কেউ কেউ কথা রাখে – ১৯

অধ্যায় ১৯

বাঙালীর জীবনে রমণী

ইমতিয়াজকে জেলে ভরার পর এক ধরণের তৃপ্তিতে কেটে গেলো বেশ কয়েকটা দিন। হায়দারভাই অবশ্য তখনও কেসের আলামত, মোটিভ, সাক্ষি-সাবুদ নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন। আর আমি অনেকটা অবসর পেয়ে বই পড়ায় ডুব দিলাম। রামজিয়ার দেয়া বইটা সারা রাত পড়ে শেষ করতে না পেরে পরদিন থানায় নিয়ে গেলাম। কাজের চাপ কম থাকায় নিজের ডেস্কে বসে আয়েশ করে চায়ে চুমুক দিতে দিতে বাকিটা পড়তে শুরু করলাম।

হায়দারভাই তখনও থানায় আসেনি। সম্ভবত অন্য একটা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিংবা গতরাতে আবারো মদ খেয়ে বাড়িতে গেছেন। সারা রাত বউয়ের সাথে ঝগড়া করে দেরি করে ঘুমিয়েছেন, সকাল এগারোটার আগে আসবেন বলে মনে হয় না।

বেশ কিছুক্ষণ পড়ার পর টয়লেটে যাবার দরকার হলে আমি টেবিলের উপর বইটা রেখে চলে গেলাম। সত্যি বলতে, বই পড়তে গিয়ে অনেক সময় জোর করে প্রশ্রাব আটকে রাখাটা আমার বদ অভ্যেসে পরিণত হয়েছিলো। একটা অধ্যায় কিংবা সিকোন্সের মাঝপথে বই রেখে টয়লেটে যেতে ইচ্ছে করতো না। পুরোটা শেষ করে তবেই উঠতাম। ততোক্ষণে হয়তো আমার ব্লাডার পরিপূর্ণ হয়ে রীতিমতো চাপ দিতে শুরু করে দিতো।

টয়লেট থেকে ফিরে এসে দেখি হায়দারভাই আমার টেবিলের সামনে বসে রামজিয়ার দেয়া বইটা হাতে নিয়ে উল্টে-পাল্টে দেখছেন। আমাকে দেখেই তিনি ভুরু নাচিয়ে এমন একটা ভঙ্গি করলেন, বুঝতে পারলাম পরবর্তি সংলাপগুলো কি রকম হতে পারে।

একজন সত্যিকারের ডিটেক্টিভকে’…” বইয়ের শুরুতে রামজিয়ার লেখা কথাগুলো আবৃত্তি করলেন এসএম হায়দার।

আমি টের পেলাম দু-কান গরম হয়ে গেছে।

‘যার কাছ থেকে সত্যিকারের রোমাঞ্চকর ঘটনা শুনে শিহরিত হয়েছি।’” বইটা উপুড় করে টেবিলের উপর রেখে আমার দিকে মাস্টারের মতো দৃষ্টি নিয়ে চেয়ে রইলেন তিনি। যেন বড়দের কোনো বই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তে গিয়ে ক্লাস-টিচারের হাতে ধরা পড়ে গেছি। “ঘটনা কি?”

আমি বোকার মতো হেসে ফেললাম।

“এই হাসিতে কাজ হবে না। মেয়েটা কে?”

“মেয়ে?” আমি সর্বোচ্চ অভিনয় করার চেষ্টা করলাম। “নাম তো লেখা নেই…মেয়ে পেলেন কোত্থেকে? কোনো ছেলেও হতে পারে, পারে না?”

মুচকি হাসলেন হায়দারভাই। “শোন, আমি লেখা দেখেই বুঝতে পারি কোনটা ছেলে আর কোনটা মেয়ের হাতের লেখা। দ্বিতীয়ত, তুমি যতো ভালোমানুষই হও না কেন, কোনো ছেলেকে রোমাঞ্চকর ঘটনা শুনিয়ে ‘শিহরিত’ করবে সেটা আমি বিশ্বাস করি না। তৃতীয়ত, তোমার চেহারায় যে চোর-চোর আর লাজুকমার্কা ভাব ফুটে উঠেছে সেটা তুমি নিজে দেখলেও বুঝতে পারতে তুমি ধরা খেয়ে গেছো।”

“আশ্চর্য, এখানে ধরা খাওয়ার কী আছে?” কথাটা বলেই আমি নিজের চেয়ারে বসে পড়লাম। “একজন একটা বই গিফট করেছে…এই তো।”

“হুম। সেই একজনটা কে? এই বড়ভাইকে তার নাম-ধাম একটু পেশ করো তো।”

“ঐ যে…” কথাটা বলতে গিয়ে টের পেলাম কেমন লজ্জা-লজ্জা করছে, “…ঐ মেয়েটা।”

সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন হায়দারভাই। “কোন্ মেয়েটা?”

“আরে, ঐ যে…মিলির বান্ধবি।”

আমি দেখতে পেলাম হায়দারভায়ের ভুরু আস্তে আস্তে কপালে উঠে যাচ্ছে। আমার দিকে কেমন স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। “বাপরে!” অবশেষে বললেন তিনি। “দুয়েকবার দেখা করেই পটিয়ে ফেলেছো?”

“কী যে বলেন না…এখানে পটানোর কি আছে? আজব!”

“আমি কিন্তু অন্য রকম গন্ধ পাচ্ছি।”

প্রতিবাদ করে উঠলাম আমি। “ওর বান্ধবির খুনিকে আমরা ধরতে পেরেছি, সেজন্যে খুশি হয়ে আমাকে বইটা গিফট করেছে। এর মধ্যে অন্য কোন গন্ধ খুঁজে লাভ নেই।”

“আচ্ছা। তাহলে আমার গিফট কই? আমি কি ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চা?” কৃত্রিম আক্ষেপে মাথা দোলালেন এবার।

আমি হেসে ফেললাম। “ঠিক আছে, এরপর দেখা হলে ওকে বলবো আপনাকেও একটা বই গিফট করে দিতে।”

ভুরু কপালে তুললেন। “আজকাল কি রেগুলার দেখা-টেখা হচ্ছে নাকি? যারপরনাই বিব্রত হলাম আমি। “নিউ মার্কেটের সামনে দেখা হয়ে গেলে ইমতিয়াজকে ধরার কথাটা তখন বললাম। তারপর আমাকে নিউ মার্কেটে নিয়ে গিয় কফি খাওয়ালো, এই বইটা দিলো।”

“আবার কফিও খাওয়ালো?”

হায়দারভাই যে সহজে এ বিষয়টা ছাড়বেন না বুঝতে পারলাম। “আপনি মনে হয় সকাল সকাল ওসব খেয়ে এসেছেন, নইলে এইসব হাবিজাবি চিন্তা আপনার মাথায় আসে কী করে।”

“ব্রাদার, আমি হাবিজাবি খেয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলি আর না বলি তাতে কিছু যায় আসে না। ঘটনা যা ঘটার তা অলরেডি ঘটতে শুরু করে দিয়েছে।”

“কি ঘটতে শুরু করেছে, অ্যাঁ? আশ্চর্য!”

“লাভ স্টোরি, ব্রাদার… লাভ স্টোরি।”

কথাটা শুনে আমি যারপরনাই বিব্রত হলাম। লজ্জায় কুঁকড়ে গেলাম যেন। “আপনার কি মাথা খারাপ হয়েছে?! কী সব বলছেন। তিল থেকে তাল বানাচ্ছেন। একটা ছেলে আর মেয়ে একসাথে বসে দুটো কথা বললেই হয়ে গেলো? আশ্চর্য। আপনিও দেখি সবার মতোই ভাবেন।” কপট রাগ দেখালাম আমি হায়দারভাই কিছু না বলে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন।

“ওর সাথে আমার যায়? আমি সামান্য পুলিশ, আর ও?” কথাটা বলে দম নিয়ে নিলাম, “শোনেন, মেয়েটা খুব ভালো, সবার সাথেই ভালো ব্যবহার করে। কোনো গরিমা নেই। ওরা যে এতো ধনী সেটা বোঝাই যায় না ওর আচরণে। এটাকে আপনি কিস্সা বানালে তো হবে না, বিগ ব্রাদার।”

“আহা, আমি তো কিস্সা বানাচ্ছি না, শুধু একটু গন্ধ পাচ্ছি!”

“গন্ধ খুঁজে লাভ নেই। জীবনটা সিনেমা নয়, বুঝলেন?”

হা-হা করে হেসে ফেললেন এসএম হায়দার। “শোনো, আমি জানি তোমার সাথে ওদের আকাশ-পাতাল ব্যবধান কিন্তু তাই বলে প্রেমে পড়তে দোষ কি, অ্যাঁ?”

“আপনি বলতে চাচ্ছেন ওই মেয়ে আমার প্রেমে পড়েছে? আপনার আসলে মাথা খারাপ হয়ে গেছে।”

“আমার না, তোমার মাথা খারাপ হয়েছে। তুমি ওই মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছো, ব্রাদার।”

আমি থ বনে গেলাম কয়েক মুহূর্তের জন্য। আমার চেহারায় নিশ্চয় ভড়কে যাবার অভিব্যক্তি ছিলো। “কী যে বলেন না। আ-আমি…” কথাটা শেষ করতে পারলাম না।

“প্রেমে পড়াটা তো অন্যায় কিছু না। আর হিসেব করে কখনও প্রেম হয় না।”

এসব কথার জবাবে কী বলবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

“শোন, তোমার এখন যা বয়স তাতে এরকম একটা জম্পেশ প্রেম হলে কিন্তু মন্দ হয় না।” কথাটা বলে তিনি চোখ টিপে দিলেন। “বুড়ো হয়ে যাবার পর স্মৃতি রোমন্থন করতে পারবে-’আহা এক কালে এক আপ-টু-ডেট ছুকরির সাথে চুটিয়ে প্রেম করেছিলাম!”

“কী যে বলেন না, মাথা খারাপ হয়ে গেছে আপনার। বামন হয়ে চাঁদের দিকে হাত বাড়ানোর কথা বলছেন।”

আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। “ছোটোভাই বলে বলছি না, তুমি ছেলেটা কিন্তু দেখতে-শুনতে বেশ। আচার-ব্যবহারও ভালো। মার্জিত। শুধু সমস্যা ঐ স্ট্যাটাস নিয়ে।” একটু থেমে আবার বললেন তিনি, “আমার মনে হয় বিয়ের কথা বাদ দিয়ে শুধু প্রেম করা যেতে পারে। কি বলো?”

হাত নেড়ে বাতিল করে দিলাম তার এমন প্রস্তাবকে। “আমি কিছুই করছি না। ওকে?”

“কিছু করছো না মানে কি?” অবাক হবার ভঙ্গি করলেন। “অলরেডি তো করে বসে আছো!”

“কি?”

“প্রেমে পড়ার কথা বলছি।”

“আমি প্রেমে পড়েছি?”

“হুম।” তারপর নাটকিয় ভঙ্গিতে বলতে শুরু করলেন, “আমি দিব্যচোখে দেখিতেছি ঐ আপ-টু-ডেট ছুকরিটার প্রেমে তুমি হাবুডুবু খাইতেছো! দিবা-রাত্রি তাহার কথাই ভাবিতেছো! ভাবিতে ভাবিতে তোমার সমস্ত কিছু শিকায় উঠিয়া যাইতেছে! সিগারেট ভাবিয়া কলম মুখে ঢুকাইয়া দিতেছো। আর সিগারেট দিয়া জিডি লিখিতে যাইয়া কাচুমাচু খাইতেছো।”

লজ্জায় আমার কান গরম হয়ে গেলো। থানার চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম কেউ আমাদের কথা শুনে হাসছে কি-না। ঘরের এককোণে দু-জন কনস্টেবলকে দেখলাম মুখ টিপে হাসছে। আমাদের দিকে চেয়ে আছে তারা।

“প্লিজ, ভাই। এসব বন্ধ করেন। ওরা সবাই শুনে ফেলছে। ইজ্জত- সম্মান তো পাঙ্কচার করে দেবেন।”

“আরে ব্রাদার, যাব পেয়ার কিয়া তো ডারনা কেয়া!”

আমাকে লজ্জার সাগরে ডুবিয়ে দিয়ে তিনি রীতিমতো হেরে গলায় মুঘল-এ-আজম শুরু করে দিলেন।

“পেয়ার কিয়া কই চুরি নেহি কি…..

“ভাই, আপনার পায়ে পড়ি! প্লিজ!”

আমার প্রবল আকুতিতে হায়দারভাই তার ভরাট আর বেসুরো গলার লাগাম টেনে ধরলেন আর হাফ ছেড়ে বাঁচলাম আমি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *