অধ্যায় ২8
অমানিশা
থার্টিফার্স্ট নাইটের পর বেশ কয়েকদিন রামজিয়ার সাথে আর আমার যোগাযোগ হয়নি। কিন্তু যখন দেখা হলো তখন আমাদের জন্য সময়টা মোটেও সুখকর ছিলো না। ঐদিনটির কথা আমি কখনও ভুলবো না। আমার মনের গহীনে থাকা সুদৃঢ় বিশ্বাস টলে গেছিলো। ভয়ঙ্কর রকমের হতাশায় নিপতিত হয়েছিলাম আমি। সেই দিনটি যদি আমার জীবনে না আসতো তাহলে হয়তো খুশিই হতাম। এটাও সত্যি, ভয়াল সেই দিনটি না এলে আজ আমি লেখক হয়ে উঠতাম কি-না সন্দেহ।
ঐ দিন ছিলো খুবই মেঘলা, সকাল থেকে সূর্যের দেখা নেই। যেন আসন্ন বিষাদের পূর্বাভাষ দিচ্ছিলো প্রকৃতি! জানুয়ারির শেষে তিন-চারদিনের শৈত্যপ্রবাহ বইছিলো দেশজুড়ে। থানায় বসে থেকে রীতিমতো আমার দাঁতে দাঁত ঠোকাঠুকি হচ্ছে। পুরনো দিনের দালান, চারদিকে বড় বড় অসংখ্য দরজা-জানালা। শীতের হিম শৈত্য হু হু করে ঢুকে পড়ছে ভেতরে। পুলিশের ইউনিফর্মের সাথে দেয়া পাতলা সোয়েটার সেই শীত কাবু করতে পারার কথাও নয়। আমি জবুথবু হয়ে নিজের চেয়ারে বসে থানার পাশে টঙ দোকান থেকে গুঁড়ের চা এনে খাচ্ছিলাম। হায়দারভায়ের চায়ের কাপটা আমার টেবিলের উপর থেকে তখনও ধোঁয়া ছাড়ছে। চা আসার আগেই জরুরি একটা দরকারে ওসিসাহেব নিজের রুমে ডেকে নিয়ে গেছে তাকে। আমি ভাবছিলাম পিরিচ দিয়ে কাপটা ঢেকে দেবো কি-না, এভাবে খোলা থাকলে চা ঠাণ্ডা হয়ে যাবে। হায়দারভাই আবার ঠাণ্ডা চা একদম পছন্দ করতেন না।”
আমি চায়ের কাপের উপর পিরিচ রাখতে যাবো অমনি চিৎকার- চেঁচামেচি ভেসে এলো ওসির রুম থেকে। হায়দারভায়ের ভরাট কণ্ঠটা চিনতে মোটেও ভুল হবার নয়। চিৎকার করে ওসিকে তিনি গালাগালি করছেন!
সর্বনাশ!
আমি পিরিচ রেখে ছুটে গেলাম ওসির রুমে, সঙ্গে সঙ্গে আরো কয়েকজন কলিগও ছুটে গেলো সেখানে। দরজা দিয়ে ঢুকতেই দেখি অবিশ্বাস্য একটি দৃশ্য।
হায়দারভাই ওসির কলার ধরে তাকে শাসাচ্ছেন! এরইমধ্যে গায়ে হাত তুলেছে কি-না জানি না, আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে ফেলি। পেছন থেকে জাপটে ধরে টেনে নিয়ে আসি ওসির ঘর থেকে।
“ছাড়ো আমাকে! শালার কত্ত বড় সাহস! আমাকে…” দম ফুরিয়ে হাপাতে লাগলেন তিনি।
“ভাই, আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেলো? এসব কী করছেন?”
থানার কনস্টেবল আর বাকি পুলিশের দলটি হা করে চেয়ে আছে আমাদের দিকে। তারা হায়দারভাইকে সমীহ করে, তার বদমেজাজের কারণে ভয়ও করে। ওসিসাহেবও তাকে খুব একটা ঘাটায় না। তাই বলে উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কলার ধরে তাকে শাসানো!
কানে গেলো ক্ষিপ্ত আর অপমানিত ওসি নিজের ঘরে দাঁড়িয়ে গজ গজ করে যাচ্ছে। তার কথায় আমি মনোযোগ দিলাম না। আমার মনোযোগ হায়দারভায়ের দিকে।
“ঘটনা কি, ভাই?”
আমার দিকে হায়দারভাই অগ্নিমূর্তি ধারণ করে তাকালেন। পুলিশের টুপিটা খুলে আছাড় মেরে রাখলেন সামনের একটা টেবিলের উপর। “শূয়োরেরবাচ্চা!”
আমি নিশ্চিত ছিলাম গালিটা আমাকে দেননি। “আরে,
কি হয়েছে, বলবেন তো?” তাড়া দিলাম তাকে। বুঝতে পারছিলাম না হঠাৎ করে ওসির উপর চড়াও হওয়ার কারণটা কি।
“কি হয়েছে?!” আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন, যেন তার এই বিশাল ক্ষোভের কারণের মধ্যে আমিও পড়ি! “ওই শালা আমাকে বলে ইমতিয়াজের জামিন আবেদনে বিরোধিতা যেন না করি! কত্ত বড় সাহস, আমাকে এ কথা বলে!”
“কি!” অবিশ্বাসে বলে উঠেছিলাম আমি। কথাটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিলো। আমার কাছে সেটা ছিলো রীতিমতো অসম্ভব একটি ঘটনা। “আপনি এসব কী বলছেন?! উনি কেন আপনাকে এটা করতে বললেন?”
আমার দিকে তাচ্ছিল্যভরে তাকালেন তিনি। তার এমন চাহনির সাথে আমি মোটেও অপরিচিত ছিলাম না কিন্তু এর আগে কখনও আমার সাথে এটা করেননি।
“কেন?” রাগে কাঁপছেন তিনি। “তোমার দলের এক নেতা…!” দু-হাত আকাশের দিকে তুলে অঙ্গভঙ্গি করলেন। “সেই মহান নেতা স্বাধীন দেশের পুলিশকে হুকুম করেছে এক খুনি-ধর্ষকের পক্ষে দাঁড়াতে!”
কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমার কপালে ভাঁজ পড়ে গেলো। বুঝতে বাকি রইলো না ঘটনা কি। ক্ষমতাসীনদের এমন আচরণ তখন নিয়মিত ব্যাপার ছিলো। অনেকেই নিজদলের চোর-বাটপার থেকে শুরু করে, মজুতদার, চোরাকারবারি, খুনি, ডাকাত সবার মাথার উপরেই বটবৃক্ষের মতো ছায়া দিয়ে যাচ্ছিলো। এসব করতে গিয়ে তারা তাদের প্রিয় নেতা আর জন্মভূমির কতো বড় সর্বনাশ করছে সেটা যদি বুঝতো! মাত্র স্বাধীন একটি দেশ, অথচ এইসব দেখে অনেকেই বলতে শুরু করেছে পাকিস্তান আমলই ভালো ছিলো।
একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আমার ভেতর থেকে।
“সাহস থাকলে নেতাদের কলার চেপে ধরেন না!” নিজের ঘর থেকে চেঁচিয়ে বললো ওসি।
ফিরে তাকালাম সেদিকে।
“আমার কলার ধরাটা তো খুব সহজ! আমাকেই শুধু গালাগালি করার মুরোদ আছে। পারলে তাদের বাল ছিড়েন গিয়ে! বুঝবো কেমন মুক্তিযোদ্ধা!”
হায়দারভাই কথাটা শুনে কিছু বলতে যাবেন অমনি আমি তার হাতটা ধরে ফেললাম। “ভাই, আপনার পায়ে পড়ি! প্লিজ! মাথা গরম করবেন না।” টানতে টানতে তাকে থানার বাইরে নিয়ে এলাম।
ক্ষুব্ধ এসএম হায়দারকে প্রশমিত করার জন্য একটা সিগারেট বের করে দিলাম কিন্তু উনি সিগারেটটা হাত নেড়ে সরিয়ে দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“ওই শালার ওসি ঠিকই বলেছে,” উদাস হয়ে বাইরের রাস্তার দিকে চেয়ে তিক্তমুখে বললেন, “আমরা পুলিশ… আমাদের কোন ক্ষমতা নেই। হুকুমের গোলাম আমরা! এই বালের চাকরি করার চেয়ে গুলিস্তানে গিয়ে হকারগিরি করাও অনেক ভালো!”
কথাটা নির্মম হলেও সত্য ছিলো সে-সময়। সত্যি বলতে, আজ এতোগুলো বছর পরও এই কথাটা যেন আরো বেশি সত্য হয়ে উদ্ভাসিত হচ্ছে আমাদের সবার কাছে। কোন পরিবর্তন নেই। যেন স্থায়ি এক অমানিশা ভর করেছে আমাদের আকাশে!
অনেকক্ষণ চুপ রইলাম আমরা, কেউ কিছু বললাম না। হায়দারভায়ের দৃষ্টিতে শূন্যতা। আমি মাথা নীচু করে রাখলাম। কারণ আমি সরকারী দলের একনিষ্ঠ সমর্থক।
হায়দারভাই তখনও উদাস হয়ে শূন্যে তাকিয়ে আছেন। “যুদ্ধের সময় বহুবার মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছিলাম,” অবশেষে শান্তকণ্ঠে বললেন তিনি। “এখন মাঝে মাঝে মনে হয় মরেই গেলেই ভালো হতো!”
কথাটা আমার বুকে শেলের মতো বিধলো। একজন মুক্তিযোদ্ধা দেশ স্বাধীন করার পর এ কথা বলছেন!
“সরকারি দলের নেতা খুনির পক্ষে দাঁড়ায়!” মাথা দোলালেন আবারো, “বোঝো এবার, এই দেশের ভবিষ্যৎ কী!”
আমি কোন জবাব দিলাম না। তার সাথে সব সময় এসব নিয়ে তর্ক করি। বার বার হেরেও যাই। হায়দারভায়ের মতো মানুষের কাছে হেরে যাওয়াতে আমার একটুও খারাপ লাগে না কিন্তু নিজের কাছে হেরে যাওয়ার যে কী কষ্ট সেটা যদি কেউ বুঝতো!
“তাহলে এখন কি হবে, ভাই?” কথাটা আবারো বললাম তাকে। এছাড়া যেন বলার মতো, জানার মতো আর কিছু নেই আমার।
বাঁকাহাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে। “আমার যা করার আমি তা করবো। ঐসব হারামখোর নেতাদের হুকুম তামিল করার জন্য দেশটা স্বাধীন হয়নি, আর আমিও নিজেকে তাদের চাকর-বাকর মনে করি না।”
মনে মনে আশান্বিত হয়ে উঠলাম। যাকগে, হায়দারভাই তাহলে ওসি কিংবা নেতার কথা শুনছেন না।
“কিন্তু আমার ক্ষমতা খুবই কম,” একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার ভেতর থেকে। “আমি যতো চেষ্টাই করি না কেন, কাজ হবে না।”
“কাজ হবে না, মানে?” আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলাম।
নিরস্ত্র সৈনিকের মতো অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। “ইমতিয়াজ ঠিকই জামিন পেয়ে যাবে।”
“কী!” যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম আমি। “কিন্তু আপনি তো বললেন জামিনের বিরোধিতা করবেন?”
বাঁকাহাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটে। “তাতে কি?”
“আপনি জামিনের বিরোধিতা করলেও কোর্ট তাকে জামিন দিয়ে দেবে?”
উনি আমার দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন আমি পঞ্চম শ্রেনির ছাত্র। “দেশটা কেমনে চলছে তুমি মনে হয় জানো না?” একটু থেমে আবার বললেন, “নাকি ব্লাইন্ড সাপোর্টার হতে হতে সত্যি সত্যি অন্ধ হয়ে গেছো।”
আমি মোটেও অন্ধ ছিলাম না। তবে হায়দারভায়ের সাথে আমার পার্থক্য ছিলো, আমি তখনও পুরোপুরি হতাশ হয়ে পড়িনি। আমার কেন জানি মনে হতো, অচিরেই বঙ্গবন্ধু সব গুছিয়ে আনবেন। উনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। উনাকে ব্যর্থ করার জন্য মাঠে অনেক শক্তিও সক্রিয় আছে। এককালে উনার ঘনিষ্ঠরা জাসদ নামের একটি বিষফোঁড়া তৈরি করেছে, সেই বিষফোঁড়া নিশ্চয় সদ্য স্বাধীন দেশের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে গ্যাংরিন সৃষ্টি করতে পারবে না। তাদেরকেসহ সব অপশক্তির বিরুদ্ধে আবারো আমার নেতা জয়ি হবে-ঠিক যেমনটি পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে তিনি জয়ি হয়েছিলেন।
“আমার মনে হয় এইসব খুব জলদিই বন্ধ হয়ে যাবে,” আস্তে করে বললাম। হায়দারভাই আমার দিকে মুখ তুলে তাকালেন। “মানে, এই যে…নেতা-কর্মিদের উল্টাপাল্টা কাজকারবার…এগুলো তো চলতে দেয়া যায় না, তাই না? এসব বন্ধ হয়ে যাবে, দেখবেন।”
আবারো বাঁকাহাসি ফুটে উঠলো তার মুখে।
“যুদ্ধের পর একটা বিধ্বস্ত দেশ পেয়েছেন উনি…নানান সমস্যা। এসব রাতারাতি ঠিক করা যাবে না, একটু সময় দিতে হবে।”
“ব্রাদার, উনি যখন পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরে এসে বললেন, তিন বছর কিছুই দিতে পারবেন না, সেটা সবাই মেনে নিয়েছিলো কিন্তু এই তিন বছরে পাবলিক কি দেখলো?” জবাবের অপেক্ষা না করেই আবার বললেন, “উনার দলের ঘনিষ্ঠজনদের অনেকেই পরিত্যক্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কারখানা আর বাড়ি পেয়ে যাচ্ছে! তারা কিন্তু তিন বছর অপেক্ষা করছে না।”
আমি কোন তর্ক করলাম না। তর্ক করার মতো অস্ত্রের মজুদ আমার কাছে খুব একটা ছিলোও না তখন।
“সেটাও কোন সমস্যা হতো না, যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা যেত আক্ষেপে মাথা দোলালেন এসএম হায়দার। “এই একটা জিনিস করতে কিন্তু টাকা লাগে না। রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট বানাতে টাকা লাগে, স্কুল-কলেজ বানাতে টাকা লাগে, এটা করতে শুধু দরকার হয় ক্ষমতাসিনদের সদিচ্ছা, আত্মত্যাগ আর দুরদর্শিতা। সেটা কি তোমার দলের সবার মধ্যে আছে?”
আমি এবারো নিশ্চুপ রইলাম।
“সবাই কিন্তু শেখসাব না, তাজউদ্দিন না।
হায়দারভায়ের কথাটা যে সত্যি সেটা বঙ্গবন্ধু নিজেও জানতেন। তিনি কি বলেননি, তার চারপাশে চাটার দল? চোরের খনি?
“তাকে আরেকটু সময় দিতে হবে, ভাই,” কথাটা আমার হতাশা ছাপিয়ে বের হয়ে গেলো যেন।
“আরে ব্রাদার, তুমি আমি সময় দিলেই কী না দিলেই বা কী…আমরা হলাম আম-পাবলিক। আমারা শুধু তালি আর গালি দিতে পারি। কিন্তু শেখসাহেবের প্রতিপক্ষরা কি তাকে সময় দেবে?”
বঙ্গবন্ধুর প্রতিপক্ষ? জাসদ? হাহ্! ওরা কেবল নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে। রাষ্ট্র চালানো, মানুষকে একতাবদ্ধ করে নতুন স্বপ্ন দেখানো ওদের কাজ না। মনে মনে বলে উঠেছিলাম আমি। কিন্তু তখন কে জানতো, পর্দার আড়ালে আরো অনেকে আছে!
যাই হোক, আরো অনেক যন্ত্রণা আর স্বপ্নভঙ্গের কথা বলেছিলেন হায়দারভাই, সে-সব কথা আমার কাছে না ছিলো নতুন, না মনে হয়েছিলো অযৌক্তিক। আমি চুপচাপ তার স্বপ্নভঙ্গ আর মর্মবেদনার সঙ্গি হয়ে বসে বসে শুনে গেছিলাম শুধু।
এই ঘটনার কয়েকদিন পরই হায়দারভায়ের তুমুল বিরোধিতা সত্ত্বেও ইমতিয়াজ জামিন পেয়ে বের হয়ে গেলো। আদালতের সিদ্ধান্তে আমি পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে গেছিলাম। অবশ্য হায়দারভাইকে দেখে মনে হয়েছিলো তিনি যেন জানতেন কি হতে যাচ্ছে। কোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বলেছিলেন, “দেশটা এভাবেই চলছে।”
আজকের দিনের ক্রিমিনাল রাজনীতিকদের মতো জেলগেট থেকে ফুলের মালা দিয়ে ইমতিয়াজকে বরণ করা হয়েছিলো কি-না সেটা আমি জানি না, তবে সে যে বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে বের হয়েছিলো সেটা অনুমাণ করতে পারি। জেলে ঢোকার আগে সে ছিলো পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো এক ধর্ষক-খুনি, কিন্তু বের হয়ে এলো ক্ষমতার বটবৃক্ষের ছায়ায় থাকা পরজীবি হিসেবে। তার কেশাগ্রও যে স্পর্শ করতে পারবো না সেটা বুঝে গেছিলো সে।
আমার স্পষ্ট মনে আছে ইমতিয়াজের জামিন পাবার পরদিনই থানায় চলে এলো মিনহাজ। তার আগমণ আমার কাছে প্রত্যাশিতই ছিলো। ঠিক যেমন প্রত্যাশিত ছিলো তার অবিশ্বাস্য চেহারা আর হতবিহ্বল মুখখানি।
“এটা কিভাবে সম্ভব হলো, ভাই?!”
মিনহাজের দিকে তাকানোর মতো সাহস আমার ছিলো না। এমনিতেই মনমরা হয়ে ছিলাম। হায়দারভাইও কোর্ট থেকে সেই যে চলে গেছেন আর থানায় ফিরে আসেননি। এই সময়টা নিজেকে বড্ড এতিম বলে মনে হচ্ছিলো আমার।
থানায় বসে মিনহাজের প্রশ্নের জবাব দেয়াটা ঠিক বলে মনে করিনি আমি, তাকে নিয়ে বাইরে চলে আসি। প্রভাবশালি এক রাজনৈতিক নেতার কারণেই যে ইমতিয়াজ জামিন পেয়েছে সেটা খুলে বলি তাকে। হায়দারভাই জামিনের বিরুদ্ধে আপত্তি জানালেও কোন লাভ হয়নি। অবশ্য মিনহাজকে আমার আশঙ্কার কথাটা বলি নি-মিলির কেস থেকে হায়দারভাইকে সরিয়ে দেয়া হতে পারে।
আমি ভেবেছিলাম আমার কাছ থেকে এসব শুনে মিনহাজ খুবই উত্তেজিত হয়ে চেঁচামেচি শুরু করে দেবে, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো সে। তার থমথমে মুখের দিকে চেয়ে আমার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। বেচারা মাত্র স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলো তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রির হত্যাকারির বিচার হবে। উপযুক্ত শাস্তি হবে। সেই স্বপ্ন বিরাট বড় একটা ধাক্কা খেয়েছে।
কোন অভিযোগ, অনুযোগ কিংবা আক্ষেপ না করে, বিন্দুমাত্র উত্তেজিত না হয়ে মিনহাজ চুপচাপ চলে গেলো। যাবার সময় আমার দিকে ফিরেও তাকালো না। আমিও তাকে পেছন থেকে ডাকলাম না, চুপচাপ তার চলে যাওয়া দেখে গেলাম কেবল।
হায়দারভাই আর থানায় আসছে না দেখে আমি ভড়কে গেলাম। তিনি কি চাকরি ছেড়ে দিলেন! এই লোকের পক্ষে এমন কাজ করা মোটেও অসম্ভব ছিলো না। ভালো করেই জানতাম, রুটি-রুজি আর ভবিষ্যতের চিন্তা, কোন কিছুই তাকে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া থেকে বিরত রাখতে পারবে না।
বাধ্য হয়ে আমি ঐদিন সন্ধ্যার পর তার বাসায় চলে গেলাম। একটা সোয়েটার আর লুঙ্গি পরে তিনি তার দু-কামরার ছোট্ট বাসার সামনে একটা পুরনো নীচু দেয়ালের উপর বসে সিগারেট টানছিলেন, আমাকে দেখে নির্বিকার মুখে তাকালেন, সেই মুখে গভীর বিষাদ। তার যন্ত্রণাকাতর মায়াভরা চোখদুটো এখনও আমি ভুলতে পারিনি।
আমি চুপচাপ তার পাশে গিয়ে বসতেই আধ-খাওয়া সিগারেটটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। তখনও তার দৃষ্টিতে শূন্যতা।
“জামিনই তো হয়েছে…কেসটা তো আর ক্লোজ হয়নি,” আধ-খাওয়া সিগারেটে একটা টান দিয়ে আস্তে করে বলেছিলাম আমি।
আমার দিকে না তাকিয়েই হাায়দারভাই বাঁকাহাসি দিলেন। “ধরে নাও এই কেস অলরেডি ক্লোজ হয়ে গেছে,” আস্তে করে বললেন তিনি, “তুমি আমি কেউ কিচ্ছু করতে পারবো না।”
প্রতিবাদ করে উঠলাম, “আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, আপনার মতো লোক এতো সহজে হাল ছেড়ে দিচ্ছে। দেখিই না কী হয়। শেষ পর্যন্ত ফাইট করা উচিত আমাদের।”
মাথা দোলালেন তিনি। “কোন লাভ নেই, আমি জানি এরপর কি হবে। একবার যখন ইন্টারফেয়ার করা শুরু হয়েছে তখন আর এই কেস নিয়ে আমি কোন আশা দেখছি না।”
“না, ভাই…এটা আমি মানতে পারলাম না।”
আমার মুখের দিকে তাকালেন তিনি।
“আপনি খুব দুরদর্শি মানুষ, অনেক কিছুই বুঝতে পারেন, কিন্তু এভাবে চেষ্টা না করে একেবারে হাল ছেড়ে দেয়াটা ঠিক হবে না। ঘটনা কোন্ দিকে যায় কে জানে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করে দেখা দরকার না?”
হায়দারভাই নির্বিকার রইলেন। যেন বালখিল্য কথাবার্তার জবাব দিতে চাইছেন না।
“মিনহাজ এসেছিলো,” আস্তে করে বললাম তাকে। “সব শুনে একেবারে পাথরের মূর্তি হয়ে গেলো। বেচারার দিকে তাকাতে পারছিলাম না।”
হায়দারভাই আবারো ফাঁকাদৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলেন দূরে কোথাও। “এখন আপনি যদি এভাবে হাল ছেড়ে দেন তো সে কোথায় যাবে, বলেন?”
“মেয়েটার চোখ শুধু ভেসে উঠছে চোখের সামনে।” অনেকক্ষণ পর আস্তে করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন তিনি।
বুঝতে পারলাম মিলির কথা বলছেন।
“মাত্র বিয়ে হয়েছে, নতুন জীবন শুরু করেছে। কতো স্বপ, কতো আশা। একদিন তার ঘর দাপিয়ে বেড়াবে ছোটো ছোটো বাচ্চা। ওদের মানুষ করবে, ছোটো ছোটো আঙুল ধরে ধরে পড়তে শেখাবে, কোলে নিয়ে গল্প শোনাতে শোনাতে ঘুম পাড়াবে।”
কথাগুলো আমাকেও আলোড়িত করলো। নিহত মিলির চোখদুটো আমিও ভুলতে পারিনি। আজো সেই স্মৃতি জ্বলজ্বল করছে।
“শোনো,” বেশ শান্তকণ্ঠেই বললেন তিনি, “আমি হাল ছেড়ে দেবো না। সারা জীবনে আমি এ কাজ করিনি। মৃত্যুর আগপর্যন্তও আমি এটা করবো না।”
আশান্বিত হয়ে উঠলাম আমি। এই তো আমার হায়দারভাই! আমাদের অতি চেনা এসএম হায়দার।
“যদিও জানি, কিচ্ছু করতে পারবো না,” একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে বললেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে আমার আশার আলো দপ করে নিভে গেলো। “কিন্তু হেরে যাবার ভয়ে যুদ্ধ করবো না সেটা ভেবো না।”
কথাটা শুনে আমার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেছিলো। সংশপ্তক! হেরে যাবে জেনেও যারা লড়াই করে যায়! মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে!
“ভাই, আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা…আমি বিশ্বাস করি না নেতা নামের ঐসব বেজন্মাদের কাছে আপনি হেরে যাবেন,” জোর দিয়ে বললাম তাকে, তবে মনেপ্রাণে বিশ্বাসও করেছিলাম কথাটা বলার সময়।
এরকম আরো অনেক কথা বলেছিলাম তখন, সে-সব আর বিস্তারিত মনে নেই। তবে পরদিন যে হায়দারভাই থানায় যোগ দিয়েছিলেন সেটা নিশ্চয় আমার এসব কথার কারণে নয়। আজন্ম লালিত স্বভাব আর চরিত্রই তাকে পরিচালিত করতো সব সময়।
