অধ্যায় ৬
আমি জানি সময় কখনও এক মুহূর্তের জন্যেও থেমে থাকে না কিন্তু কখনও কখনও কিছু কিছু দৃশ্য দেখলে মনে হয়, সময় বুঝি থমকে আছে। রামজিয়াদের বাড়িতে ঢুকেই আমি এটা বুঝতে পারলাম। দুই যুগ আগে বাড়িটা যেমন ছিলো তেমনি আছে, খুব একটা বদলায়নি। বদলে গেছে কেবল আশেপাশের পরিবেশ। ধানমণ্ডিতে আর একতলা-দোতলা বাড়ি বলে কিছু চোখে পড়ে না। তবে অল্পকিছু বাড়ির মতো এই বাড়িটা এখনও আগের আভিজাত্য নিয়ে টিকে আছে। সত্যি কথা হলো, আমি এ শহরে থাকলেও ঠিক দুই যুগ পরে এখানে এলাম। আশ্চর্য হলেও সত্যি, এই দীর্ঘ সময়ে কোনো দরকারে-অদরকারেও এই বাড়ির সামনে দিয়েও যাতায়াত করা হয়নি
প্রথমবার এই বাড়িতে ঢুকে যে ড্রইংরুমে বসেছিলাম সেটা যেন ফ্রেমে বাধাই করা ছবির মতোই থমকে আছে। আমি অনেক কষ্টেও মনে করতে পারলাম না চব্বিশ বছর আগে যা দেখেছিলাম তার সাথে বর্তমান সময়ে কি কি পার্থক্য তৈরি হয়েছে। সেই পুরনো বুকসেলফ, পেইন্টিং, সোফা, এমনকি লং-প্লেয়ারটা পর্যন্ত ঠিক যে-জায়গায় ছিলো সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে এখনও। সম্ভবত বুকসেলফে নতুন কিছু বই ঠাঁই করে নিয়েছে। তবে লং- প্লেয়ারটা নিশ্চয় অ্যান্টিক হিসেবে বেঁচে-বর্তে আছে, মনে হয় না ওটা আর কাজ করে।
“তুমি একটু বসো, আমি বুয়াকে বলি চা দিতে,” হেসে বললো সে। “এইফাঁকে একটু ফ্রেশ হয়ে আসি।”
আমি কেবল আশ্বস্ত করার হাসি দিতে পারলাম। সোফায় বসেই বুঝতে পারলাম একটা জিনিস নেই। টিভি! হ্যা, আগে যেখানে টিভিটা ছিলো সেখানে এখন তিনফুট উঁচু পোড়ামাটির একটি ফুলদানি রাখা। ফুলদানি থেকে একটু উপরে চোখ যেতেই থমকে গেলাম আমি।
দেয়ালে একটি সাদা-কালো ছবির ফ্রেম। দু-জন প্রাণের সখি। একজন বহুকাল আগেই পাশবিকতার শিকার হয়ে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। আমার মনে পড়ে গেলো, এটাই মিলির তোলা শেষ ছবিগুলোর একটি।
মিলির কাজলমাখা চোখ আমার স্মৃতিতে ফিরিয়ে আনলো ভয়ঙ্কর ঐ দৃশ্যটি : এক তরুণী উদাস হয়ে তাকিয়ে আছে শূন্যে। নিজের নগ্ন শরীরকে অবজ্ঞা করে। সেই চোখে তখনও অশ্রু থমকে ছিলো।
চট করে ছবি থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম আমি। বড় জানালার পাশে রকিং-চেয়ারটা খুঁজে বেড়ালাম। ওটাও নেই।”
আসলে সময় সব কিছু বদলে দেয়, কোনো কিছুই আগের মতো থাকে না। যতো সযত্নেই পুরনো জিনিসগুলো আগলে রাখা হোক না কেন, সময়ের আঘাত ঠিকই চোখে পড়বে।
আস্তে আস্তে পরিবর্তনগুলো ধরা পড়তে শুরু করলো আমার চোখে। বামদিকের বড় বড় জানালাগুলোর রঙ আগের মতো থাকলেও বাইরের বাগান বলতে এখন আর কিছু নেই। সেখানে দেখতে পেলাম নগ্ন মাটি। যেন ক্ষেতের জমি লাঙ্গল দিয়ে চষে ফেলা হয়েছে। ওখানে কি আবারো বাগান করা হবে?
“দেশে ফিরে এসে দেখি বাগানটা নেই,” ঘরে ঢুকে বললো রামজিয়া। এখন তার পরনে ঢিলেঢালা লং-গাউন। “ঝোঁপ-ঝাঁড়ে ভরে গেছে। আমি ওগুলো সাফ করিয়েছি, আবার বাগান করবো।”
“তুমি যখন দেশে ছিলে না তখন কি তোমাদের বাসায় কেউ থাকতো না?” জিজ্ঞেস করলাম।
“আমি চলে যাবার পাঁচ বছর পর আম্মুও চলে এলো। ক্যান্সার ধরা পড়েছিলো…আমেরিকায় রেখে ট্রিটমেন্ট করিয়েছিলাম কিন্তু সারভাইভ করতে পারেনি। এরপর আব্বু আর ছোটোভাই আশফাক এখানে থেকেছে কয়েক বছর। কয়েক বছর পর ও কানাডায় চলে গেলে আব্বুও চলে গেলো ওর ওখানে। বাড়িটা খালিই পড়েছিলো। একজন কেয়ারটেকার রেখেছিলাম। পরে আব্বু চলে এলো আবার। মারা যাবার আগপর্যন্ত একাই থাকতো এই বাড়িতে।”
“উনি কবে মারা গেছেন?”
“তিন বছর আগে।” মাথার চুলগুলো রিবন দিয়ে পেঁচিয়ে নিলো সে। আগের মতো আর লম্বা চুল রাখে না, বড়জোর কাঁধ অবধি হবে। “আব্বুর কারণেই বাড়িটা আগের মতো আছে। আব্বু কোনো কিছু সহজে বদলাতে চাইতো না। ডেভেলপারদের অফার ফিরিয়ে দিতেন সব সময়। খুবই ট্র্যাডিশনালিস্ট ছিলো।”
“তোমার ভাই দেশে আসে না?”
“না,” ছোট্ট করে বললো। “তুমি চা খাওনি এখনও? ঠাণ্ডা হয়ে গেছে তো।”
আমি চেয়ে দেখলাম সোফার টেবিলে এককাপ চা রাখা। এটা আবার কখন দিয়ে গেলো? “ইয়ে মানে…খেয়াল করিনি।”
“চা-টা বোধহয় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, আরেক কাপ দিতে বলি?”
“আরে না, লাগবে না,” বলেই আমি কাপটা তুলে নিলাম হাতে। “এই এলাকায় মনে হয় তোমাদের বাড়িটাই আগের মতো আছে।”
“হুম। তবে ডেভেলপাররা খুব জ্বালাচ্ছে। ওরা এমনকি কানাডায় আশফাকের সাথেও কন্ট্যাক্ট করছে। এ নিয়ে আমার সাথে ওর মনোমালিন্য হচ্ছে। আমি চাই বাড়িটা যেমন আছে তেমনি থাকুক, অন্তত যতোদিন বেঁচে আছি।”
তার শেষ কথাটা দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনালো।
ধানমণ্ডির মতো জায়গায় এরকম একটি বাড়ির দিকে ডেভেলপারদের শ্যেনদৃষ্টি পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। এদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমিও বেশ ওয়াকিবহাল। দু-বছর আগে এদের জমি দখলের ঘৃণ্য কাজকারবার নিয়ে একটি ক্রাইম-ফিকশন লিখেছিলাম। তখন গ্রাউন্ড-ওয়ার্ক করতে গিয়ে অনেক সত্যি আবিষ্কার করেছি।
অবশেষে ঠাণ্ডা চায়ে চুমুক দিয়ে বললাম, “তুমি তাহলে দেশেই থেকে যাচ্ছো?”
“হুম।”
“এখানেই…মানে, এই বাড়িতে?”
“আশ্চর্য, এই বাড়ি ছাড়া আর কোথায় থাকবো?”
“কেন, তোমার হাজব্যান্ডের বাড়ি নেই ঢাকায়? শ্বশুড়বাড়ি?”
“তা আছে কিন্তু ওখানে তো আমার পক্ষে ওঠা সম্ভব নয়।” হাসিটা আস্তে করে মিইয়ে গেলো যেন।
আমি কিছু বললাম না। দুই যুগ পর দেখা হতেই অনেক বেশি ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ফেলছি। অযাচিতভাবে নাক গলিয়ে ফেলছি তার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপারগুলোতে।
“অনেক আগেই ওর সাথে আমার ডিভোর্স হয়ে গেছে,” খুব স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললো রামজিয়া। কপালের সামনে চলে আসা এক গোছা চুল সরিয়ে দিলো। “ইট ডিডেন্ট ওয়ার্ক…অ্যাকচুয়ালি।”
“তোমার ছেলেমেয়ে?” প্রশ্নটা না করে পারলাম না।
“একটাই মেয়ে, লাস্ট ইয়ার কানাডার এক ছেলেকে বিয়ে করেছে। ওরা দু-জন ওখানেই সেটেল্ড। তো, আমি আর ওখানে কী করবো? আই হেট লোনলিনেস।”
“কিন্তু এখানেও তো তুমি একা… ফ্যামিলির কেউ নেই।”
“এখানে আমি যতোটা লোনলি ফিল করবো ওখানে তারচেয়ে অনেক বেশি ফিল করতাম। তাছাড়া বিদেশে সেটেল্ড করার কোন ইচ্ছে আমার ছিলো না, ওটা ঘটনাচক্রে হয়ে গেছে।”
ঘটনাচক্রে? খুব জানতে ইচ্ছে করলো, সেটা কি-কিন্তু বলতে পারলাম না।
“আচ্ছা, ইমতিয়াজের কোনো খবর কি জানো? সে এখন কোথায়? কি করে?”
আমি কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইলাম তার দিকে।
