অধ্যায় ১৪
খেলা
জীবনে প্রথম স্টেডিয়ামে গেলাম খেলা দেখতে নয়, আসামি ধরতে!
তার মানে এই নয় ঢাকা স্টেডিয়াম আমার কাছে অপরিচিত জায়গা। মাঝেমাঝে ওখানে ঢু মারতাম আমি, কিন্তু সেটা অবশ্যই মাঠের বাইরে। ঐ সময় ঢাকা শহরে নিউ মার্কেট ছাড়াও স্টেডিয়ামের নীচে বড় বড় কয়েকটি বইয়ের দোকান ছিলো। সেকেন্ডহ্যান্ড ইংরেজি বইও পাওয়া যেত কিছু দোকানে।
তো, হায়দারভাই আর আমি একদিনের জন্য আবাহনীর সাপোর্টার হয়ে গেলাম!
পশ্চিম-গ্যালারিতে ঢুকে দেখি একেবারে কাণায় কাণায় পূর্ণ। হায়দারভাই বলেছিলেন নতুন দল আবাহনীর সপোর্টার অতো বেশি হবে না। কিন্তু গ্যালারি চিত্র সে-কথা বলছিলো না। আবাহনীর সাপোর্টাররা সংখ্যায় যেমন বেশি তেমনি তারা সুসংগঠিত। অনেকেই দলের জার্সি পরে এসেছে। কারো কারো হাতে দলের পতাকা। অন্যদিকে পুব-গ্যালারিতে পুরনো দল ঢাকা ওয়ান্ডারাসের কয়েক হাজার সমর্থক-দর্শক দেখে মনে হলো, দীনহীন এক জমিদার বসে আছে! যার সমস্ত গৌরব আর জৌলুস ম্রিয়মান। যেন দলটির সাপোর্টাররা দীর্ঘদিনের অভ্যাসবশত চলে এসেছে স্টেডিয়ামে! “
কট্টর সাপোর্টারদের গ্যালারিতে ঢুকে শুরু করে দিলাম মানুষের মুখ দেখার কাজ। শতশত, হাজার-হাজার মানুষের মুখ দেখা যে কী পরিমাণ বিরক্তিকর আর যন্ত্রণাদায়ক কাজ সেটা ভুক্তভোগি ছাড়া কেউ বুঝবে না।
খেলা শুরু হবার আগে পনেরো মিনিটে ইমতিয়াজের খোঁজ পেলাম না। খেলা শুরু হবার পর পনেরো-বিশ মিনিট অতিক্রান্ত হতেই আমাদের হতাশা বাড়তে শুরু করলো। হায়দারভাই দুই ঠোঙা চিনাবাদাম কিনে আনতে গেলেন। আমি জানি ইমতিয়াজের ছবি দেখিয়ে তিনি বাদামওয়ালাদের কাছে জানতে চাইবেন চেনে কি-না। ওদের কাছ থেকে কিছু না পেয়ে ফিরে এসে একটা বাদামের ঠোঙা আমার হাতে ধরিয়ে দিলেন তিনি। ভাবখানা এমন, খাও আর দেখো!
কিন্তু কী দেখবো, জনসমুদ্র?
এক একটা সুদীর্ঘ গ্যালারি ধরে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মানুষের মুখ পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছি। ততোক্ষণে চোখ, ঘাড় আর মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেছে আমাদের। সত্যি বলতে, খেলার হাফ-টাইমের একটু আগেই আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। বাদাম চিবোতে চিবোতে মানুষের মুখগুলো আর দেখছিলাম না। শুধু ভান করছিলাম আমি ইমতিয়াজকে খুঁজে যাচ্ছি।
প্রথম আশার আলোটা দেখলেন হায়দারভাই-ই। হাফ-টাইম হবে হবে, ঠিক অমন সময় খপ্ করে আমার হাতটা ধরে বললেন, “ঐযে!”
আমি চমকে তাকালাম তার দিকে। “কোথায়?”
আমার কথার জবাব না দিয়ে তিনি ছুটে গেলেন সামনের একটা গ্যালারির দিকে। অগত্যা তাকে অনুসরণ করতে বাধ্য হলাম আমি।
গ্যালারি ভর্তি দর্শকের মধ্য দিয়ে ঠেলেঠুলে এগোনোটা যে কতো দুরুহ ব্যাপার সেটা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেলাম। ফুটবলপ্রেমিদের মনোযোগ বিঘ্ন ঘটিয়ে, গালাগালি হজম করে এগিয়ে গেলেন এসএম হায়দার, আর তার পিছু পিছু আমি। তাকে যে কিছু বলবো তার কোনো উপায় নেই। তবে জিজ্ঞেস করার খুব একটা দরকারও পড়েনি, ভালো করেই জানতাম ইমতিয়াজকে দেখতে পেয়েছেন!
নিবিষ্টমনে খেলা দেখতে থাকা এক যুবককে কলার ধরে টেনে ওঠাতে যাবেন অমনি থমকে গেলেন এসএম হায়দার। যুবক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। আমি তার পেছনে এসেই বুঝতে পারলাম কি হয়েছে।
ভুলে ইমতিয়াজ মনে করে এক যুবককে ধরেছেন তিনি!
ছেলেটা দেখতে ইমতিয়াজের মতো। মানে, ছবিতে যে ইমতিয়াজকে আমরা দেখি। সন্দেহভাজনকে আমরা তখনও সামনাসামনি দেখিনি। সুতরাং বাস্তবের ইমতিয়াজ কেমন তা জানতাম না, ভুল হওয়াটা একদম স্বাভাবিকই ছিলো।
যাই হোক, সঙ্গে সঙ্গে কলার ছেড়ে দিয়ে হাসিমুখে যুবককে এসএম হায়দার বললেন, “সরি ভাই। আমি ভেবেছিলাম আমার বন্ধু ইমতিয়াজ।” বলেই তিনি আমার দিকে ফিরলেন।
বিরক্ত হয়ে সেই যুবক বিড়বিড় করে কিছু বললেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই আমাদের।
আক্ষেপে মাথা দোলালেন এসএম হায়দার। আমি তার বাহু ধরে ওখান থেকে টেনে নিয়ে এলাম অপেক্ষাকৃত কম ভিড়ের একটি জায়গায়।
“ভাই, এভাবে যাকে তাকে ধরলে তো গণপিটুনি দেয়া শুরু করবে।”
মাথা নেড়ে সায় দিলেন তিনি, “হুম।”
কিন্তু আমার মনে হলো না হায়দারভাই বুঝেছেন। তিনি যে ছবির ইমতিয়াজকে গ্যালারিতে থাকা হাজার-হাজার দর্শকের ভেতর থেকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে মরিয়া সেটা তার চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো।
“চলো, একটা সিগারেট ধরাই,” বলে তিনি আমাকে আরেকটু কম ভিড়ের জায়গায় নিয়ে গেলেন। “এটা কোনো ব্যাপার না, বুঝলে।” আমি কিছু বলার আগেই আবার বললেন, “এরকম মিসটেক হতেই পারে। আমরা তো ঐ রেপিস্টটাকে সামনাসামনি কখনও দেখিনি, তাই না?”
আমি আর কী বলবো। চুপচাপ তার বাড়িয়ে দেয়া সিগারেটটা ধরিয়ে বার কয়েক টান দিলাম। আমাদের চারপাশে উত্তেজিত দর্শক। নিজের দলের অলস, অকর্মণ্য আর অযোগ্য সব খেলোয়াড়দের মা-বাপ তুলে গালাগালি করছে। এদের দিয়ে কাজ হবে না। খালি পোস্ট পেলেও বল বাইরে দিয়ে মারবে এরা! একেকটার নল্লি ভেঙে লুলা করে দেয়া দরকার। হারামজাদারা ফুটবল খেলতে এসেছে নাকি জাম্বুরা!
এরকম কথার ফুলঝুরি ছুটছে চারপাশে। ভালো করে কান পাতলে অনেক মজার মজার কথাও শোনা যেত কিন্তু আমরা ওখানে গেছি আসামি ধরতে, খেলা দেখতেও নয়। ক্ষুব্ধ দর্শক হয়ে মনের আশ মিটিয়ে গালাগালি করতে তো নয়-ই।
হায়দারভাই উদাস হয়ে মাঠের দিকে তাকিয়ে সিগারেট টেনে যেতে লাগলেন। আমিও কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে মাঠের দিকে নজর দিলাম।
“এই যে, এরা গালাগালি করছে, এদের একটু ভালো করে দেখো তো।”
হায়দারভায়ের এমন অপ্রাসঙ্গিক কথা শুনে আমি তার দিকে ফিরে তাকালাম। তারপর গালাগালি করতে থাকা লোকজনের দিকেও চোখ বোলালাম একটু। “বুঝলাম না…কী বলছেন?”
“এই যে এরা প্লেয়ারদের মা-বাপ-চৌদ্দগুষ্টি তুলে গালি দিচ্ছে, এরা কারা?”
প্রশ্নটা এমনই যে প্রথমে আমার মনে হয়েছিলো হায়দারভাই বুঝি মজা করছেন। কিংবা হেয়ালি করছেন অন্য কিছু বলার জন্য। এসএম হায়দারকে আমি যতোদিন ধরে চিনতাম, তাতে এটা স্পষ্ট, উনি এরকম সহজ প্রশ্ন করছেন অন্য একটা কারণে। তবে সেই কারণটা আমি তখনও জানতাম না।
“এরা সাপোর্টার।” আমিও তার সহজ প্রশ্নে সহজ জবাব দিলাম।
মাথা নেড়ে সায় দিলেন তিনি। “হুম। কোন্ দলের?’
একেবারেই বালখিল্য প্রশ্ন। “কেন, আবাহনীর!”
“তাই?”
আমি এবার সত্যি সত্যি অবাক হলাম। এখানে ঢোকার আগে হায়দারভাই আমাকে এ বিষয়ে জ্ঞান দিয়েছিলেন। দু-দলের সমর্থক বসে দুটো আলাদা গ্যালারিতে। এখানে ভুল করলে বিপদ। এটা যেন অনেকটা শত্রু-শিবিরে ঢুকে পড়ার মতোই বিপজ্জনক কাজ।
“আশ্চর্য, আবাহনীর গ্যালারিতে কি অন্যদলের সাপোর্টার বসবে নাকি!” বিরক্ত হয়ে আবার বললাম, “আপনিই না একটু আগে জ্ঞান দিলেন আমাকে?”
মাথা নেড়ে সায় দিলেন এসএম হায়দার। “একদম ঠিক। কিন্তু এরা যেভাবে গালি দিচ্ছে…একেবারে মা-বাপ তুলে…আমার তো মনে হচ্ছে না এরা কেউ আবাহনীর সমর্থক।”
আমি চারপাশে আবারো তাকালাম। উদ্বিগ্ন আর ক্ষিপ্ত সমর্থকদের শত শত মুখ আর সেই মুখ থেকে বের হচ্ছে ভয়ঙ্কর সব খিস্তি।
“আমি আসলে বুঝতে পারছি না, আপনি কী বলতে চাচ্ছেন?”
“আমি বলতে চাচ্ছি, যারা প্লেয়ারদের এভাবে গালাগালি করছে তারা কিভাবে এই দলের সমর্থক হয়? আমার তো ঘোরতর সন্দেহ হচ্ছে।”
“কিসের সন্দেহ?” এবার আমি সিরিয়াস হয়ে উঠলাম।
“আমি নিশ্চিত, এরা আবাহনীর সমর্থক না…ওয়ান্ডারাসের হবে বোধহয়।”
আমি বেকুবের মতো আবারো চারপাশে গ্যালারির দিকে তাকালাম। শত শত, হাজার-হাজার মুখ দেখে মনে হচ্ছে না এরা প্রতিপক্ষ দলের সমর্থক। কয়েকজন খিস্তিবাজ লোকের হাতে আবাহনীর পতাকা পর্যন্ত আছে।
“না, ভাই, এরা সবাই আবাহনীর সমর্থক। নিজের দলের খেলা পছন্দ না হলে সবাই এমন করে। তার মানে এই না, এরা অন্যদলের।”
“ঠিক বলছো। আমারও তাতে কোনো সন্দেহ নেই।”
হায়দারভায়ের এমন হেয়ালিপূর্ণ কথায় আমি সত্যি সত্যি হতভম্ব হয়ে গেলাম।
“এরা সবাই আবাহনীর সমর্থক। এই গ্যালারিতে আবাহনীর বিরুদ্ধে সমর্থন করলে তার হাড্ডি-গুড্ডি এক করে ফেলবে সাপোর্টাররা।”
“আশ্চর্য, আপনি একবার বলছেন এরা আবাহনীর সমর্থক না…আবার এখন বলছেন এরা…”
হায়দারভায়ের মুখে যে চওড়া আর নিঃশব্দ হাসি দেখতে পেলাম সেটা আমাকে পরিস্কার বলে দিচ্ছে উনি এখন সমস্ত প্রহেলিকা বাদ দিয়ে আসল কথায় চলে আসবেন।
“তাহলে কেউ যদি শেখসাহেবের সমালোচনা করে, তার দলের সমালোচনা করে তাকে তুমি প্রতিপক্ষ ভাববে নাকি সমর্থক ভাববে?”
বুঝতে পারলাম আমি। হায়দারভাই যে সব সময় সরকারের সমালোচনা করে, বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করে সে কারণে আমি তাকে বঙ্গবন্ধু আর আওয়ামী বিরোধি হিসেবে মনে করি। কিন্তু উনি যে এই স্টেডিয়ামে আসামি ধরতে এসে আমাকে ঈসপের মতো গল্পের ছলে শিক্ষা দেবেন, চোখে আঙুল দিয়ে আমার ভুল ধরিয়ে দেবেন সেটা আশা করিনি। স্বাভাবিকভাবেই আমি লা-জওয়াব হয়ে ছিলাম। এসএম হয়দারের খুরধার যুক্তিতে আমি পর্যুদস্ত। আমার আর কিছুই বলার ছিলো না।
“বুঝেছি। এখন চলেন…মনে হচ্ছে আসামি ধরার আশা বাদ দিয়েছেন,” আমি তাকে বললাম।
মাথা দোলালেন তিনি। “এতো সহজে ধৈর্যহারা হলে চলে না, বুঝেছো?” সিগারেটে জোরে জোরে টান দিয়ে বললেন এসএম হায়দার। “ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন খুব টাফ জব।”
কথাগুলো যে আমার উদ্দেশ্যে সেটা বুঝতে পারলাম। “ভাই, আমি ধৈর্যহারা হচ্ছি না, শুধু বলতে চাচ্ছি কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে খোঁজাখুঁজি করা ঠিক হবে না।”
আমাকে অবাক করে দিয়ে হায়দারভাই মাথা নেড়ে সায় দিলেন। “ঠিক বলছো।”
কিন্তু আমার মনে হলো না তিনি এই খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজা বাদ দেবেন। “আমরা কি আরো কিছুক্ষণ থাকবো নাকি চলে যাবো?”
বিস্মিত হলেন এসএম হায়দার। “কি বলো? খেলার তো হাফটাইমও হলো না এখনও।”
“আপনি খেলা শেষ হওয়ার পর্যন্ত এখানে থাকতে চাইছেন?” আঁতকে উঠলাম আমি।
“আজব কথা বললে,” সিগারেটে জোরে জোরে টান মেরে বললেন, “খেলা শেষ হবার পরই তো আসল খোঁজাখুঁজি শুরু হবে।”
পাগলে কয় কি! মনে মনে বলে উঠেছিলাম। “আসল খোঁজাখুঁজি মানে?”
“আহা, খেলা শেষ হলে কি সবাই হুটহাট করে বাড়িতে চলে যায়? আড্ডাবাজি করে, স্টেডিয়ামের বাইরে রেস্টুেরেন্টগুলোতে ঢুকে হালকা খাওয়া-দাওয়া করে। এখানে সেখানে জটলা পাকিয়ে আড্ডা মারে।”
“আপনি কি ওইসব জায়গাতেও ঢু মারবেন?”
“মারবো না?” পাল্টা বলে উঠলেন। “এই সুযোগ কি বার বার পাবো? আবার কবে না কবে খেলা হয়।”
কিছু বলতে যাবো অমনি টের পেলাম সব দর্শক উঠে যাচ্ছে। খেলার হাফটাইম হয়ে গেছে ততোক্ষণে। আমি আর হায়দারভাই দু-জনেই টয়লেটে চলে গেলাম। ফিরে এসে আরো দুই প্যাকেট বাদাম কিনে বসে পড়লাম গ্যালারিতে। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হবার আগে আবারো তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দর্শকদের মধ্যে একটা মুখ খুঁজে গেলাম দু-জনে।
খেলা আবার শুরু হলো। কোনো দলই গোল করতে পারেনি তখনও। সমর্থকদের মধ্যে টানটান উত্তেজনা। কিন্তু আমি আর এসএম হায়দার সেই উত্তেজনা থেকে মুক্ত। আমাদের উত্তেজনা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের।
প্রায় ষাট মিনিট অতিক্রম হয়ে গেলেও খেলার মতোই নিষ্ফল রইলো আমাদের প্রচেষ্টা। দু-দল যেমন হন্যে হয়েও গোলের দেখা পায়নি তেমনি আমরাও ইমতিয়াজের দেখা পেলাম না গ্যালারির কোথাও। ততোক্ষণে একটা ব্যাপারে প্রায় নিশ্চিত হয়ে গেলাম-আমাদের সন্দেহভাজন ঢাকা শহরে নেই। প্রিয় দলের খেলা দেখার জন্য ঢাকায় আসার ঝুঁকিও সে নেয়নি
হায়দারভায়ের দিকে তাকালাম। বেচারা এক মিনিটের জন্যেও মাঠের দিকে তাকাচ্ছেন না। তাকে যদি কেউ খেয়াল করতো দেখতে পেতো, তিনি মাঠের দিকে চোখ না রেখে দর্শকদের দেখে যাচ্ছেন নিবিষ্টমনে। নিজের হতাশা দূর করতেই যেন একের পর এক সিগারেট ধ্বংস করে যাচ্ছেন। আমি অবশ্য তার সাথে পাল্লা দিয়ে সিগারেট খাইনি। চুপচাপ গ্যালারিতে বসে নিষ্ফল খেলাটাই দেখতে শুরু করে দিয়েছিলাম ততোক্ষণে। আমার দিকে তাকানোরও ফুরসত নেই হায়দারভায়ের। তিনি হাজার হাজার মুখ দেখার কাজে ডুবে থাকলেন।
সম্ভবত খেলা শেষ হবার দশ-বারো মিনিট আগে, যখন আবাহনীর সমর্থকেরা গালাগালি আর উল্লাস করা বাদ দিয়ে আমাদের মতোই হতাশ হয়ে বসে আছে ঠিক তখনই তাদের দলের দশ নাম্বার জার্সির স্ট্রাইকার আরেকটি সহজ সুযোগ নষ্ট করে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে টের পেলাম আমার চারপাশে ক্ষিপ্ত সমর্থকদের গালাগালির ফোয়ারা ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু অজস্র মানুষের অজস্র গালাগালির মধ্যে একজনের বিক্ষুব্ধ কণ্ঠ আমার মনোযোগ আকর্ষণ করলো। আমি জানি না কেন, মাথাটা ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম সেই বিশিষ্ট গালিবাজকে।
“চুতমারানির পোলা! লোপ্পা পায়াও গোল দিবার পারে না! বালের স্ট্রাইকার একটা!”
সত্যি বলতে কোনো রকম প্রচেষ্টা ছাড়াই, একেবারে ঘটনাচক্রে কিংবা ঝড়ে বক মরার মতো, আমার দৃষ্টি গিয়ে পড়লো গালাগালি করতে থাকা লোকটার উপরে। আমার পেছনে, বামদিকে এক রো উপরে বসে আছে সে। রেগেমেগে চোখমুখ খিচে সিগারেটে জোরে জোরে টান দিচ্ছে আর খিস্তির ফোয়ারা ছোটাচ্ছে। মুখটা আস্ত শয়তানের মতোই দেখাচ্ছে যেন!
ইমতিয়াজ?
আমি নিশ্চিত হতে না পারলেও কয়েক মুহূর্তের জন্য হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গেলো। পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্য তড়িঘড়ি পকেট থেকে সাদা-কালো একটি ছবি বের করে দেখে নিলাম। মিলিয়ে নিলাম ছবির সাথে কয়েক হাত দূরে বসা মানুষটিকে। সাদা-কালো গ্রুপফটো থেকে একজন মানুষকে দেখে বাস্তবের কারো সাথে মিলিয়ে নেয়াটা খুবই দুরুহ ব্যাপার। আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। বিদ্যুৎগতিতে তাকালাম হায়দারভায়ের দিকে। উনি আমার থেকে বেশ খানিকটা দূরে চলে গেছেন। নাছোরবান্দার মতো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন গ্যালারির প্রতিটি রো। একটু জোরেই ডাকলাম।
“হায়দারভাই!”
চমকে তাকালেন তিনি। আমার চিৎকারের মধ্যে কিছু একটা ছিলো হয়তো, সম্ভবত একটা তাড়না। তার সাথে চোখাচোখি হতেই তিনি বুঝে গেলেন আমি সম্ভবত ইমতিয়াজকে দেখেছি। দেরি না-করে দর্শকদের ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসতে লাগলেন। তার চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছে আমার চারপাশে।
“কোথায়!?” তাড়া দিয়ে জানতে চাইলেন তিনি।
আমি আস্তে করে তাকে দেখিয়ে দিলাম আমার পেছনে বামদিকে বসা ক্ষিপ্ত আর খিস্তি আউড়াতে থাকা লোকটার দিকে।
হায়দারভাইও যেন নিশ্চিত হতে পারলেন না। আমার হাত থেকে ইমতিয়াজের ছবিটা ছোঁ মেরে নিয়ে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করলেন। একবার ছবির দিকে, আরেকবার খিস্তিবাজের দিকে চোখ কুচকে তাকিয়ে নিশ্চিত হতে চাইছেন। একটু আগে ভুল করে একজনকে ধরেছিলেন, সেজন্যে তিনি বেশি সতর্ক এখন।
আমার দিকে তাকালেন হায়দারভাই। “ইমতিয়াজই তো মনে হচ্ছে, তাই না?”
কিন্তু আমি তার অনিশ্চয়তা দূর করতে পারলাম না, এটা করলো ইমতিয়াজ নিজেই!
সম্ভবত আমাদের দিকে চোখ গেছিলো বদমাশটার, সে কিছুটা আঁচ করতে পেরে ভড়কে গেলো। চোরের মন পুলিশ পুলিশ-কথাটা অবশ্যই সত্যি। হায়দারভাই আর আমার সাথে তার কয়েক মুহূর্তের চোখাচোখি হতেই দৌড় দিলো সে।
“শূয়োরেরবাচ্চা!” দাঁতে দাঁত পিষে বললেন হায়দারভাই।
সন্দেহের আর কোনো অবকাশ নেই। আমার জন্য অপেক্ষা না করেই উপরের রো-তে ওঠার জন্য পা বাড়ালেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে পুরো গ্যালারিটা আন্দোলিত হয়ে উঠলো একসঙ্গে। সেইসাথে গগনবিদারি উল্লাস-ধ্বণি!
গোল!!
কোন্ দল দিয়েছে সেটা মাঠের দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম। খেলা শেষ হবার মাত্র দশ মিনিট আগে আবাহনী সত্যি সত্যি তাক লাগিয়ে দিয়েছে গোল করে। পুরো গ্যালারিটা যেন সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তরঙ্গায়িত হতে লাগলো। একজনও নিজের আসনে বসে নেই। সবাই লাফাচ্ছে অভূতপূর্ব এক উল্লাসে। সেই প্রথম আমি দেখলাম স্টেডিয়ামে খেলার দেখার কী উন্মাদনা।
হায়দারভাই আর আমার পক্ষে উন্মাতাল দর্শকদের ডিঙিয়ে ইমতিয়াজের নাগাল পাওয়া সম্ভব হলো না। নিরূপায় হয়েই কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হলো। লাফালাফি করা সমর্থকদের ফাঁকফোকড় দিয়ে দেখার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলাম।
সুদীর্ঘ এক মিনিট পর দর্শকদের উন্মাদনা নিস্তেজ হয়ে আসতেই হতাশার সাথে দেখতে পেলাম ইমতিয়াজ নেই! আশেপাশে চোখ বুলালাম উদভ্রান্তের মতো, শতশত মুখের ভিড়ে খুঁজে পেলাম না তাকে।
হায়দারভাই আমার দিকে তাকালেন। তার চোখের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হলো না। আমাদের সন্দেহভাজন হাত ফসকে পালিয়ে গেছে। আর খুনির জন্য আশির্বাদ হয়ে নাজেল হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত একটি গোল! সেই গোলটা যেন ওয়ান্ডারাসের বিরুদ্ধে নয়, আমাদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে! আবারো পিছিয়ে গেলাম আমরা। দ্বিতীয়বারের মতো!
কিন্তু এসএম হায়দার হাল ছেড়ে দেবার পাত্র নন। কী মনে করে যেন গ্যালারির উপরের দিকে রো-গুলো ডিঙিয়ে উঠতে শুরু করলেন আমাকে কোনো কিছু না বলেই। তার ভাবসাব দেখে আমি নিশ্চিত বুঝে গেলাম তিনি কতোটা মরিয়া। একজন ধর্ষক-খুনি তার হাত ফসকে চলে যাবে-এটা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। কয়েক বছর আগে যুদ্ধ করেছেন। তার রক্তে তখনও যোদ্ধার তেজ বিরাজ করছিলো পূর্ণমাত্রায়। অগত্যা আমিও তার সাথে পাল্লা দিতে বাধ্য হলাম।
হায়দারভাই গ্যালারির উপরের দিকে রো-তে উঠতেই ঘটনা ঘটে গেলো। ইমতিয়াজ, যে কি-না দর্শকদের মধ্যে নীচু হয়ে ঘাপটি মেরে বসে ছিলো, সে বুঝে গেলো এভাবে ধোঁকা দেয়া যাবে না। উঠেই দৌড় লাগালো সে। তার গন্তব্য গ্যালারির আরো উপরে। আমি দেখতে পেলাম হায়দারভাই তার দিকে ছুটে যাচ্ছে। আমিও প্রাণপণে চেষ্টা করলাম তাদের কাছে পৌঁছাতে। গ্যালারির দর্শক গোলের আবেগে আপ্লুত, তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই আমাদের দিকে। কয়েকজন হয়তো ব্যাপারটা খেয়াল করে অবাক হয়ে চেয়ে ছিলো কিন্তু তাদের দিকে তাকানোর ফুরসতও আমাদের ছিলো না।
ইমতিয়াজ গ্যালারির উপরে উঠে অন্যদিক দিয়ে আবার নেমে যেতে শুরু করলো। তার থেকে দুটো রো নীচে ছিলাম বলে হায়দারভাই চকিতে আমার দিকে তাকিয়ে ইশারা করলেন। আমি দ্রুত সরে গিয়ে ইমতিয়াজের পথরোধ করে দাঁড়ালাম। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সে থমকে দাঁড়ালো কয়েক মুহূর্ত, তারপরই বামদিকে অনেকটা ঝাঁপিয়ে কিছু দর্শকের গায়ে গিয়ে পড়লো। কোণঠাসা বেড়ালের মতো মরিয়া সে। পড়িমরি করে উঠে দাঁড়াতেই আবার দৌড় লাগালো। বেশ কিছু দর্শক বুঝতে না পেরে গালাগালি শুরু করলে স্টেডিয়ামে ছোটোখাটো একটি হল্লা তৈরি হয়ে গেলো মুহূর্তে। কিন্তু আবাহনীর আরেকটি আক্রমণ শুরু হলে তাদের সবার মনোযোগ চলে গেলো সেদিকে। ইমতিয়াজের জন্য দারুণ সুযোগ তৈরি করলো এটা। প্রতিটি রো লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে যেতে শুরু করলো সে। তার কারণে কিছু দর্শক ধাক্কা খেয়ে হুরমুর করে পড়েও গেলো। আমি অবশ্য তার মতো করে এগোতে পারলাম না। হায়দারভাইও না।
আমরা দু-জনেই দেখতে পেলাম চোখের সামনে দিয়ে ইমতিয়াজ স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। আমাদের থেকে তার দূরত্ব খুব বেশি ছিলো না কিন্তু দর্শকভর্তি গ্যালারি দিয়ে দ্রুত নেমে যাওয়াটা সত্যি কঠিন কাজ। ইমতিয়াজ যখন একদম নীচের রো-তে তখন আমি আর হায়দারভাই তিন রো উপরে। এটা বুঝতে আর বাকি রইলো না, তার নাগাল পাওয়াটা প্রায় অসম্ভব।
স্টেডিয়ামের আট নাম্বার গেট দিয়ে দৌড়ে বের হয়ে গেলো আমাদের শিকার।
হায়দারভাই তখনও হাল ছেড়ে না দিয়ে প্রাণপণে দৌড়ে যাচ্ছেন। আমরা যখন আট নাম্বার গেটটা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলাম তখন ইমতিয়াজের টিকিটাও দেখতে পেলাম না। আউটার স্টেডিয়ামের দিকে তাকালাম আমি—এখন যেটা মওলানা ভাসানী হকি সেইডয়াম হিসেবেই সবাই চেনে। বিশাল খোলা প্রাঙ্গন। সেখানে কিছু টোকাই ছেঁড়া-ফাঁটা ফুটবল নিয়ে খেলছে। আর কেউ নেই। হায়দারভাই সম্ভবত আগেই এটা দেখেছে, তিনি সোজা দৌড়ে গেলেন পশ্চিম-দিকের মেইনগেটটার কাছে। একটু পরই খেলা শেষ হয়ে গেলে হাজার-হাজার দর্শক গেট দিয়ে বেরিয়ে আসবে। এরইমধ্যে আশাহত ওয়ান্ডারাসের সমর্থকেরা বেরিয়ে আসছে একে একে। স্টেডিয়ামের বাইরে কোলাহল বাড়ছে ক্রমশ।
দম ফুরিয়ে প্রায় কুপোকাত আমি। একটু থেমে জিরিয়ে নিলাম। কিন্তু হায়দারভাইকে দেখতে পেলাম হঠাৎ করেই তিনি স্টেডিয়ামের ডানদিকে, বায়তুল মোকারমের পাশ দিয়ে দৌড়ে গেলেন। আমি বাধ্য হয়েই তাকে অনুসরণ করলাম।
কিছুটা সামনে গিয়েই দেখি আমার থেকে বিশ-ত্রিশ গজ সামনে পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। তার সামনে দু-জন মানুষ ধরাশায়ি হয়ে মাটিতে পড়ে আছে। তাদের একজনকে চিনতে ভুল হলো না আমার-ইমতিয়াজ।
স্টেডিয়ামের উত্তর-দিকে পুরানা পল্টনের যে গেটটা আছে সেখান দিয়ে বের হয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলো ইমতিয়াজ। কিন্তু এক ঘুমনিওয়ালার সাথে ধাক্কা লাগতেই তারা দু-জন হুরমুর করে পড়ে যায়। রাস্তায় ছিটকে পড়ে ঘুমনির বোলসহ বাকি জিনিসপত্র।
হায়দারভাই দ্রুত পিস্তল বের করে তাক্ করে ফেলে ইমতিয়াজের দিকে। বেচারা মাটি থেকে উঠে আর দৌড়ানোর সাহস করেনি।
আমি তার কাছে এগিয়ে যেতেই দেখতে পেলাম দম ফুরিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে নিচ্ছেন। ইমতিয়াজ উঠবে-কি-উঠবে না একরকম দ্বিধায় পড়ে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে আছে। তাকে শেষ ওয়ার্নিং দেবার জন্য গর্জে উঠলেন এসএম হায়দার।
“শূয়োরেরবাচ্চা, পালানোর চেষ্টা করলেই গুলি করবো!”
