অধ্যায় ২
একটি খুন
এরকম একজোড়া চোখ যেকোনো যুবকের হৃদয়ে ঝড় তোলার ক্ষমতা রাখে। সেই চোখে তাকিয়ে সাধারণ কোনো যুবকও লিখে ফেলতে পারে কবিতা। সম্ভবত এই চোখের করুণ আর্তি দেখে ক্ষণিকের জন্যে থমকে গেছিলো খুনি; কেঁপে উঠেছিলো তার উদ্যত হাত। তারপরও খুনটা হয়েছে। খুনির ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা পশু লাগাম খুলে বেরিয়ে এসেছিলো। পাশবিক উন্মাদনায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো মেয়েটির উপরে।
আমি যখন বিকেলের দিকে ক্রাইমসিনে আসি তখনও পথঘাট ভেজা। ঘণ্টা দুয়েকের বৃষ্টিতে পুরো শহর কেমন পরিস্কার হয়ে গেছে। ঢাকায় তখন বৃষ্টি হলে একদমই জলাবদ্ধতা হতো না।
ঘরে ঢোকামাত্রই দেখি মেয়েটির মৃতদেহ একটি চাদর দিয়ে ঢাকা, তবে মুখটা উন্মুক্ত। প্রথমেই আমার নজরে পড়লো তার মায়াভরা চোখদুটো ঐদিনের পর থেকে এই চোখদুটো আমি কোনোদিনই ভুলতে পারিনি। অবশ্য সেই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা সম্ভব হলো না আমার পক্ষে। কয়েক মুহূর্ত পরই দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম অন্যদিকে। মাত্র দু-বছর ধরে পুলিশের চাকরি করছি, খুন-খারাবি দেখতে অভ্যস্ত হইনি তখনও। সিনিয়র কলিগেরা বলতো, পুরোপুরি পুলিশ হতে গেলে নাকি কমপক্ষে পাঁচ বছর লাগে। আমি তিন বছরের ঘাটতি নিয়ে যারপরনাই অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেলাম!
চাদরে ঢাকা লাশের সামনে দাঁড়িয়ে আছি দ্বিধা নিয়ে। হাত দিয়ে চাদরটা সরানোর সাহস হচ্ছে না। তিনজন কনস্টেবল আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও তাদেরকে বলতে সংকোচ হচ্ছে। হাজার হলেও আমি একজন অ্যাসিসটেন্ট সাব-ইন্সপেক্টর, এই খুনের তদন্তে সহযোগী ভূমিকা আমার। দ্বিধা ঝেড়ে যে-ই না একটু এগিয়ে যাবো লাশের দিকে অমনি একজন ত্রাণকর্তা এসে আমার জন্যে কাজটা সহজ করে দিলেন। আমার যাবতীয় কঠিন কাজগুলোর সময় তিনি যেন ঈশ্বরের ইঙ্গিতে চলে আসেন ঠিক সময়ে। বিগত দু-বছর ধরে এমনটিই হয়ে আসছে।
সিনিয়র সাব-ইন্সপেক্টর এসএম হায়দার ঘরে ঢুকে এক ঝটকায় চাদরটা সরিয়ে দিয়ে আমার দিকে ক্ষিপ্ত চোখে চেয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্ত। আমি তার ক্রোধ টের পাচ্ছিলাম।
“দেখো, শূয়োরেরবাচ্চাটা কি করছে!” অজ্ঞাত খুনিকে গালি দিয়ে বললেন তিনি।
আমার সামনে দৃষ্টি মেলে চেয়ে আছে মৃত এক তরুণী। মেয়েটির গায়ে বলতে গেলে কোনো পোশাকই নেই। এই প্রথম আমি কোনো নগ্ন লাশ দেখলাম, তা-ও আবার কোনো তরুণীর। চোখ সরিয়ে ফেললাম। বয়সের কারণে হোক কিংবা আমার কোমল হৃদয়ের জন্য, এরকম মৃতদেহ দেখলেই কেমনজানি লাগে।
“আপনি এতোক্ষণ কোথায় ছিলেন?”
“উপরে,” ছোট্ট করে জবাব দিলেন। “দোতলার ভাড়াটিয়াদের সাথে কথা বলছিলাম।”
“ঘটনাটা কখন ঘটেছে?” কাজের প্রসঙ্গে চলে আসার চেষ্টা করলাম আমি।
থুতনির নীচে একটু চুলকে নিলেন এসএম হায়দার। এটা তার মুদ্রাদোষ। কোনো বিষয়ে খুব নিশ্চিত হলেই তিনি এটা করেন। নতুন কারোর কাছে মনে হতে পারে তিনি অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
“সাড়ে তিনটা থেকে পৌণে চারটার মধ্যে খুনটা করা হয়েছে। খুনি হয়তো এখানে এসেছে তারও কিছুক্ষণ আগে। উমমম…ধরো, দশ-পনেরো মিনিট?”
আমি বিস্মিত। স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের বিখ্যাত চরিত্রটিও এতো কম সময়ের মধ্যে খুনের সঠিক সময় বলতে পারতো কি-না সন্দেহ। হায়দারভাই বড়জোর বিশ মিনিট আগে এখানে এসেছেন। আমি একটা কাজে বাইরে গেছিলাম, থানায় ফিরে এসে শুনি হায়দারভাই আমাকে এখানে চলে আসতে বলেছেন। এই অল্প সময়ের মধ্যে মিনিটের হিসেবও বের করে ফেলেছেন তিনি!
এসএম হায়দার আমার চোখেমুখে অবিশ্বাস আর বিস্ময় দেখে মুচকি হাসলেন। ভাবখানা এমন, এতে অবাক হবার কী আছে!
সত্যি বলতে আমি খুবই অবাক হয়েছিলাম। “একেবারে মিনিটের হিসেবও বলে দিলেন?!”
এসএম হায়দার বিছানার বামদিকের বেডসাইড টেবিলের নীচে আঙুল তুলে দেখালেন। “ঘড়িটা দেখেছো?”
একটা গোলাকার বেডসাইড ঘড়ি চিৎ হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। কাঁচটা ভেঙে গেছে, ডায়ালটাও ফেঁটে গেছে পড়ে যাওয়ার সময়। ওটার কাঁটা স্থির হয়ে আছে তিনটা বাহান্নতে।
“ধস্তাধস্তির সময় ঘড়িটা পড়ে গেছে,” বললেন তিনি, “এরপর বড়জোর তিন-চার মিনিট বেঁচে ছিলো মেয়েটি, এর বেশি হবে না।”
শার্লক হোমস যেমন তার দুর্দান্ত অনুমাণের ব্যাখ্যা দেবার পর ডাক্তার ওয়াটসন কিংবা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ইন্সপেক্টরদের কাছে সেটা মামুলি বলে মনে হয়, হায়দারভাই ঘড়িটা দেখিয়ে দেবার পর আমারও তাই মনে হলো।
এ আর এমন কি ঘড়িটা আমার চোখে পড়লে আমিও একইভাবে অনুমান করে এটা বলে দিতে পারতাম!
কিন্তু সত্যি হলো, এরকম সব বিষয় বাকিদের চোখে ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে হায়দারভায়ের চোখে। তার ক্ষুরধার মস্তিষ্কটি যে আমাদের সবার চেয়ে সেরা, সে-কথা তার কড়া মেজাজ আর বদরাগি চরিত্রের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে সব সময়। ঘনিষ্ঠভাবে না মিশলে কেউ বুঝতেই পারে না এসএম হায়দার কতোটা মেধাবি।
“ঘটনার শুরু ড্রইংরুমে, সেখান থেকে মেয়েটা হয় বাঁচার জন্য বেডরুমে এসেছিলো, নয়তো ধর্ষকই তাকে টেনে হিচরে এখানে নিয়ে এসেছে।”
“ডাকাতির ঘটনা?”
আমার কথা দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দিলেন তিনি। “রেপিস্ট মেয়েটার পরিচিত, তবে মেয়েটার সাথে খুব একটা ভালো সম্পর্ক ছিলো না। স্বল্প- পরিচিত কেউ।”
আমি ঘাড় ঘুরিয়ে হায়দারভায়ের দিকে তাকালাম। এটাও কি মামুলি কোনো জিনিস দেখে আন্দাজ করেছেন তিনি? আমার মনের ভেতরে যে প্রশ্নের উদয় হয়েছে সেটা আমার অভিব্যক্তি দেখে আবারো ধরতে পারলেন। মাথার পেছনটা চুলকে আমাকে ড্রইংরুমে আসার জন্য ইশারা করলেন তিনি। আমি তার পেছন পেছন সেখানে চলে গেলাম।
“দেখো।” ড্রইংরুমের সোফার সামনে টেবিলটার দিকে ইশারা করলেন। একটা চায়ের কাপ আর পিরিচ, কিছু টোস্ট বিস্কিট টেবিলের ঠিক কাছেই, মেঝেতে পড়ে আছে। “মেহমান…বুঝলে? কিন্তু উটকো মেহমান।”
মেঝেতে পড়ে থাকা কাপ-পিরিচ দেখতে লাগলাম আমি। মেহমান ঠিক আছে কিন্তু উটকো মেহমানের ব্যাপারটা মাথায় ঢুকলো না।
“আর মেহমান কখনও একদম অপরিচিত হয় না। তার মানেটা দাঁড়াচ্ছে, খুনি ভিক্টিমের পরিচিত।”
হায়দারভায়ের দিকে তাকালাম। “এটা কিভাবে বুঝলেন? মানে, উটকো মেহমানের কথা বলছি।”
মাথা দোলালেন তিনি। তার মধ্যে অধৈর্যভাব ফুটে উঠলো। “চায়ের কাপ একটা…বুঝলে না?”
বুঝতে পারলাম না আমি। চায়ের কাপ একটা তো কি হয়েছে? কাপ গুণে মেহমানের সংখ্যা বের করা যায় কিন্তু পরিচয়ের ঘনিষ্ঠতা কিংবা অযাচিত-কাঙ্খিত এসব বের করা যায় জানা ছিলো না।
“তোমার বাড়িতে যদি ঘনিষ্ঠ কেউ বেড়াতে আসে তাহলে তুমিও তার সাথে চা খাবে,” ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন তিনি। “কিন্তু এমন কেউ যদি আসে যার সাথে তোমার ঘনিষ্ঠতা কম, কিংবা যাকে তুমি ঠিক মেহমান হিসেবে পছন্দ করছো না, তাহলে?”
বুঝতে পারলাম, আবারো এসএম হায়দার ঠিক ঠিক অনুমাণ করতে পেরেছেন সম্ভবত।
“মেহমানের জন্য এক কাপ চা বানিয়ে দেবে…তার সাথে বসে এক কাপ চা খেতে চাইবে না, ঠিক?”
আমি মাথার পেছনটা একটু চুলকে বোকার মতো হাসলাম, সেই সাথে মাথা নেড়ে সায় দিতেও ভুললাম না। যেন পড়া না-পারা কোন ছাত্র শিক্ষকের কাছে ধরা খেয়েছে। সত্যি বলতে, তিনি আমার শিক্ষকই। তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে আমার যতোটুকু জ্ঞান অর্জিত হয়েছে তার বেশিরভাগই এসএম হায়দারের কাছ থেকে পাওয়া।
“আমরা ভিক্টিমের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব আর পরিচিতজনদের সাথে কথা বলবো। এই বাড়ির বাইরে ছোট্ট একটা মুদির দোকান আছে,
ওটা বন্ধ দেখলাম। মুদির সাথে কথা বলা দরকার।”
“মুদির সাথে কেন?”
“আমার ধারণা খুনি বেশ কয়েকদিন ধরে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব কিছু লক্ষ্য করেছে। মেয়েটার স্বামি কখন বাসায় ফেরে, মেয়েটা কি করে এসব অবজার্ভ করেছে। মনে হয়, এই কাজটা সে মুদি দোকানের আশেপাশেই করেছে।”
বুঝতে পেরে মাথা দোলালাম আমি। “তাহলে এটা প্রি-প্ল্যান ছিলো?”
“অবশ্যই। এখন সেই মেহমানকে খুঁজে বের করতে হবে।”
শেষ কথাটা হায়দারভাই অনেকটা আপনমনে বললেন।
“আচ্ছা, খুনের সময় মেয়েটির স্বামি কোথায় ছিলো?” আমি চেষ্টা করলাম গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রশ্ন করে অবদান রাখতে।
“হাজব্যান্ড বলছে, সে অফিস থেকে বাসায় এসে দেখে ওয়াইফ খুন হয়ে পড়ে আছে।” কোমরে দু-হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আবার বললেন, “এটা আমরা চেক করে দেখবো।”
“কেন?” কথাটা আমার মুখ ফসকে বের হয়ে গেলো।
শিক্ষক যেমন বোকা ছাত্রের দিকে তাকায় হায়দারভাই ঠিক সেভাবে আমার দিকে তাকালেন। “স্ত্রি যখন খুন হয় তখন বেশরিভাগ ক্ষেত্রে প্রাইম সাসপেক্ট কে হয়, জানো?” আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই তিনি জোর দিয়ে বললেন, “হাজব্যান্ড।”
আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম।
“সুতরাং হাজব্যান্ডের এই স্টেটমেন্টটা আমাদেরকে চেক করে দেখতে হবে। তদন্ত কাজে সব কিছু শুধু চেক করে দেখলেই হয় না, ডাবল চেক করতে হয়।”
আমি এবার বেশ জোরেই মাথা নেড়ে সায় দিলাম। আলবৎ!
“তাছাড়া কেউই সন্দেহের বাইরে নয়। কেউ না।”
এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করার কোন কারণ নেই। “মেয়েটার স্বামি এখন কোথায়?” জানতে চাইলাম আমি।
আলতো করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। “ঘুমাচ্ছে।”
“ঘুমাচ্ছে?” অবাকই হলাম।
“পাগলের মতো আচরণ করছিলো, ডাক্তার সিডেটিভ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে।”
একটু চুপ থেকে আবার বললাম, “আশেপাশের বাড়ি থেকে কেউ কিছু দেখে নি?”
“আই উইটনেসের কথা বলছো?”
“হুম।”
“আপাতত সে-রকম কাউকে পাওয়া যায়নি। এই গলিটা খুবই নিরিবিলি, মানুষজন খুব একটা আসে না। ঘটনা যখন ঘটেছে তখন আবার খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো। সে-কারণে কেনো রকম চিৎকার কিংবা ধস্তাধস্তির শব্দ কেউ শুনতে পায়নি। তবে আমার মনে হচ্ছে দোতলায় যারা আছে তাদের কেউ কিছু একটা দেখেছে। অবশ্য সেটা তারা স্বীকার করছে না।”
হাটতে হাটতে আমরা আবারো চলে এলাম শোবার ঘরে, মেয়েটার লাশের কাছে।
“অনেকের সাথে কথা বলতে হবে আমাদের, বুঝলে?”
মাথা নেড়ে সায় দিলাম। খুনের তদন্তে প্রচুর লোকজনকে জেরা করতে হয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ শুনে ফিরে তাকালাম হায়দারভায়ের দিকে।
“মাত্র তিনমাস আগে বিয়ে হয়েছে ওদের,” গম্ভীর মুখে বললেন তিনি।
ওহ্! কথাটা শুনে আমার খুব খারাপ লাগলো। নিহত মেয়েটির দিকে আবার তাকালাম, মনে হলো মেয়েটির ফাঁকা দৃষ্টি আমার দিকেই নিবদ্ধ। চোখ সরিয়ে ফেললাম সঙ্গে সঙ্গে। কী করুণ আর মায়াভরা চোখ। এখনও দু-চোখে অশ্রু টলটল করছে যেন!
“ওদের কোনো কাজের লোক নেই?” আমি তদন্ত প্রক্রিয়ার মধ্যে থাকতে চাইলাম। এটা হয়তো এক ধরণের পলায়ন। অন্তত মেয়েটির দৃষ্টি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইছিলাম।
“আছে, কিন্তু সে এখানে থাকে না। ছুটা বুয়া।” হায়দারভাই লাশের দিকে চেয়েই বললেন। কী যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন।
“মেয়েটি তাহলে সারাদিন একাই থাকতো?”
এবার আমার দিকে তাকালেন তিনি। “ছেলেটা ব্যাঙ্কে চাকরি করে, বিয়ের ঠিক আগে দিয়ে ঢাকায় পোস্টিং পেয়েছে। আর বিয়ের এক মাস পরই এই বাড়িতে উঠেছে মেয়েটাকে নিয়ে।”
“মেয়েটা এখানে সারাদিন একাই থাকতো?”
“এটা খতিয়ে দেখতে হবে। দোতলার ভাড়াটিয়াদের সাথে কথা বলে মনে হলো ওরা কিছু লুকাচ্ছে। আবারো ওদের সাথে কথা বলতে হবে। ভিক্টিমের হাজব্যান্ডের সাথে তো এখন কথা বলা যাবে না। ওর সাথে কথা বলাটা খুব জরুরি।”
আমি আর কিছু বললাম না। হায়দারভাই এই তদন্তের প্রায় সবগুলো দিকেই নজর রাখছেন। উনি থাকতে আমার কোনো চিন্তা নেই। আমি আস্তে করে দরজার দিকে পা বাড়ালাম।
“কই যাও?” পেছন থেকে এসএম হায়দার বললেন।
“বাইরে। আপনি কাজ সেরে আসেন।”
“লাশের সুরতহাল করবে না?”
“আপনি তো করেছেনই।” আমি আর কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম।
বাড়ির বাইরে প্রচুর লোকজন উঁকিঝুঁকি মারছে। চাপাকণ্ঠে একে অন্যের সাথে কথা বলছে প্রতিবেশীরা। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক। বিশেষ করে বয়স্ক লোকজনের কপালে চিন্তার ভাঁজ একটু বেশি। সম্ভবত তাদের ঘরে এরকম তরুণী মেয়ে আছে। একই রকম ঘটনা তাদের পরিবারেও ঘটতে পারে। দেশের অবস্থা ভালো নয়। দুর্ভিক্ষের কালো ছায়া এখনও তিরোহিত হয়নি। এটা নেই ওটা নেই। চারদিকে শুধু হাহাকার আর স্বপ্ন ভঙ্গের বেদনা। সেই বেদনা আবার ক্ষোভ হয়ে ছাইচাপা আগুনের মতো ফুঁসছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুবই খারাপ। যতো অপরাধ সংঘটিত হয় তার সিকিভাগের আসামিও ধরা পড়ে না। আবার যাদের ধরা হয় তাদের বিরাট একটি অংশ ক্ষমতাসীন দলের সাথে সংশ্লিষ্ট, সুতরাং উপর থেকে ফোন পেয়ে মাথা নীচু করে তাদেরকে ছেড়ে দিতে হয়। প্রতিদিনই ঘটছে এরকম ঘটনা। জনগণ অতীষ্ঠ হয়ে উঠছে কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না। আশেপাশে জটলা পাকানো লোকজনের চোখেমুখে এক ধরণের চাপাঘৃণা দেখতে পেলাম আমি।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেট থেকে ক্যাপস্টেন সিগারেট বের করে ধরালাম। এসব জানলে পুলিশের চাকরিতে ঢুকতাম না। অনেক স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম, ইচ্ছে ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার, কিন্তু ইন্টারমিডিয়েট পাস করতে না করতেই বাবা মারা গেলো, মা- তো মারা গিয়েছিলেন আমার জন্মের সময়েই। একেবারে অথৈজলে পড়ে যাওয়া যাকে বলে আমার বেলায় তাই হয়েছিলো। উচ্চাশিক্ষার স্বপ্ন বাদ দিয়ে প্রাইভেট টিউশনির টাকায় কোনো রকমে ডিগ্রি পাস করেই ঢুকে পড়ি পুলিশবাহিনীতে। সেটাও হয়েছে বাপের এক বাল্যবন্ধুর বদান্যতায়। ভদ্রলোক আমাদের এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা। বাল্যবন্ধুর প্রতি করুণা দেখানোর মতো একটি সহৃদয় তখনও তার ছিলো, তাই আমার এই চাকরি; আর ঢাকার মতো জায়গায় পোস্টিং।
“এখনও তুমি অভ্যস্ত হতে পারলে না,” পেছন থেকে আমার পিঠে চাপড় মেরে বললেন হায়দারভাই।
আমি কোনো জবাব দিলাম না। পকেট থেকে তার জন্যে একটা সিগারেট বের করে বাড়িয়ে দিলাম।
সিগারেটটা হাতে নিয়ে বললেন, “আজ আর ধোঁয়ায় কাজ হবে না, গলা ভেজাতে হবে।”
“আপনি তো চান্স পেলেই খান, উসিলা খুঁজছেন কেন?” সিগারেটে টান দিয়ে বললাম।
হায়দারভায়ের একটাই দোষ-মদ্যপান। খুব সম্ভব প্রতিদিনই খান কিন্তু তার দাবি সপ্তাহে দু-তিনবারের বেশি বোতলের ছিপি খোলেন না।
“না, বউয়ের প্যানপ্যানানিতে স্টপ রেখেছিলাম কয়টা দিন, আজ মনে হচ্ছে খেতেই হবে।”
আমি চুপ মেরে রইলাম।
“মেয়েটার চোখদুটো দেখে কেমনজানি অস্থির অস্থির লাগছে।”
অবাক হলাম খুব। তাহলে জাঁদরেল হায়দারভায়েরও আমার মতো অবস্থা হয়!
“চিন্তা করো, মাত্র তিন মাস আগে বিয়ে হয়েছে,” বলেই সিগারেটে এমন একটা টান দিলেন যেন এক টানেই পুরো সিগারেটটা শেষ করে দেবেন। একগাল ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, “খুনির কাছে পিস্তল ছিলো, বুঝলে?” অবাক হয়ে তাকালাম তার দিকে। “কিভাবে বুঝলেন? খুনি তো মেয়েটাকে গুলি করেনি?”
“দেখো, খুনটা করা হয়েছে শ্বাসরোধ করে। নাকে-মুখে অনেক ঘুষিও মারা হয়েছে।” একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বললেন, “আমার ধারণা মেয়েটাকে পিস্তল দেখিয়ে চুপ থাকতে বাধ্য করেছিলো খুনি, নইলে এত সহজে কাজটা সে করতে পারতো না।”
মাথা নেড়ে সায় দিলাম আমি। হায়দারভায়ের এমন লজিকে আস্থা রাখতেই হলো।
“এজন্যেই ভিক্টিম কোনরকম চিল্লাফাল্লা করেনি। যেটুকু করেছিলো সেটাও বৃষ্টি আর বজ্রপাতের আওয়াজে ঢাকা পড়ে গেছে।”
দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। অসহায়, ভীত এক তরুণিকে তারই স্বল্পপরিচিত কেউ পিস্তল দেখিয়ে চুপ থাকতে বাধ্য করছে। কিন্তু ধর্ষণের সময় মেয়েটা চিৎকার না করেও পারেনি। খুনি হয়তো মুখ চেপে ধরেছিলো। তাতেও সুবিধা করতে না পেরে গলা টিপে ধরে।
কয়েক মুহূর্তের নীরবতার পর আমি মুখ খুললাম। “এখন আমাদের কাজ কি?”
“এখানে আর কাজ নাই…লাশটা মর্গে নিয়া যাবে এখন। আজকে আর কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই, কাল আসতে হবে আবার।”
“তাহলে থানায় যাই, চলেন।”
“তুমি যাও, আমাকে একটু খেতে হবে, তারপর বাড়ি যাবো।”
“ভাবি না নিষেধ করেছে? এসব খেয়ে বাড়ি গেলে তো আবার ঝগড়া হবে।”
“আর ঝগড়া!” চোখমুখ বিকৃত করে সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। “ওটা আমাদের রোজই হয়…না খেলেও হয়।”
আমি মাথা দোলালাম। “কেন যে আপনারা ঝগড়া করেন বুঝি না।”
“বিয়ে তো করো নাই বুঝবে কেমনে? করো না একটা, তখন বুঝবে ঠ্যালার নাম কাশেমবাবা।”
এই কাশেমবাবাটা কে, হায়দারভাইকে কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি। সবাই যেখানে ঠ্যালার নাম বাবাজি বলে, তিনি বলেন কাশেমবাবা। ঠিক করলাম, একদিন তার কাছে জানতে চাইবো এটা।
