কেউ কেউ কথা রাখে – ৩৩

অধ্যায় ৩৩

তুমি

জ্ঞান ফিরে এলে দেখি আমার সারা মুখ আর মাথা ভেঁজা। বিছানায় শুয়ে আছি। পাশে একটা চেয়ারে বসে আছে রামজিয়া। তার হাতে পানির গ্লাস।

“থ্যাঙ্কস গড,” হাফ ছেড়ে বাঁচলো যেন সে। “আমি তো খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম। এখন কেমন লাগছে?”

তার উদ্বিগ্ন মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়েছিলাম আমি। “আপনি ঠিক আছেন তো?”

“হ্যা,” কোনভাবে বলতে পেরেছিলাম। মাথাটা খুব ফাঁকা আর হালকা লাগছিলো।

“আমার মনে হয় আপনার ডাক্তার দেখানো দরকার। “না, না… আমি ঠিক আছি।”

“খাওয়া-দাওয়া…কোন কিছুই মনে হয় ঠিক নেই। স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে পড়েছে। ক-দিন ধরে শেভ করেন না?”

মনে পড়ে গেলো, দু-সপ্তাহ আগে শেভ করেছিলাম। আমার গালে চাপদাড়ি আর গোঁফ।

“আপনাকে খুবই বিশ্রি দেখাচ্ছে কিন্তু,” বললো সে।

এ কথার কোন জবাব দিলাম না আমি, তার দিকে চেয়ে রইলাম। একটু আগে যে তাকে দেখে দৃষ্টিবিভ্রম বলে মনে হচ্ছিলো সেটা পুরোপুরি কেটে গেছে। ঘোর ঘোর ভাবটাও নেই আমার মধ্যে।

“আপনি আমাকে খুব খারাপ ভাবছেন?”

আমার কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্ত স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইলো সে। “না, তা ভাববো কেন। আপনার মানসিক অবস্থাটা বুঝতে পারছি। যা ঘটেছে সেটা সহ্য করা খুব কঠিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম।”

“কিন্তু আপনি যেটা করছেন সেটা ঠিক না। এসব করার কোন মানেই হয় না। আপনাকে এসব ছাড়তে হবে। স্বাভাবিক হতে হবে।”

তার কথাগুলো চুপচাপ শুনে গেলাম আমি। হ্যা-না কিছুই বললাম না। “থানা থেকে বললো আপনি অনেকদিন ধরেই ডিউটিতে যাচ্ছেন না?” মাথা নেড়ে সায় দিলাম আমি। “ওখানে যেতে ইচ্ছে করে না আর।” থানায় গেলেই যে হায়দারভায়ের কথা আরো বেশি করে মনে পড়ে, তার চেয়ার আর টেবিলে অন্য কাউকে বসে থাকতে দেখলে ভীষণ খারাপ লাগে, নিজেকে মনে হয় বড্ড একা সেটা আর বললাম না।

“এভাবে দিনের পর দিন অ্যাবসেন্ট থাকলে তো চাকরিটা থাকবে না।” আমি তার উদ্বিগ্ন মুখের দিকে চেয়ে থেকে বললাম, “আমার মনে হয় না পুলিশের চাকরি আর করতে পারবো।

“কী বলেন এসব,” সান্ত্বনার ভঙ্গিতে বলে উঠলো রামজিয়া শেহরিন “কয়েকটা দিন ছুটি নিয়ে একটু বিশ্রাম নিন, সব ঠিক হয়ে যাবে। ইউ নিড রেস্ট।”

তার পর কয়েক মুহূর্ত কোন কথা হলো না আমাদের। যেন কেউ কোন কথা খুঁজে পাচ্ছে না। রামজিয়া হঠাৎ করে তার হাতঘড়িতে তাকালো।

“আজকে আসি,” উঠে দাঁড়ালো সে। আমিও উঠে দাঁড়াতে গেলে বলে উঠলো, “আপনার ওঠার দরকার নেই, রেস্ট নিন।”

“না, না। আমি ঠিক আছি।” বিছানা থেকে নেমে উঠে দাঁড়ালাম।

“আপনার কিন্তু ডাক্তার দেখানো দরকার,” কথাটা আবারো বললো রামজিয়া। “জ্ঞান হারানোর আগে কেমনজানি অ্যাবনরমাল বিহেইভ ছিলেন।”

তার কথা শুনে আঁতকে উঠলাম। মনে করার চেষ্টা করলাম অজ্ঞান হবার আগে কী করেছিলাম, কিন্তু মাথা কাজ করছিলো না। শুধু মনে পড়ছিলো দরজার সামনে সে দাঁড়িয়ে আছে। আমার কাছে এসে দাঁড়ালো। কিছু বললো। তারপর?

“আ-আমি কি…” ঢোক গিলে বললাম, “…উল্টাপাল্টা কিছু করেছি?” নিজের অভিব্যক্তি লুকিয়ে বললো, “তেমন কিছু না। ওতে আমি কিছু মনে করিনি।”

তেমন কিছু না মানে? ভড়কে গেলাম একটু। আমি আসলে কি করেছি? “এসব নিয়ে টেনশন করার কিছু নেই।” আবারো আশ্বস্ত করলো আমাকে।

“না, মানে…আমি কী করেছি? আসলে, আমার কিচ্ছু মনে পড়ছে না।”

“আমাকে তুমি করে বলছিলেন। আপনার বিশ্বাসই হচ্ছিলো না আমি এখানে এসেছি। ভেবেছেন ডিল্যুশন হচ্ছে আপনার।”

হতভম্ব হয়ে গেলাম আমি। নিজের উপরে এতোটা নিয়ন্ত্রণ কিভাবে হারালাম বুঝে এলো না। শুনেছি মদের প্রভাবে নাকি এরকম অনেক কিছু হয়। কিন্তু বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো আমার।

“সরি সরি। বিশ্বাস করেন, আমি এটা-”

“ইটস ওকে,” হাত তুলে আমাকে থামিয়ে দিলো রামজিয়া।

“প্লিজ আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আমি সজ্ঞানে এটা করিনি।”

“আহা,” বললো সে। “এটা এমন কোন ব্যাপার না।”

“না, না। কী যে বলেন। আমার এটা করা ঠিক হয়নি।”

“আর অ্যাপোলজি চাইতে হবে না।” আশ্বস্ত করলো সে। “আমরা প্রায় কাছাকাছি বয়সেরই, তুমি করে বলা যেতেই পারে।”

আমি ফ্যাল ফ্যাল চোখে চেয়ে রইলাম।

“এটা নিয়ে এতোটা ওরিড কেন হচ্ছেন বুঝতে পারছি না। আমি তো বাবা-মা থেকে শুরু করে কাকা-কাকি, মামা-মামি সবাইকেই তুমি করে ডাকি। আপনি বলার রেওয়াজ আমাদের ফ্যামিলিতে নেই।”

আমি বোকার মতো চেয়ে রইলাম ওর দিকে।

“ইচ্ছে করলে এখন থেকে আপনি আমাকে তুমি করে বলতে পারেন, কোন সমস্যা নেই। একবার যখন তুমি করে বলেই ফেলেছেন তখন আর আপনি’তে ফিরে যাওয়ার কী দরকার, তাই না?”

আমি হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলাম।

“আমাকে কিন্তু বন্ধু ভাবতে পারেন।”

কথাটা শুনে কী যে ভালো লেগেছিলো বলে বোঝাতে পারবো না। “ঠিক আছে?”

মাথা নেড়ে সায় দিয়েছিলাম আমি। “তাহলে আমাকেও তুমি করে ডাকতে হবে।”

হুট করেই মুখ দিয়ে কথাটা বের হয়ে গেছিলো। এমন কথা কিভাবে আমি ঐদিন বলতে পেরেছিলাম সেটা আজো আমার কাছে বিস্ময় ঠেকে। জীবনে এরকম অনেক সময় আসে যখন মানুষ তার স্বভাবের বাইরে গিয়ে কিছু করে ফেলে। আমিও সেদিন তা-ই করেছিলাম।

“ও, এটা।” আমার কথার জবাবে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলেছিলো। “ঠিক আছে।”

কথাটা বলেই দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো সে, ফিরে তাকালো আমার দিকে। “পাঁচদিন পর কিন্তু জন্মদিন…মনে আছে তো?

মনে পড়ে গেলো আমার। জন্মের পর থেকে কখনও জন্মদিন পালন করিনি। গত বছর হায়দারভাই যখন জানতে পারলেন আমার জন্মদিনের কথা তখন সঙ্গে সঙ্গে নিউ মার্কেটে নিয়ে গিয়ে একটা শার্ট গিফট করেছিলেন। রাতে ভাবির হাতে রান্না করা সুস্বাদু পোলাও তো ছিলোই। সেটাই ছিলো আমার জীবনে প্রথম জন্মদিন পালন করা।

“নিউ মার্কেটে বিকেলে আমি আসবো ঐদিন, ঠিক আছে?” বললো সে। “বুক পয়েন্টের সামনে, পাঁচটার দিকে।”

মাথা নেড়ে সায় দিলাম আমি।

“জন্মদিনের ট্রিট দিতে হবে কিন্তু।” হেসে বললো রামজিয়া। “ভুলে যে- ও না।” কথাটা বলেই ঘুরে চলে গেলো সে।

আমি অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাকিয়ে থাকলাম দরজার দিকে।

*

পরদিন শেভ করে চুল কেটে একদম ফ্রেশ হয়ে গেলাম। একটা দিন বিশ্ৰাম নিয়ে চলে গেলাম থানায়। আমার কাছে মনে হতে লাগলো এ ক-দিনে কেমন অচেনা হয়ে গেছে সব কিছু। কলিগদের ভাববঙ্গি দেখেও আন্তরিক বলে মনে হলো না। যেন আমি অযাচিত একজন।

নিজের চেয়ার-টেবিলে অন্য একজন অফিসারকে দেখে খুবই অবাক হলাম। পুরনো এক কলিগ জানালো নতুন জয়েন করেছে সে। তাহলে কি আমার চাকরি চলে গেছে?

না। ঐ কলিগই জানালো, গত সপ্তাহে আমার বদলি হয়ে গেছে বরিশালের উজিরপুর নামক এক জায়গায়। এই বদলিটা যে শাস্তি হিসেবে দেয়া হয়েছে সেটা জানাতেও ভুললো না ততোদিনে সাবেক হয়ে যাওয়া আমার সেই কলিগ। ওসিসাহেব থানায় ছিলো না বলে তার সঙ্গে আর দেখা হলো না। আমি কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ বসে রইলাম থানায়। মাথায় নানান চিন্তা ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে-ভাবলাম। এই থানায় নিজেকে মানিয়ে নিতে খুবই বেগ পেতে হচ্ছিলো আমার। হায়দারভায়ের স্মৃতি ছাড়াও ওসি এবং ওসির ঘনিষ্ঠ কলিগদের মনোভাব মোটেও বন্ধুসুলভ ছিলো না আর। এখন উজিরপুরের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে এসব থেকে দূরত্ব বাড়ানোর একটা সুযোগ এসে গেলো।

আমার প্রতি কিছুটা বন্ধুভাবাপন্ন দুয়েকজন কলিগ যে ওখানে ছিলো না তা নয়। তাদেরই একজন সোহরাব মুন্সি এক কাপ চা বাড়িয়ে দিলো আমার দিকে। আমি সেই চায়ে চুমুক দিতে যাবো অমনি তার একটা কথা শুনে থমকে গেলাম।

“ইমতিয়াজের লগে বাড়াবাড়ি না করলে এত খারাপ জায়গায় পোস্টিং হইতো না, বুঝলেন?”

বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে গেলাম আমি।

“সবাই বলাবলি করতাছে, ও-ই নাকি আপনারে এমন জায়গায় বদলি করছে। ওর নেতা এখন বিরাট ক্ষমতাবান।”

মুহূর্তে চায়ের স্বাদ বিস্বাদ হয়ে গেলো আমার কাছে। কাপটা নামিয়ে রাখলাম।

“ওসিসাহেবের লগে তরা এখন খুব খাতির।”

আমার কানে ভো ভো শব্দ হতে শুরু করলো।

“হায়দারসাহেরে সে মারুক আর না-ই মারুক, লোকজন কিন্তু মনে করে পুলিশ মারার পরও কিচ্ছু হয় নাই যখন সে নিশ্চয় বিরাট ক্ষমতাবান।” সোহরাব মুন্সি আমার জন্য অপেক্ষা না করে নিজের কাপে চুমুক দিতে দিতে গল্প করে যেতে লাগলো। “এইসব লোকজনের জন্য এইরকম অ্যালিগেশন কিন্তু ক্রেডিট।”

আমি যন্ত্রের মতো উঠে দাঁড়ালাম। খুব দ্রুত আর হুট করে হলেও অবশেষে সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম তখনই।

“আরে, কই যান? ওসিসাহেবের লগে দেখা করবেন না?”

সোহরাব মুন্সি পেছন থেকে কথাটা বললেও আমি ফিরেও তাকাইনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *