কেউ কেউ কথা রাখে – ১৫

অধ্যায় ১৫

স্বীকারোক্তি

ভেবেছিলাম ইমতিয়াজকে থানায় নিয়ে আসার পর হায়দারভাই তার উপরে চড়াও হবেন কিন্তু দেখা গেলো তিনি একদম শান্ত হয়ে গেলেন। ব্যাপারটা আমার কাছে অস্বাভাবিক বলেই মনে হলো। মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম মিলির খুনির উপরে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লে তাকে কিভাবে বিরত রাখবো।

থানায় লকাপের পাশে একটা খালি ঘর, ওটাকেই আমরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যবহার করি, ইমতিয়াজকে ওই ঘরে বসিয়ে রেখে হায়দারভাই আমাকে নিয়ে বাইরে চলে এলেন। আমি নিজের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিলে তিনি সেটা ধরিয়ে উদাস হয়ে টানতে লাগলেন।

“এখন মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে হবে,” কিছুক্ষণ পর ধোঁয়া ছেড়ে বললেন।

আমিও একটা ধরিয়ে টান দিলাম। “হুম।”

“আমরা মোটামুটি নিশ্চিত খুনটা ও-ই করেছে, কিন্তু এটা ওর মুখ দিয়ে বের করতে হবে।”

মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “এতো সহজে মুখ খুলবে বলে তো মনে হয় না।”

“কেউই সহজে মুখ খোলে না, খোলাতে হয়।” উদাস হয়ে সিগারেটে টান দিতে দিতে বললেন এসএম হায়দার।

“আপনি টর্চার করবেন নাকি?”

আমি অবশ্য এর আগে মাত্র একবারই হায়দারভাইকে আসামি ধরে এনে টর্চার করতে দেখেছি। তবে সেটার কারণ ছিলো একদমই ভিন্ন। গত বছর সরকারের কড়া নিষেধ থাকা সত্ত্বেও আকালের সময় এক ব্যবসায়ি খাদ্যদ্রব্য স্টক করে রেখেছিলো। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে এলে হায়দারভাই হঠাৎ করেই তার উপরে চড়াও হন। নিজের বেল্ট খুলে আচ্ছামতো পেটান লোকটাকে। আমরা দু-তিনজন তাকে ধরে নিবৃত্ত করেছিলাম। পরে হায়দারভায়ের কাছে যখন জানতে চেয়েছিলাম আচমকা তার এমন আচরণের কারণ, তখন তিনি বলেছিলেন, এই ব্যবসায়ি সরকারি দলের স্থানীয় এক নেতা। ওর বিরুদ্ধে কোনো কেস করা যাবে না। করলেও লাভ নেই। কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বেরিয়ে পড়বে। তাছাড়া একটু পরই যে দলের নেতারা ফোন করে ছেড়ে দিতে বলবে সেটা তিনি নিশ্চিত জানতেন। আদতে তা-ই হয়েছিলো। সেজন্যেই ছেড়ে দেবার আগে একটু ‘ধোলাই’ করে দিয়েছিলেন।

লম্বা করে ধোয়া গিলে মাথা দোলালেন তিনি। “না। প্রথমে কিছুই করবো না।”

“কিন্তু ও যদি কোনো কিছু না বলে, তখন?”

আমার দিকে তাকালেন। “যখন যেটা করতে হবে সেটাই করবো, ব্রাদার।”

আমি কিছু না বলে সিগারেটের দিকে নজর দিলাম।

“যেভাবেই হোক ওর কাছ থেকে কথা বের করতে হবে।”

“ছেলেটা তো রাজনীতি করে, নেতারা ফোন করতে পারে।”

“কোনো ফোনেই কাজ হবে না,” কথাটা বেশ জোর দিয়ে বললেন তিনি। “যে ফোন করবে তাকে আমার স্পেশাল গালি খেতে হবে আজ।”

এসএম হায়দারের স্পেশাল গালাগালিগুলোর সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছিলো আমার।

সিগারেট শেষ করে আমি আর হায়দারভাই ঢুকলাম সেই ঘরে।

ইমতিয়াজ চেয়ারে বসে আছে। চোখেমুখে ভড়কে যাবার লক্ষণ। আমাদের দেখে মুখ তুলে তাকালো সে।

হায়দারভাই তার সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসলো। “ওঠ,” আদেশের সুরে বললেন তিনি।

ঢোক গিলে আস্তে করে উঠে দাঁড়ালো আমাদের সন্দেহভাজন।

ইমতিয়াজ যে চেয়ারে বসেছিলো এতোক্ষণ সেটায় বসে পড়লেন হায়দারভাই। “বস্,” আসামিকে বসার নির্দেশ দিলেন তিনি।

ইমতিয়াজ আশেপাশে একটু তাকালো। ঘরে আর কোনো চেয়ার নেই। “মাটিতে বস্,” হায়দারভাই শীতলকণ্ঠে বললেন।

ইমতিয়াজ মাটিতে বসে পড়লো চুপচাপ। তার চোখমুখ দেখে মনে হলো অপমানিত বোধ করছে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম হায়দারভায়ের পাশে।

“তোর নাম কি?”

ইমতিয়াজ সম্ভবত এমন প্রশ্ন আশা করেনি। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থেকে বললো, “ই-ইমতিয়াজ।” একটু ঢোক গিলে নিলো এবার। “ইমতিয়াজ শফিক।”

“কি করিস?”

অধৈর্য হয়ে উঠলো সন্দেহভাজন। “আ-আমাকে ধরে এনেছেন কেন? আমি কি করেছি?”

হায়দারভায়ের অভিব্যক্তি একটুও বদলালো না। নির্বিকার ভঙ্গিতে তিনি বললেন, “কেন ধরে এনেছি সেটা তুই ভালো করেই জানিস। এখন যা জানতে চাইবো আমাকে বলবি।” একটু থেমে আবার বললেন, “কি করিস? মানে, কাজ-কামের কথা বলছি।”

ঘন ঘন চোখের পাতা ফেললো ইমতিয়াজ। একটু সময় নিলো প্রশ্নের জবাব দিতে। “কিছু করি না।” অবশেষে বেশ তিক্ততার সাথে বললো সে।

“থাকিস কোথায়?”

“কাঠালবাগানে।”

“হারামির বাচ্চা, তাহলে দখল করা বাড়িতে থাকিস কেন?!” ইমতিয়াজ চুপ মেরে গেলো।

“ইতর-বদমাশ নেতাদের চামচা নাকি লাঠিয়াল? কোন্‌টা বলবো?” ইমতিয়াজ রেগেমেগে বলে উঠলো, “আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, আমাকে এখানে কেন ধরে এনছেন? আমি কি করেছি?”

মুচকি হাসলেন হায়দারভাই। “জান্নাতুল ফেরদৌস মিলিকে চিনিস তো?”

সন্দেহভাজন দ্রুত ভেবে যেতে লাগলো, সে বুঝতে পারছে না কী বলবে।

হায়দারভাই তার চোখের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন। এমন অন্তর্ভেদি দৃষ্টিতে বিদ্ধ হয়ে ইমতিয়াজ একটু ভড়কেই গেলো। “চিনিস ওকে?”

“হুম,” আস্তে করে বললো সে।

“কিভাবে চিনিস? কতোদিন ধরে চিনিস?”

ইমতিয়াজ বেশ সময় নিলো এই প্রশ্নের জবাব দিতে। “আমাদের দুরসম্পর্কের আত্মীয় হয়। কিন্তু মিলির কথা কেন জিজ্ঞেস করছেন?”

হায়দারভাই পায়ের উপর পা তুলে দিলেন। “কেন জিজ্ঞেস করছি বুঝতে পারছিস না?”

“না। আমার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। আমি কি করেছি?”

“কিছু না করলে নিজের বাড়িতে কেন থাকিস না? আমাদের দেখে ওভাবে পালালি কেন?”

ইমতিয়াজ জোর করে অবাক হবার ভঙ্গি করলো। “আরে, আপনারা দু-জন আমাকে দেখে দৌড়ানি দিলেন…ভয় পাবো না?”

“আচ্ছা। আর বাড়িতে কেন থাকিস না?”

“বাবার সাথে রাগারাগি করে থাকি না। কাজকর্ম কিছু করি না… বাবা এটা নিয়ে সব সময় কথা শোনায়।”

মাথা নেড়ে সায় দিলেন হায়দারভাই। “ভালো। খুব ভালো। ইমতিয়াজ কিছু বুঝতে না পেরে চেয়ে রইলো।

“মিলি তো তোর আত্মীয় হয় তাহলে মেয়েটা খুন হবার পর ওর বাড়িতে গেলি না কেন? ওর অনেক আত্মীয়-স্বজনই গেছিলো…তোরও তো যাওয়ার কথা, তাই না?”

“মিলি খুন হয়েছে?” তার অভিনয়টা বেশ কাঁচা বলে মনে হলো আমার কাছে। “কই, আমি তো জানি না!”

“তোর মা জানে আর তুই জানিস না?”

“মিলি খুন হবার পর তো বাসায় যাইনি, জানবো কিভাবে?”

হায়দারভাই পাশে ফিরে আমার দিকে তাকালেন। “ও তো কিছু জানে না…কাকে ধরে আনলাম?” তারপর বাঁকাহাসি দিয়ে তাকালেন খুনির দিকে। “শূয়োরেরবাচ্চা! আমি কি তোকে বলেছি মিলি কবে খুন হয়েছে?”

ইমতিয়াজ বুঝতে পারলো বেফাঁস কিছু বলে ফেলেছে। একটু ঘাবড়ে গেলো সে।

“অথচ বলছিস, মেয়েটা খুন হবার পর আর বাড়িতে যাসনি! তার মানে মিলি কবে মারা গেছে তুই জানিস।” মাথা দোলালেন হায়দারভাই। “দারুণ। বুঝতে পারছি তুই অনেক স্মার্ট।”

রাগে আমার গা জ্বলে যাচ্ছিলো। ইমতিয়াজ যে খুনি সে-ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহ নেই।

“মিলির সাথে কি তোর কোনো সম্পর্ক ছিলো?”

“আমাদের আত্মীয় হয়।

“আর কিছু?”

অনেকক্ষণ পর মাথা দুলিয়ে জানালো ইমতিয়াজ, “না।”

একটু সময় নিয়ে হায়দারভাই বললেন, “ও যেদিন খুন হয় সেদিন তুই কোথায় ছিলি? কার সাথে ছিলি?”

‘পার্টি অফিসে ছিলাম।”

“কখন?”

মনে করার চেষ্টা করলো সে। “চারটার দিকে?”

“চারটার দিকে? মিলি যখন খুন হয় ঠিক তখনই?” কথাটা বলেই আমার দিকে তাকালেন হায়দারভাই। এরপর আরো শীতলকণ্ঠে বললেন, “তুই কেমনে জানলি ঠিক ঐ সময়ই মিলি খুন হয়েছিলো?”

ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে রইলো ইমতিয়াজ শফিক। “মা-মানে?” তোতলালো একটু।

“মানে, তুই তো জানতি না মিলি কখন খুন হয়েছে, তাহলে নিজেকে বাঁচানোর জন্য কিভাবে বলছিস ঐদিন চারটর দিকে পার্টি অফিসে ছিলি। এত সময় থাকতে ঠিক ঐ সময়ের কথা বলছিস কেন? টাইমটা তো একেবারে মিলে যাচ্ছে! অ্যালিবাই তৈরি করতে চাচ্ছিস, সেটা না-হয় বুঝলাম কিন্তু এভাবে বোকার মতো সব কিছু সাজিয়ে বললে তো ধরা খেয়ে যাবি।”

“আপনি কি বলছেন, বুঝতে পারছি না,” ইমতিয়াজ না বোঝার ভান করলো।

“তোর বোঝার দরকার নেই, আমার যা বোঝার বুঝে গেছি।”

আমি অনেক আগেই নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম খুনটা ইমতিয়াজ করেছে, সেই মুহূর্তে আমার এই শক্তপোক্ত বিশ্বাস আরো জোড়ালো হয়ে উঠতে শুরু করলো। খুনিকে সামনে বসে থাকতে দেখে রাগে-ঘৃণায় কাঁপতে লাগলো আমার সারা শরীর।

“তাহলে শোন। একটা কালো ছাতা নিয়ে তুই মিলিদের বাড়িতে গেছিলি,” একদম শান্তকণ্ঠে বললেন হায়দারভাই, “তুই মিলির ঘরের দরজার সামনে যখন কলিংবেল বাজাচ্ছিলি তখন দোতলার সিঁড়ি থেকে তোকে একজন দেখে ফেলেছে।”

কথাগুলো ইমতিয়াজের মধ্যে কি রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে দেখার জন্য একটু বিরতি দিলেন এসএম হায়দার।

আমাদের সামনে বসে থাকা মিলির খুনি পুরোপুরি ভড়কে গেলো কথাটা শুনে। সে অনেক চেষ্টা করেও অভিব্যক্তি লুকিয়ে রাখতে পারলো না।

“মিলিদের বাড়ির সামনে যে মুদি দোকানটা আছে, সেই মুদি আমাদের বলেছে ঘটনার কয়েকদিন আগে থেকে তুই নিয়মিত ঐ বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করতি।”

ইমতিয়াজ রীতিমতো অস্থির হয়ে উঠলো। তার শ্বাসপ্রশ্বাস যে দ্রুত হয়ে গেছে সেটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম আমরা।

“তোর মা আমাদের বলেছে, মিলির খুন হবার পর থেকে তুই বাড়িতে থাকা বন্ধ করেছিস। ধানমণ্ডির একটা দখল হওয়া বাড়িতে থাকিস তুই। পুলিশ যে তোর বাড়িতে গেছিলো সেটা জানার পর কাপড়-চোপর নিয়ে বাড়ি থেকে চলে গেছিলি। আমরা ধানমণ্ডির ঐ বাড়িতে ঢোকার আগে দোতলা থেকে দেখে দেয়াল টপকে পালালি। একটুর জন্যে তোকে আমরা ধরতে পারিনি।”

ইমতিয়াজের মুখে কোনো রা নেই। তার চোখেমুখে অস্থিরতা। একটু ঘেমেও উঠলো তার কপাল।

“খুন হবার আগে শেষ কবে মিলির সাথে তোর দেখা হয়েছিলো?” একেবারে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন হায়দারভাই।

ইমতিয়াজ শফিকের কপালে হালকা ভাঁজ পড়লো এ সময়।

“ওর সাথে শেষ কবে তোর কথা হয়েছে?”

ঢোক গিললো খুনি। “অ-অনেকদিন আগে।”

“অনেকদিন বলতে কতোদিন?”

আবারো ঢোক গিললো ইমতিয়াজ। “এ-এক দেড়-বছর…বেশিও হতে পারে।”

হায়দারভাই কিছু বলার আগেই আমি পকেট থেকে একটা ছবি বের করলাম। মিনহাজের কাছ থেকে এটা আমি নিয়েছিলাম-গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে তোলা একটি গ্রুপ ছবি।

সম্ভবত চোখের কোণ দিয়ে হায়দারভাই আমাকে ছবিটা বের করতে দেখেছিলেন, তিনি ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে থেকেই হাত বাড়িয়ে ছবিটা নিয়ে নিলেন আমার হাত থেকে। মেঝেতে বসে থাকা ইমতিয়াজের চোখের সামনে মেলে ধরলেন ওটা।

“হুটহাট করে এভাবে মিথ্যে বললে আদালতের বিচারক বুঝে যাবেন তুই একটা পাক্কা বদমাশ। তোর উকিল তখন কিছুই করতে পারবে না। ফাঁসি ঠেকানো সম্ভব হবে না রে, হারামখোর।”

ইমতিয়াজের দৃষ্টিতে ভয় আর অবিশ্বাস মিলেমিশে একাকার। চোখ পিটপিট করে চেয়ে রইলো ছবিটার দিকে। হায়দারভায়ের প্রতিটি কথায় যেন চমকে উঠলো সে।

“তোকে পিটিয়ে কথা বের করার কোনো দরকারই নেই… ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য শক্ত প্রমাণ আছে আমাদের হাতে।”

বুঝতে পারলাম, হায়দারভাই চাইছেন ইমতিয়াজকে মানসিকভাবে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে।

“তুই অস্বীকার করলি নাকি স্বীকার করলি তাতে কিছুই যায় আসে না,’ কথাটা একটু হেসেই বললেন তিনি। “এটা নিয়ে আমরা মোটেও ভাবছি না। আমরা শুধু তোকে কিভাবে ধরা যায় সেটা নিয়ে টেনশনে ছিলাম।” হাফ ছাড়লেন এবার। “অবশেষে বহুকষ্টে তোকে ধরতে পেরেছি। এখন আর চিন্তা নেই।”

ইমতিয়াজের মধ্যে রাগ-ভয় আর উত্তেজনা দেখা দিলো। দম ফুরিয়ে যেন হাফাচ্ছে সে। হায়দারভাই তাকে আর কিছু না বলে চুপচাপ বসে রইলেন। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সামনে বসে থাকা খুনির দিকে। এভাবে কয়েক মিনিট চলে গেলো। আমি মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম সব। ইমতিয়াজ চেষ্টা করে গেলো তার এলোমেলো চিন্তাভাবনাগুলো গুছিয়ে নিতে। স্পষ্টতই সে বিপর্যস্ত।

“সব কিছু ভালোমতো স্বীকার করলে হয়তো বিচারক দয়া করে তোকে ফাঁসি না-ও দিতে পারে।”

ভালো করেই জানতাম হায়দারভায়ের কথাটা মোটেও সত্যি নয়। সিনেমায় এসব নাটকিয় ডায়লগ থাকে। প্রচুর মানুষ আছে যারা এমন কথায় বিশ্বাসও করে। তাদের ধারণা, খুনের কথা, অপরাধের কথা স্বীকার করলে শাস্তি কমে যায়। বাস্তবতা হলো, এতে একবিন্দুও শাস্তি কমে না। কমে শুধুমাত্র মামলা আর আদালতের মূল্যবান সময়।

“হত্যা-ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, তবে যাবজ্জীবনও দেয়া হয় অনেককে। ভাগ্য ভালো থাকলে তোর কপালে ফাঁসি না-ও জুটতে পারে।”

ইমতিয়াজ চোখমুখ কুচকে চেয়ে রইলো হায়দারভায়ের দিকে।

“ফাঁসিতে ঝুলে মরে যাওয়ার চেয়ে যাবজ্জীবন অনেক ভালো। অন্তত বেঁচে থাকা যায়।”

আমার দিকে তাকালো ইমতিয়াজ। আমি যে তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে আছি সেটা দেখতে পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে মুখটা সরিয়ে নিলো। কিন্তু ততোক্ষণে একটা জিনিস আমার চোখে পড়ে গেছে। সামনের দিকে ঝুঁকে ইমতিয়াজের বাম-কানের দিকে ভালো করে তাকালাম আমি। একটা পুরনো আঁচড়ের দাগ! শুধু কানের উপরেই নয়, কানের ঠিক পেছনেও আছে আরেকটা।

“ভাই, এটা দেখছেন?” আসামির বাম কানটা দেখিয়ে বললাম।

হায়দারভাইও ঝুঁকে এলেন ইমতিয়াজের দিকে। ছেলেটা মুখ সরিয়ে নেবার চেষ্টা করতেই আমি তার চুল মুঠি করে ধরে ফেললাম শক্ত করে।

“এটা কেমনে হয়েছে, বল্‌?”

আমার প্রশ্নে কোনো জবাব দিলো না ইমতিয়াজ।

হায়দারভাই মুচকি হাসলেন। “আলামত আর সাক্ষি-প্রমাণ তো দেখছি বেড়েই চলছে।”

ইমতিয়াজকে ছেড়ে দিয়ে আবার আগের জায়গা চলে এলাম আমি। “ওর শরীরে নিশ্চয় আরো কিছু চিহ্ন আছে, হায়দারভাই।”

আমার কথায় মাথা নেড়ে সায় দিলেন তিনি। “অবশ্যই আছে। থাকারই কথা। মেয়েটার সাথে জবরদস্তি করার সময় হয়েছে।” একটু থেমে আবার বললেন, “মিলির হাতের নখ দেখেছিলে? বেশ বড় বড়। মেয়েটা নিশ্চয় বাঁচার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। এই শূয়োরটার গায়ে অনেক খামচির দাগ থাকার কথা।”

“আমি কি ওর শার্টটটা খুলে দেখবো?”

“আস্তে, ব্রাদার,” হাত তুলে আমাকে নিবৃত্ত করলেন তিনি। “আমাদের হাতে অনেক সময় আছে। আগে দেখি, ও নিজে থেকে কিছু বলে কি-না।”

“আমি কিচ্ছু বলবো না!” গর্জে ওঠার চেষ্টা করলো ইমতিয়াজ। “আমি কোনো খুন করিনি! কিছু করিনি!”

হায়দারভায়ের অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন হলো না, নির্বিকারভাবে চেয়ে রইলেন তিনি।

“তাহলে এই দাগগুলো কিসের? কিভাবে হলো?” আমি রেগেমেগে বলে উঠলাম।

“আ-আমি যুদ্ধ করেছি…” একটু তোতলালো ইমতিয়াজ। “মি- মিলিটারির কাছে ধরা পড়েছিলাম…ও-ওরা টর্চার করেছে।”

বাঁকাহাসি ফুটে উঠলো এসএম হায়দারের ঠোঁটে। “এটা মিলিটারির মারের দাগ! ওরা বাঙালিদের ধরে ধরে খামচি দিতো?! শালা!” বলেই চোখমুখ তিক্ত করে ফেললেন তিনি। “তিন-চার বছরের পুরনো পাকিদের খামচির দাগ?!”

ইমতিয়াজ কোনো জবাব দিলো না।

“কোন্ সেক্টরে যুদ্ধ করেছিস, তুই?”

একটু ঢোক গিললো খুনি। “আ-আমি বিএলএফ-এ ছিলাম।”

সঙ্গে সঙ্গে হায়দারভায়ের চোখমুখ কুচকে গেলো। পায়ের উপর থেকে পা-টা নামিয়ে নিলেন তিনি। “তুই মুজিববাহিনীতে ছিলি?”

ইমতিয়াজ কিছু বললো না। তবে তার চোখমুখ দেখে আমার মনে হলো সে প্রাথমিক ধাক্কা আর বিপর্যস্ততা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছে।

“তোরা আবার যুদ্ধ করেছিস নাকি?! তোরা তো মুক্তিযোদ্ধাদের পেছনে লেগে থাকতি…যুদ্ধ করলি কবে? কয়টা পাকি মেরেছিস, অ্যাঁ? কয়টা গুলি করেছিস ফ্রন্টিয়ারে গিয়ে? তোরা হলি সিক্সটিং ডিভিশনের ফাইটার!” এতোক্ষণ ধরে নিজেকে শান্ত রেখেছিলেন হায়দারভাই, সেটা যেন নিমেষে ভেঙে পড়লো এবার।

“না, আমরা যুদ্ধ করিনি! তোরা যুদ্ধ করেছিস!” রাগে ফুসে উঠলো ইমিতিয়াজ। “শালার কোলাবরেটর! ভেবেছিস আমরা জানি না? ঢাকায় বসে বসে পাকিস্তানিদের ফয়ফরমাশ খেটেছিস নয়টা মাস! এখন বড় বড় কথা বলছিস্!”

ইমতিয়াজের কাছ থেকে এমন জবাব আমি কিংবা হায়দারভাই, কেউই আশা করিনি। নিজেকে আর সামলে রাখতে পারলেন না এসএম হায়দার। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। আমাকে বললেন ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতে। আমি দ্বিধাগ্রস্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে ধমক দিয়ে উঠলেন।

“দরজা বন্ধ করতে বললাম না!”

দরজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় মনে মনে প্রমাদ গুনলাম আমি। ভালো করেই জানি ইমতিয়াজ কতো বড় ভুল করে ফেলেছে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এসএম হায়দারকে কটাক্ষ করা! তাকে কোলাবরেটর বলা! ইমতিয়াজ যদি জানতো এই মানুষটি কতো বড় মুক্তিযোদ্ধা তাহলে নিশ্চয় এমন ভুল করতো না।

আমি যে-ই না দরজার ছিটকিনি লাগাবো অমনি পেছন থেকে শুনতে পেলাম তীব্র একটা আর্তনাদ। ঘুরে দেখি ততোক্ষণে কোমরের বেল্ট খুলে ফেলেছেন হায়দারভাই। ইমতিয়াজকে সেটা দিয়েই সমানে পেটাতে শুরু করেছেন।

“শূয়োরেরবাচ্চা! আমি কোলাবরেটর!? আমি ঢাকায় বসে বসে পাকিদের…” রাগে আর ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিলেন, দম ফুরিয়ে হাপাচ্ছেন তিনি। সপাং করে বেল্ট দিয়ে আরেকটা আঘাত করলেন।

“ওই! গায়ে হাত তুলবি না!” ইমতিয়াজ গর্জে উঠলো আবার। “খবরদার! একটারেও ছাড়বো না! ভালো হবে না কিন্তু!”

হায়দারভায়ের বেল্টের আঘাত থেকে বাঁচতে নিজেকে কোনোরকমে সরিয়ে নিয়ে ঘরের এককোণে কুকড়ে থাকলো সে। তার হাতে-পিঠে-পায়ে বেল্টের আঘাত লাগছে।

“যুদ্ধ শুধু তোরা করেছিস, না? আর আমরা সব কোলাবরেটর!” আবারো আঘাত। বিশাল বদ্ধঘরে সেটা আরো বেশি জোড়ালো শোনালো।

আমি পেছন থেকে হায়দারভাইকে মৃদুস্বরে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলেও তিনি আমার কথাগুলো শুনতেই পেলেন না। কী করবো বুঝতে না পেরে দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক মুহূর্ত।

তৎকালীন আওয়ামী লীগ দলের অনেকেরই ভাবসাব এমন ছিলো, ভারতে আশ্রয় নেয়া এককোটির মতো শরণার্থি ছাড়া বাকিরা সবাই হয় কোলাবরেটর নয়তো সুবিধাবাদী ছিলো। এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের ক্ষোভও ছিলো।

ইমতিয়াজের চিৎকারে প্রকম্পিত হলো ঘরটা। সঙ্গে সঙ্গে পেছন থেকে হায়দারভাইকে জাপটে ধরে নিবৃত্ত করলাম। বেল্ট রেখে তিনি এবার পা ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।

হায়দারভাইকে রুম থেকে বের করতে গিয়ে আমাকে ঘাম ঝরাতে হয়েছিলো সেদিন। বাইরে এসে তাকে শান্ত করতে একটা সিগারেট ধরিয়ে দেই। সেই সিগারেট কয়েক টানে শেষ করে আরেকটা চেয়ে বসেন। রাগে- ক্ষোভে গজ গজ করছিলেন। আমি তাকে না থামালে ইমতিয়াজকে মেরেই ফেলতেন হয়তো।

যাই হোক, অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে শান্ত করি তাকে। ইমতিয়াজকে জিজ্ঞাসাবাদ করার বাকি কাজটুকু আমি নিজের কাঁধে তুলে নেই। আমার সিগারেটের প্যাকেটটা হায়দারভায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঢুকে পড়ি সেই ঘরে।

ইমতিয়াজের সারা শরীরে প্রহারের চিহ্ন। শেষের দিকে এসএম হায়দারের লাখি তার নাক-মুখের অবস্থাও কাহিল করে দিয়েছে। দু-হাত আর পিঠে বেল্টের দাগগুলো ডলে যাচ্ছে সে চোখমুখ খিচিয়ে

পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে দিলে ইমতিয়াজ অবিশ্বাসে চেয়ে রইলো আমার দিকে, তারপর চুপচাপ রুমালটা নিয়ে নাক-মুখের রক্ত মুছতে লাগলো। ঘরের একমাত্র চেয়ারে বসে পড়লাম আমি।

“আমি ওই শালাকে ছাড়বো না,” ইমতিয়াজ বলে উঠলো। “ও জাসদ করে, আমি শিওর। ওর কথা শুনেই বোঝা যায়। আমার গায়ে হাত তুলেছে…কতো বড় সাহস!”

“চুপ!” আমি রেগে গিয়ে বলে উঠলাম। আমার ধমক খেয়ে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে রইলো সে। “একদম চুপ! একটা মেয়েকে বিয়ের মাত্র তিনমাসের মাথায় রেপ করে মার্ডার করেছিস…এখন আবার বড় গলায় কথা বলছিস!” আমার চোখেমুখে তিক্ততায় ভরে উঠলো। “ভেবেছিস সব অস্বীকার করলেই বেঁচে যাবি?” মাথা দোলালাম আমি। “কক্ষনো না! এসএম হায়দার তোকে ফাঁসিতে ঝোলানোর আগপর্যন্ত থামবে না।”

“আমি কিচ্ছু করিনি! আমি কিচ্ছু জানি না। আমাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে ওই শালার পুলিশ!” ইমতিয়াজ চেঁচিয়ে উঠলো।

তাকে আমার আস্ত একটা শয়তান বলে মনে হচ্ছিলো তখন। “তুই এখন পর্যন্ত একটাও সত্যি কথা বলিসনি। সব মিথ্যে বলেছিস। তাতে কোনো সমস্যা হবে না। যে প্রমাণ আমাদের হাতে-”

“আরে রাখ তোর প্রমাণ!” এবার চোখমুখ খিচে বললো সে। “আমার বালটাও ছিঁড়তে পারবি না তোরা!”

আমি স্থিরচোখে চেয়ে রইলাম মিলির খুনির দিকে।

“একবার খালি আমার নেতা জানুক, তারপর দেখবি কি হয়। তোদের সবাইকে আমি ভুরুঙ্গামারিতে পাঠামু!”

শেষ কথাটা আঙুল উঁচিয়ে বললো ইমতিয়াজ। স্বাধীনতার পর থেকেই পুলিশকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলির হুমকি দিয়ে কাবু করার রেওয়াজ চালু হয়ে গেছিলো। আর হুমকিটা শুধু বড় বড় নেতারাই নয়, ইমতিয়াজের মতো পাতিরাও দিতে কসুর করতো না। পরবর্তিতে ভুরুঙ্গামারির জায়গায় বান্দরবান-খাগড়াছড়ি ব্যবহৃত হতে শুরু করেছিলো, এই যা।”

আমার ইচ্ছে করছিলো হায়দারভায়ের মতো বেল্ট খুলে হারামজাদাকে পেটাই, কিন্তু এ কাজ আমি জীবনেও করিনি। পুলিশে যোগ দেবার পরও না। এরকম আগ্রাসি আচরণের কথা আমি শুধু ভাবতেই পারি, কিন্তু সত্যি সত্যি কোনো মানুষকে পেটানো যে আমার পক্ষে সম্ভব নয় সেটা বহুকাল আগেই বুঝে গেছিলাম। সম্ভবত এ কারণেই উপযুক্ত বয়স থাকার পরও, মনে প্রবল ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে পারিনি। কারণ যুদ্ধে মানুষ হত্যা করতে হয়!

ইমতিয়াজের আচরণে রাগে আমার গা রি রি করে উঠলো। আমি কিছু বলতে যাবো অমনি ঘরে ঢুকে পড়লেন হায়দারভাই। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সম্ভবত বাইরে থেকে ইমতিয়াজের তর্জন-গর্জন উনার কানে গেছে। মিলির খুনিও একটু ভড়কে গিয়ে চুপ মেরে গেলো হঠাৎ করে। কিন্তু এসএম হায়দারের মধ্যে কোনো উত্তেজনা দেখতে পেলাম না। তাকে খুব শান্ত আর স্বাভাবিক মনে হলো আমার কাছে।

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে তিনি আমাকে বসার জন্য ইশারা করলেন। “বসো।” তারপর আমার পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কিছু স্বীকার করেছে?”

“না,” আস্তে করে বললাম তাকে।”

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে হায়দারভাই বলে উঠলেন, “মনে হচ্ছে বিরাট বড় একটা ভুল করে ফেলেছি আমরা।”

আমি তার কথার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে না পেরে চেয়ে রইলাম। “ভুল করেছি? কি?”

“এই ছেলেটা মনে হয় না একা একা মিলিকে ধর্ষণ করে খুন করেছে। আমি যেন আক্ষরিক অর্থেই আকাশ থেকে পড়লাম। “কি?!” এরইমধ্যে কি খুনির নেতা থানায় ফোন করে ফেলেছে? আর সেই ফোন পেয়ে মুক্তিযোদ্ধা এসএম হায়দার বেড়ালের মতো চুপসে গেছেন? মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগলো কথাগুলো।

“আহ্, ওকে ভালো করে দেখো।” ইমতিয়াজকে ইঙ্গিত করে বললেন তিনি।

আমি কোনো কিছু বুঝতে না পেরে তাকালাম মেঝেতে বসে থাকা খুনির দিকে।

“ওর মতো রোগাপটকা আর পাঁচফুটি সাইজের একটা ছেলের পক্ষে মিলির মতো মেয়েকে ধর্ষণ করা সম্ভব না।”

“আপনি এসব কী বলছেন?” কথাটা আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলো। “ভেবে দেখো, আমাদের ভিক্টিমের হাইট কতো…পাঁচফিট পাঁচ। মেয়ে হিসেবে বেশ ভালো উচ্চতা। আর এটাকে দেখো, পাঁচফুট তিন-চারের বেশি হবে না। তার উপরে শরীরে কিছু নেই…রোগাপটকা। দেখলেই মনে হয় দিনে তিনবার গাঞ্জা খায়। এর পক্ষে কি একা একা মিলিকে ধর্ষণ করে খুন করা সম্ভব?”

“আপনি বলতে চাইছেন…?”

মাথা নেড়ে সায় দিলেন এসএম হায়দার। “কাজটা ও একা করেনি।”

“কিন্তু আপনি যে বলেছিলেন, একজন মেহমান-”

হাত তুলে আমার কথার মাঝখানে বাধা দিলেন তিনি। “ভুলটা তো সেখানেই করেছি।” এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “গোড়ায় গলদ হয়ে গেছে। তখন তো এই হারামজাদাকে সামনাসামনি দেখিনি। ছবি দেখে কি বোঝা যায়? এখন আমি নিশ্চিত, ওর পক্ষে মিলিকে ধর্ষণ করে খুন করা সম্ভবই না।”

সত্যি বলতে আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম কথাটা শুনে। আরো একবার ইমতিয়াজের দিকে ভালো করে তাকালাম। রাগে-অপমানে সে কাঁপছে। কথাগুলো হজম করতে বেগ পাচ্ছে যেন।

“তাছাড়া, ময়নাতদন্তের রিপোর্টের কথাটা ভাবো,” হায়দারভাই আমার কাঁধে হাত রাখলেন। “ভিক্টিমের ভ্যাজাইনার যে কন্ডিশন হয়েছিলো সেটা এর পক্ষে করা কি সম্ভব?”

আমার মুখের জবান বন্ধ হয়ে গেলো। ফ্যালফ্যাল করে হায়দারভায়ের দিকে চেয়ে রইলাম।

“এই বগা-টাইপের ছেলেটার ওই জিনিস আর কতো বড় হবে, অ্যাঁ?” তর্জনি আর বুড়ো আঙুল দিয়ে আকৃতিটা দেখালেন তিনি, “দাঁড়ালেও তিন ইঞ্চির বেশি হবে না। এরকম সাইজ দিয়ে কি ওটা করা যাবে?” মাথা দোলালেন এসএম হায়দার। “অসম্ভব!”

ঢোক গিললাম আমি, “তাহলে ওর সাথে আরেকজন ছিলো? সে কে?”

“সেটাই এখন বের করতে হবে। এই শালা অবশ্যই ছিলো কিন্তু কাজটা করেছে ওর সঙ্গে থাকা বলশালী আর তাকত আছে এমন কেউ। এই শালা হলো পাহারাদার। ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা। বুঝলে? দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা দেখেছে। খচ্চরটার জন্মই হয়েছে পাহারা দেবার জন্য। কাজ করার মুরোদ ওর নেই।”

আমার মাথায় ঢুকলো না হায়দারভাই হঠাৎ করে এসব কেন বলছেন! কিন্তু রোগাপটকা, ছোটোখাটো ইমিতিয়াজকে আমার সামনে বসে থাকতে দেখে মনে হলো, হায়দারভায়ের কথাটা উড়িয়ে দেয়াও যায় না। তার কথা শোনার পর আমারও মনে হলো, এই ছেলের পক্ষে মিলির মতো মেয়েকে ধর্ষণ করে খুন করাটা আসলেই কঠিন।

হায়দারভাই এগিয়ে গেলেন ইমতিয়াজের দিকে। ওর একটা হাত ধরে বললেন, “দেখো, মেয়েমানুষের মতো নরম হাত…আমাদের সামনে নার্ভাস হয়ে কেমন কাঁপছে…ও তো মিলির সামনে গিয়ে দাঁড়ানোরই সাহস রাখতো না। এই টাইপের ছেলেগুলো মেয়েদের সাথে জোর-জবরদস্তি করার হিম্মত রাখে না, ব্রাদার। আমি নিশ্চিত, ওর সাথে আরেকজন ছিলো।” এবার ইমতিয়াজের দিকে তাকিয়ে বললেন তিনি, “বল্, কে ছিলো তোর সাথে?”

ইমতিয়াজ নিজের হাতটা ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে নিলো এসএম হায়দারের কাছ থেকে। “কেউ ছিলো না! আমি একাই খুন করেছি! আর আমার ওটা দেখতে চা?” কেমনজানি উন্মাদগ্রস্ত হয়ে পড়লো সে। প্যান্টের জিপার খুলে গোপনাঙ্গটা বের করে বিশ্রিভাবে দেখালো আমাদের। “দেখ শূয়োরেরবাচ্চা! তিন ইঞ্চির নুনু নিয়ে আমি ঘুরে বেড়াই না! তোদের চেয়েও বড় আছে! এটা দিয়ে ওই মেয়ের জন্মের সাধ মিটিয়ে দিয়েছি! ফাটায়া দিছি শালিরে!”

কথাটা শুনে আমার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেলো। চট করে তাকালাম এসএম হায়দারের দিকে, উনার ঠোঁটে তখন প্রচ্ছন্ন বাঁকাহাসি। সঙ্গে সঙ্গে উনার কৌশলটা ধরতে পারলাম, বুঝতে পারলাম মিলির খুনির স্বীকারোক্তি পেয়ে গেছি আমরা!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *