অধ্যায় ৪০
ঢাকায় ফিরে এসে আমি কয়েকটা দিন কিছুই করতে পারিনি। তবে দুই যুগ ধরে আমার বুকের ভেতর চেপে বসে থাকা পাথরটির অনুপস্থিতি বেশ ভালোমতোই টের পাচ্ছিলাম।
হায়দারভায়ের লাশ দাফন করার পর এই দীর্ঘ দুই যুগে আমি তার কবর দেখতে যাইনি। এবার গেলাম এক গোছা ফুল নিয়ে। কিছুক্ষণ তার কবরের সামনে বসে থাকার সময় অসংখ্য স্মৃতি হুরোহুরি করে এসে আমাকে আবেগতাড়িত করে ফেললো।
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মিনহাজের খামারবাড়িতে গিয়ে কি দেখেছি সেটা কাউকে বলবো না। কিন্তু আমার অটল সিদ্ধান্তে ফাঁটল ধরালো রামজিয়া। তাকে কি বলবো? বলা উচিত হবে?
সে-ও তো এই ঘটনার একটি অংশ। মিলির বান্ধবি। আমার মতো তার মনের গহীনেও নিশ্চয় দুই যুগ ধরে একটি কৌতূহল জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। যে অভাবনীয় ঘটনা আমি জানতে পেরেছি সেটা শোনার অধিকার সে রাখে।
আমার যুক্তি বললো কথাটা না বলার জন্য। কিন্তু আবেগ তাতে সায় দিলো না। যুক্তি আর আবেগের চিরন্তন লড়াই শুরু হয়ে গেলো নিজের ভেতরে। কিন্তু নরম মনের মানুষ আমি, এবং অবশ্যই ভীরু। দৃঢ় বলা যাবে না কোনমতেই। অবশেষে যুক্তি পরাস্ত হলো আবেগের কাছে।
মিনহাজের ওখান থেকে ফিরে আসার তিনদিন পর রামজিয়ার সাথে দেখা করলাম। তাকে কঠিন প্রতীজ্ঞায় আবদ্ধ করে সত্যটা জানালাম অবশেষে। সব শুনে হতভম্ব হয়ে রইলো সে।
“আনবিলেল!” অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠলো রামজিয়া। “আমার এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।”
“হুম।” শুধু এটাই বললাম।
“তাহলে এখন কি করবে?”
আমি চেয়ে রইলাম তার দিকে। প্রশ্নটা বুঝতে আমার একটুও কষ্ট হয়নি।
“লেখাটা কি শেষ করবে?”
কাঁধ তুললাম। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না তখন। “জানি না।”
“ইউ শুড ডু ইট।” দৃঢ়ভাবে বললো সে। “এমন একটা গল্প শুধু তোমার- আমার মধ্যে রাখাটা ঠিক হবে না। তোমার আনফিনিশড লেখাটা আমি পড়েছি, ওটার কোন এন্ডিং নেই। এখন তো সেটা পেয়ে গেছো, তাহলে কেন লিখবে না?”
সায় দিলাম তার কথার সাথে। “হুম। হয়তো লেখাটা শেষ করবো আমি কিন্তু …”
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সে।
“… বইটা প্রকাশ করবো না এখন।”
“আই ডোন্ট গেট ইট?”
“মিনহাজের দিকটাও তো দেখতে হবে।”
“তাহলে তুমি লিখছো কিন্তু পাবলিশ করছো না?”
“হুম।”
তারপর তাকে জানালাম আমার পরিকল্পনার কথা।
সবটা শুনে সে বললো, “আমার মনে হয় তোমাকে একটা জিনিস বদলাতে হবে।”
“কি?”
“নামটা।”
“ওহ্, এটা আমি এরইমধ্যে বদলে ফেলেছি।”
“তাই নাকি?” তার চোখেমুখে বিস্ময়।
“মিনহাজ আর ইমতিয়াজের ঘটনাটা জানার আগে ওরকম শিরোনাম দিয়েছিলাম, এখন আর সেটা প্রসঙ্গিক নয়। লেখার মূল টোনটাই বদলে গেছে। বলতে পারো, একদম উল্টে গেছে।”
মুচকি হাসলো সে। “আই কুডেন্ট মোর এগ্রি উইথ ইউ।” তারপর আমার দিকে একটু ঝুঁকে জানতে চাইলো, “তাহলে টাইটেলটা কি দিলে?”
তার চোখে চোখ রাখলাম আমি। দুই যুগ আগে হলে এক ধরণের অস্বস্তি জেঁকে ধরতো আমাকে।
আস্তে করে বললাম, “কেউ কেউ কথা রাখে।”
