কেউ কেউ কথা রাখে – ১৭

অধ্যায় ১৭

উদযাপন আর উপহার

“আমি তোমাকে বলেছিলাম না,” তর্জনি উঁচিয়ে আমার মুখের খুব কাছে নিজের মুখ এনে বললেন হায়দারভাই, “ওই শালারে আমি ধরবোই!” তারপরই একটা ঢেকুর তুললেন তিনি।

সন্ধ্যার পর আমরা দু-জন থানা থেকে বের হয়ে চলে এসেছি কলাবাগান মাঠের এককোণে। হায়দারভাই এখানে আসার আগেই যা খাওয়ার খেয়ে নিয়েছেন। এখন একের পর এক সিগারেট ধ্বংস করে যাচ্ছেন। এ কাজে অবশ্য আমি ভালো সঙ্গই দিচ্ছি তাকে।

মদের কটু গন্ধের কারনে আমি আমার মুখটা সরিয়ে ফেললাম। “কী সব খান…এতো বাজে গন্ধ!” সত্যি বলতে মদের গন্ধ আমার কাছে বিশ্রি মনে হতো। এই জিনিস মানুষ কী করে খায় মাথায় ঢুকতো না। তখনও আমি জানতাম না, আর ক-দিন পর গোগ্রাসেই গিলবো এ জিনিস।

“ধুর মিয়া!” হাত নাড়িয়ে বলে উঠলেন তিনি, “এখনও পোলাপানের মতো কথা বলো। এই জিনিস না খেলে পুরুষ মানুষ হওয়া যায় নাকি! “

মাথা দোলালাম আমি। “আমার ওসব হওয়া লাগবে না। এখন বলেন, পুরো বোতল সাফ করে দিয়েছেন নাকি? আপনার অবস্থা তো সুবিধার মনে হচ্ছে না।”

“আহ্!” একটু চটে গেলেন। “মদ আমাকে গিলতে পারে না, ব্রাদার… আমি ওরে গিলি!” এবার লম্বা করে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন।

“আপনার কি আজ বাড়িতে যাবার ইচ্ছে নেই? ভাবি তো মনে হয় লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে ফেলবে।”

হা-হা-হা করে হেসে ফেললেন তিনি। “ব্যাগ অ্যান্ড ব্যাগেজ বাপের বাড়ি চলে গেছে…নো চিন্তা, ব্রাদার!”

“আবার ঝগড়া করেছেন?”

“আহ্!” বিরক্ত হলেন যেন। “আবিয়াত্তা পোলাপান, কিস্তু বোঝো না। ঝগড়া না-হলে কি মেয়েমানুষ বাপের বাড়ি যাবে না?”

আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম।

“নাইওর গেছে,” বলেই একটা চোখ টিপে দিলেন।

আমি অনেকটা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। “তাহলে ঠিক আছে। কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে বউ বাপের বাড়ি চলে যাওয়ায় খুব খুশি?”

মাথা দোলালেন এসএম হায়দার। “এটা খুশি-অখুশির ব্যাপার না। মেয়েরা মাঝেমধ্যে বাপের বাড়ি যাবেই… হাজব্যান্ডদের এটা মেনে নিতে হয়, বুঝলে?”

“আমি সেটার কথা বলছি না, আপনাকে মনে হচ্ছে খুব খুশি। বউকে তো মনে হয় মিস্ করেন না?”

বাঁকাহাসি দিলেন তিনি। “কী করি না করি সেটা জানে আমার মন। বাইরেরটা দেখে বুঝবে না, ব্রাদার।”

আমি প্রসঙ্গ বদলে ফেলতে চাইলাম। “আপনার যা অবস্থা, কাল সকালে কোর্টে যেতে পারবেন তো? ওই হারামজাদার জামিন কিন্তু ঠেকাতে হবে।”

“ওটা নিয়ে ভাববে না, আমি ঠিক সময়েই চলে যাবো।”

“শুধু ঠিক সময়ে গেলেই তো হবে না, আপনাকেও ঠিক থাকতে হবে।” “আমি ঠিক থাকবো, চিন্তা কোরো না।”

“ঠিক থাকলেই ভালো।” কথাটা বলেই সিগারেটের দিকে নজর দিলাম।

“এই কেসে কিন্তু তোমার কন্ট্রিবিউশন অনেক,” নতুন আরেকটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন এসএম হায়দার। “তুমি না থাকলে কেসটার যে কী অবস্থা হতো!”

আমি বিনয়ী হবার চেষ্টা করলাম। “কী যে বলেন, আপনার সাথে থেকে থেকেই তো একটু-আধটু শিখেছি।”

মুচকি হাসলেন তিনি। “ভালোই শিখছো। তোমার মাথাটা খুব ভালো, আমার মতো গরম না।”

কথাটা অবশ্য সত্যি। ছোটোবেলা থেকেই আমি শান্তশিষ্ট।

“চলো, পুরান ঢাকায় যাই। আজ কমপক্ষে দুইটা হাজি মারতে হবে।”

“কি?” বুঝতে না পেরে বলে উঠলাম। “দু-জন হাজি মারবেন?”

“হাজিসাব না, হাজির বিরিয়ানি।” বলেই হেসে ফেললেন।”

“এতো রাতে কি পাওয়া যাবে? শুনেছি, সন্ধ্যার পরই শেষ হয়ে যায়।”

“আরে, কী আর রাত হয়েছে…চলো তো।”

হায়দারভাই আমাকে টেনে দাঁড় করালেন। আমিও তাকে বাধা দিলাম না। হাজির বিরিয়ানি আগেও দুয়েকবার খেয়েছি, এর দুর্নিবার আকর্ষণ থেকে মুক্ত রাখতে পারলাম না নিজেকে, হাজার হলেও, উদযাপন করার মতো একটা ঘটনা তো ঘটেছেই!

*

পরদিন কোর্টে একটু দেরি করে হাজির হলেও হায়দারভাইকে দেখে মনে হলো না তিনি গতরাতে পুরোপুরি মাতাল ছিলেন, বরং তাকে একটু বেশিই ফ্রেশ মনে হলো আমার কাছে। বেশ ফুরফুরে মেজাজে ছিলেন। আমি অবশ্য আশঙ্কা করছিলাম, ইমতিয়াজের জামিন হয়ে যেতে পারে ভেবে। সে যে রাজনীতি করে সেটা আমরা জানি। সেই প্রভাব খাটিয়ে জামিন করার চেষ্টা করতেই পারে।

কিন্তু ইমতিয়াজের হয়ে যে উকিল জামিনের আবেদন করেছিলো তাকে দেখেই হায়দারভাই আমাকে নীচুস্বরে বলেছিলেন, “এইসব পাঁচানি কেসের উকিল কি জীবনে কখনও খুনের মামলায় জামিনের জন্য কোর্টে দাঁড়িয়েছে?”

তার ঠোঁটের বাঁকাহাসি দেখে বুঝেছিলাম আসামিপক্ষের উকিল সম্পর্কে তিনি মোটেও ভালো ধারণা পোষণ করেন না। তারচেয়েও বড় কথা, আসামির জামিন না হবার ব্যাপারে তিনি প্রায় নিশ্চিত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। আদালত তার জামিন আবেদন প্রতাখ্যান করে জেলহাজতে পাঠিয়ে দেন।

কোর্ট থেকে বের হয়ে হায়দারভাই আর আমি সোজা ঢুকে পড়লাম রাস্তার ওপাড়ে প্রসিদ্ধ দিল্লী মুসলিম নামের একটি রেস্তোরাঁয়। দুপুরের খাবার ওখানেই খেয়ে নিলাম। মামলাটার পরবর্তি কার্যক্রম কিভাবে এগিয়ে নিয়ে যাবো সেটা নিয়েও অল্পবিস্তর আলাপ করলাম। হায়দারভাই বললেন, মিলির স্বামি মিনহাজকে খবরটা দেয়া দরকার। আমি যেন আজ বিকেলের পর ওর সাথে দেখা করি।

বিকেলের দিকে, ব্যাঙ্ক ছুটি হবার একটু আগে আমি মিনহাজের সাথে দেখা করি ওর অফিসে। আমার কাছ থেকে খবরটা শুনতে পেয়ে মিনহাজের চোখ দিয়ে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে শুরু করলো। বিব্রত হয়ে আমি কী করবো বুঝতে পারলাম না। এক পর্যায়ে সে আমার হাতদুটো ধরে তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলো।

“আপনি আর আপনার ঐ সিনিয়র অফিসারের কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো, ভাই,” চোখ মুছতে মুছতে বলেছিলো সে। “আপনাদের ঋণ আমি কোনোদিনও শোধ করতে পারবো না।”

“এটা ঋণ হতে যাবে কেন, মিনহাজসাহেব?” আমি বিনয় দেখিয়ে বললাম। “এটা তো আমাদের দায়িত্ব।”

কয়েক মুহূর্ত নিজেকে স্বাভাবিক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো মিলির স্বামি “আচ্ছা, এখন মামলা শেষ হতে কতোদিন লাগতে পারে?”

আমি একটু কাচুমাচু খেলাম। এ দেশের আদালতের দীর্ঘসূত্রিতা বহু পুরনো একটি ঐতিহ্য। বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও মামলা শেষ হয় না। এইসব রুঢ় বাস্তবতা কাউকেই স্বস্তি দেবে না, আর আমিও চাইছিলাম না এমন মুহূর্তে মিনহাজকে অপ্রিয় সত্যিটা জানাতে

“মনে হয় বছরখানেকের বেশি লাগবে না।” সত্যি বলতে, নিজের কাছেই কথাটা অসাড় বলে মনে হলো।

হালকা ভাঁজ পড়লো মিনহাজের কপালে। “তাই নাকি?” ঢোক গিলে বললো সে, “আমি তো শুনেছি, বছরের পর বছর পার হয়ে যায়, অনেক সময় লাগে?”

“সেটা দেওয়ানি মামলা-মোকদ্দমায়। ফৌজদারি মামলা একটু দ্রুতই শেষ হয়,” আবারো প্রবোধ দেবার চেষ্টা করলাম।

“দেওয়ানি-ফৌজদারি মানে?”

সাধারণ জনগণের মতো মিনহাজও এটা জানতো না। জীবনে যে ব্যক্তি আদালতে পা রাখেনি, যার পরিবারের কেউ মামলা-মোকদ্দমায় জড়িত ছিলো না তার পক্ষে এইসব আইনী প্রভেদ বোঝা সম্ভব নয়।

“জমি-জমা, সম্পত্তি নিয়ে যে মামলা হয় সেটা দেওয়ানি,” মিনহাজকে বললাম। “আর খুন-রাহাজানি, চুরি-ডাকাতি, ওগুলো ফৌজদারি,” ইচ্ছে করেই ধর্ষণের কথাটা উল্লেখ করলাম না।

“ও,” মাথা নেড়ে সায় দিলো সে, তারপর অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলো। “খেয়াল রাখবেন, ঐ হারামজাদার যেন ফাঁসি না-হয়।”

আমি দ্বিতীয়বারের মতো অবাক হয়েছিলাম মিনহাজের কাছ থেকে এমন কথা শুনে।

“আমি চাই শূয়োরেরবাচ্চাটা জেলে পচে মরুক। আস্তে আস্তে…ধীরে ধীরে!”

আমি তার মনোভাবটা বুঝতে পেরে চুপ থাকলাম।

“সারাটা জীবন জেলে কাটাক। জীবনে যেন জেলের বাইরে পা রাখতে না পারে। মরে যাবার পর ওর লাশ জেলে বাইরে নেয়া হবে, তার আগে নয়।”

এ সময় নম্র-ভদ্র মিনহাজের চেহারাটা কেমন উন্মাদগ্রস্ত বলে মনে হলো আমার কাছে, তবে সেটা একেবারেই অল্প সময়ের জন্য। পরক্ষনেই নিজেকে ফিরে পেলো সে। “এখন মিলির কবরের সামনে গিয়ে আর কাঁদবো না। ওকে বলবো, ওর খুনি ধরা পড়েছে…ওর শাস্তি হবে।”

আমি জানি মিনহাজ প্রায় প্রতিদিন ওর স্ত্রীর কবরের সামনে গিয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে আসে। এরকম ভালোবাসা, এমন প্রেম আমি গল্প-উপন্যাসেও পড়িনি। সত্যি বলতে, মিনহাজের প্রতি আমার যে পক্ষপাতিত্ব তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটাও অন্যতম।

*

মিনহাজের ওখান থেকে থানায় ফিরে এসেই আমি রামজিয়াকে ফোন করলাম। কিন্তু ও তখন বাসায় ছিলো না। কাজের লোক জানালো ওদের আপা বাইরে গেছে, সন্ধ্যার দিকে ফিরবে। তবে সন্ধ্যায় আর আমাকে ফোন করতে হলো না, রামজিয়া নিজেই ফোন করলো।

“ইমতিয়াজকে গতকাল অ্যারেস্ট করেছি আমরা।”

“তাই?” খুবই অবাক হলো, সেইসঙ্গে অবশ্যই আনন্দিত। “মাই গড! কিভাবে ধরলেন ওকে? কোথায় পেলেন?”

‘স্টেডিয়াম থেকে ধরেছি। খেলা দেখতে গেছিলো।”

‘স্টেডিয়াম থেকে? বলেন কি?!”

“একেবারে ডিটেক্টিভ উপন্যাসের মতো ঘটনা,” বেশ গর্বের সাথেই বললাম।

“ওয়াও,” তার বিস্ময় যেন শেষই হয় না। “প্লিজ, একটু ডিটেইল বলেন না? আমার খুব শুনতে ইচ্ছে করছে।”

আমি বিপাকে পড়ে গেলাম। টেলিফোনে পুরোটা বলতে গেলে অনেক সময় লাগবে। তখনকার দিনে খুব কম লোকেই টেলিফোনে এতো সময় নিয়ে কথা বলতো। তাছাড়া থানায় বসে এটা করা প্রায় অসম্ভব। জরুরি দরকার ছাড়া একটা ফোন দীর্ঘক্ষণ আটকে রাখার কথা চিন্তাও করা যায় না। প্রচুর লোকজন আমার আশেপাশে, তাদের কানে ঠিকই যাবে আমি কাউকে গল্প বলছি।

“ইয়ে, মানে…লম্বা কাহিনী।”

ভাগ্য ভালো সে বুঝতে পেরেছিলো সঙ্গে সঙ্গে। “ঠিক আছে, তাহলে এক কাজ করুন, কাল বিকেলে নিউ মার্কেটে চলে আসুন, বুক পয়েন্টের সামনে। কফি খেতে খেতে শোনা যাবে।”

রামজিয়ার এমন প্রস্তাবে রাজি না-হয়ে উপায় ছিলো না। আমরা দু-জন নিউ মার্কেটের ভেতরে একটি খাবারের দোকানে গিয়ে বসলাম পরদিন বিকেলে। দু-কাপ কফি খেতে খেতে পুরো ঘটনাটা তাকে বলতে বাধ্যই হলাম বলা যায়। আমার গল্প বলার ভঙ্গি নাকি কাহিনীটার জন্য, মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনে গেলো সে।

“ওয়াও! আনবিলিভেবল!”

আমার কথা বলার মধ্যে বেশ কয়েকবার এ কথাটা উচ্চারণ করলো। বুঝতে পারলাম, সচ্ছল পরিবারে বড় হয়েছে, আর্থিক অনিশ্চয়তা কি জিনিস জানে না। তার জীবনটা একেবারে নিস্তরঙ্গ কেটেছে। খুব কমই উত্থান-পতন দেখেছে সে, মিশেছে আরো কম মানুষের সাথে। আর যাদের সাথে মিশেছে তাদের বেশিরভাগই তার সমগোত্রীয়, তাই খুব সহজেই বিস্মিত হয়ে যায়। আমাদের মতো তার কিছু কিছু অনুভূতি এখনও ভোতা হয়ে যায়নি।

আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না।” সব শোনার পর আবারো নিজের বিস্ময় প্রকাশ করলো সে। “আগে ভাবতাম, বিদেশি গোয়েন্দারা অসাধারণ হয়, আমাদের দেশেও যে এমন কেউ আছে সেটা বিশ্বাস করতাম না।” মাই গড! ইউ আর অ্যা জিনিয়াস!”

রামজিয়ার শেহরিনের মতো আপ-টু-ডেট সুন্দরি মেয়ের কাছ থেকে প্রশংসা পেতে কে না চাইবে, কিন্তু আমি ভীষণ বিব্রত বোধ করলাম সব কৃতিত্ব একা আমাকে দিয়ে দিচ্ছে বলে।

“আসলে, কেসটা তদন্ত করেছেন এসএম হায়দার, উনি আমার সিনিয়র,” বললাম তাকে। “খুবই অসাধারণ মানুষ, এয়ারকুল পোইরোর মতো।”

আগাথা ক্রিস্টির পোইরোর কিছু গল্প পড়ে বেশ ভালো লেগেছিলো, তাই হয়তো তুলনাটা দিয়েছিলাম।

“কিন্তু ছবি থেকে সাসপেক্ট খুঁজে বের করেছেন তো আপনিই?” নিষ্পাপ চানি দিয়ে বললো রামজিয়া। তার প্রশ্নটা শিশুর মতোই সরল।

“হ্যা, সেটা ঠিক। হায়দারভায়ের সহকারি হিসেবে একটু কন্ট্রিবিউট করেছি বলতে পারেন। এর চেয়ে বেশি কিছু না।”

“আপনি যে ছবি থেকে ইমতিয়াজকে সাসপেক্ট হিসেবে ধরে নিলেন, এটা কিন্তু আমার কাছে ইউনিক আইডিয়া বলে মনে হয়েছে। একদম গল্পের মতো।”

বিনয়ী আর বিব্রত হাসি দেয়া ছাড়া আমি আর কিছুই করতে পারলাম না।

“শেষ পর্যন্ত আপনার সন্দেহই ঠিক বলে প্রমাণিত হলো। দ্যাটস গ্রেট।”

আবারো বিব্রত হাসি দিয়ে আশেপাশে তাকালাম। নিউ মার্কেটের ভেতরে লোকজন যাওয়া-আসা করার সময় আমাদের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। এটা দেখে আমার খুব ভালো লাগলো। আপনি যদি দেখেন কোনো সুন্দরির সাথে বসে আড্ডা দিচ্ছেন আর লোকজন আপনার দিকে ঈর্ষার চোখে তাকাচ্ছে তখন ভালো না লেগে উপায় নেই। আমি হলফ করে বলতে পারি, কোনো সুন্দরি তরুণীর সাথে নির্জন কোনো সৈকতে কিংবা জনবিরল স্থানে বসে গল্প করার চেয়ে নিউ মার্কেটের মতো জনাকীর্ণ স্থানে বসে কফি খাওয়াটা অনেক বেশি উপভোগ্য! চারপাশে ঈর্ষণীয় চোখের চেয়ে সুখের বস্তু আর কী আছে!

আমরা অনেকক্ষণ ধরে গল্প করেছিলাম সেদিন। নানান কথার ভিড়ে যে নিজেদের কথা বলেছিলাম সেটা বেশ মনে আছে। রামজিয়া জানিয়েছিলো ওদের আদি-নিবাস কোলকাতা। সাতচল্লিশের পর বাবা-মাসহ পরিবারের বেশিরভাগ সদস্য চলে আসে ঢাকায়। তার জন্ম অবশ্য এখানেই। এক কাকা তখনও কোলকাতা রয়ে গেছেন, তিন ওখানকার হাইকোর্টের একজন জাস্টিস। তার বাবা বেশ কিছুদিন করাচিতে এক আমেরিকান ফার্মে চাকরি করার পর নিজের লেদার-ব্যবসা শুরু করেন। তাদের বেশিরভাগ আত্মীয়- স্বজনই কোলকাতায় আছে। দুই ভাই-বোনের ছোট্ট সংসার তাদের।

রামজিয়ার আগ্রহে আমিও আমার কথা বলেছিলাম। জন্মের সময় মা মারা গেলো, বাবা আর বিয়ে করলেন না। মানুষ হলাম মামা-মামির কাছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আশা ছিলো কিন্তু বাবা মারা গেলেন বলে ডিগ্রি পাস করে ঢুকে পড়ি পুলিশবাহিনীতে।

আমার কথা একাকি শৈশব আর জীবনযুদ্ধের গল্প শুনে সমব্যথি হয়ে উঠেছিলো সে।

এভাবে আলাপ চলতে চলতে সন্ধ্যা হয়ে এলে বাড়ি ফেরার প্রস্ততি নেই। নিউ মার্কেট থেকে বের হবার আগে বুক পয়েন্ট থেকে তিন-চারটা বই কিনে নিলো রামজিয়া। অবাক করে দিয়ে তার প্রিয় বান্ধবির খুনিকে ধরার পুরস্কার হিসেবে একটা বই গিফটও করে দিলো আমাকে।

কী মনে করে যেন বলে ফেললাম, “বইতে কিছু লিখে দিন।”

আমার দিকে বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলো সে। “কী লিখবো?!”

“কিছু একটা…আপনি যে বইটা আমাকে উপহার দিয়েছেন তার একটা প্রমাণ থাকতে হবে না?” হালকাচালে বললাম তাকে।

“প্রমাণ!?” তার বিস্ময় তখনও কাটেনি।

“ঠিক তা নয়। আসলে বই উপহার দিলে কিছু একটা লিখে দিতে হয়, বুঝলেন?”

কিন্তু রামজিয়ার চেহারা দেখে মনে হলো না সে কিছু বুঝতে পারছে। তারপরও দ্বিধাভরে বইটা হাতে নিয়ে একটু ভেবে গেলো, অবশেষে কলম বের করে লিখে দিলো কিছু। লেখা শেষ করে বইটা যখন আমার দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছিলো তখন তার চেহারায়, চোখেমুখে অদ্ভুত এক লজ্জার আবেশ ভর করেছিলো।

বইটা হাতে নিয়ে আমি সঙ্গে সঙ্গে খুলে দেখলাম না।

“কি লিখেছি দেখলেন না যে?” অবাক হলো আমার এমন অদ্ভুত আচরণে।

“এখন না, বাসায় গিয়ে দেখবো।”

“কেন?!”

“এমনি।”

আমার এ কথা শুনে হেসে ফেললো সে। “সেটাই ভালো। লেখাটা পড়ে হয়তো আপনার হাসি পাবে। আমি আসলে গুছিয়ে কিছু লিখতে পারি না।” একটু থেমে আবার বললো, “প্লিজ, আপনি কিন্তু হাসবেন না।”

হাত তুলে তাকে অভয় দিলাম। “একদম হাসবো না।” বলেই হেসে ফেললাম।

রামজিয়াও হেসে ফেললো আমার সঙ্গে সঙ্গে। তার মোহনীয় হাসির মাদকতাপূর্ণ শব্দ এখনও আমার কানে বাজে। দৃশ্যটা যেন আমার স্মৃতির দেয়ালে চমৎকার ফ্রেমে বন্দি হয়ে আছে আজও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *