কেউ কেউ কথা রাখে – ২৫

অধ্যায় ২৫

ওসির কলার ধরে শাসানোর মতো কাণ্ড করার পরও হায়দারভায়ের বিরুদ্ধে কোন রকম শৃঙ্খলাজনিত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আমি নিশ্চিত ছিলাম, এটা আমাদের থানার ওসি আলী ইকরাম সাহেবের ঔদার্য ছিলো না মোটেও। তবে ঠিক কী কারণে সে পুরো ব্যাপারটা হজম করে ফেলেছিলো সেটাও আমি কখনও জানতে পারিনি। আমার অনুমাণ, দুটো কারণে এসএম হায়দারকে ঘাটানোর সাহস করেনি ভদ্রলোক। প্রথমত তিনি একজন সৎ অফিসার, বেতনের বাইরে এক পয়সাও বাড়িতে নিয়ে যাবার কথা ভাবেন না। দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধে তার অংশগ্রহণ। সার্টিফিকেটধারী, বানোয়াট কোন মুক্তিযোদ্ধা তিনি ছিলেন না। পঁচিশে মার্চ রাতে রাজারবাগ থেকে প্রতিরোধ করার মাধ্যমে তিনি মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছিলেন, যার শেষটা ষোলোই ডিসেম্বরে।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনে লড়াই করে বেঁচে যাওয়া হাতেগোনা কয়েকজন তরুণ পুলিশের মধ্যে এসএম হায়দার ছিলেন অন্যতম। তার এই বীরত্বপূর্ণ অবদান পুলিশ বিভাগের প্রায় সবাই জানতো। দেশ স্বাধীন হবার পর সরকার তাকে প্রমোশন দিয়ে, ঢাকার মতো জায়গায় দীর্ঘদিন পোস্টিংয়ে রেখে এক ধরণের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। তার সঙ্গি মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই বড় বড় পদে আসীন এখন। এসব কারণে সম্ভবত ওসিসাহেব পুরো ব্যাপারটা চেপে গেছে। সে হয়তো বুঝতে পেরেছিলো এসএম হায়দারের বিরুদ্ধে উপর মহলে নালিশ করে কোন লাভ হবে না।

যাই হোক, ঐ ঘটনার পর থেকে হায়দারভাইকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে ওসি আলী ইকরাম। পারতপক্ষে তার সঙ্গে কোন রকম কথাবার্তা বলতো না। এটাকে আমি স্বাভাবিক বলেই ধরে নিয়েছিলাম।

ঐ ঘটনার পরের সপ্তাহে, একদিন আমি আমার টেবিলে বসে একটা জিডি রেকর্ড করছিলাম, হায়দারভাই একটা কাজে বাইরে ছিলেন, এমন সময় ওসি আমাকে ডেকে পাঠালো। জিডিটা অসম্পূর্ণ রেখে চলে গেলাম তার ঘরে। আমাকে বসতে বললো ভদ্রলোক।

“আপনি তো হায়দারসাহেবের ঘনিষ্ঠ লোক,” প্রথমেই সে এটা বলে কথা বলতে শুরু করলো, “আপনার কথা হয়তো শুনবে,” একটু থেমে কথাটা গুছিয়ে নিলো। “ওরে বোঝান, মাথা গরম করে কোন লাভ হবে না। আমরা হলাম গভমেন্ট সার্ভেন্ট…হুকুম তামিল করাই আমাদের কাজ। পলিটিশিয়ানদের সাথে বাজাবাজি করলে ফল ভালো হবে না। সময়টা কিন্তু খুব ভালোও না।” শেষ কথাটা বলে কী ইঙ্গিত করলো সেটা অবশ্য আমি বুঝতে পারিনি। “অধস্তনদের সাথে মাথা গরম করে যা-তা ব্যবহার করে। কিন্তু এ কাজটা সবার সাথে করা যায় না, তাই না?”

আমি হা করে চেয়ে রইলাম, বুঝতে পারলাম না কী বলবো।

“তারে বলেন, কথামতো কাজ করলে ঐ কেস থেকে তাকে আমি বাদ দেবো না। নইলে কিন্তু আমার কিছু করার থাকবে না। চাকরির মায়া তার থাকতে না পারে আমার তো আছে, নাকি?”

“কথামতো কাজ করবে মানে, স্যার?”

আমার দিকে এমনভাবে তাকালো আলী ইকরামসাহেব যেন নাদানের মতো কথাটা বলে ফেলেছি। “আরে, তার সাথে থাকতে থাকতে তো দেখি আপনার কাণ্ডজ্ঞানও গেছে!”

আমি কাচুমাচু খেলাম। একেবারেই যে বুঝতে পারিনি তা তো নয়, তবে ওসির মুখ থেকে কথাটা সরাসরি শুনতে চাইছিলাম।

“ঐ কেসটা যে পর্যায়ে আছে সে পর্যায়েই থাকুক। এটা নিয়ে আর কিছু করার দরকার নাই। বাকিটা আদালত দেখবে। আসামি যদি নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে পারে তো করুক, না পারলে ফাঁসিতে ঝুলে মরুক। আমাদের কী?”

বুঝতে পারলাম ওসি আসলে কি বলতে চাইছে। প্রতিপক্ষ গোল দিতে গেলে যেন কোনরকম বাধা দেয়া না-হয়! অন্যভাবে বলতে গেলে, ইমতিয়াজ নামের জঘন্য এক ধর্ষক-খুনিকে বেকসুর খালাস করে দেবার জন্য পথ করে দেয়া।

“একটা কথা মনে রাখবেন, হায়দার যতো চেষ্টাই করুক না কেন, এই কেসে খুব একটা সুবিধা হবে না। মাঝখান থেকে ঝামেলা বাড়ানো শুধু।”

“কেন, স্যার? ইমতিয়াজ তো নিজের মুখে স্বীকার করেছে… তাছাড়া কিছু সাক্ষি-প্রমাণও—”

“রাখেন,” মৃদু ধমক দিয়ে আমাকে থামিয়ে দিলো ওসি। “বিচার শুরু হলে সে সবকিছু অস্বীকার করবে। আদালতকে বলবে, মারের হাত থেকে বাঁচার জন্য স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলো। তার কাছ থেকে জোর করে জবানবন্দিতে স্বাক্ষর নিয়েছে হায়দার। আর ঐসব সাক্ষি-প্রমাণ…দেখেন, কী হয়।”

আমি থ বনে গেলাম। থানার ওসিই যদি এমন কথা বলে তাহলে ইমতিয়াজকে দোষি প্রমাণ করা যাবে কিভাবে? হায়দারভাই শত চেষ্টা করলেও তো কোন কাজ হবে না।

“ওকে বলবেন, আমার উপর রাগারাগি করে কোন লাভ নেই। আমার হাত বান্ধা। বুঝলেন?”

“জি, স্যার,” খুব কষ্টের সাথে কথাটা বলেছিলাম।

“বিয়ে-শাদি করেছে, দু-দিন পর বাচ্চা-কাচ্চার বাপ হবে, মাথা গরম করে নিজের ক্ষতি করার কী দরকার, বলেন?”

ক্ষতি?! আমি যারপরনাই অবাক হলাম কথাটা শুনে। ইমতিয়াজের মতো একজন ধর্ষক-খুনি হায়দারভায়ের মতো মানুষের ক্ষতিও করতে পারে?

“ঐ ইমতিয়াজ ছেলেটা খুব খারাপ,” ওসি বললো, “ওর সাথের লোকগুলোও ভয়ঙ্কর। কখন কী করে বসে বলা যায় না। মাথার উপরে আবার এক নেতা আছে। সে তো রাস্তার লোক না রে, ভাই।”

সত্যিকার অর্থেই আমার জবান বন্ধ হয়ে গেছিলো। কী বলবো এসব কথার জবাবে?

“হায়দারকে বলবেন, সে একা যুদ্ধ করেনি…ইমতিয়াজও যুদ্ধ করছে, “ কথাটা বলে চেয়ারে হেলান দিলো ভদ্রলোক। “একটু ছাড় তো সে পেতেই পারে।”

ওসির রুম থেকে ফিরে এসে নিজের চেয়ারে বসে ছিলাম ঝিম মেরে। একটা খুনি! ধর্ষক! নববিবাহিত একটি সংসার তছনছ করে দিয়েছে। মাত্র জীবন শুরু করতে যাওয়া এক তরুণীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে নিজের হাতে, বুক ফুলিয়ে সে কথা স্বীকারও করেছে। তাকে কি-না রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছে রাজনীতি করা কোন এক নেতা! এখন আবার তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে পার পাইয়ে দেবার চেষ্টা করা হচ্ছে!

আমার ভেতরটা ভেঙে গুড়িয়ে যেতে শুরু করলো। এমন সময় এক কনস্টেবল এসে বললো আমার একটা ফোন এসেছে। কে করেছে সেটা জানতে চাওয়ার মতো অবস্থায় ছিলাম না। যন্ত্রের মতো চেয়ার থেকে উঠে ঘরের এককোণে রাখা কালো রঙের টেলিফোনটার দিকে চলে গেলাম আমি। রিসিভারটা তুলে নিয়ে বললাম, “হ্যালো, কে বলছেন?”

“আমি রামজিয়া।”

ওপাশ থেকে কণ্ঠটা বললো। তবে নাম বলার কোন দরকারই ছিলো না, তার কণ্ঠটাই যথেষ্ট ছিলো আমার জন্য। তারচেয়েও বড় কথা, রামজিয়া শেহরিন ছাড়া আমাকে আর কোন মেয়ে কখনও থানায় ফোন করার কথাও নয়।

“কেমন আছেন?” ম্রিয়মান কণ্ঠে জানতে চাইলাম।

“ভালো না…মন খুব খারাপ,” একটু থেমে আবার বললো, “যা শুনলাম সেটা কি সত্যি? ইমতিয়াজ নাকি জামিন পেয়ে গেছে?”

দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে গেলো আমার ভেতর থেকে। “হুম।” ছোট্ট করে জবাব দিলাম।

“হাউ ইট পসিবল! মাই গুডনেস! এটা কিভাবে হলো? কেন হলো?”

তার এ প্রশ্নের জবাব দেবার মতো মানসিক অবস্থা আমার ছিলো না তখন। তারচেয়েও বড় কথা, আমি তখন থানায়। আশেপাশে অনেক লোকজন। এদের মধ্যে প্রায় সবাই ওসির ঘনিষ্ঠ। কান খাড়া করে সব শুনে ফেলার সম্ভাবনা আছে। আর সে কথা ওসির কানে পৌঁছে যাবে অবধারিতভাবেই।

“কি হলো, চুপ মেরে আছেন যে?” ফোনের ওপাশ থেকে তাড়া দিয়ে বললো সে।

“ইয়ে, মানে…আপনাকে পরে বলবো সব। ঠিক আছে?”

মনে হলো কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে।

“উমম…ওকে। বিকেলে নিউ মার্কেটে চলে আসেন। ঐ যে, কফি খেয়েছিলাম যেখানে।”

“আচ্ছা.” আস্তে করে বলে ফোনটা রেখে দিলাম আমি। এই প্রথম তার সঙ্গে দেখা করার আরেকটি সুযোগ পেয়েও আমার মধ্যে কোন সুখকর অনুভূতি তৈরি হলো না। তার বদলে এক ধরণের অস্বস্তি জেঁকে বসলো।

*

যতো অস্বস্তিই লাগুক না কেন, কথামতো ঐদিন বিকেলে নিউ মার্কেটে ঠিকই গিয়েছিলাম আমি।

পুরো ঘটনাটা তাকে খুলে বললাম। এমনকি, ওসিসাহেব আমাকে কি বলেছিলো সেটাও বাদ দিলাম না। সব শুনে কয়েক মুহূর্ত বিস্ময় আর হতাশা নিয়ে কফিতে চুমুক দিয়ে গেলো রামজিয়া।

“জামিন পেয়ে ইমতিয়াজ কি পালিয়ে যেতে পারে?” অবশেষে নীরবতা ভেঙে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাইলো সে।

“আমার তা মনে হচ্ছে না।”

“তাহলে আপনারা ওর জামিন নিয়ে এতো চিন্তিত হয়ে পড়েছেন কেন?” একেবারেই সহজ-সরল প্রশ্ন।

“এ ধরণের মার্ডার কেসের আসামি…যার পেছনে আবার পলিটিশিয়ান আছে…জামিনে বের হয়ে গেলে তদন্তে অনেক সমস্যা করবে,” বললাম তাকে।

“কি ধরণের প্রবলেম করতে পারে?”

“তদন্তে বাধা সৃষ্টি করবে, আলামত নষ্ট করার চেষ্টা করবে। সাক্ষিদের ভয়-ভীতি দেখাবে।”

উদ্বিগ্ন চোখে আমার দিকে চেয়ে রইলো সে। “যে লিডার ইমতিয়াজকে শেল্টার দিচ্ছে সে কি জানে না ও একটা রেইপিস্ট, মার্ডারার?”

“অবশ্যই জানে। না জানার তো কারণ দেখছি না।”

“তাহলে?” মাথা দোলালো সে। “এতো বড় অন্যায় ঐ পলিটিশিয়ান কিভাবে করতে পারলো!”

এ প্রশ্নের জবাবে আমি কী-ই বা বলতে পারতাম! হায়দারভাই যেভাবে স্পষ্ট করে সমালোচনা করতে পারতেন আমি তো সেভাবে কখনও করতে পারতাম না। খুব অল্প বয়সেই আমি যতোটা না দল তার চেয়ে অনেক বেশি বঙ্গবন্ধুর ভক্ত। ছেষট্টির ৬ দফা আন্দোলনের সময় থেকে শেখ মুজিবের ভক্ত আমি। ঊনসত্তুরের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা কলেজে পড়ি, টুকটাক রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছি। বাবা শুনলে ভীষণ কষ্ট পাবেন জেনেও ঢাকা কলেজের অন্যান্য ছেলেদের সাথে আন্দোলনে যোগ দেই আয়ুবশাহীর পতন ঘটিয়ে শেখ মুজিবকে জেল থেকে বের করে আনার জন্য।”

যাই হোক, রাজনীতিবিদদের প্রতি আমার বিশ্বাস-আস্থার চির ধরেছিলো দেশ স্বাধীনের পর পরই। হায়দারভায়ের সাথে তর্ক করতাম, নিজের প্রিয় দল আর নেতার হয়ে লড়াই করতাম সব সময়, কিন্তু তাই বলে তাদের হতাশাজনক কীর্তিকলাপ সম্পর্কে অবগত ছিলাম না তা তো নয়।

“কি হলো?” রামজিয়ার কথায় সম্বিত ফিরে পেয়ে তাকালাম তার দিকে। “কী ভাবছেন?”

“না, কিছু না,” বললাম তাকে। আসলে, এ কথা মানুষ যখন বলে তখন অনেক বেশি ভাবনায় ডুবে থাকে সে কিন্তু ভাবনাগুলো থাকে গভীর আর অকথিত।

“তাহলে এখন কি হবে? মিনহাজ যদি জানতে পারে তাহলে তো খুবই আপসেট হয়ে পড়বে।”

“মিনহাজ জানে,” আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম তাকে।

“তাই নাকি?”

“হুম। ইমতিয়াজ জামিন পাবার পর থানায় এসেছিলো। সব শুনে একদম চুপ মেরে গেছে।”

“আই ফিল সরি ফর হিম,” বিষণ্ন কণ্ঠে বললো রামজিয়া। “মিলির মার্ডারের পর তো পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিলো…এখন আবার…”

অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর বললাম তাকে, “তবে আমার বিশ্বাস হায়দারভাই এতো সহজে ছেড়ে দেবেন না।”

আরো কিছু শোনার জন্য আমার দিকে চেয়ে রইলো সে।

“উনি এর শেষ দেখে ছাড়বেন।”

আমার এ কথায় রামজিয়া কতোটুকু আস্থা পেলো জানি না, তবে আর কোন কথা না বলে চুপ মেরে গেছিলো।

ঐদিন খুব মন খারাপ করে ঘরে ফিরেছিলাম। সেই প্রথম রামজিয়ার সাথে দেখা করার মহূর্তগুলো কেমন অস্বস্তিকর ঠেকছিলো, সাক্ষাৎকার পর্বটি দীর্ঘ হোক সেটাও চাইছিলাম না মনে মনে!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *