কেউ কেউ কথা রাখে – ২৭

অধ্যায় ২৭

হায়দারভাই কতোটা মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তার প্রমাণ পেলাম বেশ কয়েক দিন পর। তিনি আমাকে এমন একটা কথাট বললেন যে শোনার সঙ্গে সঙ্গে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।

“কী যে বলেন না… এটা কিভাবে সম্ভব? আপনি কিভাবে আশা করলেন ও এতে রাজি হবে?”

“তুমি বলেই দেখো না, রাজি তো হতেও পারে?” নাছোরবান্দার মতো বলেছিলেন তিনি। “হাজার হলেও বান্ধবি, তার একটা দায়িত্ব আছে না?”

আমি নিঃশব্দে মাথা দোলালাম। বুঝতে পারছিলাম হায়দারভাই মরিয়া হয়ে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে চাইছেন। তিনি আমাকে দিয়ে রামজিয়াকে একটা ব্যাপারে রাজি করাতে বলছেন মিলির কেসে তাকে সাক্ষি দিতে হবে!

রামজিয়া কী সাক্ষি দেবে? আমার মাথায় কিছুই ঢুকছিলো না। সে তো এই ঘটনার সাথে জড়িত নয়। কোনভাবেই না।

“শোনো, ইমতিয়াজের সাথে যে মিলির পরিচয় ছিলো, এক সময় মিলির পেছনে ঘুর ঘুর করতো, মেয়েটা খুন হওয়ার কয়েকদিন আগে গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে যে সে ছোক ছোক করেছে, এইসব ঘটনার সাক্ষি তো ঐ মেয়েটাই। সে যদি সাহস করে আদালতে এসে এটা বলে তাহলে মামলার গ্রাউন্ডটা শক্তিশালি হয় না?”

“আপনার ধারনা ঐ বড়লোকের মেয়ে এরকম ঝামেলায় জড়াতে রাজি হবে?”

“রাজি হতেও পারে।”

মাথা দোলালাম আমি। “আপনি বুঝতে পারছেন না, ওর মতো মেয়ে এটা করতে রাজি হবে না। এসব কোর্ট-কাচারির ধারেকাছেও সে যাবে না। ভুলেভালে যদি রাজিও হয়, তার পরিবার তাকে এটা করতে দেবে না।”

“আহা,” বিরক্ত হয়ে উঠলেন এসএম হায়দার, “এতো কিছু না ভেবে তুমি আগে ওকে বলেই দেখো না। রাজি না হলে কী আর করা। আর যদি সাহস করে রাজি হয়েই যায় তাহলে আমাদের অনেক উপকারে আসবে।”

আমাকে চুপ থাকতে দেখে আবারো তিনি বললেন কথাটা।

“একবার বলে দেখো,” গভীর করে নিঃশ্বাস নিলেন, “তুমিই না আমাকে বললে এতো সহজে হাল ছেড়ে না দিতে, শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করে যেতে?”

“ঠিক আছে,” আমার নিজের যুক্তিতেই আমাকে ঘায়েল করলেন হায়দারভাই। “আমি তাকে বলবো।”

ঐদিন বিকেলে আমি ফোন করি রামজিয়াদের বাড়িতে। সে ছিলো না, ফোনটা ধরেছিলো কাজের লোক। সে জানালো তাদের আপামনি বাইরে আছে।

সন্ধ্যার পর আমি যখন থানায় কাজ করছিলাম তখন রামজিয়া আমাকে ফোন করে। আমি একটু অবাকই হয়েছিলাম, কারণ কাজের লোককে আমি আমার পরিচয় দেইনি। তাহলে সে জানলো কিভাবে ফোনটা আমি করেছিলাম? ওটা অ্যানালগ ফোনের যুগ ছিলো, কে ফোন করেছে জানার কোন উপায় ছিলো না তখন।

“আমার কেনজানি মনে হলো আপনিই ফোন করেছিলেন,” আমার প্রশ্নের জবাবে বলেছিলো সে। “এখন বলেন, কি ব্যাপার?”

আমি সঙ্কোচ বোধ করলাম একটু। আমার মনের একটা অংশ চাইছে তার সঙ্গে দেখা করে কথাটা বলতে কিন্তু অন্য অংশটি ফোনেই কাজ সেরে নিতে চাইলো, তাহলে অন্তত অস্বস্তিটা কম হবে। অবশ্য থানার ভেতরে জোড়ায় জোড়ায় চোখ ঘুরে ফিরছে আমার দিকে। তার চেয়েও বেশি সংখ্যক কান খাড়া হয়ে আছে কথা শোনার জন্য। আমাকে যে একটা মেয়ে ফোন করেছে এটা বাকিদের কাছে ছড়িয়ে পড়তে কয়েক সেকেন্ড লেগেছিলো মনে হয়। তাছাড়া মিলির কেসটা নিয়ে থানার ভেতরে কথা বলাটাও নিরাপদ ছিলো না। তাই বাধ্য হয়েই সমস্ত সঙ্কোচ ভুলে কথাটা বললাম তাকে।

“ইয়ে, মানে…একটা কথা বলার ছিলো।”

“হুম, বলেন?” আগ্রহি হয়ে উঠলো সে।

“না, মানে…কাল একটু দেখা করা যাবে? একটা দরকার ছিলো।”

“আগামিকাল তো দেখা করতে পারবো না। ইনফ্যাক্ট দু-দিনের আগে দেখা করা সম্ভব হবে না বোধহয়।”

আমি একটু অবাক হলাম কথাটা শুনে। “কেন?”

“কাল আমার একটা অপারেশন আছে।”

“অপারেশন?”

“আমার পায়ের বুড়ো আঙুলের উপর ছোট্ট একটা ফোঁড়ার মতো কি জানি হয়েছে, ডাক্তার বলেছে ওটা অপারেশন করতে হবে। আগামিকাল সকালে অপারেশ।”

“বলেন কি? টিউমার নাকি?”

“না, না। সে-রকম কিছু না। অনেক আগেই ডাক্তার বলেছিলো ওটা অপারেশন করে রিমুভ করে দিতে কিন্তু আই হেট সার্জারি। ভীষণ ভয় লাগে।” কথাটা বলেই হেসে ফেলেছিলো। “আপনি জানেন, এই ভয়ে আমি নাক ফুটো করিনি এখনও।”

যে মেয়ে নাক ফুটো করার সাহস নেই সে দেবে খুনি-ধর্ষকের বিরুদ্ধে সাক্ষি!

“কেন জানি সার্জারি, কাটাকুটি একদম পছন্দ করি না। ইউ নো, আমি সহজে ইনজেকশন দিতেও রাজি হই না।” ফোনের অপর পাশ থেকে হাসির শব্দ শোনা গেলো।

আমিও হেসে ফেললাম তবে নিঃশব্দে। আমার সেই হাসি যে রামজিয়ার পক্ষে দেখা সম্ভব নয় সেটা যেন খেয়ালই ছিলো না।। “তাহলে কবে দেখা করবো?” জানতে চাইলাম আমি।

“আপনি সামনের সোমবার বিকেল চারটায় আলিয়ঁস ফ্রাঁসেজে চলে আসুন…আমি একটা কাজে ওখানে যাবো, কাজ সেরে আপনার জন্য অপেক্ষা করবো ক্যাফে’তে…ওদের কফিটা দারুণ। আই লাইক ইট।”

তার সাথে দেখা করার জন্য মাঝখানের দুটো দিন অপেক্ষা করলাম বেশ অস্থিরতার মধ্যে। কেন এই অস্থিরতা আমি জানি না। হতে পারে তাকে আবারো দেখতে পাবার খুশি আর হায়দারভায়ের দেয়া প্রস্তাবটির ব্যাপারে আমার অস্বস্তি-দুটো মিলে মিশ্র অনুভূতির জন্ম নিয়েছিলো আমার মধ্যে।

দু-দিন পর বিকেলের শেষের দিকে রামজিয়ার সাথে আমি দেখা করলাম আলিয়ঁস ফ্রাঁসেজে। ঐ জায়গাটা তখন বেশ নিরিবিলি ছিলো। ধানমণ্ডি তখনও বিশুদ্ধ আবাসিক এলাকা, মানুষজনও ছিলো খুব কম।

চটি পরা রামজিয়ার ডানপায়ের বুড়ো আঙুলের দিকে তাকালাম, একটা টেপ ব্যান্ডেজ দেখতে পেলাম সেখানে।

“পায়ের কি অবস্থা?” জানতে চাইলাম।

“সিরিয়াস কিছু ছিলো না। পনেরো মিনিটের ছোট্ট একটা সার্জারি। এখন একদম ঠিক আছি। স্টিচ খুলবে পরশু।”

এরপর টুকটাক অন্য কথা বলে অবশেষে কফি খেতে খেতে সাহস করে হায়দারভায়ের প্রস্তাবটা দিয়েই ফেললাম তাকে।

কথাটা শুনে যতোটা চমকে যাবে, অবাক হবে বলে ভেবেছিলাম ততোটুকু হলো না। নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরে একটু ভেবে নিলো সে। “মিলি আমার খুব ঘনিষ্ঠ বান্ধবি, ওর জন্য এটুকু করা তো আমার দায়িত্ব, তাই না?”

আমি হ্যা-না কিছুই বললাম না।

“এতে করে যদি কেসটায় সুবিধা হয় তাহলে কেন নয়,” কফিতে চুমুক দিলো।

আমি তার এমন সহজ-সরলভাবে রাজি হয়ে যাওয়াতে রীতিমতো ভড়কে গেলাম। যে মেয়ে ইনজেকশন দিতে, নাক ফুটো করতে ভয় পায় সে কী না…! ভেবে-চিন্তে বলছে তো? কাজটা যে ঝুঁকিপূর্ণ সে কি জানে না?

“আপনার ভয় করছে না?” কথাটা না বলে পারলাম না।

“কেন? ভয় কিসের? ঐ ইমতিয়াজকে?”

এটা তার সারল্য নাকি সাহস বুঝে উঠতে পারছিলাম না। “সে আপনাকে হুমকি দিতে পারে? ক্ষতি করারও চেষ্টা করতে পারে?”

একটু ভাবলো রামজিয়া। “একটু ঝুঁকি তো নিতেই হবে, তাই না? আমরা সবাই যদি ভয়ে পিছিয়ে যাই তাহলে মিলির হত্যার বিচার হবে কিভাবে?”

আমি কিছু না বলে চুপ মেরে রইলাম। নিজেকে কাপুরুষ বলে মনে হলো আমার। একাত্তরে যুদ্ধে যাইনি, আর এখন একটা মেয়ে ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে যখন সাক্ষি দিতে রাজি হচ্ছে তখন তাকে সাহস না জুগিয়ে উল্টো ভড়কে দিচ্ছি!

আলিয়ঁস ফ্রাঁসেজ থেকে বের হবার আগে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে নতুন একটা ইংরেজি বই বের করে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো সে। “আমার এক কাজিন লন্ডন থেকে এটা নিয়ে এসেছে।”

ফ্যাকাশে লাল রঙের একটা বই, নগ্ন এক তরুণীর অর্ধাঙ্গ। বইটার নাম ‘দ্য নাইট অব দি জেনারেল।” প্রচ্ছদটা দেখে আমার মিলির কথা মনে পড়ে গেলো। ও ঠিক এভাবেই পড়েছিলো খুন হয়ে

“আমি পড়েছি, খুব ভালো লেগেছে।”

তার কথায় মুখ তুলে তাকালাম।

“আপনারও হয়তো ভালো লাগবে,” হেসে বললো রামজিয়া। “পুলিশ

আর মার্ডার মিস্ট্রি…আপনার সাথে যায়।”

বইটা পড়ার জন্য ধার দেয়া হলো বলে খুশিই হয়েছিলাম। এর কারণ অবশ্যই আমি বইয়ের পোকা বলে নয়। বইটা ফেরত দেবার জন্য তার সাথে আরেকবার দেখা হবার সুযোগ পাবার জন্য!

সৌজন্যতা দেখিয়ে রামজিয়াকে একটু এগিয়ে দেবার জন্য বললে সে হাসিমুখেই রাজি হয়ে গেছিলো।

আমরা রিক্সা না নিয়ে ধানমণ্ডির নির্জন পথ ধরে কথা বলতে বলতে হেটে যাচ্ছিলাম।

“আপনার বিয়ের কী খবর?” কথাটা কেন বললাম জানি না। সম্ভবত আর কোন কথা খুঁজে না পেয়ে, কিংবা আমার মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা কৌতুহল-আমি নিশ্চিত নই।

তার অভিব্যক্তি দেখে মনে হলো প্রশ্নটা তাকে একটু অবাক করেছে। “খবর আবার কি,” হেসে বললো সে, “আমি তো কবেই না করে দিয়েছি। আপনাকে বলেছিলাম না, ভুলে গেছেন?”

“না, সেটার কথা বলছি না, নতুন কোন প্রপোজালের কথা বলছিলাম। আমার তো মনে হয় প্রায়ই আপনার বিয়ের সম্বন্ধ আসে।”

মুখ টিপে হাসলো রামজিয়া, “অনার্স পাস করার আগে থেকেই আসছে, আমি পাত্তা দেই না। তবে হাদনিং আব্বু-আম্মু খুব জ্বালাচ্ছে। আত্মীয়-স্বজন সব আমার বিয়ের জন্য হুমরি খেয়ে পড়েছে, বুঝলেন। মনে হয় আমার বিয়ের জন্য তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে গেছে।” কথাটা বলেই মোহনীয়ভাবে হেসে ফেললো সে।

“আপনি রাজি হচ্ছেন না কেন?”

“আপনাকে মনে হয় বলেছিলাম, আমি আসলে সেটেল্ড ম্যারেজকে খুব হেইট করি। কেমনজানি লাগে। চিনি না জানি না এমন একজনকে…ইউ নো, আই জাস্ট হেইট ইট।”

সৌজন্যতা দেখিয়ে আমিও হেসে ফেললাম। কিছু বলতে যাবো অমনি থমকে দাঁড়ালাম, আমার সাথে সাথে রামজিয়াও। বিস্ময়ে দুচোখ বিস্ফোরিত হলো আমার।

আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ইমতিয়াজ!

তার চোখেমুখে কেমন বেপরোয়া হাসি। আমাদের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে। লক্ষ্য করলাম হায়দারভায়ের সৃষ্টিকর্ম এখনও তার মুখমণ্ডল থেকে পুরোপুরি দুরীভূত হয়ে যায় নি। ধর্ষকের নাক একটু ফুলে আছে। কালশিটে পড়ে গেছে বাম চোখের নীচে।

“কি খবর, রামজিয়া? কেমন আছো?”

আমি রামজিয়ার দিকে তাকালাম। সে কিছুটা ভড়কে গিয়ে চেয়ে রইলো, ইমতিয়াজের কথার কোন জবাব দিলো না।

“পুলিশ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছো…ঘটনা কি?” আমাদের আরো সামনে এসে বললো জামিনে বের হয়ে আসা খুনি।  

ইমতিয়াজের দিকে অবিশ্বাসে, ক্ষোভের সাথে তাকালাম আমি। চোখেমুখে লাম্পট্য ভর করেছে যেন। একইসাথে সেই চোখে বেপরোয়া মনোভার আর প্রচ্ছন্ন হিংস্রতা। টের পেলাম রামজিয়া আমার বামহাতটা ধরে ফেলেছে। চমকে উঠে তাকালাম তার দিকে।

“চলেন,” দৃঢ়ভাবে বললো সে।

আর দেরি না করে ইমতিয়াজকে পাশ কাটিয়ে আমরা পা বাড়ালাম সামনের দিকে। পেছন থেকে শিষ বাজিয়ে উঠলো মিলির খুনি।

কয়েক গজ এগিয়ে যাবার পর আমি পেছন ফিরে দেখি ইমতিয়াজ আমাদের দিকে চেয়ে আছে চোখেমুখে অদ্ভুত এক ভঙ্গি করে। আমি মুখ ঘুরিয়ে সামনের দিকে পা বাড়ালাম। একজন খুনির এমন দুঃসাহস দেখে রীতিমতো হতবাক হয়ে গেছিলাম সেদিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *