কেউ কেউ কথা রাখে – ৩৪

অধ্যায় ৩৪

নিহত ভোর

থানা থেকে ফিরে এসে পর পর দু-দিন আমি নিজের ঘরে বন্দি হয়ে রইলাম আবারো। চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেও আনুষ্ঠানিকভাবে সেটা করার দরকার মনে করিনি। ভালো করেই জানতাম, নতুন পোস্টিংয়ে জয়েন না করলে কিছুদিনের মধ্যেই আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

চাকরি ছেড়ে দেবার সিদ্ধান্তটা নেবার পর থেকে খুব হালকা বোধ করছিলাম আমি, যেন এক ধরণের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়েছি।

কিন্তু আমি করবো কি? জীবনধারণের জন্য তো একটা কিছু করতেই হবে। অবশ্য এই চিন্তাটা আমাকে খুব একটা ব্যতিব্যস্ত করতে পারেনি। একা একজন মানুষ। সংসার বলতে কিছু নেই। কিছু একটা করে জীবন ধারণ করা যে যাবে সেটা নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন ছিলাম না। যা হবার হবে। পুলিশের চাকরি আর করছি না। এই চাকরির জন্য আমি একদমই বেমানান। জোর করেও যদি করে যাই তাহলে বড়জোর কয়েক মাস টিকে থাকতে পারবো, এর বেশি নয়। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত হয়ে গেছিলাম।

এদিকে পকেট আমার ফুটো। জমানো টাকার প্রায় সবটাই তেতো জলে ভেসে গেছে! ঘরের কোণে কতোগুলো খালি বোতল সেই কথাই বলছিলো।

খুব বেশি বন্ধু আমার কখনওই ছিলো না, বড় মামার বড় ছেলে সামাদ আমারই সমবয়সি, তার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিলো আমার। কয়েক মাস আগে এক প্রাইভেট ফার্মে চাকরি নিয়ে ঢাকার সোবহানবাগে উঠেছে সে। আমার মতোই ব্যাচেলর ছিলো। জন্মদিনের আগের রাতে কিছু টাকা ধার করার উদ্দেশ্যে তার বাড়িতে যাবার জন্য রওনা দিলাম

আমি থাকতাম আজিমপুর থানার খুব কাছে, পলাশিতে। ঐ সময় জায়গাটা এখনকার তুলনায় আরো বেশি নিরিবিলি ছিলো। রিক্সার টাকা বাঁচিয়ে সিগারেট খাবো বলে বাস ধরার জন্য শাহবাগের দিকে রওনা হলাম। হাটতে হাটতে চলে এলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে, দেখতে পেলাম পুরো এলাকাটি উৎসবের আমেজে সাজানো। মনে পড়ে গেলো, আগামিকাল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানে আসবেন। সমগ্র এলাকা জুড়ে ছড়ানো-ছিটানো বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে সাজানো-গোছানোর আয়োজন। রাস্তার এবড়ো-থেবড়ো গর্তগুলো সুরকি দিয়ে ভরাট করে পিচের আস্তরণ দেয়া হচ্ছে। অনেকদিন অনাদরে মৃত জন্তুর কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে থাকা হতশ্রী দেয়ালগুলোর মুখে যেন চুন-সুরকির প্রসাধন মেখে দেয়া হচ্ছে যত্নসহকারে। গোটা এলাকায় সাজ সাজ রব, তাড়াহুড়ো আর ব্যস্ততা।

রাতের অন্ধকারে আলকাতরা দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে লেখা চিকাগুলো চুনের প্রলেপে ঢেকে ফেলা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের উঁচু দেয়ালে শিল্পীর নিপুণ তুলিতে লেখা সুন্দর সুন্দর কথা শোভা পাচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, বাঙালি জাতির ত্রাণকর্তা, সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রবর্তনের মহানায়ক, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লৌহমানব, ইত্যাদি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আসছেন তাই বিশ্ববিদ্যালয় নানান রঙের লেখায় সেজেগুজে সুন্দর হয়ে উঠেছে। চারদিকে একটা উৎসবের হাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তাগুলোর মোড়ে মোড়ে অভিনন্দন জানিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নানান রঙের প্ল্যাকার্ড আর তোরণ।

এগুলো দেখে আমার ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। দেশের সত্যিকারের চিত্রটা অবশ্যই এরকম ছিলো না। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় বিপ্লব বাকশাল মানুষকে তেমন আশান্বিত করতে পারছিলো না। বরং পরিস্থিতি আগের তুলনায় আরো বেশি খারাপ হয়ে উঠছিলো।

আমি নিশ্চিত ছিলাম না, তবে যতোটুকু মনে পড়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর এটা প্রথম আনুষ্ঠানিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন। তিনি শুধু রাষ্ট্রপতি নন, বাঙালি জাতির পিতা, মুক্তিদাতা, বাংলার হাটের মানুষ, ঘাটের মানুষ, মাঠের মানুষের বন্ধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে যাবার সময় সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনের কিছু ছেলেপেলেকে দেখলাম বেশ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। তাদের চোখেমুখে এক ধরণের উদ্বিগ্নতা। এক বাদামওয়ালার কাছ থেকে জানতে পারলাম সন্ধ্যার দিকে কে বা কারা কার্জন হলের কাছে বোমা ফাটিয়েছে-এটা নিয়ে নেতাদের ঘুম হারাম হবার জোগাড়। পুলিশ থাকা সত্ত্বেও সারারাত ক্যাম্পাসে পাহারা দেবে তারা।

হাটতে হাটতে শাহবাগে চলে এলাম আমি কিন্তু বাসের দেখা পেলাম না। অগত্যা পকেটে যা ছিলো তা দিয়ে এক প্যাকেট সিগারেট কিনে একটা ধরিয়ে আবারো হাটতে শুরু করলাম আমি। একের পর এক সিগারেট ধ্বংস করে আর নানান ভাবনা ভাবতে ভাবতে চলে এলাম বত্রিশ নাম্বারের কাছে-বঙ্গবন্ধু যেখানে তার পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করেন। বত্রিশ নম্বর পেরোবার সময় খাকি পোশাক পরা আট-দশজন পুলিশ দেখলাম। কয়েকজন অফিসার, বাকিরা কনস্টেবল। বন্দুক উঁচিয়ে রাষ্ট্রপতির বাসভবনের সামনের সড়কে পাহারা দিচ্ছে।

একা একা হাটছিলাম আর ভয়ানক একা বোধ করছিলাম আমি। চারপাশের কারো সঙ্গে আমার সম্পর্ক নেই, যেন কোনকালে ছিলোও না। আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো চিৎকার করে কিছু বলতে। যদি সেই চিৎকার বঙ্গবন্ধুর কানে পৌঁছায়!

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দেখে আসছি, যেসব মূল্যবোধগুলো সমীহ করতাম সেগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। লোভির লোভ, প্রবলের অন্যায়কে এমনভাবে জেগে উঠতে আমি কোনোদিন দেখিনি। এত কষ্টের, এতো রক্তে রঞ্জিত স্বাধীনতা যেন আমাদেরকে প্রতিদিন প্রতারিত করছে। কিন্তু সে কথা কার কাছে যেয়ে বলবো? এ কেমন স্বাধীনতা যেখানে আমরা মনের কথা খুলেও বলতে পারছি না! চোখের সামনে সত্য হয়ে যাচ্ছে মিথ্যে! বঙ্গবন্ধু গোটা জাতিকে নিয়ে আসলে কি করতে চান-আমি জানি না। এত অত্যাচার, এত দুঃখ, এত কাপুরুষতা আর সহ্য হচ্ছিলো না।

বত্রিশ নাম্বার অতিক্রম করার সময় আমার অন্তরাত্মা আর্তনাদ করে উঠলো।

বঙ্গবন্ধু! তোমার স্বাধীন দেশে হায়দাররা বেঘোরে মরে পড়ে থাকে। মিলিদের জীবনস্বপ্ন ধর্ষিত হয়। কিন্তু ইমতিয়াজরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়!

বাড়িটা পেরোনোর সময় একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এলো আমার ভেতর থেকে।

সোবহান বাগে মামাতোভায়ের ডেরায় যখন পৌঁছালাম পা দুটো ব্যথা করতে শুরু করে দিয়েছে। আমাকে দেখে একটু অবাকই হলো সামাদ। কারণ ও ঢাকায় আসার পর মাত্র একবার এসেছিলাম দেখা করতে। খুব একটা যোগাযোগ ছিলো না আমাদের।”

যাই হোক, অনেকদিন পর ওর সাথে দেখা হয়ে যাওয়াতে ভালোই লাগলো। গ্রামের খবর জানতে পারলাম। পরিচিত মানুষগুলো কে কোথায় আছে জেনে নিলাম। রাত বেশি হয়ে যাওয়াতে সামাদ থেকে যেতে বললো। আমি খুব একটা আপত্তি করেলাম না। নিজেকে বড্ড অসহায় আর একাকি মনে হচ্ছিলো। সামাদের সাথে রাতটা থেকে গেলে আমার বিশাল একাকিত্ব একটুখানি ঘুচবে।

পুরনো দিনের গল্প করতে করতে অনেক রাতে ঘুমিয়ে পড়লাম আমরা। ভোরের আগেই আমাদের সেই কাঁচা ঘুম ভাঙলো বিকট শব্দে। প্রথমে বুঝতে পারিনি। বুক ধরফর করে উঠে বসি দু-জনে। সামাদই প্রথমে বললো এটা গোলাগুলির শব্দ। কয়েক বছর আগে মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন ফায়ারিংয়ের শব্দের সাথে আমাদের সবারই পরিচয় হয়ে গেছিলো। এমনকি শব্দ শুনেও আমরা বুঝতে পারতাম কোনটা কামান আর মেশিনগানের আওয়াজ।

আরেকটা বিকট শব্দে কেঁপে উঠলো সামাদের ছোট্ট ঘরটা। সে-ই প্রথমে বলে উঠলো, এটা ট্যাঙ্কের গোলার শব্দ।

ট্যাঙ্ক?! এই সোবহানবাগে?!

সামাদের ঘরটা ছিলো মেইনরোডের পাশে ছোট্ট একটা গলির মুখে। তার ঘরের জানালা দিয়ে রাস্তাটা দেখা যেতো। জানালা একটু ফাঁক করে সামাদ বাইরে তাকালো।

“ট্যাঙ্ক! মিলিটারি!” অস্ফুট কণ্ঠে বলে উঠেছিলো সে।

“ট্যাঙ্ক? মিলিটারি?” অবিশ্বাস্য বলে মনে হলো আমার কাছে। “কি বলিস? ঘটনা কি?”

“দেখ্‌ না,” বলেই জানালা দিয়ে দেখার ইশারা করলো। আমি যে দৃশ্যটা দেখতে পেলাম সেটা একাত্তরের কোন মিলিটারি অপারেশনের কথাই মনে করিয়ে দিলো। কয়েক মুহূর্তে জন্য আমার মনে হলো, পাকিস্তানিরা আবার হামলে পড়েছে আমাদের উপরে!

“শেখ মুজিবের বাড়িতে হামলা করেছে মনে হয়,” সামাদই প্রথমে আন্দাজ করে বলেছিলো।

“কি?!” আমার বিশ্বাসই হলো না কথাটা। “কারা হামলা করবে? কার এত বড় সাহস!”

“কারা আবার করবে, দেখছিস না, মিলিটারি!” একটু থেমে আবার বললো সে, “কয়েক দিন ধরেই শহরে গুজব শোনা যাচ্ছিলো কিছু একটা হবে।”

আমি সামাদের কথা মেনে নিতে পারলাম না। এটা কিভাবে বিশ্বাস করি, যে বঙ্গবন্ধুর জন্য একাত্তরে মানুষ জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলো, পাকিস্তানি কারাগারে বন্দি থাকার সময় যার মুক্তির জন্য এ দেশের মা-বোনেরা রোযা রেখেছে, যাকে জাতির পিতা হিসেবে সবাই মানে, তাকে কি-না হত্যা করবে এ দেশেরই সেনাবাহিনী!

খবরটা জানার জন্য সামাদ দোতলায় চলে গেলো আমাকে রেখে। আমি জানালায় চোখ রেখে দেখে যেতে থাকলাম। রাস্তাটা পুরোপুরি ফাঁকা। মাঝেমধ্যে সেনাবাহিনীর জিপ আর ট্রাক যাতায়াত করছে। কিন্তু এর বেশি দেখা যাচ্ছিলো না। তবে আশেপাশে থেমে থেমে গুলির শব্দ হচ্ছিলো।

“বলেছিলাম না শেখ মুজিবের বাড়িতে হামলা করেছে!” দোতলা থেকে ফিরে এসে বললো সামাদ। “ছাদ থেকে দেখা যাচ্ছে মিলিটারি ঘিরে রেখেছে বত্রিশ নাম্বার।”

আমি প্রচণ্ড হতাশার সাথেই দেখতে পেলাম সামাদের চোখেমুখে খুশির ঝিলিক! তবে আমার মনোভাব বুঝতে পেরে অভিব্যক্তি বদলে ফেললো সে।

ভোরের পর গোলাগুলি থেমে গেলেও রাস্তাঘাট ফাঁকাই রইলো। সামাদ এসে জানালো রেডিওতে নাকি মেজর ডালিম নামের একজন ঘোষণা দিচ্ছে, শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে! সামাদ অবশ্য জানালো, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কেউ বেঁচে নেই। সবাইকে হত্যা করা হয়েছে!

এমন অবিশ্বাস্য ঘটনাও যে কখনও ঘটতে পারে এ দেশে সে কথা আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না তখনও। থম মেরে বসে ছিলাম কতোক্ষণ বলতে পারবো না। আমার সমস্ত জগত দুলে উঠেছিলো।

সকাল দশটার দিকে সামাদের নিষেধ সত্ত্বেও তার বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম আমি। বত্রিশ নাম্বারের সামনে দিয়ে যাবার সময় এক ভবঘুরে টাইপের লোককে দেখলাম আরেকজন উৎসুক ব্যক্তিকে বলছে, বাড়ির ভেতরে সিঁড়িতে নাকি বঙ্গবন্ধুর লাশ পড়ে আছে। সে নিজের চোখে দেখে এসেছে।

কথাটা সত্য নাকি মিথ্যা সেটা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামালাম না আমি। শুধু মনে হচ্ছিলো, এ দেশে সবই সম্ভব! অসম্ভব বলে কিছু আর নেই এখন!

জীবনে কখনও জন্মদিন পালন করিনি, ১৯৭৫ সালের পনেরোই আগস্ট জন্মদিন পালন করার কথা ছিলো, কিন্তু সেটা আর করা হয়নি। সত্যি বলতে, আর কখনও জন্মদিন পালন করা হয়ে ওঠেনি আমার। ইচ্ছেও করেনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *