অধ্যায় ২১
আগেই বলেছি, ইমতিয়াজকে ধরে জেলে ভরার পর বেশ কয়েকটা দিন দারুণ কেটেছে আমার। থানা থেকে রামজিয়া চলে যাবার পর দু-দিনের বেশি অপেক্ষা করতে পারিনি আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ নিয়ে ছুটে গেলাম ধানমণ্ডিতে। আমাকে দেখে বিস্ময়ভরা চোখে চেয়ে রইলো সে। তবে সেটা কয়েক মুহূর্তের জন্য।
“আপনাকে দেখে তো চেনাই যাচ্ছে না,” ড্রইংরুমে ঢুকে আমাকে দেখেই বলে উঠলো।
আমি কেবল মুচকি হাসলাম, কিছু বললাম না। এই প্রথম পুলিশের ইউনিফর্ম ছেড়ে সাধারণ পোশাকে দেখা করলাম। সঙ্গত কারণেই আমাকে দেখে সে অবাক হয়েছে।
“অবশ্য আপনাকে ইউনিফর্ম ছাড়াই বেশি ভালো দেখায়,” আমার বিপরীতে সোফায় বসতে বসতে বললো। “কিছু মনে করবেন না, আপনাদের পুলিশের ইউনিফর্মটা আমার কাছে একদম ভালো লাগে না।”
আমি এ কথায়ও হেসে ফেললাম। তখন পুলিশের ইউনিফর্ম ছিলো পুরোপুরি খাকি রঙের। প্যান্ট-শার্ট দুটোই। “সরকার যে পোশাক দেবে আমাদের সেটাই পরতে হবে…এখানে কোনো চয়েজ নেই।”
“তা তো ঠিকই।” একমত পোষণ করে বললো সে। “মিলির কেসটা…আই মিন, ওটার কি খবর?”
“খবর ভালো। ইমতিয়াজ জেলে আছে, খুব শীঘ্রই বিচার শুরু হয়ে যাবে।”
মাথা নেড়ে সায় দিলো সে, তবে মুখে কিছু বললো না।
আমি আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথ বাড়িয়ে দিলাম তার দিকে।
“থ্যাঙ্কস,” বইটা হাতে নিয়ে মিষ্টি করে হেসে বললো রামজিয়া। “নিরদ সি. চৌধুরির ভাষা খুবই কঠিন। আমার তো মাঝেমধ্যে মাথা ধরে যায়। তবে নো ডাউট, উনি খুব ভালো লেখেন। উনার সাবজেক্টগুলোও দারুণ।”
“উনার ভাষা যে কঠিন সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা যারা বাংলা বই পড়ি তারাও হিমশিম খাই।”
“ওয়ান্স অ্যাগেইন থ্যাঙ্কস,” হেসে বললো সে।
“আবার থ্যাঙ্কস কেন?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“বাংলা বই পড়ার অভ্যেস করানোর জন্য।”
“তাহলে তো আপনাকেও আমার ধন্যবাদ দিতে হয়… ইংরেজি বই ধরিয়ে দেবার জন্য।”
হি-হি-হি করে হেসে উঠলো সে। “আমি ধরিয়ে দিয়েছি?”
“ঐ যে বই ধার দিয়েছেন, ওটার কথাই বলছি আর কি।”
আবারো হেসে ফেললো সে। “গান শুনবেন?” হঠাৎ করে বলে উঠলো। “আমার কাকা লন্ডন থেকে কিছু লং-প্লে নিয়ে এছেন…একদম নতুন।”
“ঠিক আছে,” আমি বললাম। লন্ডনের কথা শুনেই মনে পড়ে গেলো বিলাত ফেরত পাত্রের কথা। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছিলো তার বিয়ের কী খবর সেটা জিজ্ঞেস করি কিন্তু সঙ্কোচের কারণে বলতে পারিনি।
“ক্যাট স্টিভেনেরটা শোনাই…আমার ফেভারিট, “ লং-প্লেতে একটা রেকর্ড চাপাতে চাপাতে বললো সে। “ওর মর্নিং হ্যাজ ব্রোকেন গানটা আমার কী যে ভালো লাগে!”
টার্ন ওভারটা লং-প্লের উপর বসিয়ে দিতেই হালকা মুড়ি ভাঁজার শব্দ ভেসে এলো। যারা লং-প্লে শুনেছে তারা জানে এরকম নয়েজের ব্যাপারটা। রামজিয়াদের ড্রইংরুমটা ভরে উঠলো চমৎকার কণ্ঠ আর সুরে। গায়কের গায়কি খুবই সুন্দর। হালকা তালে বেজে চললো গানটা।
“ওয়েট, আমি একটু আসছি,” বলেই পাশের ঘরের চলে গেলো। দরজার কাছে গিয়ে আবার ঘুরে তাকালো আমার দিকে। “চা, নাকি কফি?”
“চা।”
প্রসন্নভাবে হেসে মাথা নেড়ে চলে গেলো রামজিয়া।
আমি একা একা ড্রইংরুমে বসে মি. স্টিভেনের সুরেলা কণ্ঠের গান শুনে গেলাম। লং-প্লেতে ইংরেজি গান শোনা সেটাই আমার প্রথম অভিজ্ঞতা। বলা বাহুল্য,
আমার কাছে অসম্ভব ভালো লেগেছিলো। গানের কথা পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও সুরটা দারুণ মোহিত করেছিলো আমাকে। পরবর্তি কালে আমি নিজের জন্য লং-প্লে কিনে বাঙলঅ-ইংরেজি গান শোনা শুরু করেছিলাম। এই অভেস্যটা এখনও আমার রয়ে গেছে।
কিছুক্ষণ আবার ড্রইংরুমে ফিরে এলো সে, তারপর পরই কাজের লোক নিয়ে এলো চা-বিস্কিট-চানাচুর।
“ঐদিন যে আপনি এলেন, তখন তো চা খাওয়াতে পারিনি, বাড়িতে একটা প্রোগ্রাম ছিলো।” নিজে থেকেই বললো।
আমার জানতে চাওয়া উচিত ছিলো কিসের অনুষ্ঠান, কিন্তু কিছুই বলতে পারলাম না। সহজ একটা সুযোগ হাতছাড়া হতে যাচ্ছিলো প্রায়।
“আমি সাধারণত এসব লাইক করি না কিন্তু কী করবো বলেন, বাড়ির সব মুরুব্বি একজোট হয়ে গেলো।”
“কি লাইক করেন না,” চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। মুচকি হাসি দেখা গেলো তার ঠোঁটে। সে-ও তার কাপটা তুলে নিলো “মেয়েদেখা-ছেলেদেখা, এইসব।”
“ছেলেপক্ষ এসেছিলো? আপনাকে দেখতে?”
মাথা নেড়ে সায় দিলো। তারপর কথা বলা থেকে বিরত থাকার জন্যই যেন চায়ে চুমুক দিতে শুরু করলো সে।
“আপনার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে?” আমার ভেতর থেকে সমস্ত জড়তা দূর হয়ে গেলো এবার। নিজের কৌতূহল আর দমানোর চেষ্টা করলাম না।
চায়ে চুমুক দিয়ে মাথা দুলিয়ে জবাব দিলো। “না। ছেলে আর তার ফ্যামিলি দেখতে এসেছিলো। এই তো, আর কিছু না।”
“কেন, আপনার ছেলে পছন্দ হয় নি?” আমি একটু হালকাচালেই বলে ফেললাম কথাটা।
মুখ টিপে হেসে ফেললো সে। “না।”
“কেন?”
“এমনি। কী বলবো, জাস্ট পছন্দ হয়নি।”
“বিলাত ফেরত ছেলে পছন্দ না করার তো কারণ দেখছি না।”
আমার কথা শুনে ভুরু কুচকে ফেললো রামজিয়া। আর আমি সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম, একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছি। মনে মনে প্ৰমাদ গুণলাম।
“আপনি কিভাবে জানলেন? স্ট্রেইঞ্জ!”
“আ-আপনিই না বললেন?” একটা চালাকি করার চেষ্টা করলাম। জানি ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
“আমি বলেছি?” কথাটা বলেই স্মরণ করার চেষ্টা করলো, নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরলো সে। আমি নিশ্চিত, আমার মিথ্যেটা ধরতে পেরেছ। তবে মুখে কিছু বললো না।
“ছেলে পছন্দ না হবার কারণ কি?” আমি প্রসঙ্গ পাল্টাতে চাইলাম। “কথা বলে ভালো লাগে নি?”
“আমি আমার বাবা-কাকাকে আগেই বলেছিলাম, কথা বলে ভালো না লাগলে কোনোভাবেই রাজি হবো না।” একটু থেমে আবার বললো, “এটা আমার কাকার আইডিয়া ছিলো, বুঝলেন?”
“কোন্টা?” বুঝতে না পেরে বললাম।
“এই যে…বিয়ের সম্বন্ধটার কথা বলছি।”
“ও।”
“ঐ ছেলে বলে, তার নাকি অনেক টাকা, আমার বাবারও মাশাল্লা কম নয়, চাকরি-বাকরি করার কোনো দরকার সে দেখছে না।” কথাটা শেষ করে হেসে ফেললো। “এডুকেটেড ছেলেরা এসব কথা কিভাবে বলে, বুঝি না।”
আমি অবশ্য কথাটা শুনে খুব একটা অবাক হইনি। ঐ সময়ে মেয়েদের চাকরি করাটাই বরং বিরল ব্যাপার ছিলো। বিয়ের পর কোনো মেয়ে চাকরি করতে চাইলে খুব কম স্বামিই সেটা করতে দিতো।
“বেচারা…..পুরোপুরিই ব্যাডলাক। আপনার মনোভাব বুঝতে পারেনি,” আমি হেসে বললাম।
“সত্যি কথা কি জানেন, ছেলে যদি সবদিক দিয়ে ঠিকও থাকতো আমি এই বিয়েতে রাজি হতাম না।”
এ কথা শুনে তার দিকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলাম আমি। “কেন?”
“আমি আসলে সেটেল্ড ম্যারেজ খুবই ডিস্লাইক করি।”
সত্তুরের দশকে এ কথাটা তার মতো আপ-টু-ডেট মেয়ের পক্ষেই বলা সম্ভব ছিলো। সাধারণ বাঙালি পরিবারের মেয়ের পক্ষে এমন কথা মনে এলেও মুখে আনা সম্ভব ছিলো না। অন্তত আমার চেনাজানা পরিসরে এমনটিই দেখেছি।
তাহলে প্রেম করে বিয়ে করেন—কথাটা কণ্ঠনালিতে এসে আটকে গেলো যেন। এই সামান্য পরিচয় আর সখ্যতার মধ্যে এমন কথা বলা উচিত হবে না ভেবে চুপ থাকলাম। তখনই খেয়াল করলাম লং-প্লেটা আর বাজছে না। সম্ভবত যে গানটা শুনছিলাম সেটা শেষের দিকে কোনো গান ছিলো। লং-প্লে ঘুরছে কিন্তু গান হচ্ছে না, তার বদলে যে হালকা নয়েজ হচ্ছে-অনেকটা মুড়ি ভাঁজার শব্দের মতো—সেটা যেন নীরবতাকে আরো প্রকট করে তুললো।
“আমিও সেটেল্ড ম্যারেজ পছন্দ করি না,” সেই নীরবতা ভাঙার জন্য বোকার মতো বলে ফেললাম কথাটা
রামজিয়া আমার দিকে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। “দ্যাটস গুড,” অবশেষে বললো সে। “প্রেম করেন?”
তার কাছ থেকে আচমকা এমন প্রশ্ন শুনে আমি রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
“ন্-না।” কথাটা বলতে গিয়ে কেমন যেন লজ্জা করলো আমার।
“কেন?”
কী বলবো ভেবে পেলাম না। বিব্রত হয়ে হেসে ফেললাম। “না, মানে…ইয়ে…” কথাটা আর শেষ করতে পারলাম না।
“বলতে না চাইলে থাক।” বললো সে।
খেয়াল করলাম রামজিয়া খুবই স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে। কিন্তু আমি পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে গেছি।
“বলার মতো কিছু নেই…আসলে।” কোনভাবে বলতে পারলাম। “কাউকে ভালোও লাগেনি কখনও?”
এ প্রশ্নে একেবারে ওলট-পালট হয়ে গেলাম আমি। তখনও জানতাম কিভাবে সত্যিকারের অভিব্যক্তি লুকিয়ে রাখতে হয়। সম্ভবত রামজিয়াও বুঝতে পেরেছিলো আমার অবস্থা। খুবই অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করলাম আমি। তার দিকে তাকাতেও হিমশিম খেলাম। এমন সময় একেবারে আনাড়ি আর বোকার মতো একটা কাজ করে বসলাম। হুট করেই উঠে দাঁড়ালাম। “আ-আজ আসি…একটা জরুরি কাজ আছে।”
রামজিয়াও হাসিমুখে উঠে দাঁড়ালো। “ওকে,” আমার দিকে স্থিরচোখে চেয়ে বললো। “বইয়ের জন্য থ্যাঙ্কস।”
