো। যেকোন সময় বের হয়ে যেতে পারে গুলি!

“ইমতিয়াজ, প্লিজ! তুমি কি পাগল হয়ে গেছো!” রামজিয়া বলে উঠলো এবার।

টের পেলাম রিক্সা থেকে নেমে আমার কাঁধ ধরে টেনে সরিয়ে দিতে চাইছে সে।

“ফর গড সেক, লিভ আস অ্যালোন!”

তাচ্ছিল্যভারে হেসে উঠলো ইমতিয়াজ। পিস্তলটা নামিয়ে ফেললো এবার। রামজিয়া আমাকে টেনে তাদের বাড়ির মেইনগেটের সামনে নিয়ে গেলো।

“তোর মতো দুই টাকা দামের ঠোলা আমার পকেটে থাকে, বুঝলি?” পিস্তলটা শূন্যে নেড়ে বলে উঠলো। “শালার দুই পয়সার ঠোলা…বড়লোকের মাইয়া পটাইয়া ফালাইছে! এই মাইয়ার বাড়ির চাকর হওনের যোগ্যতাও তোর নাই!”

“অ্যাই! একদম চুপ!” বিস্ফারিত হলো রামজিয়া শেহরিন। “গেট লস্!” আমি রীতিমতো হতভম্ব হয়ে পড়েছিলাম ইমতিয়াজের এমন আচরণে, এমন সব কথাবার্তায়। মূর্তির মতো ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে ছাড়া আর কিছুই করতে পারিনি।

রামজিয়াদের বাড়ির দারোয়ান হৈ-হল্লা শুনে বের হয়ে এসে দেখে আমাদেরকে। ততোক্ষণে ইমতিয়াজ কোমরে পিস্তল গুঁজে হাটা ধরেছে। যেতে যেতে আরো কিছু জঘন্য গালিগালাজ করলো সে।

পুরোপুরি ধাতস্থ হতে কয়েক মিনিট লেগে গেছিলো আমার। রামজিয়া আমাকে তাদের বাড়িতে কিছুক্ষণ থেকে যেতে বললেও আমি রাজি হইনি। অপমানে বিধ্বস্ত হয়ে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসি থানায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *