কেউ কেউ কথা রাখে – ১১

অধ্যায় ১১

“তোমার কি মনে হয়, ও বেঁচে আছে?”

রামজিয়ার দিকে চেয়ে রইলাম। “আমি নিশ্চিত নই। তবে আমার কেনজানি মনে হয় বেঁচে আছে।”

রামজিয়া কিছু না বলে শুধু মাথা নেড়ে সায় দিলো।

“মিলিকে নিয়ে লেখা শুরু করার আগে ইমতিয়াজের খোঁজ করার চেষ্টা করেছিলাম। ওর কোন পরিচিত লোককে আমি চিনি না, কার কাছে গিয়ে খোঁজ করবো-তাই দীর্ঘদিন পর কাঠালবাগানে ওদের বাড়িতে চলে গেছিলাম।”

“আচ্ছা…তারপর?” আগ্রহি হয়ে উঠলো সে।

“ওখানে গিয়ে দেখি আশেপাশের বাড়িগুলো উধাও হয়ে গেছে। ওদের সেই একতলার পুরনো বাড়িটা নেই, ওখানে এখন নতুন ছয়তলার একটি বিল্ডিং। ইমতিয়াজের মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। ওর বড়বোন থাকে একটা অ্যাপার্টমেন্টে। সম্ভবত সে-ই এখন বাড়ির মালিক। কয়েক বছর আগে ডেভেলপারকে দিয়ে এটা ডেভেলপ করেছে। ভদ্রমহিলার কাছে ইমতিয়াজের ব্যাপারে জানতে চাইলে আকাশ থেকে পড়লেন যেন। এতোদিন পর ওর খোঁজ করছি! আমি কে? সঙ্গে সঙ্গে একটা মিথ্যে বলে দিলাম, ইমতিয়াজ আমার পুরনো বন্ধু, দুই যুগ পর বিদেশ থেকে দেশে এসেছি। একটা কাজে কাঠালবাগানে এসেছিলাম, ভাবলাম একটু দেখা করে যাই।”

মুচকি হাসলো রামজিয়া শেহরিন।

“ওর বোন জানালো, পঁচাত্তরের পর থেকে ইমতিয়াজ লাপাত্তা। ও বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে সেটা তারা জানে না। মহিলার কথা বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো আমার।”

“বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো কেন?”

“মরে গেলে এতোদিনে অন্তত ওর পরিবার জানতো, আর এটা লুকানোর চেষ্টা করতো না, করার দরকারও হতো না।”

“হুম,” মাথা নেড়ে সায় দিলো সে। “তোমার ধারণা ও ঢাকাতেই আছে?”

“হুম। মিলির কেসটা ম্যানেজ করে ফেলেছিলো, আর হায়দারভায়ের কেসে ওর নামটা পর্যন্ত অভিযোগপত্রে দেয়া হয়নি। ওর জন্য ঢাকা শহর ছাড়ার কোন কারণই ছিলো না। হয়তো দিব্যি সংসার করে সুখে আছে এখন।

“আচ্ছা, ওর সাথে দেখা করতে চাইছো কেন? যদি দেখা হয়ে যেতো তাহলে কি করতে?” একটু থেমে আবার বললো, “এই বইটা ওকে পড়তে দিতে?”

স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে থেকে মাথা দোলালাম আমি। “না।”

“তাহলে?”

“লেখাটা শেষ করার জন্য…মানে, সমাপ্তির জন্য ইমতিয়াজের বর্তমান অবস্থা জানার দরকার।”

“হুম।”

“ও এখন কি করে, বিয়ে-থা করেছে কি-না, সন্তান আছে কি-না, বাবা হিসেবে কেমন, স্বামি হিসেবে কেমন…এসব জানার চেষ্টা করতাম। তাছাড়া, এই বইটা শেষ করার পর ওকে এক কপি দিতাম। ও হয়তো পড়বে না কিন্তু ওকে জানিয়ে দিতাম, সত্যটা পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।”

স্থিরচোখে চেয়ে রইলো রামজিয়া।

তার চোখে চোখ রেখে আলতো করে মাথা দোলালাম। “আরেকটা কারণও আছে, কিন্তু তার আগে তোমার অর্গ্যানাইজেশন সম্পর্কে একটু জানতে চাই।”

কথাটা শুনে একটু অবাকই হলো সে। “কি জানতে চাও?”

“ইন্টারভিউতে তুমি বলেছিলে তোমার এই অর্গ্যানাইজেশন ভুলভাবে বিচার করা হয়েছে যাদের তাদের হয়ে কাজ করে?”

“হ্যা। আমরা রংলি কনভিক্টেড’দের সহায়তা দেই, এজন্যেই ফার্মের নাম অ্যাসোসিয়েশন ইন ডিফেন্স অব দি রংলি কনভিক্টেড-আমরা সংক্ষেপে বলি এইড-ডব্লিউসি।”

“এটা কিভাবে করো? মানে, কারা ভুল বিচারের শিকার হয়েছে বোঝো কিভাবে?”

“এখন আমরা কিছু কেস পিক-আপ করি, আর কিছু কেস ভিক্টিমের নিকটজনেরাই নিয়ে আসে আমাদের কাছে। মাত্র শুরু করেছি, আশা করি বছরখানেক পর হিউম্যান রিসোর্স বাড়াতে পারলে আমরা নিজেরাই বেশিরভাগ কেস খুঁজে বের করতে পারবো।”

আমি এ বিষয়ে আরো কিছু কথা শোনার জন্য মুখিয়ে থাকলাম। “আমেরিকা-কানাডায় ওদের মেইন অফিস আছে, এশিয়ার কিছু দেশেও আছে। এবার আমরা বাংলাদেশে শুরু করলাম।”

“এরকম একটা প্রতিষ্ঠানের দরকার ছিলো এখানে।”

আমার কথায় আলতো করে হাসলো সে।

“ইন্টারভিউতে তুমি বলেছিলে, তোমাদের এই ‘রংলি কনভিক্টেড’ টার্মটা দিয়ে শুধু ভুল বিচারকেই বোঝানো হয় না…যেসব কেস বিচার না করে ক্লোজ করা হয়েছে…বিশেষ করে হোমিসাইড…সেগুলোকেও রংলি কনভিক্টেড হিসেবে ট্রিট করো?”

“ওয়াও, আমার ইন্টারভিউটা দেখি বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়েছো। দ্যাটস গ্রেট,” প্রশংসার সুরে বললো সে।

নিঃশব্দে হাসি দিলাম কেবল।

“লাস্ট টেন ইয়ার্স আমি এই সংগঠনের সাথেই কাজ করে যাচ্ছি। ডিভোর্সের পর মনে হলো ওখানে আর থাকবো না, বাকি জীবনটা দেশেই কাটাবো। তাই অপারচুনিটা নিলাম বলতে পারো। আমি জানতাম, ওরা অনেকদিন ধরে এখানে ওদের কার্যক্রম শুরু করার চেষ্টা করছিলো কিন্তু রিলায়েল কাউকে পাচ্ছিলো না। তাই যখন বললাম আমি ব্যাক করবো তখন ওরা খুশিমনেই রাজি হয়ে গেলো।”

“তোমার ইন্টারভিউটা পড়ার পর আমার মনে হলো, মিলির কেসটা হয়তো রি-ওপেন করা সম্ভব। তুমি কি বলো?”

একটু ভাবলো রামজিয়া। “স্টেট্সে হলে এটা করা যেত কিন্তু এ দেশে…ইউ নো, এখানে এতদিনের পুরনো কোনো কেস নিয়ে মাথা ঘামাবে না কেউ। লক্ষ-লক্ষ মামলা-মোকদ্দমা জমে আছে, সেগুলোরই সুরাহা করা যাচ্ছে না।”

কথাটা সত্যি। আমার চাওয়াটা হয়তো একটু বাড়াবাড়ি রকমের হয়ে যাচ্ছে। অনেকটা ছেলেমানুষি আব্দারের মতো।

“তারচেয়েও বড় কথা, প্রাইম সাসপেক্টেরই কোনো খবর নেই। মামলার বাদি, মিলির হাজব্যান্ডও ঢাকায় থাকে না। মনে হয় না কেসটা নিয়ে সে আর আগ্রহি। তার অনুমতি ছাড়া কেস রি-ওপেন করার কোন স্টেপও নেয়া যাবে না।”

“মিনহাজ যদি রাজি হয় তাহলে কি রি-ওপেন করা সম্ভব?” উদগ্রিব হয়ে জানতে চাইলাম আমি।

“থিউরিটিক্যালি সম্ভব, কিন্তু প্র্যাকটিক্যালি করা যাবে কি-না বুঝতে পারছি না।”

“কেন?”

“মিনহাজ অনুমতি দিলেও কেসটা কিভাবে এগোবে যদি ইমতিয়াজকে পাওয়া না যায়? তুমি তো বললে, ওর কোন খবর কেউ জানে না। এমন কি ওর পরিবারও কিছু জানে না এ ব্যাপারে।

“হুম…..তা ঠিক। ইমতিয়াজ যদি ঢাকায় থেকে থাকে আমার পক্ষে তাকে খুঁজে বের করাটা সহজ হবে না। শহরটা এখন অনেক বড়। তবে আমার বিশ্বাস, কেসটা রি-ওপেন করা হলে পুলিশের তদন্তকারি কর্মকর্তারা ওকে ঠিকই খুঁজে বের করতে পারবে।”

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বললো সে, “ঠিক যেভাবে তোমরা ওকে খুঁজে পেয়েছিলে?”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *