কেউ কেউ কথা রাখে – ৩৮

অধ্যায় ৩৮

খুনির সন্ধান

টিকেট কেটে বাসের জন্য অপেক্ষা করছি আর ভাবছি শেক্সপিয়ার ঠিকই বলেছেন, বাস্তব কল্পনার চেয়েও বেশি রোমাঞ্চকর!

মনের কোণে একটা আক্ষেপেরও উদয় হলো। ইমতিয়াজের মতো এক অমানুষকে যে শাস্তি দিয়েছে মিনহাজ সেটা দেবার কথা ছিলো আমার। সে কেবল মিলিরই নয়, হায়দারভাইয়েরও খুনি। আমি কি এরকম উদ্যোগ নিতে পারতাম না? মিনহাজের মতো? খুঁজে খুঁজে ইমতিয়াজকে বের করে ওকে ওর প্রাপ্য শাস্তি দিয়ে হায়দারভায়ের খুনের প্রতিশোধ নিতে পারতাম না?

কিন্তু আমি ভালো করেই জানি এরকম কাজ কখনওই আমার পক্ষে করা সম্ভব হতো না। চিরটাকালই আমি ভীতু আর কাপুরুষ একজন। আমার পক্ষে যুদ্ধে যাওয়া সম্ভব হয়নি। হায়দারভায়ের হত্যার বদলাও নিতে পারিনি। কিছুই করতে পারিনি। আমি কেবল পালাতে পারি, নিভৃতে বসে বসে গল্প লিখতে পারি। এর বেশি কিছু করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

ব্যাগের ভেতর থেকে পাণ্ডুলিপিটা বের করে আশেপাশে কোন ডোবা-নালায় ছুঁড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে করলো। কিন্তু ওই পর্যন্তই, .এটা করতেও ব্যর্থ হলাম আমি। ব্যাগটা বুকে আগলে ধরে উদাস হয়ে চেয়ে রইলাম মহাসড়কের দিকে এই আক্ষেপ না করে পারলাম না, যে গল্পটা আমি জানলাম, যে গল্পটা আমার জীবন আমূল পাল্টে দিয়েছিলো সেটার পরিসমাপ্তি যতো রোমাঞ্চকরই হোক না কেন, হয়তো প্রকাশ করতে পারবো না। অন্তত মিনহাজ বেঁচে থাকতে তো নয়- ই।

বাসটা আসতে বেশ দেরি করলো। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে গেলাম আমি। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার দিকে হামাগুঁড়ি দিচ্ছে দিনের আলো। ক্ষিদেয় পেট আর্তনাদ করতে শুরু করে দিলেও উঠে গিয়ে আশেপাশের কোন খাবারের দোকান থেকে যে কিছু কিনে খাবো সে ইচ্ছেও করলো না।

এ সময় হঠাৎ করেই কিছু দৃশ্য আর স্মৃতি আমার মাথায় ভর করলো। এটা আমি গুছিয়ে বলতে পারবো না। দৃশ্যগুলো বর্ণনা দেয়াও সম্ভব নয়। কেমন এলোমেলো আর দ্রুত। কিন্তু স্পষ্ট একটা ইঙ্গিত আছে তাতে।

মিনহাজ নিজের হাতে ইমতিয়াজকে গুলি করে হত্যা করেছে-এটা মেনে নিতে কষ্ট হলো আমার। কেন এমনটা মনে হলো সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না, তবে মনের ভেতর একটা খচখচানির জন্ম হলো আচমকাই। অতীত আর বর্তমানের কতোগুলো দৃশ্য, কথা, ঘটনা আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুললো। আপাতত বিচ্ছিন্ন এসব দৃশ্য, ঘটনা আর কথাগুলো জোড়া লাগতে লাগতে একটা আকার তৈরি করে ফেললো।

কিছু একটা ভুল হয়ে গেছে!

মিনহাজ যা বলেছে তাতে কিছু অসঙ্গতি আছে!

পুরোটা সত্যি বলেনি!

আমি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালাম এক ধরণের তাড়নায়। ঢাকায় যাবার নির্দিষ্ট বাসটা চলে এলো এ সময়। কিন্তু আমি সেটাতে না উঠে একটা রিক্সা ডাকলাম।

*

মিনহাজের খামারবাড়ি থেকে একটু দূরেই রিক্সাটা ছেড়ে দিলাম আমি। সন্ধ্যা নেমে পড়েছে। চারপাশ অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। বাড়ির সামনের গেট দিয়ে না ঢুকে আমি অনেকটা পথ হেটে পেছন দিকে চলে এলাম। জায়গাটা ডোবা-নালা আর ঝোঁপঝাঁড়ে পরিপূর্ণ। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাড়ির সীমানা দেয়া থাকলেও সেটা অনায়াসে টপকে যেতে পারলাম, কারণ বেশ কিছু জায়গায় কাঁটাতার ঝুলে নীচু হয়ে গেছিলো।

খুবই সতর্ক পদক্ষেপে, একটু নীচু হয়ে আমি ঢুকে পড়লাম মিনহাজের বাড়ির পেছনে থাকা গোয়াল ঘরের পাশ দিয়ে। বড় বড় গাছ আর ঝোঁপের কারণে লুকিয়ে প্রবেশ করাটা সহজ হলো আমার জন্য। দূর থেকে মিনহাজের একতলা বাড়িটার দিকে তাকালাম। একটা ঘর আর বারান্দায় বাতি জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছে। জানালা দিয়ে ভেতরে মিনহাজকে দেখতে পেলাম না অবশ্য।

অপেক্ষা করার জন্য একটা বড় গাছের নীচে ঘাপটি মেরে বসে পড়লাম। আমার মাথার মধ্যে দৃশ্য আর স্মৃতি প্রবল বেগে এসে আছড়ে পড়ছে। অসঙ্গতিটা খুব যে বড় তা নয়, কিন্তু আমার মন বলছে, এখানে এসে ভুল করিনি। সত্যটা আমাকে জানতে হবে। পুরো সত্যটা। মিনহাজের বলা অর্ধসত্য নয়!

আমি জানি না কতোক্ষণ এভাবে গাছের নীচে বসে ছিলাম, তবে চারপাশ

গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে যাবার পর এক সময় দেখতে পেলাম মিনহাজ বাড়ির ভেতর থেকে বের হয়ে আসছে। সতর্ক হয়ে উঠলাম আমি, যদিও জানি অমন অন্ধকারে এত দূর থেকে আমাকে সে দেখতে পাবে না।

মিনহাজ গোয়াল ঘরের দিকে না এসে তার ডানপাশে একটি ঘন ঝোঁপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তার হাতে খাবারের ট্রে! তবে তাতে খাবার নাকি অন্য কিছু আছে সে-ব্যাপারে নিশ্চিত হতে পারলাম না।

চামড়ার ব্যাগটা রেখে গাছের নীচ থেকে উঠে পা টিপে টিপে চলে গেলাম সেই ঝোঁপের কাছে। ঘন ঝোঁপের মাঝখান দিয়ে সরু একটা গলির মতো চলে গেছে, অন্ধকারের জন্য দেখতে বেশ বেগ পেতে হলো। ঝোঁপের ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়তেই দেখতে পেলাম আরেকটা ঘর আছে সেখানে। সম্ভবত গুদামঘর, কিংবা এরকম কিছু।

সেই ঘরের কাঠের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একহাতে ট্রে-টা ধরে অন্য হাত পকেটে ঢুকিয়ে চাবি খুঁজছে মিনহাজ। আমি থমকে দাঁড়ালাম। আস্তে করে কয়েক পা পিছিয়ে গেলাম, পাছে টের পেয়ে যায় সে। তালা খুলে দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়লো মিলি স্বামি। ভয় পাচ্ছিলাম, ভেতরে ঢুকে হয়তো দরজাটা আবার লাগিয়ে দেবে, কিন্তু সেটা না করেই ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়লো মিনহাজ।

একটু অপেক্ষা করে আমিও ঢুকে পড়লাম সেই ঘরে। ঘুট ঘুটে অন্ধকার। চোখে কিছুই দেখতে না পেয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক মুহূর্ত। মিনহাজের কোন চিহ্ন নেই সেখানে!

অন্ধকারে চোখ সয়ে আসার পর দেখতে পেলাম ঘরের ডানদিকে, এককোণে একটা দরজা। আধ-ভেজানো। ভেতর থেকে মৃদু আলো আসছে!

দরজাটার দিকে এগিয়ে গেলাম আমি। নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিলাম এ সময়। আস্তে করে দরজা খুলে যা দেখতে পেলাম সেটা অভাবনীয়।

দরজাটা পাশের কোন ঘরে যাবার জন্য নয়! ওটার ওপর পাশে মাটির নীচে একটা সিঁড়ি চলে গেছে

একটি ভূ-গর্ভস্থ কক্ষ!

সেই ঘরটায় মৃদু লালচে আলোর একটি বাল্ব জ্বলছে। সেই আলো এসে পড়েছে সিঁড়ির উপরে, আলমিরার দরজা পর্যন্ত।

বুক ভরে দম নিয়ে সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখলাম আমি। আস্তে আস্তে নীচে নামতে শুরু করলাম। নীচের ঘর থেকে একটা শব্দ ভেসে এলো। সম্ভবত খাবারের ট্রে-টা মেঝেতে রাখার শব্দ।

মাটির নীচে ঘরটার আয়তন হবে বড়জোর পনেরো বাই পনেরো ফুটের মতো। বেশ নীচু ছাদ। আমার ধারণা, উচ্চতা আট ফুটের বেশি হবে না। অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে একটি জায়গা। তীব্র বোটকা গন্ধ সেখানে। বামদিকের দেয়ালে একটা লালচে বাতি জ্বলছে। সেই আলোতে দেখতে পেলাম ঘরের এককোণে একটা খাঁচা! সেই খাঁচার ভেতরে শেকলে বাধা একটি পশু জবুথবু হয়ে বসে আছে!

মিনহাজ চেয়ে আছে সেই খাঁচা থেকে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে। খাবারের ট্রে-টা খাঁচার সামনে রাখা, পশুটার নাগালের মধ্যে।

চোখ কুচকে ভালো করে তাকালাম আমি। পশুটা মুখ তুলে তাকালো মিনহাজের দিকে!

আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো।

পশু নয়! এক আদম সন্তান! ময়লা গেঞ্জি, ছেঁড়া প্যান্ট আর খালি পা। মাথার চুলগুলো আগাছার মতো বেড়ে কাঁধ পর্যন্ত আছড়ে পড়েছে। মুখের সাদা দাড়ি-গোঁফও সেই মতো বাড়ন্ত। অনেকটা বন-মানুষের মতো দেখাচ্ছে তাকে!

মানুষটা টের পেয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমার দিকে তাকালো। তার দু-চোখে বিস্ময়, অবিশ্বাস।

আমাদের মধ্যে চোখেচোখি হলো। মিনহাজও চমকে দেখতে পেলো আমাকে। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো সে। কিন্তু আমার সমস্ত মনোযোগ বন্দির দিকে।

কয়েক মুহূর্ত, তারপরই বুঝতে পারলাম, বন্দি মানুষটাকে আমি চিনি। ইমতিয়াজ!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *