কেউ কেউ কথা রাখে – ৩৫

অধ্যায় ৩৫

পলায়ন পর্ব

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আবারো নিজের ঘরে দুয়েকদিন বন্দি থেকে অবশেষে কোনো রকম চিন্তাভাবনা না করেই দরকারি কাপড়চোপড় একটা ব্যাগে ভরে ঘরে তালা মেরে নিজের গ্রামে চলে গেলাম। ঢাকা শহরে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিলো। আমি এই গুমোট আর নৃশংস নীরবতাকে মেনে নিতে পারছিলাম না।

বঙ্গবন্ধুর লাশকে ফেলে রেখেই তার দলের অধিকাংশ নেতা খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন করেছিলো। একাত্তরে যে মানুষটি শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থেকেও ছিলেন মহানায়ক তিনিই কি-না হয়ে উঠলেন কারো কাছে ফেরাউন, কারো কাছে জালেম!

এসব দেখে রীতিমতো ঘেন্না জন্মে গেলো আমার। পালাতে চাইলাম আমি কিন্তু যাবার মতো খুব বেশি জায়গা ছিলো না। তাই পৈতৃক বাড়িতেই আশ্রয় নিলাম।

মাথা গোজার জন্য একটা ভিটে আর বাড়ি ছিলো। অল্পবিস্তর ধানী জমিও রেখে গেছিলেন আমার বাবা, সেগুলো বর্গা দিয়ে রাখলেও খুব কমই খোঁজ খবর রাখতাম। দূর সম্পর্কে এক অভাবী আত্মীয় দেখভাল করতো সে-সব। প্রথমে ভেবেছিলাম কিছুদিনের জন্য গ্রামে থেকে ফিরে আসবো আবার, ঢাকা শহরে কোন চাকরি জুটিয়ে নেবো। কিন্তু কিভাবে যেন সেই কিছুদিন দীর্ঘ হতে হতে মাসখানেক সময় হয়ে গেলো।

বাবা যে স্কুলে আমৃত্যু শিক্ষকতা করেছেন সেই স্কুলে কিছু শিক্ষকের দরকার ছিলো। বিশেষ করে ভালো ইংরেজি শিক্ষকের খুব অভাব ছিলো তখন। একদিন সেই স্কুলের হেডমাস্টার আমাকে বললেন যতোদিন গ্রামে আছি বাচ্চাগুলোকে একটু ইংরেজি পড়াচ্ছি না কেন-শিক্ষকের অভাবে বাচ্চাগুলো ক্লাস করতে পারছে না। আমি এক কথায় রাজি হয়ে গেছিলাম। গ্রামে আমার সারাটা দিন অলস সময়ই কাটতো, সুতরাং সকালের দিকে স্কুলে গিয়ে ঘণ্টাখানেক পড়িয়ে আসলে মন্দ কি।

কিন্তু বাচ্চাগুলোকে পড়াতে গিয়ে কী মজা পেলাম জানি না, খুব সিরিয়াস হয়ে উঠলাম। মাসখানেক পর হেডস্যার ডেকে জানতে চাইলেন, আমি পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়েছি কি-না। তাকে সত্যিটাই বললাম। তখনই তিনি প্রস্তাব দিলেন, যদি আপত্তি না থাকে স্কুলে জয়েন করতে পারি। অনেক খুঁজেও ইংরেজি শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না।

সত্যি বলতে, সেই সময় আমি নিজেকে নিয়তির হাতে সপে দিয়েছিলাম। ঘটনা প্রবাহের স্রোত আমাকে যে-দিকে নিয়ে যাবে সে-দিকেই যাবো। এক ধরণের বৈরাগ্য পেয়ে বসেছিলো। তাই কোন কিছু না ভেবেই স্কুলে পড়ানোর কাজটা নিয়ে নিলাম।

শিক্ষকতা শুরু করার তিন মাস পরই জেগে উঠলো আমার ঘুমন্ত পাঠকসত্তা। মনে পড়ে গেলো ঢাকায় যে বাড়িতে ছিলাম সেটা ছেড়ে আসিনি। বাড়িওয়ালাকেও কিছু বলিনি। পলাশীর ঐ বাড়িতে কিছু আসবাব আর কাগজপত্রের সাথে আছে আমার সমস্ত বইপত্রগুলো। এতদিনে আছে কি নেই কে জানে। তাছাড়া বাড়িওয়ালা আমার কাছ থেকে তার প্রাপ্য ভাড়াও পায়।

স্কুল থেকে দু-তিন দিনের ছুটি নিয়ে আমি নভেম্বর মাসের ১ তারিখে ঢাকায় ফিরে আসি, উঠি মামাতোভাই সামাদের বাসায়। দেশ তখনও টালমাটাল। চারদিকে নানা গুজব। সামাদই আমাকে জানালো, যেকোন সময় আবারো নাকি কিছু একটা হবে। তবে সেটা কি, কেন আর কবে হবে-সে-সব নিয়ে আমার কোন আগ্রহ ছিলো না। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সাথে সাথে আমার রাজনৈতিক আগ্রহেরও সমাধি ঘটে গেছিলো।

পরদিন পলাশীতে গিয়ে দেখি আমার ঘরটা অন্য কেউ ভাড়া নিয়ে নিয়েছে। সম্ভবত বাড়িওয়ালা আমার সমস্ত জিনিসপত্র বিক্রি করে তার পাওনা টাকার কিছুটা আদায় করারও ব্যবস্থা করে ফেলেছেন। তবে আসবাব আর বাকি জিনিসগুলো নিয়ে আমার কোন আক্ষেপ ছিলো না, আমার আক্ষেপ ছিলো তিল তিল করে জমানো প্রিয় বইগুলোর জন্য।

বাড়িওয়ালা ভদ্রলোক আমাকে দেখে বেশ অবাক হয়েছিলেন। তিনি ধরেই নিয়েছিলেন আমি আর ঢাকায় ফিরে আসবো না।

“আপনি তো পুলিশ আছিলেন…আ’মিলীগ করতেন না…পলাইলেন ক্যান?”

তাকে জানালাম ব্যক্তিগত কারণে হুট করে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে হয়েছিলো। যাক, তিনি অবশ্য আমার উধাও হবার ঘটনা নিয়ে বেশি আগ্রহ দেখালেন না। আমাকে জানালেন, আমি এসে নাকি ভালোই করেছি। আর ক- দিন পর এলে আমার জিনিসপত্রগুলো ফিরে পেতাম কি-না সন্দেহ। ওগুলো তিনি পানির দরে বিক্রি করে ভাড়া টাকা তোলার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছিলেন।

আমি যারপরনাই খুশি হয়েছিলাম কথাটা শুনে। তাহলে আমার বইগুলো সব আছে!

বাড়িওয়ালা আমার সব মালপত্র আর বইগুলো চিলেকোঠার একটা ঘরে বস্তাবন্দি করে তালা মেরে রেখে দিয়েছিলেন এই আশায়, আমি হয়তো কোনদিন ওগুলো নিতে আসবো।

বাড়ি ভাড়ার পাওনা টাকা পরিশোধ করে তাকে জানালাম শুধুমাত্র দরকারি কাগজপত্র আর বইগুলো আমি নেবো। আমকাঠের সিঙ্গেল খাট একটা আলনা আর ছোট্ট আলমিরাটা বাড়িওয়লার কাছেই থাকুক। ওগুলো গ্রামে বয়ে নিয়ে যাবার কোন ইচ্ছে আমার নেই। চাইলে তিনি বিক্রি করে দিতে পারেন। আমার কোন দাবি থাকবে না।

গ্রামে ফিরে যাবার আগে আমি চলে গেলাম হায়দারভায়ের বাসায়। ভাবির কোন খোঁজ নিতে পারিনি দীর্ঘদিন। বেচারি কেমন আছে কে জানে। খুবই সঙ্কোচ হচ্ছিলো তার মুখোমুখি হতে। কিন্তু ওখানে কী বিস্ময় আমার জন্য অপেক্ষা করছে সেটা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি।

নীলুভাবি অন্তঃস্বত্ত্বা!

হায়দারভায়ের মৃত্যুর পর পরই তিনি জানতে পারেন তার পেটে অনাগত সন্তান আসছে। এটা জানতে পেরে আমার চোখদুটো ছল ছল করে উঠেছিলো। আমি মিথ্যে সান্ত্বনা দেবার জন্য ভাবিকে বলেছিলাম তাদের যে সন্তান হবে সেটা আমি স্বপ্নে দেখেছি, কিন্তু আমার এমন মিথ্যে প্রবোধ শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়ে গেলো!

পরক্ষণেই মনে পড়ে গেলো হায়দারভায়ের কথা। বেঁচে থাকলে কী করতেন তিনি? অবশ্যই খুশি হতেন। হয়তো আমার কাছে করা প্রতীজ্ঞাটা হাসতে হাসতেই ভেঙে ফেলতেন, আর আমিও সানন্দে যোগ দিতাম তার সঙ্গে!

অবশেষে বিষাদের মধ্যেও সান্ত্বনা খুঁজে পেলাম-এসএম হায়দার পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও তার বীজ রেখে গেছেন।

*

নীলুভাবির সাথে দেখা করে বেশ উৎফুল্ল হয়ে আমি পলাশীতে ফিরে যাবার সময় কী মনে করে যেন মিনহাজের বাসায় চলে গেলাম। কিন্তু ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম, কিছুদিন আগে বাড়িটা ছেড়ে দিয়েছে মিলির স্বামি। ততোক্ষণে ব্যাঙ্ক ছুটি হয়ে গেছে, নইলে ওর ব্যাঙ্কেই চলে যেতাম।

মিনহাজকে না পেয়ে বই আর দরকারি জিনিসগুলো নেবার জন্য পলাশীতে ফিরে গেলাম এরপর। চলে আসার সময় বাড়িওয়ালা আমার কাছে এসে জানালেন, একটা কথা বলতে ভুলে গেছিলেন তিনি। আমি উধাও হয়ে যাবার পর দু-তিনবার এক মেয়ে এসে আমার খোঁজ করেছিলো। নামটা তিনি মনে করতে না পারলেও আমার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিলো না কে এসেছিলো।

রামজিয়া শেহরিন।

এই তিনমাসে তার কথা মনে পড়লেও আমি যেন নিজের তৈরি একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিলাম। সেই ঘোর থেকে বের হবার কোন ইচ্ছে আমার ছিলো না।

বাড়িওয়ালা আরো জানালেন রামজিয়া শেষবার যখন এসেছিলো তখন একটা চিরকুট দিয়ে গেছিলো তার কাছে, আমি এলে যেন তিনি সেটা দিয়ে দেন। ভদ্রলোক জানালেন, আমার দরকারি কাগজ-পত্রের সাথে ওই চিঠিটা রেখে দিয়েছেন। খুঁজলেই পেয়ে যাবো।

প্রচণ্ড আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও গাট্টি-বোচকা খুলে চিঠি খোঁজাটা সমীচিন বলে মনে করিনি, তার বদলে বাড়িওয়ালার কাছে গাট্টি-বোচকাটা আবারো কিছুক্ষণের জন্য রেখে চলে যাই কাছের একটা টেলিফোন-বুথে। রামজিয়ার ফোন নাম্বারটা আমার মুখস্তই ছিলো। কয়েন ফেলে ওর বাসার নাম্বারে ডায়াল করি। ফোনটা ধরলো অল্পবয়সি এক মেয়ে। আমি রামজিয়াকে চাইলে সে হোল্ড করতে বলে চলে গেলো।

কয়েক মুহূর্ত পর তার কণ্ঠটা শুনতে পেলাম দীর্ঘদিন পর।

“হ্যালো?”

নিজের পরিচয় দিলাম আমি, সঙ্গে সঙ্গে ফোনের ওপাশে নেমে এলো নীরবতা।

“তুমি! এতদিন পর?” কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো সে।

“দেশের বাড়িতে চলে গেছিলাম…কাল ঢাকায় এসেছি।” শুধু এটুকুই বলতে পারলাম।

আলতো করে একটা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলাম আমি। তারপরই সে বলে উঠলো, “তুমি আমার চিঠি পাওনি?”

“না, মানে…” কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না। তার চিরকুটটা জরুরি কাগজের মধ্যে আছে। আমি সেটা পড়ে দেখিনি তখনও।

“আ-আজ আমার…গায়েহলুদ।” আস্তে করে বললো সে। “কাল বিয়ে।”

বজ্রাহত হলাম আমি। কিছু বলতে পারলাম না। কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর আমার হাত থেকে রিসিভারটা আস্তে করে পড়ে গেলো। একটা ঘোরের মধ্যে হাটতে শুরু করলাম।

কথাটা শোনার পর আবারো বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠেছিলো আমার। বুঝতে পারলাম, এই শহরের সাথে আমার সব ধরণের লেনদেন চুকে গেছে।

গ্রামের পথে রওনা দেবার আগে আরো একটা জায়গায় যাবার তাড়না বোধ করেছিলাম আমি, কিন্তু নতুন করে প্রচণ্ড দুঃবোধে আক্রান্ত হবার ঝুঁকিটা আর নিতে পারিনি।

গ্রামে পৌঁছাতেই খবর পেলাম জেলখানায় পৈশাচিক একটি ঘটনা ঘটে গেছে। হত্যা করা হয়েছে জাতীয় চার নেতাকে। দেশের অবস্থা টালমাটাল। কে ক্ষমতায় আছে সেটাও পরিস্কার নয়। কখন কী হয়ে যায় বলা যায় না। লোকজন বলাবলি করছে, বঙ্গবন্ধুকে যারা সপরিবারে হত্যা করেছিলো তারাই নাকি এই জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছে।

গ্রামে ফিরে বইপত্র আর কাগজপত্র ঘেঁটে রামজিয়ার চিরকুটটা উদ্ধার করতে পেরেছিলাম আমি। ছোট্ট একটা কাগজ। তাতে সম্বোধন ছাড়া কয়েক লাইনের হাতের লেখা :

আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। বুঝতে পারছি না কী করবো। তোমার সাথে দেখা করতে কেন এসেছিলাম তা-ও জানি না।

শেষ পর্যন্ত পরিবারের কথা মেনে নিতে হলো। ছেলে আমেরিকায় সেটেল্ড। বিয়ের পর পরই ওখানে চলে যাবো। হয়তো তোমার সাথে আর দেখা হবে না। তুমি যে কোথায় হারিয়ে গেলে জানি না।

ভালো থেকো।

রামজিয়া

এই ছোট্ট চিরকুটটা আজো আমার কাছে রয়ে গেছে। মাঝেমধ্যেই ওটা আমি দেখি। কেন দেখি জানি না। দেখে যে খুব ভালো লাগে তা-ও নয়। তার পরও দেখি। দীর্ঘ দুই যুগ ধরেই দেখে আসছি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *