কেউ কেউ কথা রাখে – ৩১

অধ্যায় ৩১

কালো দিন

এভাবে আরো কিছুদিন অতিবাহিত হলেও মিলির কেসের কোন অগ্রগতি হলো না। আমি হাল ছেড়ে দিলেও হায়দারভাই লেগে ছিলেন তখনও। দিন দিন সরকারের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে বাকশাল হবার পর থেকে তার সমালোচনা আরো তীব্র আকার ধারণ করলো, মদ খাওয়ার পরিমাণও বেড়ে গেলো আগের তুলনায় অনেক বেশি। আমার ধারণা দেশের অবস্থা, মিলির কেসটার বেহাল দশা আর নিজের ব্যক্তিগত সমস্যায় জর্জরিত হয়ে তিনি মদ্যপানের দিকে আরো বেশি করে ঝুঁকে পড়েছিলেন।

সন্তান না হওয়ার জন্য হায়দারভায়ের মধ্যে দুঃখবোধ কতোটা ছিলো সেটা আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি। তিনি এ নিয়ে কোন কথা বলতেন না। তাকে দেখে মনে হতো না এসব বিষয় নিয়ে বিরাট কোন আক্ষেপ আছে। তবে ভাবি যে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছিলেন সেটা বুঝতে পারতাম।

আমার জীবনের সবচাইতে করুণ অধ্যায়ের শুরুটা বেশ স্পষ্টই মনে আছে। ঘটনার আগের দিন রাতে টহলদল নিয়ে ডিউটিতে ছিলাম আমি, ওয়াকিটকিতে আমাকে জানানো হলো হায়দারভাই মতিঝিল পাড়ার একটি ফুটবল ক্লাবে গিয়ে মদ খেয়ে ভীষণ মারামারি করেছেন। স্থানীয় পুলিশ এসে তাকে থানায় নিয়ে গেছে, আমি যেন সেখানে গিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসি। সাদা পোশাকে ছিলেন বলে নিজেকে পুলিশ পরিচয় দেবার পরও লোকাল থানা তার কথা বিশ্বাস করছিলো না। তারা আমাদের থানার সাথে যোগাযোগ করলে সেখান থেকে বলা হয়, এসএম হায়দার সত্যি সত্যি একজন সিনিয়র এসআই, তিনি আজিমপুর থানায় কর্মরত আছেন। তবে আটককৃত লোকটি সেই লোক কি-না তা খতিয়ে দেখার জন্য আমাকে সেখানে চলে যেতে বলা হয়।

এটা যে হায়দারভাই সে-ব্যাপারে আমার মনে অবশ্য কোন সন্দেহ ছিলো না। দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে টহল দলটি নিয়েই মতিঝিল থানায় চলে যাই আমি।

বিধ্বস্ত, মাতাল আর বেসামাল হায়দারভাইকে দেখে খুব রেগে গেছিলাম আমি। ইচ্ছে করছিলো কড়া করে কিছু কথা শুনিয়ে দেই, কিন্তু সেই ইচ্ছে দমিয়ে তাকে থানা থেকে নিজের হেফাজতে নিয়ে নেই। মাতালদের সাথে মারামারি করে মাথা ফেঁটে গেছে তার। লোকাল পুলিশ হাসপাতালের এমার্জেন্সি থেকে ব্যান্ডেজ করিয়ে নিয়ে এসেছে। ডাক্তার বলেছে, গুরুতর কিছু না। মাত্র দুটো সেলাই দিতে হয়েছে।

“আপনি এসব কী শুরু করেছেন, ভাই?” গাড়িতে করে ফেরার সময় খুব হতাশ কণ্ঠেই বললাম তাকে। “আপনার সমস্যা কী!”

হায়দারভাই ছিলেন পুরো মাতাল, আমার কথার জবাবে মুখ সরিয়ে নিয়েছিলেন।

“আগেও তো মদ খেতেন, কখনও তো এরকম মাতলামি করতে দেখিনি,” এবার রাগ দেখিয়ে বললাম। “পুলিশ হয়ে মদ খেয়ে মাতলামি করে পুলিশের হাতেই ধরা পড়েছেন। আপনার লজ্জা পাওয়া উচিত।”

“ব্রাদার,” টেনে টেনে বলেছিলেন তিনি, “তুমি আমার দুঃখটা বুঝবে না।”

“রাখেন আপনার দুঃখ,” চটে গেছিলাম খুব। “ঐ এক কথা আর বলবেন না। মানুষ দুঃখ পেলে কি এসব খেয়ে মাতাল হয়ে পড়ে থাকে নাকি?”

তিনি গালে হাত দিয়ে চিন্তিত হবার ভঙ্গি করলেন। বুঝতে পারলাম আমার কোন কথাই এখন গুরুত্ব দেবার মতো অবস্থায় নেই।

“থামলে কেন, আরেকটু লেকচার দাও…শুনি।”

রাগে-ক্ষোভে আর আক্ষেপে মাথা দোলালাম আমি। “আপনার অবস্থা তো পুরাই বেসামাল। এই অবস্থায় বাড়িতে যাবেন কিভাবে? ভাবি কিন্তু তুলকালাম কাণ্ড বাধিয়ে দেবে।”

“কিচ্ছু করবে না ও,” বাচ্চাদের মতোন বলে উঠলেন তিনি। “কিছু না।”

“মানে?” বুঝতে পারলাম না তার কথার অর্থ। “আপনি মদ খেয়ে মাতাল হয়ে বাড়িতে যাবেন আর ভাবি কিচ্ছু করবে না?”

মাথা নেড়ে সায় দিলেন, তারপর অনেকটা ফুঁপিয়ে কাঁদার মতো করে বললেন, “ও আমাকে ছেড়ে চলে গেছে, আর ফিরে আসবে না!”

“কি!” অবাক না হয়ে পারলাম না। “কি বলছেন? ভাবি কোথায় গেছে? কি হয়েছে?” উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলাম তাকে।

“আমার সাথে ঝগড়া করে চলে গেছে।” তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করে দিলেন।

ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম আমি। টহল গাড়িতে আরো দু-জন কনস্টেবল আর ড্রাইভার ছিলো, তারা একে অন্যের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। অফিসারের এমন আচরণে তারা না পারছে হাসতে, না পারছে স্বাভাবিক থাকতে। অভিব্যক্তি লুকিয়ে রাখার মতো কঠিন কাজ করতে হচ্ছে তাদেরকে।

আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। অপেক্ষা করলাম তার বাড়ি যাওয়া পর্যন্ত। আমাদের টহল গাড়িটা তার বাড়ির সামনে থামলে তিনি বাচ্চা ছেলেদের মতো গোঁ ধরে বসলেন বাড়িতে যাবেন না। কারণ ভাবি বাড়িতে নেই!

“যতোক্ষণ না ও বাড়িতে ফিরে আসছে আমি এই বাড়িতে ঢুকবো না।” মাতালের এক কথা!

কী করবো বুঝে উঠতে না পেরে ড্রাইভারকে বললাম আমার বাড়িতে চলে যাবার জন্য। এরকম মাতাল অবস্থায় হায়দারভাইকে খালি বাড়িতে রেখে যাওয়াটাও সমীচিন বলে মনে করিনি। কি করতে কী করে ফেলবে কে জানে। বিপজ্জনক কাজ-কারবারও যে করবে না সেই ভরসাও পেলাম না। তার মানসিক অবস্থা খুবই নাজুক ছিলো। এমনটা আমি আগে কখনও দেখিনি। বাইরে থেকে হায়দারভাই খুবই কঠিন আর শক্ত প্রকৃতির একজন মানুষ। তবে আমি জানতাম, ভেতরের মানুষটার মন খুব নরম। মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার আগে তেমনটাই ছিলেন। যুদ্ধ তাকে বদলে দিয়েছিলো। যুদ্ধের সময়কার বিভীষিকা ভোলার জন্য তিনি মদ্যপান শুরু করেন।

রাত শেষ হবার আগেই টহল দল থেকে ছুটি নিয়ে নিজের বাড়িতে চলে এলাম মদ্যপ হায়দারভাইসহ। তখনও তিনি বেসামাল। তাকে আমার সিঙ্গেল খাটে শুইয়ে দিয়ে আমি বিছানা পাতলাম মেঝেতে। কিন্তু বাকি রাতটুকু দু- চোখের পাতা এক করতে পারলাম না মাতালের প্রলাপের কারণে। তার গা গরম হয়ে জ্বর এসে গেছিলো।

“কী নিয়ে ঝগড়া করেছেন ভাবির সাথে?” কথাবার্তারর এক পর্যায়ে জানতে চাইলাম আমি।

“ঐ তো, যেটা নিয়ে সব সময় করি,” কথাটা বলেই মনমরা হয়ে গেলেন।

“তাই বলে ভাবি আপনাকে রেখে বাপের বাড়ি চলে যাবে?” অবাক না হয়ে পারলাম না। “না, এটা ভাবি ঠিক করেননি।”

“ও খুব কষ্ট পেয়ে চলে গেছে। ওর কোন দোষ নেই, সব দোষ আমার।”

কথাটা শুনে অবাক হলাম আমি। জাতে মাতাল তালে ঠিক শুনেছি আজীবন, কিন্তু তালে মাতাল জাতে ঠিক তো শুনিনি কখনো!

“কষ্ট পেয়ে চলে গেছে মানে? কিসের কষ্ট? কী করেছেন আপনি?”

আমার এই প্রশ্ন শুনে হায়দারভাই আবারো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করলেন।

“আরে, কাঁদছেন কেন? কথা বলেন?” তাড়া দিলাম তাকে। “আপনি কি করেছেন ভাবির সাথে?”

তাকে দেখে মনে হলো খুব লজ্জিত। “আমি…আমি ওকে…” কথা শেষ করতে পারলেন না।

“কি?”

“চড় মেরেছি।”

আমার মুখ হা হয়ে গেলো। ভাবির গায়ে হাত তোলার মতো লোক হায়দারভাই নন। কথাটা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিলো। নিশ্চয় হুঁশ-জ্ঞান ছিলো না তার। “মদ খেয়ে মেরেছেন?”

“না। ওকে মেরে মদ খেয়েছি…মনের দুঃখে।”

এবার বুঝতে পারলাম ভাবি কেন বাড়ি ছেড়ে চলে গেছেন।

“বিশ্বাস করো, মাথাটা ঠিক ছিলো না।” আমাকে চুপ থাকতে দেখে তিনি বলে যেতে শুরু করলেন, “ও যদি ওটা না বলতো…

“কোটার কথা বলছেন?”

“ওই যে, আমি নাকি ওকে ভালোবাসি না…বাচ্চা-কাচ্চা চাই না।”

এরপর তিনি বলে যেতে লাগলেন তাদের ঝগড়াটা কিভাবে শুরু হয়েছিলো। বেশ কয়েকদিন ধরে এক পীরের কাছে নিয়ে যাবার জন্য ভাবি চাপ দিচ্ছিলেন। নীলুভাবির মা-খালারা সেই পীরের মুরিদ, তাদের ধারণা পীরের বরকতে উনি মা হতে পারবেন। ভাবি তাদের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করেছেন। কিন্তু এইসব পীর-ফকিরে বিশ্বাস নেই হায়দারভায়ের। তিনি সোজা বলে দিয়েছেন, ঐ পীরের দরবারে গিয়ে ধর্ণা দেবেন না।

“আমি জানি আপনি এসবে বিশ্বাস করেন না, আমিও করি না কিন্তু ভাবির জন্য এটা করলে কী এমন ক্ষতি হতো? একটু গেলেই পারতেন।” এটা জানার পর তাকে বলেছিলাম।

“তুমি কি ভেবেছো আমি পীর-ফকিরে বিশ্বাস করি না বলে যাইনি?”

“তাহলে?”

“ঐ শালার পীর তো একাত্তরে রাজাকার ছিলো, পাকিস্তানিদের দোসর ছিলো হারামজাদা! শূয়োরটাকে তখন হাতের কাছে পেলে পুরো একটা ম্যাগাজিন খালি করে ফেলতাম না!”

এবার আমি বুঝতে পারলাম তার না যাবার কারণ নিছক কোন বিশ্বাস কিংবা গোয়ার্তুমি নয়।

“তুমিই বলো, এমন একজনের কাছে আমি যেতে পারি? তা-ও যদি গেলে সত্যি সত্যি কাজ হতো!”

না, উনি যেতে পারেন না। একজন মুক্তিযোদ্ধা এমন কাজ করতে পারেন না। মনে মনে আমি তার সাথে সায় দিয়েছিলাম সেই রাতে।

ভোরের দিকে ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছিলো। কথা আর না বাড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। হায়দারভাইও আধো ঘুম আর আধো-মাতলামির মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লেন।

*

সকালে উঠে দেখি আমারও আগে ঘুম থেকে উঠে বিছানার উপর বসে উদাস হয়ে বাইরে তাকিয়ে আছেন।

“তুমি নীলুকে একটু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিয়ে আসবে?”

আমাকে ঘুম থেকে উঠতে দেখেই সবার আগে এ কথাটা বললেন। আমি হেসে ফেললাম। ভালোবাসার বর্হিপ্রকাশ দেখলেই আমার মন ভালো হয়ে যায়। সব সময়।

“আনবো। যদি আপনি একটা প্রমিজ করেন তো।” ঝোঁপ বুঝে কোপটা মেরে বসলাম আমি।

“কি?” অবাক হয়ে তাকালেন আমার দিকে।

“আমাকে কথা দিতে হবে, আর কখনও মদ খেতে পারবেন না।” আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন হায়দারভাই। “কখনো না?” হতাশ শোনালো তার কণ্ঠটা। “মাসে দু-একবারও না?”

“না। কখনো না মানে, কখনো না। যদি আমাকে কথা দিতে পারেন তাহলে আমি নিজে ভাবির বাপের বাড়িতে গিয়ে উনাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিয়ে আসবো।” কথাটা আমি বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পেরেছিলাম তার কারণ, ভাবি আমাকে খুব পছন্দ করতেন। আমি অনুরোধ করলে যে উনি না করতে পারবেন না সেটা জানতাম।

হায়দারভাই কোন রকম চিন্তা-ভাবনা না করেই রাজি হয়ে গেলেন।

‘ওকে…নো মদ, নো শারাব।”

মাথা দোলালাম আমি। “হবে না। এভাবে বললে হবে না, ভাই।”

“তাহলে, কিভাবে বলবো?” বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন তিনি। “আমাকে ছুঁয়ে কথা দিতে হবে।”

“আরে মিয়া, তুমি দেখি মেয়েমানুষের মতো কথা বলছো! আশ্চর্য!”

“যদি গা ছুঁয়ে প্রতীজ্ঞা করতে পারেন তো করেন, নইলে দরকার নেই।” আমিও নাছোরবান্দা। ভালো করেই জানতাম তিনি আমাকে কতোটা ভালোবাসেন। আমার স্থির বিশ্বাস ছিলো, আমার গা ছুঁয়ে প্রতীজ্ঞা করলে তিনি সেই প্রতীজ্ঞা ভাঙতে দশবার চিন্তা করবেন। হায়দারভাইকে দেখেও মনে হলো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধাবেন কি-না সেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বুঝি। খুবই কঠিন কাজ তার পক্ষে।

অবশেষে, অনেক কষ্টে তিনি আমার গা ছুঁয়ে কথা দিলেন এ জীবনে আর মদ স্পর্শ করবেন না।

আমার বাড়িতেই গোসল সেরে নাস্তা করে তাকে তার নির্জন বাড়িতে রেখে থানায় চলে গেলাম আমি। কথা দিলাম, দুপুরের পর ভাবিকে নিয়ে আসবো। শরীর খারাপ বলে হায়দারভাই আর থানায় গেলেন না। আমিও ভেবে দেখলাম, বাড়িতে বিশ্রাম নিলেই ভালো হয়। তখনও জ্বরটা ছিলো।

ডাক্তারের কাছে যাবেন কি-না জিজ্ঞেস করতেই বলে উঠলেন, “তুমি আমার নীলুকে নিয়ে আসো। ও-ই আমার ডাক্তার…আমার ওষুধ, বুঝলে?”

আমি হাসি চেপে রাখতে পারলাম না তার কথা শুনে।

“হাসবা না! যাও, নীলুরে নিয়ে আসো!” উধ্বর্তন কর্মকর্তা হিসেবে আহ্লাদি হুকুম দিলেন তিনি।

দুপুর পর্যন্ত থানায় ডিউটি করে লাঞ্চ-আওয়ারে চলে গেলাম গোপীবাগে ভাবির বাপের বাড়িতে। আমাকে দেখেই তিনি বুঝে গেলেন কেন এসেছি। এর আগে দুয়েকবার ওখানে গেলেও হায়দারভায়ের সাথেই গেছি। একা কখনও যাইনি।

যাই হোক, ভাবিকে খুব বেশি বোঝাতে হলো না। তাদের প্রেমটা আসলে দু-তরফ থেকেই প্রবল ছিলো। নীলুভাবি যখনই শুনতে পেলেন হায়দারভাই মারামারি করে মাথা ফাটিয়েছেন, তার শরীর খারাপ তখন আর দেরি না করে যে সুটকেস নিয়ে বাপের বাড়িতে গেছিলেন সেটা নিয়েই আমার সঙ্গে রওনা দিয়ে দিলেন। ভাবির উদ্বিগ্নতা দেখে আমার খুব ভালো লাগলো। এমন প্রেমই তো আমি মনে মনে কল্পনা করি। মানব-মানবির এমন সম্পর্কই তো আমার কাম্য।

“ভাবি, হায়দারভাইকে আর পীর-ফকিরের কাছে নিয়ে যাবার কথা বলবেন না, উনি এসবে বিশ্বাস করেন না,” রিক্সায় করে ফেরার সময় বললাম। “আমিও করি না।”

নীলুভাবি চুপচাপ আমার কথা শুনে গেলেন। কোন প্রতিবাদ করলেন না।

“দেখবেন, আল্লাহর রহমতে আপনাদের এমনিতেই সন্তান হবে, কোন কিছুর দরকার হবে না। আর লোকজনের কথা একদম পাত্তা দেবেন না। বুঝলেন?”

আলতো করে মাথা দোলালেন তিনি।

“যেখানে আপনার স্বামি এসব নিয়ে আপনাকে কিছু বলে না সেখানে লোকজনের কথা কেন এত গুরুত্ব দেন, বুঝি না।

নীলুভাবি মুখে কিছু না বললেও আমি জানতাম আমার কথাগুলো তিনি গুরুত্বসহকারেই নিচ্ছেন।

“আমি স্বপ্নে দেখেছি, হায়দারভায়ের বাচ্চাকে কোলে নিয়ে আদর করছি।”

আমার দিকে আশাবাদি হয়ে তাকালেন ভাবি। “কবে দেখেছেন? কখন দেখেছেন?”

“এই তো, কয়েকদিন আগে…শেষরাতে।” মিথ্যেটা বলতে আমার একটুও খারাপ লাগেনি

দেখে মনে হলো ভাবি খুব খুশি হয়েছেন। মুখ ফুটে না বললেও তার মনোভাব আমি বুঝতে পেরেছিলাম-ভাই, আপনার কথাই যেন ঠিক হয়।

দুপুর হয়ে গেছে অনেক আগেই, বাড়িতে কোন খাবার-দাবার নেই। ভাবি গিয়ে রান্না করলে অনেক দেরি হয়ে যাবে, তাই পথে রিক্সা থামিয়ে তিন প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে নিলাম। পূণর্মিলনি হবে আর ভুড়িভোজ হবে না তা কী করে হয়!

বাড়ির সামনে রিক্সা থামলে ভাড়া মিটিয়ে ভাবিকে নিয়ে ঢুকে পড়লাম ভেতরে। মেইন গেট খোলা দেখে মোটেও অবাক হইনি। সেই সময় মানুষজন দিনের বেলায় বাসাবাড়ির মেইন দরজা খোলাই রাখতো। আজকের মতো নিরাপত্তা নিয়ে অতোটা শঙ্কিত ছিলো না তারা। নিজের তৈরি জেলাখানায় থাকতো না কেউ।

কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে ভাবলাম, হায়দারভাই বোধহয় জ্বরের ঘোরে ঘুমাচ্ছেন।

“ঘরের এ অবস্থা কেন?” ভাবি আঁতকে উঠে বললেন।

“কি?” এবার আমার নজরে পড়লো ঘরটা। দুটো চেয়ার উল্টে পড়ে আছে। টেবিলটাও জায়গা থেকে সরে আছে। দৈনিক ইত্তেফাকের একটি কপি মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

আমার ভেতরে কিছু একটা বলে উঠলো যেন। একটা আশঙ্কা। এক ধরণের অনুভূতি। আমি জোর দিয়ে বলতে পারবো না সেটা কি ছিলো। নীলুভাবিকে পাশ কাটিয়ে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। দরজাটা আধ- ভেজানো ছিলো। সেটা আস্তে করে ধাক্কা দিতেই আমার সমস্ত জগত কেঁপে উঠলো।

লণ্ডভণ্ড বিছানায় রক্তের সাগরে মধ্যে হায়দারভায়ের নিথর দেহটা পড়ে আছে!

ঠিক তখনই আমার পেছন থেকে ভাবির চিৎকারটা কাঁপিয়ে দিলো সারা ঘর। অজ্ঞান হয়ে ঢলে পড়লেন তিনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *