কেউ কেউ কথা রাখে – ৩

অধ্যায় ৩

আমি অনেকক্ষণ ধরে চুপ মেরে আছি কারণ আমার সামনে যে বসে আছে তার দৃষ্টি এখন আমার অপ্রকাশিত বইয়ের পাণ্ডুলিপির উপরে। কোনো কথা না বলে রিডিংগ্লাসের ভেতর দিয়ে কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়ে ফেললো সে। আমি কথা বলে তার মনোযোগে বিঘ্ন ঘটাতে চাইলাম না। আমার মনে হচ্ছে অনেকদিন পর এভাবে দেখা হয়ে যাওয়াটা সহজভাবে গ্রহণ করার জন্য আপাতত পড়ায় ডুবে থাকতে চাইছে। সময় নিচ্ছে হয়তো। তাতে অবশ্য আমার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তার মতো আমিও একটু সময় পেয়ে আড়ষ্টতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছি। তাছাড়া খুব কাছ থেকে অলক্ষ্যে অপলক চোখে তাকে দেখাটাও কম নয়।

তার মনোযোগ পাণ্ডুলিপির দিকে থাকলেও আমি যে তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি এ ব্যাপারে সম্ভবত সে যথেষ্ট সচেতন। মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যে খুবই প্রখর সেটা তো প্রবাদপ্রতীম।

“আমিও অনেক বদলে গেছি, তাই না?” লেখাটার দিকে তাকিয়ে থেকেই বললো সে। তার ঠোঁটে রহস্যময় হাসি।

“খুব কম।” ছোট্ট করে বললাম।

মুচকি হেসে মাথা দোলালো, চোখ তুলে তাকালো না। “লেখালেখি করে অনেক বেশি সেনসিটিভ হয়ে গেছো নাকি বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে শিখেছো, বুঝতে পারছি না।”

“কী জানি,” আস্তে করে বললাম, আমার চোখ তার দিকেই, আর সে এখনও অক্ষরের জঞ্জালে ডুবে আছে। “হয়তো অনেক বেশি নস্টালজিক হয়ে গেছি। কিংবা ছেলেমানুষ।”

এবার রিডিংগ্লাসের উপর দিয়ে তার অন্তর্ভেদি চোখজোড়া সরাসরি আমার দিকে নিবদ্ধ করলো। মনে করলাম কিছু বলবে, কিন্তু আলতো করে মাথা দুলিয়ে দুর্বোধ্য এক হাসি দিয়ে আবারো লেখাটার দিকে মনোনিবেশ করলো সে।

“তোমার চুল খুব একটা পাকেনি,” বললাম তাকে।

“কালার করি রেগুলার।” চোখ না তুলেই বললো।

“ওজনও মনে হয় আগের মতোই আছে।”

“প্রায় কাছাকাছি বলতে পারো।”

“মুখে খুব একটা বলিরেখা পড়েনি।”

এবার মুখ তুলে তাকালো। “তাই?”

“হুম।”

আবার ফিরে গেলো পড়ায়।

“অবশ্য স্টেট্সে ছিলে…প্লাস্টিক সার্জারি করালেও করাতে পারো।” আমার টিটকারিসুলভ কথাটা সহজভাবেই নিলো, মুখ টিপে হেসে মাথা দোলালো সে। “আই হেট সার্জারি…ইউ নো দ্যাট।”

মাথা নেড়ে সায় দিলাম। আমি এটা জানি। অন্তত দুই যুগ আগে তা-ই জানতাম। “আমার মনে হয় এ কথাটা আরো অনেকে বলে তোমাকে।”

“কোন্ কথাটা?” মুখ তুলে তাকালো আবার।

“এই যে, তোমার বয়স থমকে আছে।”

চোখ নামিয়ে বললো, “হুম।”

ভালো করেই বুঝলাম অনেকের কাছ থেকে এটা শুনে শুনে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তার পড়ায় ব্যাঘাত হবে তাই আর কিছু না বলে দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলাম। ঘরের আশেপাশে তাকালাম মনোযোগ দেবার জন্য কিন্তু কিছুই পেলাম না। আসবাবপত্র আর সম্মাননার ব্যাপারে আমার কোনো কালেই আগ্রহ ছিলো না। লেখক হিসেবে আমি সবার আগে পাঠক, তাই দেয়াল জুড়ে অসংখ্য বইয়ে ঠাসা বুকসেল্ফ আমাকে মুগ্ধ করার কথা কিন্তু আইনের মোটা মোটা বইগুলো আমার কাছে বই বলেই মনে হয় না কখনও। এজন্যে কোনো আইনজীবির চেম্বারে আমি আড্ডা দেই না। আইনের বই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি একঘেয়েমির মনে হয়। একগাদা ভীতিকর হুকুম, আদেশ-উপদেশ আর দণ্ডের ফিরিস্তি। আরো আছে প্রতিটি শব্দ আর পদবাচ্যের সংজ্ঞায় ভারাক্রান্ত হাজার-হাজার শব্দ-বাক্য। আমার মনে হয় মানুষের সৃষ্ট সবচাইতে ‘যান্ত্রিক জিনিস যন্ত্রপাতি কিংবা প্রযুক্তি নয়, এটা হলো আইন-কানুনের ভারি ভারি বইগুলো। যন্ত্রের মধ্যেও প্রচুর সৃজনশীলতা থাকে কিন্তু এগুলোতে ছিঁটেফোটাও থাকে কি-না সন্দেহ

“আরেক কাপ চা খাবে?”

আমি একটু চমকে তার দিকে তাকালাম। “চা?”

“হুম!”

মুচকি হাসলাম। “তুমি কি আমাকে বসিয়ে রেখে পুরোটা এখানেই পড়ে শেষ করতে চাচ্ছো?”

যেন নিজের বালখিল্যতা বুঝতে পেরে লজ্জিত হলো সে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, পঞ্চাশেও তার গাল দুটো আরক্তিম হয়ে উঠলো ঠিক ভরা যৌবনের মতো।

“সরি, আমি আসলে খেয়ালই করিনি। মানে–”

“আহ্, সরি বলছো কেন?” আমি তাকে থামিয়ে দিলাম। “আমার তো ভালোই লাগছে। এর আগে এতো মনোযোগ দিয়ে আমার লেখা কেউ পড়েনি, তা-ও আবার আমাকে সামনে বসিয়ে রেখে।”

মাথা দোলালো সে। মুখে এখনও সলজ্জ হাসি। কিছুটা বিব্রতও বটে। “অ্যাগেইন, আ’ম সরি। বুঝতেই পারছো, এটা মিলির খুন নিয়ে। আর তোমার লেখাটাও খুব সুন্দর হয়েছে। ঘটনাগুলো ভেসে উঠছে চোখের সামনে।”

আমি কোন কথা না বলে শুধু আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

“আচ্ছা, তোমার কি তাড়া আছে?” প্রসঙ্গ পাল্টালো এবার।

“না।” সত্যিই বললাম। “লেখালেখির টেবিল ছাড়া লেখকের আবার তাড়া কিসের। আমি এখন একদম ফ্রি।”

মুখ টিপে হেসে বললো, “তাহলে চলো, একসাথে বের হই। আমি একটু পরই বের হবো।”

কাঁধ তুললাম শুধু। আপত্তি জানানোর প্রশ্নই ওঠে না। দুই যুগ আগে আমি তার সঙ্গ ভীষণ কামনা করতাম।

“গুড।” পাণ্ডুলিপিটা ভ্যানিটি ব্যাগে ভরে নিলো। “আচ্ছা, বলো তো, মিলির ঘটনাটা নিয়ে কেন লিখলে?”

একটু ভেবে নিলাম। “যে ঘটনা এতগুলো মানুষের জীবন বদলে দিলো সেটা নিয়ে লিখবো না?”

রামজিয়া কিছু না বলে চেয়ে রইলো আমার দিকে।

“বহু আগেই আমি লিখতে চেয়েছিলাম এটা নিয়ে,” একটু থেমে আবার বললাম, “কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি। ভেবেছিলাম রহস্যের কূলকিনারা করে লিখবো কিন্তু দু-বছর আগে টের পেলাম আমার স্মৃতি মুছে যাচ্ছে। বয়স হচ্ছে, দুই যুগ আগের অনেক ঘটনাই ভুলে যাচ্ছি। ডিটেইলগুলোর কথা বলছি…ভুলে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?”

মাথা নেড়ে সায় দিলো সে।

“তখনই ঠিক করলাম, খুব দ্রুত এটা লিখে ফেলবো।”

“ঘটনাটা শুধু রেকর্ড করে রাখার জন্য? আই মিন, সংরক্ষণ করতে চাইছো?”

মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “হ্যা, সেটা তুমি বলতে পারো। মিলিরা কোনো ঐতিহাসিক চরিত্র নয়। একেবারেই সাধারণ মানুষ। ওদের কথা ইতিহাসে থাকবে না, কেউ লিখবেও না। এরইমধ্যে বিস্মৃত হয়ে গেছে সে। কিন্তু আমি এখনও বেঁচে আছি। আমি মরে গেলে আর কে লিখবে?” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, “তাই ঠিক করলাম এটা লেখার এখনই সময়।”

“হুম,” সায় দিয়ে বললো রামজিয়া।

“তাছাড়া, আমি নিজেও এই ঘটনার অংশ, আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে না?”

আবারো সায় দিলো সে।

“আমি চাই মিলির গল্পটা বেঁচে থাকুক। মানুষ জানুক। বিস্মৃতির অতলে সে হারিয়ে যাক সেটা আমি চাই না।”

“ইফ অ্যা রাইটার ফলস ইন লাভ উইথ ইউ, ইউ ক্যান নেভার ডাই,” আস্তে করে বললো সে। “প্রেম বলতে অনুরাগ, অ্যাফেকশন। সাম কাইন্ড অফ ফিলিংস…যেটা তুমি ফিল করছো মিলির জন্য।”

আমি চুপ মেরে রইলাম।

“আচ্ছা, সত্যি করে একটা কথা বলবে?” তারপর আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই বললো সে, “এই বইটা পাবলিশ হবার আগে আমাকে পড়াতে চাইছো কেন?”

কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিলাম। এর জবাব আমি আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছি, তারপরও গুছিয়ে নিতে হলো কথাগুলো। “প্রথমত এই বইয়ের একটা চরিত্র তুমি। তোমার কোনো বিষয়ে আপত্তি আছে কি-না সেটা আগেভাগে জেনে নেয়া দরকার।”

“আর?” স্থিরচোখে চেয়ে বললো সে।

কপালের বামপাশটা চুলকে নিলাম। “সম্ভব হলে মিলির হাজব্যান্ডের সাথে দেখা করতে চাই। তার অদ্ভুত আচরণের কারণটা আমি জানতে চাই।” একটু থেমে আবার বললাম, “শুধু বইয়ের জন্যই নয়, এটা আমার নিজেরও কৌতুহল।

আমার দিকে চেয়ে রইলো রামজিয়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *