অধ্যায় ৩৯
যাবজ্জীবন
বাসস্টেশনে বসে বসে যখন নানান কথা ভাবছিলাম তখন কিছু স্মৃতি, কিছু ঘটনা, দৃশ্য এলোমেলোভাবে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতে শুরু করে। আমি জানি না কেন, কিসের জন্য-কিন্তু এটা এমনভাবে ঘটতে শুরু করে যা আমাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিলো।
মিনহাজ খুন করেছে ইমতিয়াজকে। তার প্রাপ্য শাস্তি দিয়েছে। কি সেই শাস্তি? মৃত্যুদণ্ড? কিন্তু দুই যুগ আগে মিনহাজ কি চেয়েছিলো? সে চেয়েছিলো ইমতিয়াজের যেন ফাঁসি না হয়। সে যেন সারাটা জীবন জেলে পচে মরে।
ফাঁসি দিলে তো ঐ শূয়োরেরবাচ্চাটা কোন কিছুই টের পাবে না! দড়িতে ঝুলতেই সব শেষ হয়ে যাবে! আমি চাই শূয়োরেরবাচ্চাটা জেলে পচে মরুক। আস্তে আস্তে… ধীরে ধীরে! সারাটা জীবন জেলে কাটাক। জীবনে যেন জেলের বাইরে পা রাখতে না পারে। মরে যাবার পর ওর লাশ জেলে বাইরে নেয়া হবে, তার আগে নয়!
মিনহাজের কথাগুলো আমার কানে বাজতে শুরু করে। কথাগুলো বলার সময় তার অভিব্যক্তি আর দৃঢ়তা আমার স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল।
তারপর মনে পড়ে যায়, একটু আগে খামারবাড়িতে মিনহাজের সাথে দেখা করার সময় কিছু মুহূর্ত, কিছু দৃশ্যের কথা।
খাবারের ট্রে হাতে বাড়ির পেছন থেকে আসছিলো সে। অথচ তার বাড়িতে আর কেউ থাকে না। সে একদম একা থাকে বিশাল ঐ বাড়িতে। আর খাবারগুলো গো-বাছুরদের জন্য ছিলো না, ওগুলো মানুষের খাবার ছিলো!
ঘরে ঢোকার পর মিনহাজ সবার আগে একটা বিশাল খোলা জানালার পর্দা টেনে দিয়েছিলো। পর্দা টেনে দেবার আগে আমি দেখেছি, ঐ জানালা দিয়ে বাড়ির পেছন দিকটা দেখা যায়।
তারপর মিনহাজের ঘরে বুকশেলফে থাকা বইগুলো। স্বাভাবিকভাবেই আমার নজর গিয়ে পড়েছিলো সেখানে।
থরে থরে সাজানো মেডিকেলের বই।
হোমিওপ্যাথির নয়।
ভেটেনারিও নয়।
এমন কি গবাদিপশুর রোগ-বালাই নিয়ে লেখা ছিলো না ওগুলো।
সাধারণ মেডিকেলের বই।
কিন্তু এই অসঙ্গতিটা বোঝার আগেই আমার মনোযোগ সেই বইগুলো থেকে সরিয়ে দিয়েছিলো মিলি! তার একটা পুরনো ছবির ফ্রেম রাখা ছিলো সেখানে। এই ছবিটা দুই যুগ আগে মিনহাজের ঘরে দেখেছিলাম আমি। সম্ভবত বিয়ের পর তোলা মিলির একটি সিঙ্গেল ছবি। সেই মায়াভরা চোখ। সেই নিষ্পাপ চাহনি। খুন হবার পরও তার চোখজুড়ে ছিলো সুগভীর মায়া। সেই চোখ আমি কোনদিন ভুলতে পারিনি।
বাসস্টেশনে বসে বসে এইসব যখন ভাবছিলাম তখন আমার মন আরো কিছু যুক্তি খুঁজতে শুরু করে।
ইমতিয়াজকে খুন করার পর মিনহাজ কেন ঢাকা ছাড়বে? যে ঢাকায় তার প্রিয়তমা স্ত্রির কবর! মিনহাজ প্রায় প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে মিলির কবরে যেতো। তাহলে ইমতিয়াজকে হত্যার পর কেন সে এমন একটা শহর ছাড়লো? যে মাটিতে মিলি শুয়ে আছে সেই মাটি থেকে কেন দূরে সরে গেলো? বেছে নিলো নিভৃত জীবন?
আমাকে নিজের বাড়িতে দেখে মিনহাজ মোটেও খুশি হতে পারেনি। এটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। অথচ মিলির কেসের জন্য সে আমার কাছে ঋণী।
আমি একটা ঘোরের মধ্যে উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার মন বলছিলো, কিছু একটা অসঙ্গতি আছে। আমার যুক্তিবাদি অংশটাও সায় দিয়েছিলো এর সাথে। মিনহাজ যা বলেছে, যা করেছে-তার মধ্যে রয়েছে অসঙ্গতি। অসামঞ্জস্য।
আর এখন, অভাবনীয় এক সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি আমি।
বিগত দুই যুগ ধরে মিনহাজের নিজস্ব জেলখানায় বন্দি হয়ে আছে মিলি আর হায়দারভায়ের খুনি ইমতিয়াজ!
“আ-আপনি?!” অবশেষে মুখ খুললো বন্দি ইমতিয়াজ। তার কণ্ঠটা কেমন জান্তব শোনালো।
আমি তাকালাম মিনহাজের দিকে। নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে সে। মনে হচ্ছে না ধরা পড়ে যাওয়ায় খুব একটা উদ্বিগ্ন। তার মুখ অস্বাভাবিক রকমেরই নির্বিকার।
“আমি মিলির কবর ছুঁয়ে শপথ করেছিলাম, ওকে সারাজীবন জেলে পচিয়ে মারবো,” আস্তে করে বললো মিনহাজ, “আমি আমার কথা রেখেছি।”
আলতো করে মাথা নেড়ে সায় দিলাম কি দিলাম না বলতে পারবো না। ফিরে তাকালাম দুই যুগ ধরে বন্দি থাকা খুনির দিকে।
“আ-আমাকে…” আর কিছু বলতে পারলো না সে, নিজে থেকেই থেমে গেলো। হয়তো বুঝতে পেরেছে আমার কাছে আবেদন জানানো, কিংবা অনুগ্রহ পাবার আশা সে করতে পারে না।
গভীর করে দম নিয়ে একটু সামনে এগিয়ে গেলাম। “তুমি হায়দারভাইকে খুন করেছো!” এটা প্রশ্ন ছিলো না মোটেও। আমি ভালো করেই জানতাম কাজটা ও-ই করেছে।
অপরাধির মতো মাথা নীচু করে রাখলো ইমতিয়াজ। যেন অনুতপ্ত সে। তারপর চোখ বন্ধ করে আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে সায় দিলো। সম্ভবত কাঁদতে চাইলো কিন্তু তার দু-চোখ সাড়া দিলো না। দুই যুগ ধরে মাটির নীচে বন্দি থাকার সময় হাজারবার অশ্রুপাত করে হয়তো সমস্ত অশ্রু নিঃশেষ করে ফেলেছে। এখন চাইলেও চোখ ভেজাতে পারে না।
ইমতিয়াজ বললো, “আমি জানি আপনি আমাকে উদ্ধার করার জন্য আসেননি…” তারপর তার সমস্ত শরীর কোন এক অজ্ঞাত আবেগে কাঁপতে শুরু করলো। “আ-আমি কিছু চাই না…আ-আমি শুধু চাই…” ফুপিয়ে উঠলো সে, “ওকে বলেন আমাকে যেন মেরে ফেলে! অনেক তো হয়েছে…আমি আমার শাস্তি পেয়ে গেছি। এবার একটু দয়া করেন। আমাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কতো চেষ্টাই না সে করে! দয়া করে এবার আমাকে মুক্তি দিতে বলেন।” দু-হাত জোর তরে শুকনো কান্নায় ভেঙে পড়লো মিলি আর হায়দারভায়ের খুনি।
আমি মিনহাজের দিতে তাকালাম। সে দূর্বল শরীরেও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি এক পা দু-পা করে পিছু হটে গেলাম। মিনহাজের চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম সেই চোখে কোন উদ্বেগ নেই। তার ঠোঁটে মৃদু বাঁকাহাসি।
মাটির নীচে তার নিজস্ব জেলখানা থেকে বের হয়ে আসার সময় সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য তার সাথে দৃষ্টি বিনিময় হলো। মনে হলো আমারা আমাদের দু- জনের চোখ দিয়ে কিছু বললাম। আর সেটা নির্ভুলভাবে পড়তেও পারলাম।
