কেউ কেউ কথা রাখে – ৪

অধ্যায় ৪

ছবি কথা বলে

মিলি খুন হবার তিনদিন পর সকালের দিকে আমাকে যেতে হলো নিহত মেয়েটির শোকাতুর স্বামির সাথে কথা বলতে। বেচারা এমনভাবে ভেঙে পড়েছিলো যে, দু-দণ্ড কথাও বলা হয়নি, অথচ এই খুনের তদন্ত কাজে এটা খুবই গুরুতপূর্ণ ছিলো।

আগের দিন রাতে থানা থেকে বের হয়ে যাবার সময়ই হায়দারভাই বলে দিয়েছিলেন আমি যেন বাসা থেকে সরাসরি ওখানে চলে যাই। অন্য একটা কাজ সেরে তিনি চলে যাবেন সেখানে। তার জন্য অপেক্ষা করার দরকার নেই, আমি যেন দরকারি তথ্যগুলো জেনে নেই ভদ্রলোকের কাছ থেকে। বুঝতে পারছিলাম না তিনি কেন আমাকে দিয়ে এ কাজটা করাতে চাইছেন।

যাই হোক, সকাল সকাল নাস্তা করেই আমি রওনা দিলাম আজিমপুরের ইরাকি কবরস্তানের দিকে। পথে যেতে যেতে মনে হলো মেয়েটির স্বামি যদি জিজ্ঞেস করে কেসের কি অবস্থা তাহলে কী বলবো। এখনও তো কোনো কূলকিণারাই করতে পারিনি আমরা।

এই তিনদিন হায়দারভাই আমাকে সঙ্গে নিয়ে অনেক মানুষের সাথে কথা বলেছেন, অনেক ভেবেছেন কিন্তু সামান্যতম ধারণাও করতে পারেননি কে বা কারা কি কারণে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে খুন করলো। আস্ত একটা মদের বোতলও হায়দারভাইকে কোনোরকম সাহায্য করতে পারেনি। যদিও তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন এইসব তেতোপানি পেটে গেলে তার বুদ্ধির ঝাপি খুলে যায়। তবে আমি নিশ্চিত, এই কেসের সুরাহা না করে ছাড়বেন না তিনি। মাত্র তিনদিন হয়েছে, খুব বেশি সময় বলা যায় না। কয়েক সপ্তাহ, কিংবা মাসখানেকের মধ্যে অবশ্যই সমাধান করতে পারবেন। তাই ঠিক করলাম, মেয়েটির স্বামিকে সত্যি কথাই বলবো, কোনোরকম মিথ্যে সান্ত্বনা দেবার দরকার নেই

১৩ নাম্বার বাড়ির সামনে এসে আমার রিক্সা থামলে দেখতে পেলাম মেইন দরজাটা খোলাই আছে। ভেতরে ঢুকে আরো অবাক হলাম। ঘরের দরজা আধভেজানো। এতোবড় ঘটনা ঘটে যাবার পরও কেউ সতর্ক হয়নি, দরজা খোলা রেখেছে! পরক্ষণেই বুঝতে পারলাম, সতর্ক থাকার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে এখন

আধভেজানো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একটু দ্বিধায় পড়ে গেলাম আমি-কলিংবেল টিপবো নাকি দরজায় টোকা দেবো? ঘরের ভেতরে যে মেয়েটির স্বামি আছে সেটা আমি দরজার ফাঁক দিয়েই দেখতে পাচ্ছি বেচারা ড্রইংরুমের সোফায় বসে মাথা ঝুঁকিয়ে একগাদা সাদা-কালো ছবি দেখছে।

অবশেষে দরজায় টোকাই দিলাম। নিহতের স্বামি একটুও চমকালো না। যেন চমকে যাবার ক্ষমতা লোপ পেয়ে গেছে তার। আস্তে করে পেছন ফিরে তাকালো সে। দরজার ফাঁক দিয়েই আমাদের চোখাচোখি হলো। লাল টকটকে চোখ। তিন-চার রাত না ঘুমানোর ফল। চোখের নীচে কালি পড়ে গেছে। স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়েছে এ-কদিনে। মাথার চুলগুলো এলোমেলো। মুখটা দেখামাত্রই খুব মায়া হলো আমার।

“আমি থানা থেকে এসেছি।” যদিও এটা বলার দরকার ছিলো না। আমার পুলিশের ইউনিফর্মটাই যথেষ্ট।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিধ্বস্ত মানুষটা আমাকে ভেতরে আসার জন্য ইশারা করলো।

“আপনার সাথে একটু কথা বলার দরকার ছিলো,” ঘরে ঢুকে বললাম।

লোকটা আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। “ঐদিন তো একজন কথা বলেছিলো…কী সব উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করেছিলো!”

এবার বুঝতে পারলাম কেন হায়দারভাই আমাকে দিয়ে এ কাজটা করাতে চেয়েছেন। ঐদিন আমি ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগে হায়দারভাই নিশ্চয় নিহতের বিপর্যস্ত স্বামিকে চাছাছোলা প্রশ্ন করে বিগড়ে দিয়েছিলেন।

“উনার কথা বাদ দিন,” বললাম তাকে। “উনি আসলে সবার সাথে এভাবেই কথা বলেন।”

মিলির স্বামি মাথা নেড়ে সায় দিলো।

“আমি জানি আপনার মানসিক অবস্থা ভালো নেই কিন্তু এই কেসে আপনার সাথে কথা বলাটা খুবই জরুরি, তাই—”

“বসুন,” আমার কথা শেষ করার আগেই আস্তে করে বললো ভদ্রলোক।

মাথার টুপিটা খুলে একটা চেয়ারে বসে পড়লাম। ভদ্রলোক কতোগুলো সাদা-কালো ছবি দেখছে। একটু চোখ বুলিয়েই বুঝতে পারলাম বেশিরভাগই তাদের বিয়ের সময় তোলা।

“তিনমাস আগে আমাদের বিয়ে হয়েছে,” একটা ছবি তুলে বললো মেয়েটির স্বামি।

আমি কিছু বললাম না।

“এই ছবিগুলোই তার শেষ ছবি।” ছড়িয়ে থাকা তিন-চারটা ছবি তুলে বললো এবার। “গতমাসে ওর এক কাজিনের বিয়ে হয়, আমি গায়ে হলুদে যেতে পারিনি। ব্যাঙ্কে খুব চাপ ছিলো তখন। গুজব ছিলো, সরকার পাঁচ শত টাকার নোট ব্যান্ড করবে। দম ফেলারও সময় ছিলো না আমাদের।”

লোকটা আমার জন্য অপেক্ষা না করেই বলে যেতে লাগলো। বুঝতে পারলাম তার মানসিক অবস্থা এখন ভিন্ন এক স্টেজে চলে এসেছে-ঝড়ের পর লণ্ডভণ্ড প্রকৃতি যেমন শান্ত আর থিতু হয়ে যায় ঠিক সেরকম। সে কথা বলছে বেশ মিনমিনে গলায়। যেন আপন মনে বলে যাচ্ছে। শরীরের দূর্বলতা কণ্ঠে প্রকট হয়ে ফুটে উঠেছে। একটা ঘোরের মধ্যে আছে এখনও।

“বাসায় কেউ নেই?”

আমার প্রশ্নটা শুনে ফ্যালফ্যাল চোখে চেয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। বুঝতে পারলাম, শোকার্ত লোকটি অন্যভাবে নিয়েছে কথাটা।

“যে ছিলো সে তো নেই! আর কে থাকবে? কেউ না। আমার আর কেউ রইলো না।” শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো ছবিগুলোর দিকে।

আমি ভয় পেয়ে গেলাম, এই বুঝি কান্নাকাটি শুরু করে দেবে। শিশুদের কান্নাই আমি সামলাতে পারি না, বড়দের কান্না দেখলে রীতিমতো অসহায় বোধ করি। কিন্তু আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে লোকটা নিজের কান্না দমিয়ে রাখলো।

“আমার মনে হয় আপনার এখন আত্মীয়স্বজনের মাঝে থাকা উচিত। এভাবে একা থাকা ঠিক হচ্ছে না।”

আমার কথায় কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। ছবিগুলো থেকে মুখ সরিয়ে নিলো। নিজেকে ফিরে পাবার জন্য চুপ থাকলো কিছুক্ষণ, তারপর মুখ তুলে তাকালো আমার দিকে। “আমার বড়ভাই বলছিলো আমাকে বাদি হয়ে কেস করতে হবে…সেটা কি কাল-পরশু করা যাবে না?”

কাজের কথা শুরু করাতে আমি খুশিই হলাম। “এ নিয়ে ভাববেন না, কাল-পরশু করলেও কোনো সমস্যা হবে না।”

“দেরি করাটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না… তদন্ত করতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

আমি আশ্বস্ত করার হাসি দিলাম। “না, তা হচ্ছে না। আমাদের তদন্ত আমরা অলরেডি শুরু করে দিয়েছি।”

লোকটার চোখদুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো। “কিছু বের করতে পারলেন?”

“আমার সিনিয়র অফিসার এটা তদন্ত করছে, আমি তার সহকারী। আসামিকে ধরার ব্যাপারে উনি খুবই কনফিডেন্ট।” আমি দ্রুত বলে গেলাম নিহতের স্বামিকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে।

“যেভাবেই পারেন ওই শূয়োরটাকে ধরেন।” লোকটা এক হাতের মুঠি শক্ত করে তুলে ধরলো।

মাথা নেড়ে সায় দিলাম আমি। “এ নিয়ে আপনি ভাববেন না, খুনিকে অবশ্যই ধরবো আমরা। ওকে ফাঁসিতে ঝুলতেই হবে।”

স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, ভিক্টিমের স্বামি আমার এ কথা শুনে খুশি হতে পারলো না। আমার দিকে কেমন দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলো। “ফাঁসি!!” অস্ফুটস্বরে বলে উঠলো সে।

“যে কাজ সে করেছে ফাঁসিই তার একমাত্র শাস্তি।”

আমাকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক মাথা দোলালো আক্ষেপে। “না, না!” চোখ বন্ধ করে ফেললো কয়েক মুহূর্তের জন্য। “ফাঁসি দেয়া চলবে না!”

সত্যি বলতে কথাটা শুনে আমি যারপরনাই অবাক হয়েছিলাম। এমন কথা জীবনেও শুনিনি। নিহতের স্বামি খুনির ফাঁসি চাইছে না!

“ঐ হারামজাদাকে সারা জীবন জেলে পচিয়ে মারতে হবে!”

আমি কী বলবো বুঝতে পারলাম না। যেখানে খুন হলেই নিহতের পরিবার-পরিজন আর আত্মীয়-স্বজনেরা ‘ফাঁসি চাই-ফাঁসি চাই’ বলে দাবি তোলে সেখানে এই লোক চাইছে যাবজ্জীবন!

“ফাঁসি দিলে তো সে কিছুই টের পাবে না,” আবারো আক্ষেপে মাথা দোলালো মিলির স্বামি। “আমি শুনেছি, ফাঁসি দিলে খুব একটা মৃত্যুযন্ত্রণা হয় না। দ্রুত মৃত্যু হয়, টেরই পায় না। কিছু বোঝার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। মিলি কিন্তু খুব যন্ত্রণা পেয়ে মারা গেছে। ওকে অনেক কষ্ট দিয়েছে হারামজাদা। অনেক!” মন্ত্রতাড়িত হয়ে একটা ঘোরের মধ্যে ডুবে কথাগুলো বলে গেলো।

আমি চুপ রইলাম।

“আপনারা ওই হারামজাদাকে সারাজীবন জেলে পচিয়ে মারবেন, ঠিক আছে?”

বেচারার মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরেও বললাম, “বিচার করবেন আদালত, আমরা না। যে কাজ সে করেছে, ঠিকমতো প্রমাণ করতে পারলে নির্ঘাত ফাঁসি হবে। তবে অনেক সময় এরকম কেসে সবকিছু প্রমাণিত হবার পরও আদালত যাবজ্জীবন শাস্তি দিয়ে থাকে,” কাঁধ তুললাম আমি। “সেটা অবশ্য আদালতই ভালো বুঝবেন। আমাদের কাজ হলো অপরাধিকে ধরা, সাক্ষি-প্রমাণ জোগাড় করা। আমরা এখন খুনিকে ধরার জন্যই চেষ্টা করে যাচ্ছি।”

“ধরা তাকে পড়তেই হবে,” মিলির স্বামি হাত মুঠো করে দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলো।

আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “অবশ্যই ধরবো তাকে, আর সেজন্যেই তো আপনার সাহায্য আমাদের দরকার।”

এ কথায় কাজে দিলো। ভদ্রলোক নড়েচড়ে উঠলো। “বলুন, আমাকে কি করতে হবে? আমি সব করতে রাজি আছি। সব!”

আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে তদন্তকারী কর্মকর্তার মতো করে বলতে শুরু করলাম : “আমাদের ধারণা খুনি আপনাদের পরিচিত কেউ হবে। এটাই আমাদের প্রাথমিক অনুমান।”

নিহতের স্বামি স্থিরচোখে চেয়ে রইলো আমার দিকে। তার অভিব্যক্তি দেখে কিছুই বুঝতে পারলাম না।

“এই খুনের ব্যাপারে আপনি কি কাউকে সন্দেহ করেন?”

ভদ্রলোক একটু ভেবে অপারগতা জানিয়ে আলতো করে মাথা দোলালো। “আমার সাথে কারোর এমন কোনো খারাপ সম্পর্ক নেই যে এরকম জঘন্য কাজ করবে। অসম্ভব!”

“আপনার হয়তো নেই কিন্তু আপনার ওয়াইফের থাকতে পারে না?”

ভদ্রলোক আবারো ভাবনায় ডুবে গেলো। তার চোখের মণি দুটো ডানে- বামে দুলছে। বিক্ষিপ্ত। অনিশ্চিত ভঙ্গিতে। “না।” খুবই দুর্বল কন্ঠে বললো, তারপর কাঁধ তুলে এমন একটা ভঙ্গি করলো যেন সে নিজেও ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না কী বলবে। “আসলে জোর দিয়ে বলতে পারছি না। জানেনই তো, কয়েক মাস আগে বিয়ে…এই অল্প সময়ে একজন মানুষের কতোটুকুই বা জানা সম্ভব।”

“আপনাদের বিয়েটা কি সেটেল্ড ম্যারেজ ছিলো?”

মাথা নেড়ে সায় দিলো ভদ্রলোক।

“আপনার ওয়াইফ কি কখনও আপনাকে এমন কারোর কথা বলেছিলেন, কেউ তার ক্ষতি করতে পারে? কিংবা তার সাথে সম্পর্ক খারাপ, এমন কারোর কথা?”

ঠোঁট উল্টে মাথা দোলালো নিহতের স্বামি। “না।”

আমি একটু থেমে ভেবে নিলাম। “এখানে এই বাসায় কতোদিন ধরে উঠেছেন?”

“বিয়ের পর পরই…দু-মাসের বেশি হবে না।”

“এর আগে কোথায় থাকতেন?”

“আমার বাবা-মা নেই, বড়ভায়ের কাছে মানুষ হয়েছি। বিয়ের পর পর কিছুদিন উনার বাসায়ই ছিলাম…মোহাম্মদপুরে। তারপর এখানে এসে উঠি।”

“এই এলাকার কারোর সাথে কি আপনার কিংবা আপনার ওয়াইফের কোনো রকম ঝামেলা হয়েছিলো কখনও? মানে, একেবারেই সামান্য কোনো ঘটনা, হয়তো আপনার কাছে সেটা তুচ্ছ মনে হতে পারে, খুবই ছোটোখাটো কোনো ব্যাপার নিয়ে কারো সাথে…?”

আমার কথা শেষ হবার আগেই ভদ্রলোক মাথা দোলাতে লাগলো। “না, না। এরকম কিছু হয়নি। হবার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা দু-জন খুবই নির্ঝঞ্ঝাট মানুষ। আর মিলি এতো মিশুক স্বভাবের…সবার সাথে ওর ভালো সম্পর্ক। আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের কাছে ও খুবই পপুলার।”

“আচ্ছা, ঘটনার কয়েক দিন আগে থেকে কি কাউকে আপনার বাড়ির আশেপাশে ঘুরঘুর করতে দেখেছেন? কারোর আচরণে কি সন্দেহজনক কিছু খেয়াল করেছেন?”

মাথা দুলিয়ে সরাসরি জবাব দিলো ভদ্রলোক।

“আপনার এই বাড়িতে নিয়মিত আসা-যাওয়া করে এরকম কোনো আত্মীয়স্বজনের কথা বলতে পারেন?”

মুখ তুলে তাকালো আমার সামনে বসে থাকা বিপর্যন্ত মানুষটি। “ওর এক বোন আর বান্ধবি মাঝেমধ্যে আসতো।”

“আমি পুরুষ মানুষের কথা বলছি।”

আবারো মাথা দুলিয়ে নেতিবাচক জবাব দিলো সে। “না। আমার বড়ভাই যে-কদিন এসেছে বউ-বাচ্চা নিয়েই এসেছে। আর সব সময়ই এসেছে ছুটির দিনে। রবিবার। আমিও তখন বাসায় ছিলাম।”

“আচ্ছা,” আবারো ভেবে নিলাম এরপর কি বলবো। “এই বাড়ির দোতলায় যে ফ্যামিলি থাকে তাদের সাথে আপনাদের সম্পর্ক কেমন?”

“আমার সাথে হাই-হ্যালো সম্পর্ক। বুঝতেই পারছেন, সারাদিন অফিসে থাকি, খুব একটা দেখাও হয় না। তবে ওর সাথে খুব ভালো সম্পর্ক ছিলো। আমি অফিসে চলে যাবার পর দিনের বেশিরভাগ সময়ই দোতলায় কাটাতো। দোতলার ভদ্রলোক সাধারণ বীমায় চাকরি করেন। উনার ওয়াইফ স্কুলটিচার। একটামাত্র বাচ্চা, ক্লাস টু-তে পড়ে। ভদ্রলোকের বৃদ্ধ মা আছেন। উনাদের সাথে মিলির সম্পর্ক খুবই ভালো ছিলো।”

আমি চুপ থেকে ভদ্রলোককে আরো কথা বলার সুযোগ করে দিলাম।

“ব্যাঙ্ক থেকে একটু দেরি করে সন্ধ্যার পর ফিরলেই দেখতাম মিলি আর ঐ বাচ্চাটা ঘরে বসে টিভি দেখছে। ওদের ঘরে তো টিভি নেই তাই বাচ্চাটা সন্ধ্যার পরই এখানে চলে আসতো।”

এই বিষয়টা হায়দারভাইও ভেবে দেখেছেন। তার মতে দোতলার বাচ্চাটা কিছু দেখেছে কিন্তু তার বাবা-মা এটা স্বীকার করতে চাইছে না। ওদের সাথে কথা বলে তার এরকম ধারণা হয়েছে। বাচ্চাটার মা-বাবা চাইছে না তাদের সন্তানকে পুলিশ এটা-ওটা জিজ্ঞেস করুক। কিংবা হতে পারে খুনোখুনির মতো ঘটনা বলে জড়াতে চাইছে না কোনোভাবে হায়দারভাই বাচ্চাটার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু ওর মা-বাবা বলেছে এই বাড়িতে খুন-খারাবির মতো ঘটনা ঘটে গেছে বলে তারা বাচ্চাটাকে আপাতত কয়েকদিনের জন্যে নানার বাসায় রেখে এসেছে।

“ও খুব ছবি তুলতো।”

কথাটা শুনে আমি সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখি নিহতের স্বামি দু-তিনটা ছবি হাতে নিয়ে উদাস হয়ে চেয়ে আছে।

“যেকোনো অনুষ্ঠানে গেলেই ছবি তুলে রাখতো। হানিমুনেরও অনেক ছবি আছে আমদের,” ভদ্রলোক অনেকটা আনমনে বলে গেলো। একের পর এক ছবি তুলে দেখছে সে। “চোখে কাজল না দিয়ে কখনও ছবি তুলতো না।” কথাটা বলেই আমার দিকে একটা ছবি বাড়িয়ে দিলো।

আমি ছবিটা হাতে তুলে নিলাম। এটা সম্ভবত বিয়ের পরের কোনো ছবি। ঐ সময় রঙ্গিন ছবি ছিলো স্বপ্নের ব্যাপার। প্রায় সবাই সাদা-কালো ছবি তুলতো। নিহত মেয়েটার যতো ছবি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ড্রইংরুমে তার সবগুলোই সাদা-কালো। হাতের ছবিটা ভালো করে দেখার আগেই আমার দিকে আরেকটা ছবি বাড়িয়ে দিলো মেয়েটির স্বামি।

পুরনো একটি ছবি। কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়কার হবে। চোখে টানা টানা কাজল দেয়া। অসম্ভব সুন্দর চোখ। মেয়েটা খুন হবার পরও তার চোখে মৃত্যু-আতঙ্ক এই সৌন্দর্য তিরোহিত করতে পারেনি। তখনও মেয়েটির চোখে কাজল দেয়া ছিলো, তবে সেটা ধর্ষক-খুনির জন্যে নয়, নিশ্চয় অফিসফেরত স্বামির জন্য। কিংবা কে জানে!

“বললাম না, কয়েক দিন আগে ওর এক কাজিনের বিয়ে হয়েছিলো, তখনও অনেক ছবি তুলেছে,” ভদ্রলোক চার-পাঁচটা ছবি বাড়িয়ে দিয়ে বললো।

ছবিগুলো হাতে নিয়ে দেখে গেলাম। মেয়েটির জীবনের শেষ কিছু ছবি। সব ছবিতেই সে হাসছে। হয় মুখে হাসি এঁটে নয়তো চোখ দিয়ে। একদঙ্গল ছেলে-মেয়ের সাথে তোলা। গায়েহলুদের আনন্দঘন পরিবেশ। কোনো সিঙ্গেল ছবি নেই। সবই গ্রুপ ফটোগ্রাফি। প্রতিটি ছবিতেই ভিক্টিম মেয়েটিকে খুব সহজেই চেনা যাচ্ছে তার দুর্দমনীয় সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বের কারণে। ছবির আর কোনো মেয়েই তার মতো সুন্দর করে চোখে কাজল দেয়নি। পোশাকে, ব্যক্তিত্বে তার মতো আর কেউ নেই।

এক এক করে ছবিগুলো দেখতে গিয়ে থমকে গেলাম।

না। আরেকজন আছে!

আমার হাতের শেষ ছবিটি গ্রুপ ফটোগ্রাফি নয়-ভিক্টিম আর তার এক বান্ধবির ছবি। দুটো মেয়েই দেখতে অসাধারণ। তাদের মধ্যে মিলগুলো বেশ চোখে পড়ার মতো। চোখে কাজল, বেশভুষা, ব্যক্তিত্ব আর সৌন্দর্যে তারা একে অন্যের সাথে কঠিন প্রতিযোগিতা করছে যেন।

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইলাম ছবিটার দিকে।

“ওর সবচাইতে ক্লোজ ফ্রেন্ড।”

নিহতের স্বামির কথায় মুখ তুলে তাকালাম। দেখি আমার হাতের ছবির দিকে ঝুঁকে আছে ভদ্রলোক।

“আপনি হয়তো ভাবছেন ওরা দুই বোন…ওদের দেখলে সবাই এরকমই মনে করে।”

মাথা নেড়ে সায় দিয়ে আবারো ফিরে গেলাম ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সাদা-কালো ছবিগুলোর দিকে। নিহত মিলির স্বামির শোকাতুর কথাবার্তা আর আক্ষেপের দিকে আমার কোনো মনোযোগ নেই, আমার সমস্ত মনোযোগ এখন একগাদা ছবির দিকে। সম্ভবত ভদ্রলোকও সেটা টের পেয়ে কথা বলা বন্ধ করে দিলো। চোখের কোণ দিয়ে দেখতে পেলাম আমার দিকে তাকিয়ে আছে সে।

একটা ছবি তুলে নিলাম। গায়েহলুদের আরেকটি গ্রুপ ছবি। অনেকেই আছে ছবিতে। দুই সারিতে কমপক্ষে দশ-বারোজন তো হবেই। নিহত মিলি আছে সবার সামনে, একেবারে মাঝখানে। ছবির পেছনের সারির একেবারে ডানদিকে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণ। তার চোখ আর সবার মতো ক্যামেরার দিকে নিবদ্ধ নয়। সে চেয়ে আছে তার ডানদিকে। স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে তার দৃষ্টি মিলির দিকেই নিবদ্ধ। মিলির মতো সুন্দরি মেয়েদের দিকে কেউ এভাবে তাকাতেই পারে, এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু পর পর তিন-চারটা গ্রুপ ছবিতেই যখন একই চিত্র দেখা যাচ্ছে তখন আর স্বাভাবিক বলার কোনো উপায় থাকে না। অন্তত আমার কাছে এটা স্বাভাবিক মনে হয়নি। কেন মনে হয়নি সেটা হয়তো বুঝিয়ে বলতেও পারবো না। এটা এক ধরণের অনুভূতি।

আমি এরকম একটা গ্রুপ ছবি নিয়ে মিলির স্বামিকে দেখালাম। “এই ছেলেটা কে?”

মিলির স্বামি ছবিটা ভালো করে দেখে মাথা দোলালো। “আমি চিনি না। হয়তো মিলির কোনো আত্মীয় হবে,” ছবিটা উল্টে অন্যপিঠের সাদা অংশটা দেখলো। “মিলি সব ছবিতেই নাম আর তারিখ লিখে রাখে কিন্তু এখানে কিছু লেখা নেই।”

আমি চুপ মেরে রইলাম। আমার মন তখন অনেক কিছু ভেবে যাচ্ছে। উটকো মেহমান! খুনি ভিক্টিমের পরিচিত!

“হয়তো সময় পায়নি,” ভদ্রলোক বললো। “ছবিগুলো মাত্ৰ গত সপ্তাহেই প্রিন্ট করা হয়েছে।”

আরেকটা গ্রুপ ছবি তুলে নিলাম। একই চিত্র। মিলির দিকে আড়চোখে চেয়ে আছে ঐ যুবক। আমার কেনজানি মনে হলো তার চোখে লাম্পট্য আর লালসা।

“একে চিনতে পারে এরকম কেউ আছে?”

মিলির স্বামি একটু অবাকই হলো। “সম্ভবত রামজিয়া চিনতে পারবে। মিলির সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বান্ধবি…ও-ই বেশিরভাগ ছবি তুলেছে।” ভদ্রলোক সেই ডুয়েট ছবিটা তুলে নিলো একটু আগে যে ছবিটা আমি অপলক দৃষ্টিতে দেখছিলাম। “এই যে, রামজিয়া। বেশ বড়লোকের মেয়ে। মিলি আর ও একসাথেই পড়াশোনা করেছে।”

এবার আমি ছবিটার দিকে বিশেষ নজর দিলাম না, সরাসরি কাজের কথায় চলে এলাম। মিলির ঘনিষ্ঠ কোনো বান্ধবির সাথে কথা বলা দরকার। এখন সেটা আরো জরুরি হয়ে পড়েছে।

“এই মেয়ের সাথে যোগাযোগ করা যায় কিভাবে?”

মিলির স্বামি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে মিনি-সাইজের ফোনবুক বের আনলো। “ও থাকে ধানমণ্ডিতে…বারো নাম্বারে।” পাতা উল্টে গেলো সে। “বাসার একজ্যাক্ট ঠিকানাটা আমি বলতে পারছি না তবে ওর ফোন নাম্বার আছে আমার কাছে।” ভদ্রলোক নির্দিষ্ট পাতাটি পেয়ে গেলে মুখ তুলে তাকালো। “নাম্বারটা লিখে নিন।”

আমি সঙ্গে সঙ্গে আমার নোটবুকে টুকে রাখলাম নাম্বারটা, তারপর কী যেন মনে করে উঠে দাঁড়ালাম। “আমি কি এই ছবিটা নিতে পারি?” পিকনিকের গ্রুপ ফটোর একটা হাতে নিয়ে বললাম। “কাজ শেষে হলে আবার ফেরত দিয়ে দেবো।”

“নিন, কোনো সমস্যা নেই। আমার কাছে নেগেটিভ আছে,” মিলির স্বামি বললো।

উঠে দাঁড়ালাম আমি, ছবিটা পকেটে ভরে হাত বাড়িয়ে দিলাম।

ভদ্রলোক আমার সাথে যন্ত্রের মতো করমর্দন করলো। তার হাত-দুটো মৃত- মানুষের মতোই ঠাণ্ডা আর ঘামে ভেঁজা।

“ধন্যবাদ, মিনহাজসাহেব।”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *