কেউ কেউ কথা রাখে – ২৮

অধ্যায় ২৮

ইমতিয়াজের সাথে রাস্তায় দেখা হয়ে যাবার কথাটা আমি হায়দারভাইকে বলিনি। জানতাম,’ রেগেমেগে মাথা গরম করে তিনি উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেলতে পারেন। তবে রামজিয়া যে সাক্ষি দিতে রাজি হয়েছে এ কথাটাও তাকে বলিনি। একটা মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছিলাম আমি। তাকে বলেছিলাম, সাক্ষি দিতে রাজি হয়নি!

হায়দারভায়ের কাছে মিথ্যেটা বলতে খুবই খারাপ লেগেছিলো আমার। যদিও আমার বলা নির্জলা মিথ্যেটা কোন রকম সন্দেহ না করেই বিশ্বাস করেছিলেন তিনি।

“এটাই স্বাভাবিক,” মিথ্যেটা শোনার পর আস্তে করে বলেছিলেন। “এদের মতো মানুষজন এরকম ঝামেলায় জড়াবে না।”

কিন্তু রামজিয়া ওদের মতো ছিলো না।

মিলি হত্যা মামলার চার্জশিট দেবার আগেই আরেকটা ঘটনা ঘটলো। মিনহাজ থানায় এসে জানালো কাউকে কিছু না জানিয়ে তাদের দোতলার ভাড়াটিয়া বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে! ব্যাঙ্ক থেকে বাসায় ফিরে সে দেখে বাড়ি খালি। বাড়িওয়ালাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে সে জানতে পেরেছে, হুট করে ঢাকার বাইরে ভদ্রলোকের বদলি হয়ে যাওয়াতে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে তারা। কথাটা মিনহাজ বিশ্বাস করেনি, ভদ্রলোকের অফিসে গিয়ে দেখে দিব্যি অফিস করছে। তাকে দেখে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছে সে। তার চাকরির যে বদলি হয়নি সেটা বুঝতে পেরেছে মিনহাজ।

এটা যে ইমতিয়াজের কাজ সে-ব্যাপারে আমার মনে কোন সন্দেহ ছিলো না। কোন সাক্ষি-প্রমাণ সে রাখতে চাইছে না। মামলাটাকে হাস্যকর আর দুর্বল করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।

কথাটা আমি হায়দারভাইকে না বলে পারিনি। সব শুনে হায়দারভাই কয়েক মুহূর্ত চুপ মেরে রইলেন।

“দোষটা আমারই,” অবশেষে আস্তে করে বলেছিলেন তিনি। “ইমতিয়াজকে জিজ্ঞাসাবাদ করার সময় বলেছিলাম তাকে ছাতাসহ কেউ দেখেছে মিলির দরজার সামনে।”

“কিন্তু ঐ মহিলা আর তার বাচ্চাটা তো কারোর চেহারা দেখেনি,” বললাম আমি।

“সেটা আমরা জানি, খুনি জানে না। ও ধরে নিয়েছে দোতলার ভাড়াটিয়াদের কেউ ওকে দেখেছে।”

কথাটা বলেই হায়দারভাই চুপ মেরে গেলেন। এতে করে আমার ভয় আরো বেড়ে গেলো।

“আপনি আবার এটা নিয়ে উল্টাপাল্টা কিছু করতে যেয়েন না, ভাই, অনুনয় করে বললাম তাকে। “আল্লাহর দোহাই লাগে।”

আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে কিছু বলতে গিয়েও বললেন না, আস্তে করে উঠে থানা থেকে বের হয়ে গেলেন।

“কই যান?” আমি পেছন থেকে ডাকলাম।

“সিগারেট আনতে,” আমার দিকে না ফিরেই বলেছিলেন।

কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিলো তিনি বুঝি এখনই ইমতিয়াজের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে চলে যাচ্ছেন, কিন্তু তিন-চার মিনিট পর সত্যি সত্যি সিগারেট নিয়ে ফিরে এসেছিলেন থানার ভেতরে। হাফ ছেড়ে বেঁচেছিলাম আমি।

একটা সিগারেট আমার দিকে বাড়িয়ে নিজেও একটা ধরিয়ে অনেকক্ষণ চুপ মেরে ছিলেন তিনি।

“কোন খবর-টবর রাখো?” অবশেষে বলেছিলেন।

“কিসের খবর?”

“রাজনীতির।”

প্রসঙ্গটা বদলে যাওয়াতে একটু খুশিই হলাম। “রাজনীতির আবার কী হলো?”

“শেখসাহেব তো বাকশাল করতে যাচ্ছেন,” একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বলেছিলেন। “এক নেতা এক দেশ, শেখ মুজিবের বাংলাদেশ!” একটু ব্যঙ্গ করে বললেন। “শেষ পর্যন্ত সেটাই হচ্ছে।”

এসব কথা আমিও শুনেছি। সত্যি বলতে আমার পূর্ণ সমর্থন ছিলো এ ব্যাপারে। আমার মনে হতো, দেশের যা পরিস্থিতি তাতে এরকম বিরাট বড় একটি পদক্ষেপ ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিলো না।

“হুম, সবাই তো বলাবলি করছে এ মাসের মধ্যেই করতে পারেন,” বললাম তাকে।

“তোমার ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে খুব খুশি?”

মুচকি হাসলাম আমি। “আর আপনার ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে খুব অখুশি হবেন এটা করলে?” আমিও পাল্টা বলেছিলাম।

“শোনো, কেবলমাত্র বোকারাই এমন কাজে খুশি হতে পারে।” কথাটা বলে জোরে টান দিলেন সিগারেটে। “তোমার হায়দারভাই রগচটা হতে পারে, মদ্যপ হতে পারে কিন্তু সে বোকা না।”

যেন ঘুরিয়ে পেচিয়ে বলার চেষ্টা করলেন আমি একটা বোকার হদ্দ!

“এছাড়া তো উনার হাতে আর কোন অপশনও নেই। আপনিই বলেন, উনি আর কী করতে পারেন?”

বাঁকাহাসি দিলেন এসএম হায়দার। “চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম। স্কুলের বইতে এমন উপদেশমূলক কথা নিশ্চয় তুমিও পড়েছো।”

“আপনি কি বলতে চাইছেন?”

“উনার উচিত ছিলো নিজের দলের ভেতরে আগাছা সাফ করা। চাটার দলকে ঝেটিয়ে বিদায় করা। কম্বল চোরদের পাছায় লাথি মারা। ইমতিয়াজের মতো জঘন্য খুনিকে যারা প্রশ্রয় দেয় তাদেরকে দল থেকে বের করে দেয়া। বুঝলে?”

আমি চুপ মেরে রইলাম। জানি, তার কথা এখনও শেষ হয়নি।

“কিন্তু উনি সেটা না করে সব দলকে বিলুপ্ত করে একটা দল করতে যাচ্ছেন, কাদের সঙ্গে নিয়ে? ঐসব আগাছাদের নিয়ে।” সিগারেটটায় সুখটান দিয়ে ফেলে দিলেন। তারপর পা দিয়ে এমনভাবে পিষে ফেললেন যেন সমস্ত রাগ-ক্ষোভ ঐ উচ্ছিষ্টের উপরে প্রয়োগ করেই প্রশমিত করার চেষ্টা করলেন।

“আগে বাকশাল করতে দেন, তারপর দেখবেন আস্তে আস্তে উনি সব আগাছাও সাফ করে ফেলবেন,” আমি আশাবাদি কণ্ঠে বলে উঠলাম।

“মানুষটাকে তো সময় দিতে হবে, নাকি?”

“আমি সময় দেবার কে?” বাঁকাহাসি ঠোঁটে লাগিয়ে প্রশ্নটা করলেন তিনি।

“আপনি মানে, জনগণ।”

“আরে, তাদের মতামত প্রকাশের সুযোগ তো তুমি রাখছো না। তারা তোমাকে সময় দিলো কি দিলো না সেটা বুঝবে কেমনে? তারা তোমার কাজ-কর্ম পছন্দ করছে কি-না সেটাও তো জানার উপায় থাকবে না।”

“উনি সবাইকে এক করে একটা দল করতে যাচ্ছেন, এক ছাতার নীচে আনতে চাইছেন।”

“জনগণ কি উনাকে সেই মেন্ডেট দিয়েছে?” হায়দারভায়ের ক্ষুরধার যুক্তি। “উনি কি জনগণের কাছে সেই মেন্ডেট চেয়েছেন?”

আমি মাথা দোলালাম। “আপনি বলতে চাইছেন, উনার উচিত ছিলো আগে জনগণের কাছে এ বিষয়ে মেন্ডেট নেয়া?”

“তুমি এতো বড় একটা বিপ্লব করতে যাবে, জনগণের মেন্ডেট ছাড়া?” পাল্টা প্রশ্ন করে বসলেন তিনি। “তাদের সমর্থন ছাড়া?”

“এখন তো সেই পরিস্থিতি নেই। এটা আপনিও বোঝেন, আমিও বুঝি। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন দিয়ে মেন্ডেট নিয়ে এতোবড় কাজ করা সম্ভব নয়। এটা এখন জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

“শোনো, আমি রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ বুঝি না, আমি যেটা বুঝি সেটা খুবই সহজ-সরল। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানিদের সাথে আমাদের থাকাটা হলো না কিন্তু গণতন্ত্রের জন্যই। সত্তুরের নির্বাচনের ফলাফল ওরা মেনে নিলো না। আমরা বুঝে গেলাম ওদের সাথে আর থাকা যাবে না। ওরা গণহত্যা শুরু করলো, আমরা রুখে দাঁড়ালাম। নয় মাসের যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলো। এখন যদি তুমি সেই স্বাধীন দেশে গণতন্ত্রকে পাশ কাটাতে চাও তাহলে বুঝতে হবে তোমার চিন্তা-ভাবনায় বিরাট বড় গলদ আছে।”

আমি কোন কথা বললাম না।

“মনে করো তোমাকে আমি এক সের দুধ দিলাম কিন্তু সেটা রাখার জন্য তোমার হাতে কোন পাত্র নাই…তুমি ঐ দুধ কতোক্ষণ দু-হাতে ধরে রাখতে পারবে?”

সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকালাম আমি। রূপকধর্মি কথাটার অর্থ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

“ব্রাদার, দুধ হলো তোমার স্বাধীনতা, উন্নতি, আইনের শাসন, আর পাত্রটা হলো গণতন্ত্র। বুঝেছো?”

আমি আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। “এ কাজে সবাই উনাকে সমর্থন দেবে না। সেটা আমি যেমন জানি আপনিও জানেন।”

সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন হায়দারভাই।

“আপনার ঐ ত্রিশ-বত্রিশ পার্সেন্টের কথা বলছি।”

সত্তুরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ আসনে বিজয়ি হয়েছিলো—এই ধারণার বিপরীতে আরেকটি সত্য হলো, নৌকা আর বঙ্গবন্ধুর অমন জোয়ারের সময়েও বিপক্ষে ভোট পড়েছিলো ত্রিশ-বত্রিশ শতাংশের মতো। অন্যদের মতো হায়দারভাই এটা ভুলে বসেননি। তিনি সব সময় আমাকে এ কথাটা বলে দেশের জনমানুষের সত্যিকারের চিত্রটি তুলে ধরতেন। এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠিকে কিভাবে মোকাবেলা করা হবে তার উপরেই

নাকি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে-তার এমন কথার সাথে অবশ্য আমি একমত পোষণ করতে পারতাম না।

“ওরা তো শেখ মুজিবের নীতি পছন্দ করে না।” তাকে চুপ থাকতে দেখে বললাম আমি। “তাহলে আপনিই বলেন, সবার মেন্ডেট নিয়ে বাকশালের মতো বিরাট বড় কাজ করা কি সম্ভব হবে কোনদিন?”

“আমি সবার কথা বলছি না, আমি বলছি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতের কথা। সেটা কি তুমি পরোয়া করবে না? নাকি তুমি বুঝে গেছো, এখন আর তোমার পাশে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ নেই? যদি তা-ই হয়ে থাকে তাহলে তো তুমিই এরজন্যে দায়ি। ঐ ত্রিশ-বত্রিশকে তুমি দিন দিন বাড়িয়ে তুলছো।” কথাটার ইঙ্গিত বুঝতে অসুবিধা হলো না আমার।

এরকম অনেকক্ষণ ধরে চললো আমাদের রাজনৈতিক তর্ক। বরাবরের মতোই আমি সুবিধা করতে পারলাম না। এটা হতে পারে, যে দলকে আমি সমর্থন করি সে দলের ভুল নীতি কিংবা এসএম হায়দারের ক্ষুরধার যুক্তির কারণে—আমি নিশ্চিত ছিলাম না পুরোপুরি। তবে সঙ্গোপনে নিজেকে প্রবোধ দিতাম, হায়দারভায়ের যুক্তি এমনই, তিনি যদি কোন পক্ষ অবলম্বন করেন তাহলে সেটাই যুক্তিযুক্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন।

এই তর্কের কয়েক দিন পরই, ২৪ শে জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তার দ্বিতীয় বিপ্লব বাকশাল প্রতিষ্ঠিত করলেন। বন্ধ হয়ে গেলো সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ ছাড়া বাকি সব রাজনৈতিক দল। সরকারি সংবাদপত্র ছাড়া বাকি সব পত্রিকাও বন্ধ করে দেয়া হলো। এর আগে ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে জারি করা হয়েছিলো জরুরি অবস্থা।

এদিকে মিলির মামলাটা পড়ে গেলো এক চোরাবালিতে। সেখান থেকে যেন উঠে আসার কোন সম্ভাবনা নেই। ইমতিয়াজকে খুনি আর ধর্ষক হিসেবে প্রমাণ করার সব উপায় একে একে বন্ধ হয়ে গেলো। বুক ফুলিয়ে সদর্পে ঘুরে বেড়াতে লাগলো সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *