অধ্যায় ১০
“তোমার মতো আমিও বিশ্বাস করি মিনহাজ কাজটা করেনি,” আলতো করে বললো রামজিয়া। “যতোদূর জানি, মিলির সাথে মিনহাজের চমৎকার সম্পর্ক ছিলো। এরকমটি স্যাটেলড ম্যারেজের বেলায় কমই দেখা যায়। ছেলে হিসেবে মিনহাজও কিন্তু দারুণ। ওরা ছিলো চমৎকার একটি জুটি।”
তার কথায় সায় দিলাম আমি। “হুম, আমারও তাই মনে হয়।”
“তবে কি জানো?” আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই সে বলতে শুরু করলো, “স্টেটসে এরকম অনেক কেস দেখেছি, হাজব্যান্ড নিজের হাতে স্ত্রিকে খুন করে এমন ভান করতো যে, ঘটনাটা নিছক কোনো বার্গরালি…ডাকাতি। শেষপর্যন্ত তদন্তে বেরিয়ে আসতো স্বামিই খুনটা করেছে।” দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। “স্বীকার করছি, মাঝেমধ্যে আমারও সন্দেহ হতো খুনটা মিনহাজ করেনি তো! বিশেষ করে ওর অদ্ভুত আচরণের কারণে।”
চুপচাপ শুনে গেলাম তার কথা। এ বিষয়টা নিয়ে আমিও অনেক ভেবেছি কিন্তু সত্যি বলতে, কোনো কূলকিণারা করে উঠতে পারিনি। মাঝেমধ্যে এমন চিন্তা আমার মাথায়ও যে আসেনি তা নয়। রামজিয়াকে যে বইটার পাণ্ডুলিপি দিয়েছি সেখানেও এমন ইঙ্গিত আছে। অন্তত পাঠকের কাছে মনে হতে পারে এটা। যদিও আমি সচেতনভাবে মিনহাজের দিকে সন্দেহের আঙুল তুলিনি কখনও। বরং পরবর্তিতে একটি ঘটনায় মিনহাজের উপরে আমার বিশ্বাস আরো বেড়ে গেছিলো। দিনটার কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার।
সাতদিনের পুরনো এক মহিলার লাশ কবর থেকে তুলে আবার পোস্টমর্টেম করার দরকার পড়েছিলো। নিহতের পরিবার থেকে অভিযোগ করা হয়েছিলো, ওদের মেয়ে আত্মহত্যা করেনি, পাষণ্ড স্বামি নিজের হাতে খুন করেছে। যাই হোক, ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে কাজটা করার সময় থানা থেকে আমাকে যেতে বলা হয়। পুলিশি জীবনে এরকম কাজ অবশ্য ওটাই আমার প্রথম ছিলো না, এর আগেও আরো একবার লাশ উত্তোলনের কাজ তদারকি করেছি। তো, আমি কয়েকজন কনস্টেবল, ডোম আর ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে আজিমপুর কবরস্তানে চলে যাই। কবর থেকে লাশ তোলার সময় নাকে রুমাল চেপে একটু দূরে সরে যেতেই দেখি, বিশ-ত্রিশ গজ দূরে, একটি কবরের সামনে এক ভদ্রলোক বসে অঝোরে কেঁদে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গেই চিনতে পেরেছিলাম।
মিলির স্বামি!
প্রয়াত স্ত্রীর প্রতি মিনহাজের এমন ভালোবাসা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো। মানুষটার প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা তৈরি হয়েছিলো আমার মনে। হায়দারভায়ের মতো পক্ষপাতিত্বহীন থাকা আর সম্ভব হয়নি।
“তোমরা তো ওকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিলে, তাই না?” তার কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম আমি। মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললাম, “হুম। যেকোন কেসেই একাধিক সন্দেহভাজন থাকে। তাদের মধ্যে হয়তো কেউ একজন কাজটা করেছে, আবার এমনও হতে পারে, সন্দেহভাজনদের কেউ কাজটা করেনি। যে করেছে সে আড়ালেই থেকে গেছে। তাকে আর ধরা যায় নি-এমন কেসও কিন্তু প্রচুর আছে।”
“তা ঠিক। ইউরোপ-আমেরিকার মতো উন্নত দেশের পুলিশও প্রচুর কেস সল্ভ করতে ব্যর্থ হয়। জ্যাক দ্য রিপারের কেসটা কিন্তু ওরকমই ছিলো।”
এটা আমি ভালো করেই জানতাম। এরকম আনসলভ মার্ডার কেসের উপরে বেশ কয়েকটি বই আমার পড়া ছিলো। এতোগুলো খুনের এই কুখ্যাত কেসটি তুখোড় গোয়েন্দারা আজো মিমাংসা করতে পারেনি।
“আচ্ছা, তোমাদের কি কখনও মনে হয়েছে, ইমতিয়াজ কাজটা করে নি?”
আমি রামজিয়ার দিকে চেয়ে রইলাম কিছুক্ষণ, তারপর বেশ জোর দিয়ে বললাম, “না। এটা আমাদের কখনও মনে হয়নি।”
কথাটা আমি জোর দিয়ে বললাম কারণ, এক পর্যায়ে হায়দারভাই ইমতিয়াজের ছবিটা নিয়ে মিলির বাসায় সামনে যে মুদি দোকানি আছে তাকে দেখিয়েছিলেন। দোকানি জানিয়েছিলো, মিলি খুন হবার আগে বেশ কয়েকদিন তার দোকানের সামনে এসে ঘুরঘুর করতো ছবির এই লোক। সিগারেট খেতো, গলির এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত পায়চারি করতো। আর এ কাজটা করার সময় তার হাতে ছাতাও দেখেছে দুয়েকবার।
তো, হায়দারভাই কথাটা শুনে খুবই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলেন। আমার অবশ্য ভালো লেগেছিলো তথ্যটা জেনে। মিনহাজ আর ছাতার মধ্যে যে কানেকশান সেটা পুরোপুরি দূর হয়ে গেলো বলে। ইমতিয়াজই খুনটা করেছে। সে ছাতা ব্যবহার করে। মুদি দোকানির কথা সত্যি না হয়ে উপায় নেই। তারপরও, পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্য হায়দারভাই একটা কাজ করেছিলেন। একটা ছাতাসহ আমাকে নিয়ে ভরদুপুরে চলে গেছিলেন মিলিদের বাসায়। মিনহাজ আবার অফিস করতে শুরু করেছে তখন, নীচতলাটা খালিই ছিলো। দোতলার ভাড়াটিয়া আর তার বাচ্চা ছেলেটি সিঁড়ির যেখান থেকে মিলির ঘরের সদর দরজায় একজনকে ছাতাসহ দেখেছিলো ঠিক সেখানে দাঁড়ালেন হায়দারভাই। আমাকে ছাতা ফুটিয়ে মাথার উপরে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে বললেন দরজার সামনে। নিঃসন্দেহে ব্যাপারটার মধ্যে নাটকিয়তা ছিলো কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিত হবার জন্য এছাড়া আর উপায়ও ছিলো না।
এই ডেমস্ট্রেশনের ফলও মিনহাজের পক্ষে গেলো। সিঁড়ির উপর থেকে ছাতা মাথায় দেয়া আমার মুখ দেখতে পাননি হায়দারভাই। বুঝতে পারলাম, দোতলার ভাড়াটিয়া মহিলা আর তার নাবালক ছেলেও একইভাবে খুনির মুখটা দেখতে পায়নি।
“আমি এখনও বিশ্বাস করি, খুনটা ইমতিয়াজই করেছে।” বেশ জোর দিয়ে বললাম।
রামজিয়া আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিলো। তারপর কিছু একটা মনে পড়ে গেছে এমন ভঙ্গি করে বলে উঠলো, “ভালো কথা, তোমার বইগুলো কি নিউ মার্কেটে পাবো? পড়ার অভ্যাস তো হারিয়েই গেছে…ভাবছি তোমাকে দিয়ে শুরু করবো আবার।”
মুচকি হাসলাম আমি। “নিউ মার্কেটে কিছু বইয়ের দোকান এখনও আছে, ওখানে গেলে পাবে মনে হয়। তবে নীলক্ষেতের বইয়ের দোকানে গেলে অবশ্যই পাবে। ঢাকায় ওটাই সবচেয়ে বড় বইয়ের মার্কেট।”
“এখানে আসার পর আর ওদিকটায় যাওয়া হয়নি। আচ্ছা, বুক পয়েন্ট কি এখনও আছে?”
***
ইরাকি কবরস্তানের পাশে মিনহাজের বাসা থেকে ছাতা সংক্রান্ত ইনকোয়্যারি শেষে করে নির্ভার হয়ে বেরিয়ে আসতেই নিউমার্কেটের দক্ষিণ গেটের কাছে আমি থমকে গেছিলাম হঠাৎ করে।
“হ্যালো? আপনি এখানে?”
একটা নারীকণ্ঠ ডেকে উঠলে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি চোখে গগল্স আর শর্ট-পাঞ্জাবির সাথে বেলবটম পরা এক আপ-টু-ডেট তরুণী নিউ মার্কেটের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে অছে। দেখামাত্রই চিনতে পারলাম-রামজিয়া শেরিন।
“আ-আপনি?” আমি কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছিলাম। “এই তো, মার্কেটে এসেছিলাম।”
তার চোখে গগল্স, আকারে একটু বড়। ওটাই তখন হালফ্যাশন ছিলো। সত্যি বলতে, গগল্স পরা রামজিয়াকে দেখে আমার একটু অচেনা বলে মনে হলো। আমি তার চোখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। গাঢ় খয়েরি রঙের কাঁচ আড়াল করে রেখেছিলো।
“ও,” আর কিছু না বলে একটু হাসি দিলাম শুধু।
“এদিকে কোথায় এসেছিলেন, মিনহাজের বাসায়?”
“উম?” নিউমার্কেট থেকে মিনহাজের বাসা হাটা দূরত্বে। সুতরং যৌক্তিকভাবেই আন্দাজ করতে পেরেছিলো সে। “হ্যা, কেসের ব্যাপারে একটু দরকার ছিলো।”
“মিলির কেসটার কোনো ডেভেলপমেন্ট?”
“আমরা কাজ করছি, আশা করি কয়েকদিনের মধ্যে কিছু একটা বের করতে পারবো।”
আমার জবাবে সন্তুষ্ট হলো কি-না বুঝতে পারলাম না। “ইমতিয়াজের কোনো খোঁজ পেয়েছেন? আপনি কিন্তু আমাকে আর কিছু জানাননি।”
সুন্দরি মেয়েরা যখন মিষ্টি করে অনুযোগ করে তখন পুরুষ মানুষ কাচুমাচু খেতে বাধ্য। আমিও কাচুমাচু খেলাম। “না…মানে…” কথা খুঁজে পেতে একটু কষ্টই হলো, “চেষ্টা করে যাচ্ছি…ধরতে পারবো আশা করছি। ওকে ধরতে পারলে আপনাকে ফোন করে জানাবো।”
“অবশ্যই জানাবেন,” রামজিয়া বললো।
“আপনি কি বই কিনতে এসেছিলেন?” বেমক্কা জিজ্ঞেস করে ফেললাম আমি। কেন করলাম জানি না। হয়তো কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে, কিংবা তার বাড়িতে বুকসেল্ফ দেখে ধরেই নিয়েছিলাম আমার মতো সে-ও বই পড়ে।
“মাই গুডনেস! আপনি কিভাবে জানলেন?”
তার বিস্ময় দেখে অবাকই হলাম একটু। বুঝতে পারলাম, খুব সহজেই বিস্মিত হয় মেয়েটি।
“আসলে আমি সব সময় নিউ মার্কেটে বই কিনতে আসি তো তাই,” বোকার মতো হেসে বললাম।
“আপনি যে খুব বই পড়েন সেটা আমি বুঝতে পেরেছি,” স্মিত হেসে বললো সে। “আই লাভ ইট।”
“জি?” আবারো বোকার মতো বলে ফেললাম।
“বই পড়ার কথা বলছিলাম…আই জাস্ট লাভ ইট।”
“ও।” আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না।
“কিন্তু যে বইটা কিনতে এসেছি সেটা পেলাম না,” মন খারাপ করে বললো সে।
“কি বই?”
“নীরদচন্দ্র চৌধুরির ‘বাঙালী জীবনে রমণী’।”
“ওটা তো বুক পয়েন্টে পাবেন না,” আমি বেশ নিশ্চিত হয়েই বললাম। এই দোকানের নিয়মিত ক্রেতা আমি। ওদের প্রায় সব বইয়ের নামই আমার জানা। প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার ঢুঁ মারি ওখানে। এই বইটা পাঁচ-ছয় বছরের পুরনো, কয়েক মাস ধরেই বইটা ওদের কাছে নেই।
“তাই নাকি?” হতাশ হলো সে। “আপনার কাছ থেকে নামটা শোনার পর মনে হলো ওর এই বাঙলা বইটা পড়ি।”
তাকে আশাহত হতে দেখে আমি বলে ফেললাম, “বইটা আমার কাছে আছে, আপনি চাইলে আমার কাছ থেকে নিয়ে পড়তে পারেন।”
“তাই?” আবারো কপালে ভুরু তুলে বিস্মিত হলো সে। “সো নাইস অব ইউ।”
পরদিনই আমি ‘বাঙালী জীবনে রমণী’ নিয়ে হাজির হই রামজিয়াদের বাড়িতে। এক কাপ চা না খাইয়ে সে আমাকে বিদায় দেয়নি। সেই সঙ্গে নিজের বুকসেল্ফ থেকে পছন্দের কোনো বই নিয়ে যাবার জন্যেও বেশ পীড়াপীড়ি করলো। অগত্য বাধ্য হয়েই আমি গ্রাহাম গ্রিনের একটা ক্রাইম- ফিকশন ধার নেই।
এভাবেই শুরু রামজিয়া শেহরিনের সঙ্গে আমার বইয়ের লেনদেন পৰ্ব।
