কেউ কেউ কথা রাখে – ৩২

অধ্যায় ৩২

ঘোর

হায়দারভায়ের মৃত্যু আমার জীবনটাই এলোমেলো করে দিলো।  

আমাকে জন্ম দিতে গিয়ে মা মারা যান। বাবাকেও বেশিদিন পাইনি। যতোদিন বেঁচে ছিলেন আমার থেকে দূরে দূরে ছিলেন তিনি। মা মারা যাবার পর আত্মীয়-স্বজনেরা বহু চেষ্টা করেও বাবাকে দ্বিতীয় বার বিয়ে করাতে পারেনি। যখন প্রশ্ন উঠলো, আমাকে মানুষ করার দায়িত্ব কে নেবে তখন তিনি সেই দায়িত্ব তুলে দেন আমার বড় মামার হাতে।

একই জেলায় হলেও দাদার বাড়ি থেকে মামার বাড়ির দূরত্ব ছিলো প্রায় বিশ-পঁচিশ মাইল। যোগাযোগ ব্যবস্থাও ছিলো বেশ খারাপ। ফলে আমার স্কুল শিক্ষক বাবা প্রতি মাসে একবারের বেশি দেখা করতে আসতেন না। সেদিক থেকে দেখলে আমি বাবার স্নেহ থেকেও বঞ্চিত ছিলাম।

পুলিশে ঢোকার পর হায়দারভাই-ই ছিলেন আমার বন্ধু, বড়ভাই এবং পিতৃতুল্য একজন মানুষ। বন্ধুর মতো সম্পর্ক ছিলো আমাদের, আবার বড়ভায়ের মতো আগলে রাখতেন সারাক্ষণ। সব মিলিয়ে আমি তার মধ্যে এমন কিছু খুঁজে পেয়েছিলাম, যেটাকে বলে ফাদার-ফিগার।

হায়দারভায়ের মৃত্যু যেন আমাকে পুরোপুরি এতিম করে দিলো। আমি হয়ে পড়লাম নিঃসঙ্গ আর বিপর্যস্ত একজন মানুষ। এই মৃত্যুটা আমি মেনে নিতে পারিনি।

মুক্তিযোদ্ধা এসএম হায়দারকে উপর্যুপুরি ছুরিকাঘাতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। কে করেছিলো কেন করেছিলো সেটা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেনি কখনও। তবে এ নিয়ে আমার মধ্যে কোন সংশয় ছিলো না। আমি জানতাম এ কাজ একজনের পক্ষেই করা সম্ভব।

ইমতিয়াজ।

আজো আমি বিশ্বাস করি, ইমতিয়াজই হায়দারভাইকে খুন করেছে। কিন্তু কেউ আমার কথা বিশ্বাস করেনি। না করার কারণ, এ ব্যাপারে আমার কাছে কোন প্রমাণ ছিলো না। আগের দিন ফুটবল ক্লাবে মদের আড্ডায় যাদের সাথে হায়দারভায়ের মারামারি হয়েছিলো তাদের দিকেই সন্দেহের আঙুল তোলা হয়েছিলো। বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতারও করেছিলো পুলিশ, কিন্তু দেখা গেলো ওটা একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা। মদের আড্ডায় এরকম ঘটনা হরহামেশাই হয়ে থাকে। ঐদিনের ঘটনাটি ছিলো নিছক তর্কাতর্কি থেকে সৃষ্ট একটি হাতাহাতি! মদের আড্ডায় এক লোকের সাথে বচসায় জড়িয়ে পড়েছিলেন হায়দারভাই। সেই লোক যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি মিলিটারির খাবার সাপ্লাই দেবার কন্ট্রাক্ট পেয়েছিলো। এ কথা তুলতেই তর্কাতর্কিটা হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যায়। লোকটার সাথে ছিলো আরো দু-জন, হায়দারভাই একা ঐ তিনজনের সাথে মারামারি শুরু করে দিয়েছিলেন।

আমিও মনে করি ক্লাবের মারামারিটার সাথে খুনের কোন সম্পর্ক নেই। ইমতিয়াজ আর তার লোকজন আরো আগে থেকে হায়দারভায়ের পিছু নিয়েছিলো। কাকতালিয়ভাবে মারামারির পরদিন খুনটা হয়েছে, এই যা।

খুনটা যে ইমতিয়াজ করেছে সেটা নিছক আমার সন্দেহ ছিলো না। এর পক্ষে জোড়ালো একটা প্রমাণও ছিলো। আততায়ির আক্রমণে নিহত হবার আগে নিজের বিছানার চাদরে একটা কিছু লেখার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

অপূর্ণাঙ্গ একটি অক্ষর! মাত্রাবিহীন ‘হ’!

কিন্তু আমি জানতাম, উনি আসলে জীবনের শেষরক্তহবিন্দু দিয়ে একজনের নাম লিখে যেতে চেয়েছিলেন।

ইমতিয়াজ।

‘ই’ লিখতে গিয়েই ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে।”

আমার এমন কথা থানার ওসি আলী ইকরামসাহেব আমলেই নেয়নি। সে ধরেই নিয়েছিলো, আমার আর হায়দারভায়ের সাথে আগে থেকেই ঝামেলা চলছিলো বলেই ইমতিয়াজকে ফাঁসাতে চাইছি। কিন্তু আমি যখন নাছোরবান্দার মতো চাপাচাপি করতে শুরু করলাম তখন নাম-কা-ওয়াস্তে ইমতিয়াজকে থানায় ডেকে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলো ভদ্রলোক। আমিও তখন উপস্থিত ছিলাম সেখানে। খুবই গোবেচারার মতো মুখ করে ইমতিয়াজ দাবি করেছিলো ঐ দিন সে ঢাকার বাইরে ছিলো তার নেতার সঙ্গে। চাইলে নেতার সাথে কথা বলে দেখতে পারে পুলিশ। শুধু নেতাই নন, আরো অনেকেই সাক্ষি দিতে পারবে এ ব্যাপারে।

ওসি আলী ইকরাম আর বেশি ঘাটায়নি. ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনাও সম্ভব হয়নি। আমার স্পষ্ট মনে আছে, ওসির রুম থেকে বের হয়ে যাবার সময় সবার অলক্ষ্যে অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু চোখ টিপে দিয়েছিলো ঐ খুনি। তার লম্পট ঠোঁটে তখন দুর্বোধ্য হাসিও দেখেছিলাম আমি। সত্যি বলতে, আমার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছিলো কয়েক মুহূর্তের জন্য। সব কিছুই পরিষ্কার হয়ে গেছিলো আমার কাছে।

মিলির খুনি-ধর্ষকই হয়াদারভাইকে খুন করেছে!

কিন্তু তাকে ধরার মতো কোন কিছু আমার হাতে ছিলো না। এক অসহায় আর বিপর্যন্ত অবস্থায় নিপতিত হলাম আমি। মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়লাম। দিনগুলো কিভাবে কেটে গেছিলো বলতে পারবো না। হায়দারভায়ের মৃত্যুর জন্য নিজেকেও দায়ি মনে করতে শুরু করলাম। বিনা নোটিশে থানায় যাওয়া বন্ধ করে দিলাম, নিজের ঘরে বসে কাটিয়ে দিতাম সারাটা দিন। কিন্তু বাড়িতে বসে বইও পড়তাম না। হায়দারভায়ের মৃত্যু আমার পাঠক সত্তাকে খুন করেছিলো! একটা ঘোরের মধ্যে জীবন-যাপন করছিলাম যেন।

মৃত্যুর আগে হায়দারভাই আমার গা ছুঁয়ে প্রতীজ্ঞা করেছিলেন এ জীবনে আর কখনো মদ স্পর্শ করবেন না। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেই আমিই কি-না ধীরে ধীরে মদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে শুরু করলাম।

প্রচণ্ড দুঃখের সেই সময়টায় নিজের কষ্ট ভুলে থাকার জন্য, আমার চূড়ান্ত অসহায়ত্বকে ভুলে থাকার জন্য, যাবতীয় সব কষ্ট থেকে যোজন যোজন দূরত্বে চলে যাবার জন্য আমি একটা আশ্রয় খুঁজে নিলাম। আমার কী করা উচিত সেটাও বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তবে এটুকু বুঝতে পারছিলাম, একটা দমবন্ধ অবস্থায় নিপতিত হয়েছি আমি। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হবে।

এমনই এক দিন, বিষন্ন বিকেলে নিজের ঘরে বসে মদ পান করছিলাম, অন্যসব দিনের তুলনায় একটু বেশিই পান করে ফেলেছিলাম সে-দিন। কেমন একটা ঘোরলাগা মুহূর্ত তৈরি হয়েছিলো বোঝাতে পারবো না। বিক্ষিপ্তভাবে অনেক কিছু ভেবে যাচ্ছিলাম। হায়দারভায়ের সাথে আমার নানান স্মৃতি আধিপত্য করলেও রামজিয়ার কথাও মনে পড়ছিলো বার বার। হায়দারভায়ের খুন হবার পর তার সাথে আমার আর কোন ধরণের যোগাযোগ হয়নি, দেখা করা তো দূরের কথা।

এমন সময় ঘোলাটে দৃষ্টিতে আমার ঘরের দরজার সামনে একটা অবয়ব দেখতে পাই। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে সে। দৃষ্টি পরিষ্কার করে ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করলাম।

রামজিয়া!

বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো। নির্ঘাত মদের প্রভাবে দৃষ্টিবিভ্রমের শিকার হচ্ছি। আমার যুক্তি-বুদ্ধি এতোটা লোপ পায়নি যে, এটা বিশ্বাস করতে হবে রামজিয়া শেহরিন আমার খোঁজে আমার ঘরে চলে এসেছে! আমি কোথায় থাকি সেটা তো সে জানে না। এসব নিশ্চয় আমার অবচেতন মনের কারসাজি।

অবয়বটা নড়তে শুরু করলো। আস্তে আস্তে এগিয়ে এলো আমার দিকে। এবার আর ভুল হলো না। চোখের সামনে আমি সত্যি সত্যি রামজিয়াকে দেখতে পাচ্ছি!

“আপনার এই অবস্থা!” বিস্মিত হয়েছিলো সে। “মাই গড! আপনি এসব খাওয়া শুরু করেছেন?!”

রামজিয়ার মুখের দিকে চেয়ে রইলাম আমি। তার মোহনীয় কণ্ঠের কথাগুলো যেন আমার দু-কানে প্রবল বেগে ধেয়ে আসতে লাগলো। সেই সাথে ভনভন করে একটা শব্দ!

“হায়দারসাহেবের খবরটা শোনার পর পর আমি অনেকবার থানায় যোগাযোগ করেছিলাম কিন্তু আপনাকে পাইনি। ওরা বললো, বেশ কয়েক দিন ধরে নাকি থানায় যাচ্ছেন না।”

আমার বিশ্বাস হলো না এটা সত্যি। মনে হলো স্বপ্ন দেখছি। কিংবা বিভ্রম।

“…থানার একজনের কাছ থেকে আপনার বাসার ঠিকানাটা পেয়েছি…”

রামজিয়া আরো কিছু বলছিলো কিন্তু সেই সব কথা আমার কানে এসে পৌঁছাচ্ছিলো না। আমার দৃষ্টি ঝাপসা হতে শুরু করলো। টের পেলাম হৃদস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছে। কেমন হাসফাস করছে বুকের ভেতরটা।

তার পর আর কিছু মনে নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *