কেউ কেউ কথা রাখে – অবশেষে

অবশেষে

কেউ কেউ কথা রাখে

বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের চেয়ে বিরক্তিকর আর অপছন্দের কিছু হয় না-অন্তত আমার নিজের কাছে। এটা করতে আমি রীতিমতো ঘেন্না করি। শুরুর দিকে প্রকাশক আমাকে কখনও এ নিয়ে তাগাদাও দিতো না। সেটা একদিক থেকে ভালোই ছিলো। কিন্তু একটু আধটু জনপ্রিয়তা পাবার পর, লেখক হিসেবে একটা পরিচিতি গড়ে ওঠার পর এ নিয়ে প্রকাশকের চাপ বাড়তে থাকলো। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের আর্থিক এবং প্রচারণার গুরুত্ব বোঝাতে আরম্ভ করলো সে। সারা দুনিয়ায় এই রীতি আছে। সব লেখকই তাদের বইয়ের প্রচারণার জন্য এটা করে থাকে। এখানে পছন্দ-অপছন্দ বলে কিছু নেই। এটা একটা বিজনেস স্ট্র্যাটেজি। পাবলিসিটি করার সর্বোত্তম পন্থা।

আপনার যে একটা বই বের হলো সেটা সবাইকে জানাতে হবে না?

প্রকাশকের এমন যুক্তির কাছে একটা সময় হার মানতেই হয়েছিলো। কিন্তু সত্যি বলতে, এরকম অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে কখনওই স্বস্তি বোধ করিনি। অনুষ্ঠানে তোলা আমার ছবিগুলোই সেটার সাক্ষ্য দেবে।

তবে বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম কেউ কেউ কথা রাখের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের সময় আমার মধ্যে আগের সেই অস্বস্তিটা আর ফিরে এলো না। সেটার কারণ কি আমি জানি না। সম্ভবত আমার পাশে তখন রামজিয়া শেহরিন ছিলো কিংবা গল্পটা প্রকাশের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা।

মিনহাজের ওখান থেকে ফিরে আসার পর রামজিয়াকে যখন সব জানালাম তখন সে আমাকে বইটা শেষ করার তাগিদ দিয়েছিলো। আমি সেটা খুব দ্রুতই করেছিলাম কারণ অসমাপ্ত বইটার শুধু সমাপ্তি জুড়ে দিতে হয়েছিলো আমাকে। বাকি সব আগের মতোই রেখে দিয়েছিলাম। ওগুলো পরিবর্তন করার কোন দরকারই পড়েনি।

তবে লেখা শেষ করলেও আমি পাণ্ডুলিপিটা প্রকাশককে দেইনি। এ নিয়ে প্রকাশক–যে কি না আমার বন্ধুও বটে-বেশ তাড়া দিচ্ছিলো। তাকে মিথ্যে বলা কিংবা এড়িয়ে যাওয়াটা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে তাকে পুরো ঘটনাটা বলি। অবশ্য বলার আগে রামজিয়ার মতো তাকেও কঠিন প্রতীজ্ঞা করিয়েছিলাম।

সবটা শুনে আমার সিদ্ধান্তের সাথে একমত পোষণ করেছিলো সে। তাকে অবশ্য বলেছিলাম, মিনহাজের মৃত্যুর পর বইটা যেন প্রকাশ করা হয়। এর আগে নয় কোনভাবেই। এমনকি তার আগে আমার মৃত্যু হলেও না।

“আর যদি আমি নিজেই মরে যাই তোমাদের আগে?” আমার প্রকাশক-বন্ধু বলেছিলো।

মুচকি হেসে কাঁধ তুলে বলেছিলাম, “সেক্ষেত্রে তুমি তোমার উইলে এমন ব্যবস্থা করে যে-ও যেন তোমার উত্তরাধিকারিরা সেটা প্রকাশ করে।”

আমার কথা শুনে সে হেসে ফেলেছিলো। “তাহলে পুরোপুরি প্রকৃতির উপরেই নির্ভর করতে হবে আমাদের!”

শেষ পর্যন্ত তা-ই হয়েছে। গত মাসে জানতে পারি, মিনহাজ মারা গেছে। সত্যি করে বললে, সে নিজের জীবন নিজের হাতেই শেষ করে দিয়েছে। কয়েক বছর আগে তার ক্যান্সার ধরা পড়েছিলো, একেবারে শেষ স্টেজে। বাঁচার কোন আশা ছিলো না। সে-ও কোন রকম চেষ্টা করেনি। ওষুধপত্র-কেমো থেরাপির দ্বারস্থ হয়নি। নিরবে, নিভৃতেই শেষ বিদায় নিয়েছে।

আত্মহত্যা করার পরদিন তার লাশ আবিষ্কার করে খামারের এক কর্মচারি। কী একটা দরকারে বাড়িতে গিয়েও ওকে ডাকাডাকি করে না পেয়ে ঘরের দরজা খুলে আবিষ্কার করে মিনহাজের নিথর দেহটা। পাশেই পড়েছিলো একটি সিরিঞ্জ আর অজ্ঞাত ওষুধের খালি শিশি। সেই সাথে একটা চিরকুট।

পুলিশ এসে তার লাশ নিয়ে যায়। পরে সৎকার করা হয় খামারবাড়ির পেছনে। কিন্তু মাটির নিচে থাকা ঐ বন্দিশালার খোঁজ কেউ পায়নি। হয়তো সময় গড়ালে সেটার খোঁজ কেউ না কেউ ঠিকই পেতো কিন্তু এখানেও প্রকৃতি হস্তক্ষেপ করেছে।

মিনহাজ মারা যাবার পরের সপ্তাহেই প্রবল বন্যা হয়। ডুবে যায় খামারবাড়ি আর তার আশেপাশের সব গ্রাম। আট-নয়দিনের বন্যায় ডুবেছিলো পুরো এলাকাটি।

আমার বুঝতে কষ্ট হয়নি ইমতিয়াজের কি পরিণতি হয়েছিলো। ক-দিন না খেয়ে কষ্ট পেয়ে অবশেষে পানিতে ডুবে তার সমাধি হয়ে গেছে।

এসব খবর আমি জেনেছি মিনহাজের কারণেই!

আত্মহত্যা করার আগে সে আমার জন্য একটা চিরকুট রেখে গেছিলো। পুলিশ যেন আমাকে হয়রানি না করে সে-কথাও বলে গেছিলো চিরকুটে। অনুরোধ করে গেছিলো, তার মৃত্যুর খবরটা যেন আমাকে জানানো হয়। কারণ আরো একবার সে আমার কাছে ঋণী!

বুঝতে পারলাম, এই ঋণ হচ্ছে আমার নীরবতা!

মিনহাজের লাশ আবিষ্কার হবার দু-দিন পরই ওখানকার পুলিশ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনাটা জানায়। সব শুনে আমি ভীষণ দোটানায় পড়ে গেছিলাম। মিনহাজের খামার বাড়িতে যে ইমতিয়াজ বন্দি হয়ে আছে সে-কথা কি পুলিশকে বলবো?

সারা রাত ভেবে অবশেষে মিনহাজের সিদ্ধান্ত আর স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে নিশ্চুপ থাকার পথটাই বেছে নেই। বুঝতে পারি, দীর্ঘ দিন ধরে পড়ে থাকা পাণ্ডুলিপিটা প্রকাশ করতে আর কোন বাধা নেই।

প্রকাশনা অনুষ্ঠানের শেষদিকে আমি যখন রামজিয়াকে নিয়ে বের হবার জন্য পা বাড়াচ্ছি তখনই অবাক হয়ে দেখতে পেলাম আমার দিকে এগিয়ে

আসছে এসএম হায়দার!

তার হাতে আমার সদ্য প্রকাশিত বইটা।

মূর্তির মতো জমে গেলাম আমি। কয়েক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম।

হায়দারভাই আমার সদ্য প্রকাশিত বইটা মেলে দিয়ে বলে উঠলো “অটোগ্রাফ, প্লিজ!”

তার পেছনে দেখতে পেলাম নীলুভাবি দাঁড়িয়ে আছে। “আমাদের ছেলে।” দেখতে একেবারে বাবার মতোই হয়েছে সে। আমি জানতাম, হায়দারভায়ের ছেলে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে ছিলো। সে যে দেশে ফিরে এসেছে সেটা আমার জানা ছিলো না। তারা এ অনুষ্ঠানের খবর কিভাবে জানলো সেই প্রশ্নের জবাব পেয়ে গেছিলাম একটু দূর থেকে আমার প্রকাশক- বন্ধুর থাম্ব-আপ আর চওড়া হাসি দেখে।

প্রসন্নভাবে হেসে জীবনের সবচেয়ে সার্থক অটোগ্রাফটা দেবার জন্য বইটির উৎসর্গ পৃষ্ঠাটি বেছে নিলাম। সাধারণত এই পৃষ্ঠায় অটোগ্রাফ দেই না আমি।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *