কেউ কেউ কথা রাখে – ১৮

অধ্যায় ১৮

রামজিয়া হাসছে ঠিক দুই যুগ আগের মতো করেই। তার হাসি যেন একটুও বদলায়নি। আমার স্মৃতির সাথে হুবহু মিলে গেলো সেই হাসি

“এখনও সেই গিফটের কথা মনে আছে তোমার?”

আমিও বোকার মতো হেসে যাচ্ছি। মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “গিফট দেবার মতো খুব বেশি মানুষ তো আর আমার ছিলো না তখন।”

“এখন বুঝি অনেক আছে?”

“অস্বীকার করলে অন্যায় করা হবে। অন্তত যারা আমাকে গিফটগুলো দেয় তাদের প্রতি ভীষণ অন্যায় করা হবে।”

“নিশ্চয় ফিমেল ফ্যান?” মুখটিপে হেসে বললো সে। “মানে, এর বাইরে কিছু ভাবতে পারছি না বলে সরি।”

“মেল-ফিমেল দু তরফ থেকেই পাই।”

“কার কাছ থেকে পেতে বেশি ভালো লাগে?”

হা-হা করে হেসে ফেললাম। “এটা নির্ভর করে সময়ের উপরে।”

“বুঝলাম না?”

“দুই যুগ আগের হলে কোনো তরুণীর কাছ থেকে পেলেই বেশি ভালো লাগতো!”

“আর এখন?”

কাঁধ তুললাম আমি। “এখন কে দিলো, কি দিলো সে-সব নিয়ে আর মাথা ঘামাই না। উপহার পেলেই খুশি হই।”

“ডিপ্লোমেসি করার দরকার নেই, বুঝলে?” কপট অভিমান করে বললো যেন। “মেয়েদের কাছ থেকে পেলে তোমার ভালোই লাগে। বিশেষ করে অল্পবয়সিদের কাছ থেকে।”

আমি আবারো জোরে জোরে হেসে ফেললাম। “তবে দুঃখের কথা কী জানো, তোমার ঐ বইটা আমার কাছে নেই। হারিয়ে ফেলেছি।

রামজিয়া কাঁধ তুললো। “এতোদিন আগের কথা…হারাতেই পারো।”

এ সময় দেয়াল ঘড়িতে চোখ গেলে আঁতকে উঠলাম আমি। সন্ধ্যা সাতটা বেজে গেছে! “আজ উঠি। খেয়ালই ছিলো না কয়টা বাজে।”

এবার আর রামজিয়া কিছু বললো না। আমাকে উঠে দাঁড়াতে দেখে সে- ও উঠে দাঁড়ালো। “যোগাযোগ রেখো…আবার উধাও হয়ে যে-ও না।”

বুঝতে পারলাম না তার কথাটা ইঙ্গিতপূর্ণ কি-না। “উধাও হবার উপায় নেই। আবারো আসবো। পাণ্ডুলিপিটার ব্যাপারে তোমার মতামত জানতে হবে না…কেসটা যদি রি-ওপেন করা সম্ভব হয় তখনও তো তোমার হেল্প লাগবে।”

“তাহলে দরকার ফুরিয়ে গেলে আর যোগাযোগ রাখবে না?”

আমি তার চোখের দিকে চেয়ে রইলাম কয়েক মুহূর্ত। দুই যুগ আগে হলে এভাবে তার চোখের দিকে সরাসরি চেয়ে থাকতে সঙ্কোচ হতো, কিন্তু এমন একটা বয়সে এসে পৌঁছেছি, এরকম সঙ্কোচ আর হয় না আজকাল। “বয়স হয়েছে…পালানোর ক্ষমতা- ইচ্ছে কোনোটাই নেই। আড্ডা দেবার মতো সময় যদি তোমার থাকে তাহলে অবশ্যই আসবো।”

হেসে ফেললো রামজিয়া শেহরিন। “ওটা আমার হাতে যথেষ্ট পরিমাণেই আছে। ইউ নো, আই হ্যাভ নো ফ্যামিলি অ্যাট অল।”

মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “ঠিক আছে। ভালো থেকো। আর পাণ্ডুলিপিটা একটু দ্রুত পড়ে মতামত দিও, প্রকাশক খুব চাপ দিচ্ছে। সামনেই বইমেলা।”

“ও” বিস্মিত হলো সে। “হুম, ফ্রেব্রুয়ারি তো চলেই এলো। এই বইটা কি তখন বের করার প্ল্যান করছো?”

“যদি সময়মতো শেষ করতে পারি তাহলে মেলাতেই বের হবে,” বললাম তাকে।

“ঠিক আছে, আমি চেষ্টা করবো দ্রুত শেষ করতে।” একটু থেমে আবার বললো সে, “এই নাও, আমার কার্ড।”

আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়া তার কার্ডটা হাতে তুলে নিলাম। এটা করতে গিয়ে তার আঙুলের সাথে আমার আঙুলের আলতো স্পর্শ হলো। সত্যি বলতে, আমি এক ধরণের শিহরণ বোধ করলাম, একেবারে অল্পবয়সিদের মতো। কার্ডটা তড়িঘড়ি পকেটে ভরে নিলাম।

“আমি কার্ড ব্যবহার করি না, তাই দিতে পারছি না।”

“ইটস ওকে,” হেসে বললো সে। “তুমি তোমার ফোন নাম্বারটা দিয়ে যাও…দরকার পড়লে আমি তোমাকে কল করবো।”

আমি আমার ফোন নাম্বারটা রামজিয়াকে দিয়ে তাদের বাড়ি থেকে ফুরফুরে মেজাজে বের হয়ে এলাম। রিক্সা না নিয়ে দীর্ঘ পথ হাটলাম অকেদিন পর। আমার দু-পাশে পথঘাটগুলো বেশ বদলে গেছে। সেগুলো দুই যুগ আগের সুনশান আর নিরিবিলি নেই। প্রচুর মানুষের আনাগোনা। রাস্তার পাশে প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা আড্ডা দিচ্ছে, বাড়ি যাবার নাম নেই। ধানমণ্ডিতে এখন আর মুক্ত বাতাস নিতে নিতে হাটা যায় না। লোকজনের ভীড় ঠেলে কায়দা করে হাটতে হয়। এভাবে হাটতে আমার ভালো লাগে না, তাই অনেকটা পথ হেটে যাবার পর রিক্সা নিয়ে নিলাম।

নিজের ঘরে ফিরে অনেকক্ষণ বসে রইলাম ড্রইংরুমের সোফায়। হঠাৎ করেই ল্যাপটপটা চালু করে পাণ্ডুলিপির ফাইলটা ওপেন করে লেখাগুলোতে চোখ বোলাতে লাগলাম। কতোগুলো স্মৃতি মনে করতে বেগ পাচ্ছি। অথচ মাত্র ক-দিন আগে ওগুলো আমি ঠিকই লিখে রেখেছিলাম। ব্যাপারটা যেন এমন-দীর্ঘদিন মাথার ভেতর থেকে স্মৃতিগুলো বের করে লিখে রাখার পর আমি ভারমুক্ত হয়ে গেছি। এখন আর সেগুলোকে মাথায় নিয়ে ঘোরার কোনো মানে নেই।

আমার স্মৃতিভাণ্ডার যেভাবে হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে তাতে করে একটা ভয় জেঁকে বসলো আমার মধ্যে সম্ভবত দু-তিন বছর পর অনেক স্মৃতি পুরোপুরি মুছে যাবে। বিশেষ করে সুখের স্মৃতিগুলো। কেনজানি ওগুলো আমার কাছে প্রায়শই ঝাপসা হয়ে যায়। গুলিয়ে যায়। দুঃখের স্মৃতিগুলো নিখুঁত পেইন্টিংয়ের মতো সমস্ত ডিটেইল নিয়ে উদ্ভাসিত হলেও সুখের স্মৃতিগুলো ঝাপসা ছবির মতোই অস্পষ্ট।

আমি মাত্র ক-দিন আগে লেখা আমার পণ্ডুলিপিটায় চোখ বুলিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ের সুখকর স্মৃতিগুলো পুণরায় মাথায় ঢুকিয়ে নেবার চেষ্টা করলাম। আর সেই সংক্ষিপ্ত সুখকর স্মৃতিগুলো অবধারিতভাবেই রামজিয়া শেহরিনকে ঘিরে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *