কেউ কেউ কথা রাখে – ৩০

অধ্যায় ৩০

“শূয়োরের বাচ্চা!” টেবিলে ঘুষি মেরে বলে উঠলেন এসএম হায়দার।

থানায় এসে তাকে পুরো ঘটনাটা না বলে আর থাকতে পারিনি। যদিও জানতাম এর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তারপরও এতো বড় একটি ঘটনা তাকে না জানিয়েও কোনো উপায় ছিলো না আমার।

“পুলিশকে পিস্তল দিয়ে ভয় দেখায়! হারামজাদারে আমি…” দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলেন।

“ভাই, মাথা ঠাণ্ডা রাখেন-”

“আরে, রাখো তোমার মাথা ঠাণ্ডা!” আমার কথার মাঝখানে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন তিনি। “এর একটা বিহিত করতেই হবে।”

“কি বিহিত করবেন?” অসহায়ের মতো বলে উঠলাম আমি। “সবার আগে ওর নামে একটা জিডি করতে হবে। এক্ষুণি!”

“এক্ষুণি? ওকে ফোন করে আগে বলতে হবে না, ডিজি করতে রাজি আছে কি-না?”

“কার কথা বলছো?” চটে গেলেন তিনি।

“রা-রামজিয়া?”

“আরে, ধুর্!” যারপরনাই বিরক্ত হলেন এবার। “জিডি তো করবে তুমি…ঐ মেয়ের কথা বলছো কেন! আজব!”

কথাটা শুনে হুঁশ হলো আমার। তাই তো! ইমতিয়াজ আমার সাথে যা করেছে তাতে করে আমারই জিডি করার কথা।

“তুমি না, ইয়ে…” বিরক্তির চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটিয়ে বলে উঠলেন এসএম হায়াদার।

এই ‘ইয়েটা কি আমি জানতাম। কাপুরুষ! ভীতু!

“কোন্ দুঃখে যে পুলিশে ঢুকেছো বুঝি না।” চেয়ারে বসে পড়লেন তিনি। “এতো কম সাহস নিয়ে, এতো নরম মন নিয়ে তুমি এখানে কেমনে টিকে থাকবে, অ্যাঁ?”

মাথা নীচু করে ফেলতে বাধ্য হলাম। আমি আমার সীমাবদ্ধতার কথা ভালো করেই জানতাম। আর পুলিশে ঢোকার পর পর এই সীমাবদ্ধতাগুলো যেন আরো প্রকট হয়ে ধরা পড়েছিলো নিজের কাছে।

রেগেমেগে একটা সিগারেট ধরিয়ে টান দিতে শুরু করলেন হায়দারভাই, আমাকে কোন সিগারেট সাধলেন না। বুঝতে পারলাম, তার চোখে এখন আমি পুলিশের কলঙ্ক।

“আরে, মর জ্বালা! বসে আছো কেন?” রেগেমেগে আমার দিকে তাকালেন। “যাও, এক্ষুণি জিডি করে ফেলো। ও পিস্তল দিয়ে তোমাকে গুলি করতে চেয়েছিলো…প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে…বুঝলে?”

আমি ঢোক গিললাম।

“ঐ মেয়ের চ্যাপ্টার বাদ! তুমি একটা কাজে গেছিলে ধানমণ্ডিতে, তখন সে তোমাকে এই হুমকি দিয়েছে। মিলির কেসটা নিয়ে যেন বাড়াবাড়ি না করো সেটাও বলেছে, ঠিক আছে?”

আমি বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। বুঝতে পারছিলাম, ইমতিয়াজকে আইনের জালে আটকে ফেলার জন্য ঘটনাটা এভাবে সাজাতে চাইছেন তিনি।

কথামতোই কাজ করলাম আমি। না করে উপায় নেই। এমনিতেই হায়দারভাই রেগে ছিলেন, আমি যদি তার সাথে সামান্যতমও দ্বিমত পোষণ করতাম তাহলে হয়তো আমার উপরেই চড়াও হতেন। তাছাড়া আমিও চাইছিলাম ইমতিয়াজের ব্যাপারে একটা বিহিত করা হোক। জামিনে বের হয়ে আসার পর থেকে সে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছে। সাক্ষিদের ভয়-ভীতি দেখানো থেকে শুরু করে আমার সাথে অমন বেপরোয়া আচরণ-তারচেয়েও বড় কথা, রামজিয়ার বাড়ির সামনে ঘুর ঘুর করছে আজকাল। তার মতলবটা কি?

ইমতিয়াজের কথাগুলো কানে বাজতে লাগলো। অপমানের চাবুক যেন আমাকে ক্ষত-বিক্ষত করে তুললো ভেতরে ভেতরে।

আমি জিডি করার পর পরই হায়দারভাই একটা টিম নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন, আমাকে সঙ্গে নিলেন না। কোথায় যাচ্ছেন-কি করবেন- সে কথা বলার সাহসও দেখাতে পারলাম না আমি।

ঐদিন আমার নাইট-শিফটের ডিউটি ছিলো। হায়দারভাই চলে যাবার পর থানা থেকে আর বের হইনি। রাত আটটার পর টহল দল নিয়ে বের হতে যাবো অমনি ফিরে এলেন তিনি। সঙ্গে করে নিয়ে এলেন হাতকড়া পরা এক আসামিকে।

ইমতিয়াজ!

থানায় যখন ঢুকলেন তখনও হায়দারভায়ের চেহারায় রাগের কোন কমতি নেই। আমার সাথে চোখাচোখি হলেও কিছুই বললেন না। আসামিকে নিয়ে সোজা চলে গেলেন গারদের পাশে টর্চার রুমে। আমি চুপচাপ দেখে গেলাম সেই দৃশ্য।

যেমনটা ভেবেছিলাম, একটু পরই সেই ঘর থেকে ভেসে আসতে লাগলো ইমতিয়াজের আর্তনাদ আর গালাগালি। হায়দারভায়ের প্রতিটা মারের জবাবে সে হুমকি-ধামকি দিয়ে যেতে লাগলো।

ওসিসাহেব তখন থানায় নেই, ফলে হায়দারভায়ের জন্য দারুণ সুযোগ তৈরি হয়ে গেলো। দশ মিনিট পর ঘেমে-টেমে একাকার হয়ে বের হয়ে এলেন তিনি। হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক, অল্পতেই ক্ষান্ত হয়েছেন এবার।

“ইয়াসিন?” এক কনস্টেবলকে ডাকলেন তিনি। “থানার সবগুলো টেলিফোনের রিসিভার তুলে রাখো।”

হায় আল্লাহ্! মনে মনে প্রমাদ গুণলাম।

“সবগুলো?” ইয়াসিন নিশ্চিত হতে চাইলো।

“বললাম না, সব!” চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। ইয়াসিন আর কোন কথা না

বলে কাজে লেগে গেলো।

আমার দিকে তাকালে কিছু বলার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম কিন্তু তিনি আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দ্রুত ফিরে গেলেন সেই ঘরে।

ইমতিয়াজের মার খাওয়ার শব্দ আর শুনতে ইচ্ছে করলো না। থানা থেকে বের হয়ে গেলাম পেট্রল ডিউটি দেবার জন্য।

*

পরদিন ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে তাকে কোর্টে তুললে তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়ে যায়, দ্বিতীয়বারের মতো জেলে পাঠানো হয় তাকে।

ঐদিন রাতে থানায় ফিরে ওসি আলী ইকরাম অবশ্য ইমতিয়াজের পক্ষ নিয়ে কিছু বলেনি। তার নিজের অধীনে থাকা একজন অফিসারের সাথে ইমতিয়াজ যে আচরণ করেছে সেটা জানার পর আমাকে ডেকে জানতে চেয়েছিলো, আসামির বিরুদ্ধে আমি যে অভিযোগ করেছি সেটা সত্যি কি- না। এমন প্রশ্নে জোর দিয়েই বলেছিলাম, সবটাই সত্যি। এরপর ওসিসাহেব আর কিছু বলেনি।

কিন্তু ইমতিয়াজের কারাবাসের মেয়াদ ছিলো মাত্র পনেরো দিনের এরপরই সে আবারো জামিনে বের হয়ে আসে। যথারীতি হতাশ হয়ে পড়েন হায়দারভাই। এ ব্যাপারে আমাদের কারোর কিছু করার ছিলো না। খুবই অসহায় লেগেছিলো তখন।

যাই হোক, দ্বিতীয়বার জামিনে বের হয়ে এসে ইমতিয়াজ একেবারে ঘাপটি মেরে রইলো। তাকে কোথাও দেখা যেতো না। তার কোন খবরও আমরা পেতাম না। এমনকি রামজিয়ার বাড়ির আশেপাশেও তাকে আর দেখা যায়নি। বিহারিকাশেমের মাধ্যমে হায়দারভাই জানতে পেরেছিলেন, ধানমণ্ডির দখল করা বাড়িতে আর থাকছে না সে। এসব কারণে আমার মনে হয়েছিলো, সে বোধহয় বুঝতে পেরেছে আগের মতো বেপরোয়া আচরণ আর করা যাবে না।

এদিকে সাক্ষির অভাব, থানার ওসির অসহযোগিতা, সব মিলিয়ে মিলির হত্যা-মামলার চার্জশিট দিতে দেরি হচ্ছিলো। হায়দারভায়ের করার কিছুই ছিলো না। তারপরও হাল ছেড়ে না দিয়ে চেষ্টা করে গেলেন তিনি।

এই সময়ের মধ্যে মিলির স্বামি মিনহাজের সাথে আমার দু-বার দেখা হয়েছে। দু-বারই আমি তাকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিয়েছিলাম। তবে সে ঠিকই বুঝে গেছিলো, মিলির কেসটার কোন ভবিষ্যৎ নেই। এ কথা আমার সামনে প্রকাশ করতেও দ্বিধা করেনি।

রামজিয়ার সাথে আমার যোগাযোগ আগের চেয়ে অনেক কমে গেছিলো। এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র একবার, ইমতিয়াজ জেলে যাবার পর কথা হয়েছিলো তার সঙ্গে, তা-ও ফোনে। কিন্তু আমাদের আর দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি। বই লেন-দেনও বন্ধ ছিলো। তার সঙ্গে দেখা করতে কেমন সঙ্কোচ বোধ হতো আমার। হঠাৎ মনে পড়ে গেলো শেষবার একটা বই ধার দিয়েছিলো আমাকে সেটা আর ফেরত দেয়া হয়নি। বইটা অনেক আগেই পড়ে শেষ করে ফেলেছিলাম যদিও, তারপর নানান ঘটনার কারণে আর মনে ছিলো না। তাকে ফোন করে বই ফেরত দেবার কথা জানালাম তাই। রামজিয়া বললো, বইটা ফেরত দিতে হবে না। ওটা আপনি গিফট হিসেবে রেখে দিন। তার কণ্ঠ কেমন ম্রিয়মান শোনালো। ধরে নিলাম শরীর খারাপ। কিংবা মন!

“মনে করুন, আপনার বার্থ ডে গিফট এটা।” বলেছিলো সে।

“আমার জন্মদিন তো এখনও আসেনি,”

“আপনার বার্থ ডে কবে?”

আমি তাকে আমার জন্ম তারিখের কথাটা বললাম, যে জন্মদিন এ জীবনে আর পালন করা হয়নি।

“ও, তাহলে তো বেশ দেরি আছে।” একটু থেমে আবার বলেছিলো, “ধরে নিন এটা অ্যাডভান্স গিফট।”

“আপনার জন্মদিন কবে?” সৌজন্যতার খাতিরেই জানতে চাইলাম। “অনেক দেরি…অক্টোবরে,” আরো বিষন্ন কণ্ঠে বললো সে।

“ও।” আর কোন কথা খুঁজে না পেয়ে জানতে চাইলাম তার মন খারাপ কি-না।

“হুম।”

অকপটেই বলে দিলো। কোন ভনিতা কিংবা সৌজন্যতা দেখালো না। যেমনটা আমরা সচরাচর করি।

“কেন? কি হয়েছে?”

“বাসায় ঝগড়া করেছি।”

আমি আর কিছু জানতে চাইলাম না। এটা একেবারেই তাদের নিজেদের ব্যাপার। এসব জানতে চাওয়ার মতো ঘনিষ্ঠতা আমাদের মধ্যে গড়ে ওঠেনি।

“বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে খুব,” নিজে থেকেই বললো।

“ও,” আমি আবারো টের পেলাম তার বিয়ের কথা শুনে বুকের গহীনে কোথাও মোচড় দিয়ে উঠছে।

“বাদ দিন এসব। আপনার কি খবর? ইমতিয়াজের কোন খবর জানেন? মিলির কেসটার কি হলো?” এক নাগারে প্রশ্নগুলো করে বসলো সে।

আমি চারপাশটা চকিতে দেখে নিলাম। কমপক্ষে তিন জোড়া চোরাচোখ আমার দিকে নিবদ্ধ। না জানি কয় জোড়া কান খাড়া হয়ে আছে আশেপাশে।

“এই তো, চলে যাচ্ছে,” খুবই আস্তে করে বললাম, অযাচিত কান পর্যন্ত যেন সেগুলো না পৌঁছায়। “দু-সপ্তাহ আগে জামিনে বের হয়েছে, আর কোন সাড়া শব্দ নেই।” ইমতিয়াজের নাম উল্লেখ না করেই বললাম। “আর ওটার কোন অগ্রগতি নেই। আগের অবস্থায়ই আছে।”

“হুম,” বললো সে।

আর কোন কথা খুঁজে না পেয়ে আমি বলে উঠলাম, “ঠিক আছে, আজ রাখি। ভালো থাকবেন।”

“আপনিও ভালো থাকবেন। বাই।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *