কেউ কেউ কথা রাখে – ৩৭

অধ্যায় ৩৭

খুনের গল্প

১৯৭৫ সালের পনেরোই আগস্টের পর অন্য অনেকের মতোই ইমতিয়াজ আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলো। অক্টোবরের শুরুর দিকে একদিন কি একটা দরকারে মিরপুরে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে গেছিলো মিনহাজ। ওখান থেকে ফেরার সময়ই সে ইমতিয়াজকে দেখতে পায় এক বাড়িতে ঢুকছে। বুঝে যায়, এই বাড়িতেই ইমতিয়াজ আত্মগোপন করে আছে।

পর পর কয়েক দিন মিরপুরে গিয়ে ঐ বাড়ি থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে ইমতিয়াজের গতিবিধি লক্ষ্য করে সে। জানতে পারে খুনি কখন বের হয়, কোথায় যায়, আবার কখন ফিরে আসে।

এরপর মিনহাজ দ্রুত একটি পরিকল্পনা করে ফেলে, সেই অনুযায়ি প্রস্তুতি নিতেও শুরু করে দেয়। এক ডাক্তার বন্ধুর কাছ থেকে কড়া ডোজের ক্লোরোফর্ম সংগ্রহ করে সে। টাকা দিয়ে একটা পিস্তল কিনে নেয়। তারপর এক সন্ধ্যায় একটা প্রাইভেট কার জোগাড় করে চলে যায় মিরপুরে। গাড়িটা ঐ বাড়ির সামনে পার্ক করে অপেক্ষায় থাকে। সে জানতো, অন্য কোথাও আড্ডা দিয়ে রাত আটটা-ন’টার দিকে ইমতিয়াজ ঐ বাড়িতে ফিরে আসবে রাতে থাকার জন্য।

ঐদিন সে বাড়িতে ঢোকার আগেই মিনহাজ পেছন থেকে ক্লোরোফর্মে ভেঁজানো রুমাল দিয়ে তার নাক-মুখ চেপে ধরে। মুহূর্তেই অজ্ঞান করে ফেলে তাকে। তারপর পাঁজাকোলা করে গাড়ির পেছনে ট্রাঙ্কে রেখে তালা মেরে দেয়। গাড়ি নিয়ে দ্রুত চলে যায় সেখান থেকে।

আগে থেকে ঠিক করে রাখা নির্জন এক রেললাইনের পাশে গাড়িটা রেখে অপেক্ষা করতে থাকে ট্রেন চলে যাবার জন্য। সেই রেললাইন দিয়ে ট্রেন চলে যাবার সময় গাড়ির পেছনের ট্রাঙ্ক খুলে ইমতিয়াজকে পর পর তিনটি গুলি করে খুন করে ফেলে মিনহাজ। ট্রেনের বিকট শব্দের কারণে তার গুলির আওয়াজ ধামাচাপা পড়ে যায়।

এরপর ইমতিয়াজের লাশটা পচা কোন খালে ফেলে দেয়া হয়। ঢাকা শহরে

তখন খালের অভাব ছিলো না, সুতরাং কাজটা করতে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি।

ইমতিয়াজকে খুন করার পরই মিনহাজ ঢাকা ত্যাগ করে।

*

“ইমতিয়াজকে খোঁজ করার চিন্তা বাদ দিন,” গল্পটা বলার পর মিনহাজ বললো আমাকে। “ভুলে যান তার কথা। সে বেঁচে নেই। বহু আগেই আমি তাকে খুন করে ফ্রি হত্যার প্রতিশোধ নিয়ে নিয়েছি।”

গল্পটা শোনার পর অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমি কোন কথা বলতে পারিনি। যেন আমার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবশ হয়ে গেছিলো।

যাই হোক, ইমতিয়াজের উধাও হবার রহস্যটা অবশেষে জানতে পারলাম। কেন তার ব্যাপারে কেউ কিছু জানে না-সেটা এখন বোধগম্য। মিলি আর হায়দারভায়ের খুনি বেঘোরে মারা পড়েনি, সবার অলক্ষ্যে তাকে খুন করে লাশ ফেলে দিয়েছে মিনহাজ।

হয়তো ক-দিন পর পানি থেকে ভেসে উঠেছিলো ইমতিয়াজের মৃতদেহ, কিন্তু ততোদিনে তাকে চেনার কোন উপায় ছিলো না। আবার এমনও হতে পারে, খুনির লাশ কখনও ঐ পচা খালের পানিতে ভেসেই ওঠেনি। ময়লা- আবর্জনার ভিড়ে চিরতরের জন্য ঠাই করে নিয়েছে।

আমি টের পেলাম দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতর চেপে বসা একটি কষ্ট যেন বাষ্প হয়ে উড়ে চলে গেলো! এক ধরণের নিষ্কৃতি। পরিত্রাণ। দুই যুগ ধরে জমে থাকা কৌতুহল আর নানান প্রশ্নের চির অবসান।

“কেমন লেগেছিলো আপনার?” দীর্ঘ সময় চুপ থাকার পর জিজ্ঞেস করলাম আমি।

মিনহাজ আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কয়েক মুহূর্ত। “অসহ্য যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম বলতে পারেন।”

মাথা নেড়ে সায় দিলাম। “আপনি কি আশঙ্কা করেছিলেন, ইমতিয়াজের লোকজন আপনাকে সন্দেহ করতে পারে? তারা আপনার পেছনে লাগতে পারে?” একটু থেমে আবার বললাম, “তবে কি সেজন্যেই এখানে চলে এসেছিলেন?”

মুচকি হাসলো মিলির স্বামি। “হয়তো এটাও একটা কারণ ছিলো। তবে সত্যি কথা হলো, ঢাকায় আর থাকতে ইচ্ছে করলো না। অসহ্য লাগছিলো শহরটা, তাই এখানে চলে এলাম।” কাঁধ তুললো সে। “এই তো…” তারপর আমার কাঁধে এক হাত রেখে নরম কণ্ঠে বললো, “এসব ভুলে যান, ভাই। দুই যুগ আগের ঘটনা…আমার মিলি বেঁচে নেই, আপনার হায়দারসাহেব বেঁচে নেই, ইমতিয়াজও বেঁচে নেই। এখন এসব নিয়ে লেখালেখি করে কী লাভ? ইমতিয়াজকে আমি যে শান্তি দিতে চেয়েছিলাম সেটা দিয়ে দিয়েছি। এই ঘটনা ওই দিনই শেষ হয়ে গেছে। সব চুকেবুকে গেছে।”

তার দিকে চেয়ে রইলাম। আমার মুখ দিয়ে কোন শব্দ বের হলো না। পুরোপুরি নির্ভার আমি।

“আপনি না থাকলে মিলির খুনি কে সেটা হয়তো কোনদিন জানা সম্ভব হতো না, তাই আপনার কাছে আমি আজীবন ঋণী। সেজন্যেই ইমতিয়াজের পরিণতির কথাটা আপনাকে বললাম, নইলে এ কথা আমি কখনও কাউকে বলবো না বলে প্রতীজ্ঞা করেছিলাম। বলার কথাও নয়। এখন আপনি সবটা জানতে পারলেন, আশা করি বুঝতে পেরেছেন।”

আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। এরকম নির্ভার মুহূর্তেও ছোট্ট একটা দুঃখবোধ পিছু নিলো আমার। মিলির গল্পটা প্রকাশ করা ঠিক হবে না।

“আমাকে সত্যিটা বলার জন্য আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, মিনহাজসাহেব,” হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললাম আমি।

“মনে করুন, আপনার কাছে আমার যে ঋণ ছিলো সেটা শোধ করে দিলাম এই সত্যিটা জানিয়ে,” প্রসন্নভাবে হেসে আমার হাতটা ধরে আন্তরিকভাবে বললো সে।

“ভালো থাকবেন, শরীরের প্রতি যত্ন নেবেন।”

“আপনিও ভালো থাকবেন।”

আমি মিনহাজের খামার বাড়ি থেকে বের হলাম অদ্ভুত এক অভিজ্ঞতা নিয়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *