কেউ কেউ কথা রাখে – ২২

অধ্যায় ২২

থার্টিফাস্ট আর হুইস্কি

বছর শেষ, সকাল হলেই নতুন বছর ১৯৭৫-এ পদার্পন করবো আমরা। নতুন বছরের ঠিক আগের রাতে থার্টি ফার্স্ট বলে যে কিছু একটা আছে সেটা আমার মতো গ্রামে বেড়ে ওঠা কারোর পক্ষে কেন, সত্যি বলতে ঐ সময়ে ঢাকা শহরের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই ছিলো অজানা।

এই শব্দটা আমি প্রথমে শুনি রামজিয়া শেহরিনের মুখে। নতুন বছরের আগের দিন শেষ বিকেলে, চারপাশে যদিও তখন গাঢ় অন্ধকার নামতে শুরু করেছে শীতকাল বলে, আমি আমার ডেস্কে বসে চা খাচ্ছিলাম নাইট শিফট করার প্রস্তুতি হিসেবে, ঠিক তখনই এক কনস্টেবল আমাকে বললো, এক ভদ্রমহিলা ফোন করেছে। কথাটা শুনেই বুঝে গেছিলাম কে হতে পারে। উঠে গিয়ে থানার ভেতরে যে ফোনটা আছে সেটা তুলে নিলাম।

ফোনে আমার কণ্ঠটা শুনেই উৎফুল্ল ভঙ্গিতে বলে উঠলো সে, “হ্যালো, কেমন আছেন?”

“এই তো ভালো। আপনি কেমন আছেন?”

“আমি তো খুবই ভালো আছি।”

তার এত ভালো থাকার কারণটা কি জানতে চেয়েও জিজ্ঞেস করলাম না।

“সেই যে গেলেন আর তো কোনো খবর নেই আপনার।”

“না, মানে…খুবই ব্যস্ত ছিলাম।”

“আজ বছরের শেষ দিন, জানেন তো?”

কয়েক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিলো আগামিকাল কি পহেলা বৈশাখ? পরক্ষণেই বুঝতে পেরেছিলাম, আজ ৩১ শে ডিসেম্বর। ইংরেজি বছরের শেষ দিন। আগামিকাল সকাল থেকে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন বছর!

“ও, হ্যা…তাই তো,” বললাম আমি।

“আজ কি আপনার নাইট-শিফটে ডিউটি আছে?”

একটু অবাক হলাম কথাটা শুনে। আমার নাইট-শিফটের ডিউটির কথা জানতে চাইছে! “হ্যা…কেন?”

“ওফ্, একটু হতাশ মনে হলো তাকে। “আজ যদি আপনার নাইট- শিফটের ডিউটি না থাকতো তাহলে ভালো হতো।”

“কেন?” আমি বুঝতে না পেরে আবারো প্রশ্ন করলাম।

“আমরা কাজিন আর বন্ধুরা মিলে বাসায় থার্টিফার্স্ট করবো আজ। সারা রাত ফান করবো। অনেক খাওয়া-দাওয়া হবে।”

“থার্টি ফার্স্ট?!” কথাটা আমার মুখ দিয়ে বের হয়ে গেলো।

“হুম। থার্টিফার্স্ট নাইট। ভাবলাম, আপনাকে ইনভাইট করি।” আমাকে ইনভাইট করতে চাইছে? নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো।

“ওদেরকে বলেছিলাম আপনি কিভাবে মিলির কেসটা ইনভেস্টিগেট করে ইমতিয়াজকে ধরেছিলেন। ওরা তো খুবই ইন্টারেস্টেড আপনার সাথে পরিচিত হবার জন্য।”

এবার বুঝতে পারলাম দাওয়াত দেবার মাজেজা। কিন্তু মিলির কেসটা যে হায়দারভাই তদন্ত করছেন সে-কথা এই মেয়েকে যতোই বলি না কেন, তার দৃঢ় বিশ্বাস কাজের কাজটা আমিই করেছি।

“একটু চেষ্টা করে দেখেন না…আসলে ভালো হতো।” আমি চুপ মেরে আছি বলে বললো সে।

“ইয়ে মানে…কখন?”

“এগারোটার পর চলে আসুন।”

কথাটা শুনে ভিরমি খেলাম। রাত এগারোটা! বলে কী! ঐ সময় তো মানুষজন অনুষ্ঠান শেষ করে যার যার বাড়িতে ফিরে যায়।

“আসলে, তখন তো ডিউটিতে থাকতে হবে। আটটা-নয়টা হলে একটু চেষ্টা করে দেখতাম।”

অনেকদিন পর বুঝতে পেরেছিলাম, আমার এ কথা শুনে রামজিয়া নিশ্চয় মুখ চাপা দিয়ে হেসেছিলো। থার্টি ফার্স্ট কোনো বিয়ে কিংবা জন্মদিনের অনুষ্ঠানও নয় যে আটটা-নয়টায় শুরু হবে। আমি যে এসব বিষয়ে নাচার সেটা ধরতে পেরেছিলো সে। তবে তার আচরণে কিছুই বুঝতে পারিনি তখন।

“ও,” একটু বিরতি দিয়ে আবার বললো, “ঠিক আছে, যদি ঐ সময়ে আমাদের বাসার সামনে দিয়ে যান তো একটু ঢুঁ মেরে যাবেন, কেমন?”

“আচ্ছা,” আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। “হ্যাপি নিউ ইয়ার।”

সুললিত কণ্ঠে বলে ফোনটা রেখে দিলো সে। আর আমি বোকার মতো

দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েক মুহূর্ত। জীবনে প্রথম কেউ আমাকে ইংরেজি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানালো, আর আমি সত্যি সত্যি ‘ক্ষেত’ থেকে উঠে আসা একজন, এর জবাবে যে পাল্টা হ্যাপি নিউ ইয়ার বলতে হয় সেটাও জানতাম না। সবেমাত্র জানলাম থার্টি ফার্স্ট বলে কিছু একটা আছে, যেটার শুরু হয় নতুন বছরের আগেরদিন রাতে। আটটা-নয়টার মতো ভদ্র সময়ে নয়, এগারোটা-বারোটার মতো নিশুতি রাতে!

যাই হোক, ঐদিনই হায়দারভায়ের পাল্লায় পড়ে আমি প্রথমবারের মতো একটু মদ্যপান করেছিলাম, তবে সেটার উপলক্ষ্য নিশ্চিতভাবেই থার্টিফার্স্ট ছিলো না। তখন আজকের দিনের মতো ওরকম কোনো উৎসব ঢাকা শহরে খুবই কম হতো। এসবের প্রচলন হয় আরো অনেক পরে। অভিজাত পাড়া হিসেবে খ্যাত ধানমণ্ডি-গুলশান-বনানীতে কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে এটা করতো। ঐ সময় ৩১শে ডিসেম্বর, বছরের শেষ রাতে পুলিশকেও বাড়তি কোনো দায়িত্ব পোহাতে হতো না। আর সব দিনের মতোই ঢাকা শহর ঘুমিয়ে পড়তো রাত দশটা-এগারোটার পর। আমাদের মতো রাতের ডিউটি যাদের ছিলো তারা অন্য সব রাতের মতোই একটা লক্কর-ঝক্কর পুলিশের গাড়ি নিয়ে থানার চৌহদ্দির মধ্যে টহল দিতো ভোর পর্যন্ত।

ঐদিন হায়দারভাই আর আমার দু-জনেরই নাইট-শিফট ছিলো। রাত ন-টার পর একটা পুলিশ জিপ আর দু-জন কনস্টেবল নিয়ে আমরা টহল দিতে বেরিয়ে পড়লাম।

“ভাই, এই থার্টি ফার্স্ট জিনিসটা কি?”

কথাটা শুনে হায়দারভাই স্থিরচোখে তাকালেন আমার দিকে। “কে বলছে তোমাকে?”

“এই তো, একজন বললো।” রামজিয়ার কথাটা বললাম না। পাছে হায়দারভাই টিটকারি মারা শুরু করেন সেই ভয়ে।

“৩১শে ডিসেম্বরের রাতে যে পার্টি করা হয় ওটাই থার্টি ফার্স্ট।” বিজ্ঞের মতো বললেন তিনি। তার ভাবভঙ্গিই বলে দিচ্ছিলো বিষয়টা সম্পর্কে ভালোই জ্ঞান রাখেন।

“এই থার্টি ফার্স্ট পার্টিতে কি করে লোকজন?”

সিগারেটের ধোঁয়া গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে ছেড়ে দিয়ে মুখ বাঁকিয়ে তিনি বললেন, “ওয়েস্টার্ন কালচার, বুঝলে। কিছু বড়লোক এটা আমদানি করেছে এ দেশে। সারা রাত মওজ-ফূর্তি করে, মদ খায়!”

কথাটা শুনে আমার বিশ্বাস করতেও কষ্ট হলো। মদ খায়?! রামজিয়া বলেছিলো বেশ খাওয়া-দাওয়া হবে-এই কি সেই খাওয়া-দাওয়া?

“শুধু মদ খায়?”

মাথা নেড়ে সায় দিলেন তিনি। “ইয়াং ছেলেপেলেরা মদ-বিয়ার খেয়ে আড্ডাবাজি করে, ইংরেজি গান শোনে, নাচানাচি করে। পুরাই তেলেসমাতি কারবার, বুঝলে? নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সব!”

আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। হায়দারভাই যা বললেন তার সাথে রামজিয়াকে মেলাতে কষ্ট হচ্ছিলো আমার। ভীষণ কষ্ট! থার্টি ফার্স্ট যদি নষ্টামি হয়ে থাকে তাহলে তার সাথে আর যাই হোক রামজিয়া শেহরিনের কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে না। কিন্তু আজ বিকেলে সে নিজেই আমাকে ফোন করে আমন্ত্রণ দিয়েছে। স্পষ্ট করেই বলেছে, রাত এগারোটার পর চলে আসতে, তার কাজিন আর বন্ধুরা থার্টি ফার্স্ট করবে!

“এসব অনুষ্ঠান কয়টার দিকে শুরু হয়, ভাই?” মলিন কণ্ঠে জানতে চাইলাম আমি, আসলে নিশ্চিত হতে চাইছিলাম।

আবারো একগাল ধোঁয়া ছেড়ে তিনি বললেন, “এগারোটা-বারোটা থেকে শুরু হয়…চলে সারা রাত।”

মিলে যাচ্ছে! রামজিয়া আমাকে এই সময়েই আসতে বলেছে।

“এই যে, বাড়িগুলো দেখছো,” ধানমণ্ডির আবাসিক এলাকার বাড়িগুলোর দিকে ইঙ্গিত করলেন তিনি। “এসব বাড়িতে আজ থার্টিফার্স্ট হবে।”

“সব বাড়িতে?” বিস্মিত হয়ে বললাম।

“সব বাড়িতে না, কিছু কিছু বাড়িতে।” আমি থম মেরে বসে রইলাম

“এগুলো হলো বড়লোকের নষ্ট পোলাপানদের আমোদ-ফূর্তির পার্টি। একটু পরই দেখবে কিছু ইয়াং ছেলেমেয়ে গাড়ি নিয়ে ঢুকছে কোনো বাড়িতে।”

আমোদ-ফূর্তি! নষ্ট পোলাপান! মদ!

কোনোভাবেই আমি রামজিয়াকে এসবের সাথে মেলাতে পারছিলাম না। “সবাই মদ খাবে?”

আমার দিকে না তাকিয়েই জবাব দিলেন হায়দারভাই, “হুম। সবাই খাবে। না খেলে পার্টি হবে নাকি, আজব! থার্টিফার্স্ট মানেই মদ্যপান। বুঝলে?” কথাটা শেষ করে বাঁকাহাসি দিলেন। “আমি মদ খাই দুঃখে আর এরা খায় ফূর্তি করার জন্য। আরে, নতুন বছর আসবে তো তোর কী? ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টা…এটা নিয়ে এতো আদিখ্যেতা দেখানোর কী আছে! পহেলা বৈশাখে তো হালখাতা দিয়ে অনুষ্ঠান করে, তোরা কী দিয়ে করিস? বাল খাতা দিয়ে?” বাঁকাহাসি দিলেন তিনি

গাড়িতে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম আমি। সেই প্রথম আমার মধ্যে একটা পরিবর্তন এলো-মদ্যপান আসলে অতোটা খারাপ কিছু না। হায়দারভায়ের মতো ভালোমানুষ খায়, তারচেয়েও বড় কথা রামজিয়া শেহরিনও থার্টিফার্স্টের সময় এটা চেখে দেখে। কেবলমাত্র আমার মতো গ্রাম থেকে উঠে আসারা এটাকে খারাপ মনে করে।

“কি মিয়া, চুপ মেরে আছো কেন?”

হায়দারভায়ের কথায় সম্বিত ফিরে পেলাম। “না, মানে…” একটু থেমে আবার বললাম, “আপনারা যে কেন মদ খান সেটা বুঝতে পারি না। এসব জিনিস খেয়ে কী হয়? আমার তো মনে হয় পুরাই ফালতু একটা জিনিস।”

আমার কথা শুনে হো হো করে হেসেন উঠলেন এসএম হায়দার। “এটা যদি ফালতু জিনিস হয় তাহলে পুরো জিন্দেগিটাই ফালতু, ব্রাদার।”

মাথা দোলালাম আমি। “একটা ফালতু কথা বললেন।”

“তুমি তো কখনও খাওনি, কেমনে বুঝবে এ জিনিসের মর্যাদা? একবার খেয়ে দেখো, তারপর এইসব বোলো।”

“থাক, আমার দরকার নেই, আপনিই খান।”

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে উঠলেন হায়দারভাই, “এই যে তুমি বিভিন্ন লেখকদের বই পড়ো, তাদেরকে এতো সম্মান করো, তুমি কি জানো, এরা প্রত্যেকেই মদ খেতো?”

আমি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালাম। “সবাই খেতো?”

মাথা নেড়ে সায় দিলেন তিনি। “আলবৎ খেতো। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নজরুল…সবাই। কে খেতো না সেটাই বলো!”

রবীন্দ্রনাথ খেতেন? খেতেই পারেন, জমিদার ছিলেন। নজরুল? তার মতো বাউণ্ডুলে জীবন-যাপন করা কবির পক্ষে সেটা বেমানান নয়। অন্য যারা আছে তারাও হয়তো খেতো।

মদ সম্পর্কে বাজে ধারনাটি আক্ষরিক অর্থেই রাতারাতি পাল্টে গেলো আমার। এ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে দিলাম। তখনও ঘুণাক্ষরে বুঝতে পারিনি একটু পরই সেই জিনিসটার আস্বাদন করবো প্রথমবারের মতো!

এমন নয় যে, হায়দারভাই আমাকে জোর করে মদ্যপান করিয়েছিলেন, আবার এমনও নয়, আমি খুব আগ্রহভরে এটা চেখে দেখেছি। ব্যাপারটা কেমন করে জানি হয়ে গেছিলো।

মাঝরাতের দিকে আমাকে চুপ মেরে থাকতে দেখে হায়দারভাই বলেছিলেন, “একটু চেখে দেখবে নাকি?”

সত্যি বলতে, আমি সঙ্গে সঙ্গে না করে দেবার মতো মানসিক অবস্থায় ছিলাম না ঐ রাতে। হাজার হলেও রামজিয়া শেহরিনও এই জিনিস খায়!

যাই হোক, রাত দেড়টার দিকে টহল দলকে বিশ্রামে রেখে হায়দারভাই আমাকে এক ফুটবল ক্লাবে নিয়ে গেলেন। ওখানকার প্রায় সবাই তাকে ভালো করেই চেনে। বোঝা গেলো নিয়মিতই আসেন তিনি। সেই প্রথম আমি জানতে পারলাম, ফুটবল ক্লবাগুলোতে রাতের বেলায় মদ-বিয়ারের সমারোহ চলে। এর আগে আমি জানতাম, ক্লাবগুলোতে জুয়া খেলা, হাউজি খেলা প্রকাশ্যে চলে, আর এটা তাদের নিজস্ব ইনকামের একটি সোর্স। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারিবাহিনী বিষয়টা জেনেও না জানার ভান করে থাকে উপরের নিদের্শে। বিনিময়ে তারা কিছু সেলামিও পেয়ে থাকে নিয়মিত।

ক্লাবের এককোণে দুটো চেয়ার নিয়ে বসে পড়ি আমরা। প্রথমবার হিসেবে হায়দারভাই আমাকে মদ না দিয়ে বিয়ার দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু ঐদিন বিয়ার শেষ হয়ে যাওয়ায় শুধু হুইস্কি আর ভদকা ছিলো। অগত্যা প্রথমবারের মতো হুইস্কি দিয়ে মদের আস্বাদন নিলাম। বলা ভালো, প্রথম অভিজ্ঞতা হিসেবে ওটা ছিলো খুবই জঘন্য। এমন তেতো পানি কেবল ছোটোবেলায় মামির দেয়া চিরতার রসের সাথেই তুলনীয় হতে পারে। নাক চেপে চিরতার রস খাওয়া যায় কিন্তু মদ নামক তরল পদার্থ আমার গলা দিয়ে নেমে যাবার সময় প্রায় বমি হবার উপক্রম হয়েছিলো, পৌরুষের অপমাণ হবে বলে জোর করে চেপে রেখেছিলাম সেটা। হায়দারভাই নিশ্চয় আমার চোখমুখ দেখে ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তিনি একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন, একটু একটু করে চুমুক দিয়ে যেন খাই।

নিঃসঙ্গভাবে মদ্যপান করলে কী ধরণের অনুভূতি হয় সেটা আমি পরবর্তিতে বুঝেছিলাম কিন্তু সঙ্গি থাকলে মদ্যপানরত ব্যক্তির আচরণ কেমন হয় সেটা ঐদিন আবিষ্কার করি।

এসএম হায়দার, যাকে থানার সবাই ভয় করে চলে তার কড়া মেজাজ আর অংশত মুক্তিযোদ্ধা হবার জন্য, সেই লোক মদ্যপানের এক পর্যায়ে শিশুর মতো আচরণ করতে শুরু করলেন। তার যতো দুঃবোধ যেন উড়ে এসে জুড়ে বসলো, আর তিনি সে-সব উগলে দিতে শুরু করলেন আমার উপরে।

আমার সাথে হায়দারভায়ের ঘনিষ্ঠতা থাকলেও ঐদিনের আগে আমি জানতে পারিনি স্ত্রির সাথে উনার ঝামেলটা আসলে কী নিয়ে। নতুন বছরের আগমনের দিনটায় আমি এই সত্যটা জানতে পারলাম-একটা ফুটফুটে শিশু।

বিয়ের চার বছর পরও তাদের কোনো বাচ্চা-কাচ্চা হচ্ছিলো না। এ নিয়ে অবশ্য হায়দারভায়ের তরফ থেকে কোনো সমস্যা ছিলো না কিন্তু তার স্ত্রি মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন, আর ঝামেলার শুরু তখন থেকেই। বেচারি হয়তো নিজেকে বন্ধ্যা নারী হিসেবে ভাবতে আতঙ্কিত বোধ করতেন। দু- জনের কারোর সমস্যা নেই, যেকোনো সময় এটা ঘটতে পারে, ডাক্তারের এমন আশ্বাসের পরও হায়দারভায়ের স্ত্রি নানা রকম কবিরাজি আর পীর- ফকিরের কাছে ধর্না দিতে শুরু করেছিলেন। কুসংস্কারমুক্ত মানুষ হিসেবে হায়দারভাই এটা মেনে নিতে পারেননি। স্ত্রির দেয়া পড়া-পানি খেতে অস্বীকার করেন, তাবিজ পরার ব্যাপারে ঘোরতর আপত্তি তার, শ্বশুড়বাড়ির লোকজনের কাছে কামেল বলে খ্যাত পীড়-ফকিরের কাছে যেতেও রাজি হন না-এইসব নিয়ে নিত্য কলহ লেগে থাকতো তাদের। তার সাথে যুক্ত হতো

হায়দারভায়ের মদ্যপানের বদঅভ্যেস আর বদমেজাজ।

“বুঝলে, তুমি যদি ঝগড়া করতে চাও তাহলে সবকিছু নিয়েই ঝগড়া করতে পারবে,” মাতাল হয়ে বলেছিলেন তিনি। “ডালে লবন বেশি দিয়েছো, কিংবা একদমই দাও নি-এটা নিয়েও তুমুল ঝগড়া করা সম্ভব।”

কথাটা শুনে আমি মুখ টিপে হেসেছিলাম।

“এই বঙ্গে কতো রঙ্গ হয়, ব্রাদার,” একটা বিশ্রি ঢেকুর তুলে বলেছিলেন। “আমার তো মনে হয় বাংলার ইতিহাসে শুধুমাত্র ডালে বেশি লবন দেয়া আর না দেয়া নিয়ে ঝগড়া করে অনেক পরিবার ভেঙে গেছে। তিন-চারটা খুনও হয়েছে মনে হয়। গত বছর ইত্তেফাকে এরকম একটা নিউজ পড়েছিলাম, স্বামির হাতে স্ত্রি খুন! ডালে লবন না দেয়ার কারণে সৃষ্ট কলহে এক পর্যায়ে ক্ষিপ্ত স্বামি বটি দিয়া স্ত্রির মাথায় কোপ মারিয়া বসে!” একেবারে ইত্তেফাকের সাধুভাষায় আবৃত্তি করলেন তিনি।

তার বলার ভঙ্গি দেখে-শুনে খুব হাসি পাচ্ছিলো আমার। “আপনিও কি এরকম বিষয় নিয়ে ঝগড়া করেন নাকি?” হাসতে হাসতেই বলেছিলাম তাকে।

তর্জনি উঁচিয়ে দু-পাশে মাথা দুলিয়ে কথাটা উড়িয়ে দিয়েছিলেন এসএম হায়দার। “না, ব্রাদার…আমি এখনও অতোটা কাণ্ডজ্ঞানহীন হইনি। নীলু মা হবার জন্য পাগল হয়ে গেছে। কী করে না করে তার নেই কোনো ঠিক। সব সময় মেজাজ খিটখিটে থাকে তার…বুঝলে? সে মনে করে মদ খেলে পুরুষমানুষের বাচ্চা-কাচ্চা হবার ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।”

“তাই নাকি? ভাবি আসলেই এটা বলে?” আমি একটু অবাকই হলাম।

মাথা নেড়ে সায় দিলেন তিনি। “হুম।” তারপর চারপাশে তাকালেন। “আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, এখানে যারা আছে তাদের একেকজনের তিন-চারটা করে বাচ্চা আছে ঘরে।” আবারো একটা ঢেকুর বের হয়ে এলো ভেতর থেকে। “কিন্তু আমার ময়নাপাখিটারে কে বোঝাবে!”

“আশ্চর্য, আপনাদের বিয়ের মাত্র চার বছর হয়েছে, এখনও অনেক সময় হাতে আছে…ভাবিকে এটা বোঝান।”

বাঁকাহাসি দিয়েছিলেন তিনি। “তাকে আমি বোঝাই, সে-ও কয়েকটা দিন ঠিক থাকে তারপর বাপের বাড়ি আর শ্বশুড়বাড়ির লোকজনের খোঁচা, টিপ্পনি খেয়ে মাথা আউলা-ঝাউলা হয়ে যায়।”

বাঙালি পরিবারের এমন চিত্র আমার কাছে মোটেও অচেনা নয়। আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে কুটনা টাইপের মহিলাদের এ নিয়ে কথা শোনানো বাঙলার সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। বিষয়টা বুঝতে পেরে চুপ মেরে রইলাম।

“তোমার ভাবি আবার খুব অভিমানি, বুঝলে? মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতে পারে না তাই সব রাগ ঝাড়ে আমার উপরে।”

“আপনি যদি ব্যাপারটা বুঝতেই পারেন তাহলে চুপচাপ মেনে নিলেই হয়, ঝগড়া করতে যান কেন?”

ঢুলু ঢুলু চোখে আবারো বাঁকাহাসি দিয়ে আমার দিকে তাকালেন তিনি। “ওই মিয়া…তুমি কি আমারে পয়গম্বর ভাবো নাকি, অ্যাঁ? এই যে তোমারে বললাম আমি সব বুঝি এটা তো তখন মাথায় থাকে না, ঝগড়া-ঝাটির পর মাথায় আসে।”

কথাটা শুনে আমি হেসে ফেলেছিলাম আবারো। “চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে!”

হায়দারভাইও হেসে ফেললেন।

“এরপর থেকে ভাবি ঝগড়া করতে চাইলেও আপনি করবেন না, ঠিক আছে?”

আমার দিকে স্থিরচোখে চেয়ে রইলেন। “এটা কি অর্ডার নাকি রিকোয়েস্ট?”

“উমম…অর্ডার।”

“ওকে, বস্!” তিনি হুট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন, মিলিটারি কায়দায় মেঝেতে জোরে পা ঠুকে স্যালুট দিলেন আমাকে। “যদি আপনার এই মূল্যবান আদেশের কথাটা তখন আমার মনে থাকে তো।”

তাকে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিলাম। এসএম হায়দারের মাতলামি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাক সেটা আমি চাইনি।

“সমস্যা হলো,” টেনে বললেন তিনি, “তখন কিছুই মনে থাকে না। শুধু মাথায় থাকে, আমার সাথে এটা করলো! আমাকে এটা বললো! এই শালি তো আমাকে একদমই ভালোবাসে না! একটুও না! এক ফোঁটাও না!” উনি তর্জনি আর বুড়ো আঙুল একসাথে করে ফোঁটার আকৃতি দেখানোর চেষ্টা করলেন।

আমি কপালের বামপাশ চুলকালাম। এই মাতালকে নিয়ে বাকি রাতটা কিভাবে টহল দেবো সেটাই ভাবতে লাগলাম।

“আরে, তুমি তো কিছুই খাওনি…মাত্র এক পেগ! ধুর!” এবার আমার গ্লাসের দিকে নজর দিলেন তিনি, “এক পেগে কিছু হয়?!” মাথা দোলালেন। “আমার বাল হয়!”

মনে মনে প্রমাদ গুণলাম। এসএম হায়দারের মাতলামি বেড়েই চলেছে। “আমার ভালো লাগেনি, খুবই বিশ্রি লেগেছে।”

“মেয়েমানুষের মতো কথা বলছো কেন? দু-তিন পেগ পেটে না গেলে এই জিনিসের মাজেজা বুঝবে নাকি, অ্যাঁ?”

“ওরে বাবা!” দু-হাত তুলে আত্মসমর্পন করার ভঙ্গি করলাম আমি। “আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

সত্যি, সেদিন আমার পক্ষে এক পেগের বেশি পান করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ঐ ঘটনার কয়েক মাস পরই যে আমি পেগের পর পেগ গলাধকরণ করতে শুরু করবো সেটা কে জানতো।

এখন নিজের ঘরে বসে একা একা মদ্যপান করছি আর ভাবছি, আজ যদি হায়দারভাই জানতেন, আমি মদ্যপান শুরু করলে চার-পাঁচ পেগের নীচে করি না তাহলে কী ভাবতেন?

বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো শুধু।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *