অধ্যায় ২৬
যেমনটা আশঙ্কা করা হয়েছিলো, ইমতিয়াজ জামিনে ছাড়া পাবার পর খুব দ্রুতই ঘটনা বদলে যেতে শুরু করলো। ওসির কথাগুলো আমি আর হায়দারভাইকে বলার সুযোগই পাইনি। ভালো করেই জানতাম, এ কথা শুনলে রেগেমেগে ওসির কলার ধরতে ছুটে যেতে পারেন তিনি। কিংবা কে জানে, হয়তো মারপিটও করতে পারেন। অপেক্ষায় ছিলাম মন-মেজাজ ভালো দেখলে সুযোগ পেলে কথাটা তুলবো। তবে আমি ইনিয়ে বিনিয়ে অন্যভাবে কথাগুলো তাকে বলেছিলাম। মানে, বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম আর কি।”
“আচ্ছা, ইমতিয়াজ যদি আদালতের কাছে বলে, তাকে আপনি ভয়– ভীতি দেখিয়ে জোর করে স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর করিয়েছেন, সে মার খাওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য এটা করেছে, তাহলে কি হবে?”
প্রশ্নটা শুনে হায়দারভাই আমার দিকে চেয়ে ছিলেন কয়েক মুহূর্ত। “এটা তো সে করবেই…সব আসামিই এটা করে।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন, “সেটা নিয়ে আমি চিন্তিত না।”
“তাহলে আপনি কি নিয়ে চিন্তিত?”
“আমাদের হাতে যে কিছু সাক্ষি আছে…চাক্ষুষ সাক্ষি…তাদেরকে সে ভয়-ভীতি দেখালে খুব সমস্যা হয়ে যাবে। দেশের অবস্থা ভালো না। এরকম পরিস্থিতিতে কেউ ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে যাবার কথা চিন্তাও করবে না।”
“আপনার ধারণা সাক্ষিরা এখনও ইমতিয়াজের রাজনৈতিক পরিচয় জানে না?”
“তারা কিভাবে এটা জানবে? তখন তো জানতামও না ও রাজনীতি করে। আর জানলেও আমি সেটা ওদেরকে বলতাম না।”
আমি চুপ মেরে গেলাম। হতাশাজনক চিত্র ভেসে উঠলো চোখের সামনে। সব জানার পর সাক্ষিরা সাক্ষ্য দিতে আর রাজি হবে না।
“এজন্যেই ওকে জেলে আটকে রাখার দরকার ছিলো। এরকম আসামি জামিনে বেরিয়ে গেলে কী করতে পারে সেটা আমি ভালো করেই জানি।”
“সে কি এরকম কিছু করেছে?”
মাথা দুলিয়ে জবাব দিলেন। “না। এখন পর্যন্ত কিছু করেনি, তবে মামলা চালু হবার আগেই ওর উকিল ওকে বলে দেবে সে যেন এটা করে, নয়তো আমাদের ওসি হারামজাদাই বলে দেবে সাক্ষিদের ভয় দেখিয়ে বিরত রাখার জন্য। ওসি এখন নেতার হয়ে কাজ করছে। নেতাকে খুশি করে কিছু হাসিল করতে চাইছে।”
কথাটা শুনে আমি আরো বেশি হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। “আচ্ছা, আপনাকে যদি কেস থেকে সরিয়ে দেয়া হয় তাহলে কি করবেন?”
আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে কাঁধ তুললেন তিনি। “জানি না।”
আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। তবে হায়দারভায়ের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হয়েছিলো। ইমতিয়াজ জামিনে ছাড়া পেয়ে সপ্তাহখানেক চুপচাপ থাকার পরই সক্রিয় ওঠে।
মিলিদের বাড়ির সামনে যে মুদির দোকানি ইমতিয়াজকে ঘুরঘুর করতে দেখেছে সে বেঁকে বসলো সাক্ষি না দেবার জন্য। হায়দারভাই বুঝতে পারলেন ইমতিয়াজ তার কাজ শুরু করে দিয়েছে। মুদিকে ধমক দিয়ে, বুঝিয়ে-সুঝিয়েও কাজ হলো না। ইমতিয়াজ যে তাকে ভয় দেখিয়েছে এ কথা পর্যন্ত স্বীকার করার সাহস দেখায়নি সে। এই সাক্ষিটা ছিলো খুবই ভাইটাল।
ক্ষিপ্ত হায়দারভাই ভেতরে ভেতরে যে তেঁতে ছিলেন সেটা আমি পুরোপুরি বুঝতে পারিনি। আমাকে তিনি এমন কোন আভাসও দেননি যে আমি বুঝতে পারবো। মুদি দোকানির সাথে কথা বলার তিন-চারদিন পর ওসিসাহেব আমাকে আবারো ডেকে নিয়েছিলো তার ঘরে। সে-ই আমাকে জানায় হায়দারভাই কি করেছেন।
“ওর তো মাথা খারাপ হয়ে গেছে, পুরা পাগল হয়ে গেছে, বুঝলেন?” ওসি বলেছিলো আমাকে।
“কেন, স্যার, আবার কি হয়েছে?” উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চেয়েছিলাম আমি।
“আপনি কিছু জানেন না?” সন্দেহের সুরে বলেছিলো ওসি আলী ইকরাম।
“না, স্যার…কি হয়েছে? হায়দারভাই কি করেছেন?”
“আরে, সে তো সাপের লেজে পা দিয়েছে,” আক্ষেপে মাথা দুলিয়ে বলেছিলো, “গতকাল ইমতিয়াজকে সে শাসিয়েছে।”
জামিনে ছাড়া পেয়ে ইমতিয়াজ বেশ বুক ফুলিয়েই ঘুরে বেড়াতো, ফলে তার নাগাল পাওয়াটা তেমন কঠিন কাজ ছিলো না।
“বলেন কি?” আমি সত্যি অবাক হয়েছিলাম কথাটা শুনে। হায়দারভাই
আমাকে এ ব্যাপারে কিছুই বলেননি। কথাটা শুনে খুবই মন খারাপ হয়েছিলো। যেন তার সব কিছু, সমস্ত কর্মকাণ্ড জানার অধিকার অর্জন করে ফেলেছি আমি। সেই অধিকার থেকে আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে!
“ভাবছিলাম আপনি ওকে বোঝাতে পারবেন.” হতাশকণ্ঠে বললো ওসি। “কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ওকে বোঝানো আপনার কাজ না।”
তাহলে আমাকে এখানে ডেকে এনে এসব কথা বলছেন কেন?-মনে মনে প্রশ্নটা না করে পারিনি। তবে পরক্ষণেই জবাবটা পেয়ে গেছিলাম উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছ থেকে।
“আপনি আর ওর সাথে ঘোরাঘুরি কইরেন না, বুঝলেন?” সিরিয়াসভঙ্গিতেই বলেছিলো ওসি। “ওর কপালে খারাবি আছে।”
ঐদিন থানার বাইরে হায়দারভাইকে একা পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম ইমতিয়াজকে তিনি কেন শাসাতে গেছিলেন।
“কে বলেছে তোমাকে?”
‘ওসিসাহেব।”
“শাসিয়েছি মানে?” অবাক হয়ে বলেছিলেন তিনি। “ঐ হারামজাদার নাক যে ফাঁটিয়ে দিয়েছি সেটা বলেনি কুত্তারবাচ্চা?”
কথাটা শুনে আমি যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম। “কি!” আমার বিশ্বাস করতেও কষ্ট হচ্ছিলো।
“ওরে বলে দিয়েছি, আমি যতোদিন বেঁচে আছি ওর নেতা ওকে বাঁচাতে পারবে না। দরকার পড়লে আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে শেখসাহেবের কাছে যাবো। তারপর দেখবো কোন্ নেতার বুকের পাটা কতো বড়!”
“আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে!” আমি সত্যি সত্যি রেগে গেছিলাম কথাটা শুনে। তবে রাগের চেয়েও উদ্বিগ্নতা ছিলো অনেক বেশি। “ওর মতো জঘন্য এক খুনিকে হুমকি দিয়েছেন! ও যদি আপনার কোন…” কথাটা পুরোপুরি আমার মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতেও পারিনি।
“ক্ষতি করবে?” আমার দিকে চেয়ে বললেন তিনি, “মেরে ফেলবে?” তারপর তাচ্ছিল্যভরে হাতে নেড়ে বলে উঠলেন, “মৃত্যুর ভয় এই হায়দার করে না, বুঝলে? এই যে আমি বেঁচে আছি এটা তো বোনাস লাইফ। আমার কতো সহযোদ্ধা মরে গেছে, আমিও মরে যেতে পারতাম।”
হতাশ হয়ে আমি মাথা দুলিয়েছিলাম। ভয়-ভীতির দোহাই দিয়ে যে তাকে দমানো যাবে না সেটা ভালো করেই জানতাম।
