উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

হালদার বাড়ির চোর

হালদার বাড়ির চোর

একদিন স্কুলে টিফিন পিরিয়ডে দেবুকে আড়ালে ডাকল শিব। উত্তেজিত চাপা স্বরে বলল, একটা কেস পেয়েছি। দারুণ রহস্যময় ব্যাপার।

কী?—জানতে চায় দেবু।

—চুরি। কিন্তু সাধারণ চুরি নয়। অসাধারণ।

ব্যাপারটা খুলে বল দেখি।–দেবু তাড়া দেয়।

—হালদার পাড়ায় নরেন হালদারের বাড়িতে মাসখানেক যাবৎ কিছু অদ্ভুত ধরনের চুরি হয়েছে। হয়েছে না বলে, বলা উচিত হচ্ছে।

নরেন হালদার মানে পিন্টুর বাবা?

হ্যাঁ। বাড়ির লোকের বদনামের ভয়ে পিন্টুরা এখনও বাইরে বেশি কিছু বলছে না। তবে পাড়ার অনেকেই দেখলাম মোটামুটি জানে কেসটা।

—কী চুরি হচ্ছে?

—ভেরি ইন্টারেস্টিং। মাথামুন্ডু নেই। কী কী চুরি হয়েছে জানিস? ডিম, আলু, গরমমশলার প্যাকেট, টফি, কিছু খুচরো পয়সা সন্দেশ মেয়েদের চুলের ফিতে টিপ এমনি অদ্ভুত সব জিনিস লোপাট হয়ে গেছে বাড়ি থেকে কাউকে ধরা যায়নি। একসঙ্গে বেশি নেয় না। রান্না ঘরে রাখা পাঁচটা ডিমের মধ্যে সকালে দেখা যায় একটা কম। আলু, হলুদ, এমনই টুকিটাকি মশলা আনাজ প্রায়ই কমে যাচ্ছে। রান্নাঘরে তালা দিচ্ছে রাতে। তবু জিনিস উধাও হয়েছে।

শুধু রান্নাঘর থেকেই যাচ্ছে?—দেবুর প্রশ্ন

—তা কেন? খাবার ঘর থেকেও গেছে। শোবার ঘরের টেবিলের ওপর থেকে গেছে পিন্টুর দুটো টফি। পরে খাবে বলে বিকেলে টেবিলের ওপর রেখেছিল, রাতে দেখে উধাও। পয়সাও গেছে কিছু খুচরো ও আর দুটো এক টাকার নোট। পিন্টুর মা খুচরো টাকা পয়সা রাখেন শোবার ঘরের তাকে রাতে। তাই থেকে গেছে। সকালে আবিষ্কার করেন। একইভাবে কিছু খুচরো পয়সা আর নোট গচ্চা গেছে পিন্টুর মেজকাকার অন্য ঘর থেকে। আশ্চর্য ব্যাপার সবপয়সা না। কিছুটা মেরে দেয়। হয়তো চোর ভাবে অল্প অল্প সরালে মালিক খেয়াল করবে না। তা হয়তো অনেকদিন ধরেই সরাচ্ছে, খেয়াল হয়নি আগে।

কোনো দুষ্টু বাচ্চা ছেলে বা মেয়ের কীর্তি মনে হচ্ছে।—ভেবে বলে দেবু।

—হালদার বাড়ির লোকেও তাই ভেবেছিল প্রথমে। বাড়িতে জনা পাঁচেক আট থেকে বারো-তেরো বছর বয়সি বাচ্চা আছে ও সবাইকে বেদম জেরা করেছে বড়রা। ছোকরা চাকরটাকেও জেরা করেছে। কিন্তু কারও মুখ থেকে কিছু বের করা যায়নি। শুধু পিন্টুর ছোট ভাইটা স্বীকার করেছিল যে সে দিদির একটা টফি চুরি করেছিল মাত্র। আর একটা জিনিস ও নেয়নি।

তেমন দামী জিনিস তো চুরি হয়নি। অত ঘাবড়াবার কী?

—দেবুর কণ্ঠে তাচ্ছিল্য।

—কে বলল দামি জিনিস যায়নি? পিন্টুর দিদির দামি রিস্টওয়াচ গেছে। দুপুরের শো-য়ে লাভপুরে সিনেমা দেখে এসে খাবার ঘরে কুলুঙ্গিতে ঘড়ি খুলে রেখে মুখ হাত ধোয়, টিফিন খায়। রাতে শোবার আগে ঘড়ির কথা মনে পড়তে খোঁজ করে দেখে ঘড়ি উধাও।

আর গত পরশু ঘটেছে আরও রহস্যময় কাণ্ড। পিন্টুর বাবার ক্যাশ বাক্সের চাবি উধাও হয়েছে ওনার শোবার ঘর থেকে। রাতে মনিব্যাগ আর রুমালে বাঁধা চাবি ছিল টেবিলে। আলমারিতে তুলতে ভুলে গিয়েছিলেন। সকালে দেখেন রুমালসুদ্ধ চাবি নেই অথচ মনিব্যাগ রয়েছে। পিন্টুর বাবা ক্যাশ বাক্স বদলাতে বাধ্য হয়েছেন। ডুপ্লিকেট চাবি আছে যদিও। কিন্তু যদি কোনো দুষ্টুলোকে চাবি সরিয়ে থাকে? ওদের ব্যবসার প্রচুর টাকা প্রায়ই থাকে ওই বাক্সে ওরা বেশ ভড়কে গেছেন। কী করবেন ভেবে পাচ্ছেন না।

তুই এত খবর পেলি কোত্থেকে?—দেবু জিজ্ঞেস করে।

—পিন্টুর থেকে। ওর পাশের বাড়ির ভুলোর মুখে প্রথমে শুনি কিছু আলগা খবর। তখন পিন্টুকে চেপে ধরি। আর আমি যে গোয়েন্দাগিরিতে নেমেছি সেটাও ওকে জানাই। বলি, হেল্প করতে চাই। কয়েকবার পিন্টুর সাথে ওদের বাড়িঘর ঘুরে দেখেও এসেছি নানান ছুতোয় তবে ওর বাড়ির আর কেউ জানে না আমার আসল উদ্দেশ্য। পিন্টুকে বলা আছে, সন্দেহজনক কিছু ঘটলেই আমায় জানাতে।

ওদের বাড়ির কাজের লোকেরা কেমন? মানে বাড়ির ভেতর যাদের যাওয়া আসা?—প্রশ্ন করে দেবু।

—পিন্টু তো বলছে, যারা আছে সবাই পুরনো আর বিশ্বাসী লোক। নতুন ছোকরা চাকরটাকে চুরি শুরু হওয়ার কদিন বাদেই ছাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

—ওরা পুলিশে খবর দিচ্ছে না কেন?

—ওদের ভয় পুলিশ ডেকে কোনও লাভ হবে না। কলা, সন্দেশ, ডিম চুরির কথায় পুলিশ হয়তো ঠাট্টাই করবে। ঘড়ি বা চাবির ব্যাপারটা যদিবা সিরিয়াসলি নেয়। তাছাড়া বাড়ি সুদ্ধুকে জেরায় অস্থির করে তুলবে। তারপর পেটপুরে ভোজন করে বিদায় নেবে। আসল কাজ কিসু হবে না। আর পুলিশ এলে খবরটা গোটা গাঁয়ে রটবে। লোকে মজা পাবে। বাড়ির নিরীহ কাজের লোকেরা হয়তো ভয় পেয়ে পালাবে। অর্থাৎ কাজের চেয়ে অকাজ বেশি। তাই আপাতত নিজেরাই চেষ্টায় আছে রহস্য উদ্ঘাটনের।

দেবুর চোখ আধবোজা। দৃষ্টি নত। মাঝে মাঝে তাল দিচ্ছে আঙুলে। অর্থাৎ সে ভাবছে। একটু পরে সে বলল,—কোনো বাড়ির লোকের কাজ।

আমারও তাই ধারণা।—শিবের সায়।

হয়তো একজনের কাজ নয়। ডিম টফির সঙ্গে ঘড়ি চুরি মেলে না। হয়তো ঘড়ি চোর এই সুযোগে ডিম চোরের ঘাড়ে তার অপরাধটি চাপিয়ে দেওয়ার মতলবেআছে? আর আর,–একটু ইতস্তত করে বলে দেবু : ও বাড়িতে বা আশেপাশে কারও পোষা বাঁদর আছে?

খানিক অবাক হয়ে থেকে দেবুর কথার মর্ম কিঞ্চিৎ উদ্ধার করে শিব। বলে,—মানে বাঁদর চোর?

—হতে পারে। এরকম ট্রেনড বাঁদরের কথা পড়েছি।

—কই শুনিনি তো। ঠিক আছে, খোঁজ নেব আরও।

দেবু বলল,—পিন্টুর ছোটকাকা, যে যাত্রা করে, তার একটু বদনাম ছিল হাতটানের। তাই না?

—হুঁ।

—দেখেছি লাভপুরে কালীমাতা কেবিনে আর গাঁয়ে কালোর দোকানে, পিন্টুর ছোটকাকা আড্ডা মারে। খুব সম্ভব ধারে খায়। খোঁজ নে, ঘড়ি চুরির পরই মনুদা হঠাৎ কিছু ধার শোধ করেছে কিনা?

—ইঙ্গিতটা ধরতে পারে শিব। নীরবে সায় দেয় মাথা নেড়ে। এবং দেবুর বুদ্ধিকে মনে মনে আবার তারিফ জানায়।

টিফিন শেষের ঘণ্টা বাজে। ক্লাসে যেতে যেতে দেবু বলে,—ইন্টারেস্টিং কেস। নজরে রাখ। খবর দিস।

তিনদিন বাদে একদুপুরে শিব উত্তেজিত ভাবে দেবুর কাছে হাজির হয়ে বলল,—জানিস, হালদার বাড়িতে আর এক কাণ্ড হয়ে গেছে। ফের চুরি। এবার গেছে পিন্টুর বাবার দামি পাথরবসানো সোনার আংটি।

কীরকম?–দেবু জানতে চায়।

কাল বিকেলে নরেন জ্যাঠা দুটো টবের মাটি তৈরি করেন গোলাপ গাছ পোঁতার জন্যে। তার আগে হাতের আংটিটা খুলে রাখেন রান্নাঘরের সামনে দাওয়ায়। কাজ সেরে হাতটাত ধুয়ে চলে যান। রাতে খাবার পর খেয়াল হয় আংটির কথা। মাঝে মাঝে ওঁর এমনই আংটি খুলে রাখা অভ্যেস। ভুলো মানুষ। প্রায় ভুলে যান কোথায় আংটি রেখেছেন। তবে হারায়নি। খুঁজে পাওয়া গেছে ঠিক।

—কিন্তু এবার পাওয়া যাচ্ছে না?

—হ্যাঁ তাই। আলো নিয়ে বারান্দায় তন্নতন্ন করে খোঁজা হয়েছে রাতে। পাওয়া যায়নি। সকালেও খুঁজেছে, পায়নি।

—আংটি ঠিক কোথায় রেখেছিলেন মনে আছে ওঁনার?

—সেই তো মুশকিল। নার্ভাস হয়ে গুলিয়ে ফেলেছেন। কখনো বলছেন এ জায়গায়, কখনো আর এক জায়গায়। আবার বলছেন, হয়তো চৌবাচ্চার পাড়ে রেখেছিলুম।

বারান্দা আর চৌবাচ্চার ধার দিয়ে গেছে নর্দমা। যদি আংটি গড়িয়ে নালায় পড়ে তারপর জলের ধাক্কায় দূরে চলে যায় বা কাদা ময়লায় ডুবে যায়—তাও হতে পারে। সুতরাং সেখানে খোঁজা দরকার। এটুকু ঠিক যে বারান্দায় বা চৌবাচ্চার পাড়ে নেই।

—বাইরের লোক কেউ এসেছিল ওখানে বিকেলে?

—না। ওদের পুরনো কাজের লোক হারু গিয়েছিল বটে একবার। কিন্তু ও খুব বিশ্বাসী। আর ছোকরা বাগালটা হলফ করে বলেছে যে সে বিকেলে বা তারপরে বারান্দার ধারে কাছে যায়নি।

—এখনো খোঁজা চলছে?

—হ্যাঁ। নর্দমার কাদা তোলা হচ্ছে। আর পিন্টুর বাবা কাকাদের মধ্যে খুব একটা তক্ক হয়ে গেছে এই নিয়ে।

—কেন?

পিন্টুর মেজকাকা বলছেন, পুলিশ ডাক। এরকম বারবার চুরি হজম করে যাওয়া ঠিক নয়। কিন্তু পিন্টুর বাবা আর ছোটকাকার মত আরও ভালো করে খোঁজা হোক। আসলে পিন্টুর বাবা লজ্জা পাচ্ছেন, যদি আংটিটা চুরি না হয়ে কোনো গর্তে টর্তে পড়ে গিয়ে থাকে? তাঁর দোষে মিছিমিছি হ্যাঙ্গামা ডাকা। আর পিন্টুর ছোটকাকা ভেবেছেন, যদি পুলিশ এসে ওর যাওয়া বন্ধ করে দেয়?

—কোথায় যাওয়া?

—যাত্রা করতে কীর্ণাহারে। আজ রাতে পালা। দুপুরে রওনা হবেন। ওঁর মেইন পার্ট আটকে গেলে পার্টি ডুববে। ছোটকাকার মত। আজ গোটা দিন খোঁজা হোক। না পাওয়া গেলে উনি কাল সকালে ফিরলে তখন যহোক করা যাবে। এতক্ষণ বোধহয় উনি রওনা হয়ে গেছেন যাত্রা দলের সঙ্গে

তোকে এত খবর দিল কে? পিন্টু?

—হ্যাঁ। আমার ওপর ওর খুব ভরসা। আমি একটা কাজ করেছি।

–কী?

—ডাকুকে চিনিস তো? বায়েন পাড়ার। ও ভারতী অপেরা মানে পিন্টুর ছোটকাকার যাত্রা পার্টিতে চাকরি করে। দলের সঙ্গে যায়। মোট বয়। ফাইফরমাস খাটে। ডাকু আমার খুব ভক্ত। ওকে ফিট করে দিয়েছি পিন্টুর কাকার পিছনে। পার্টির বাইরে কোনো বাড়ি বা দোকানে গেলে ফলো করতে। অর্থাৎ আংটি যদি উনি সরিয়ে থাকেন, কোথাও লুরিয়ে রাখবেন নিশ্চয় বাড়ির বাইরে। যদি পুলিশ আসে, খবরটা কাজে লাগতে পারে। কী বলিস?

ঠিক করেছিস।—সায় দেয় দেবু।

শিব আপাতত বিদায় নিল।

পরদিন ভোরে শিবের ডাক শুনে দেবু বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।

শিবের মুখ চোখে কেমন একটা হতচকিত ভাব দেখে দেবু অবাক হয়ে বলে,—কী ব্যাপার, এত সকালে?

শিব জবাব না দিয়ে বাইরে দাওয়ায় বসে পড়ে ফোঁস্ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে শুধু,—ধুস্।

—কী হল?

হালদার বাড়ির মিস্ট্রি সলভড়। চোর কট্।—শিব চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করে।

সেকী! কখন? কে?—দেবু উত্তেজিত।

শিবের আচরণে কিন্তু উত্তেজনার আভাস নেই। অতি নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বলে,—একটু আগে পিন্টু এসে রিপোর্ট করে গেছে।

তা বুঝলুম। কিন্তু চোরটা কে?—দেবু অধৈর্য।

একটা মস্ত ধেড়ে ইঁদুর।

—অ্যাঁ!

—হুঁ তাই।

শিব চোর ধরার যা বর্ণনা দেয় তার সারমর্ম হল : গতকাল রাত নটা নাগাদ। তখনো হালদার বাড়িতে সার্চ চলছে আংটির খোঁজে। এইসময় পিন্টুর ছোট ভাই মিন্টু দেখে একটা মস্ত ইঁদুর ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ল ভাঁড়ার ঘরের কোণে একটা গর্তে। মাটির ঘর। ইঁদুরের গর্তে পরে বিষাক্ত সাপ যদি বাসা বাঁধে? তাই হারু শাবল দিয়ে গর্তটা খুঁড়ে ফেলে, গর্ত বুজিয়ে দিতে। ইঁদুর বেরল। ওটাকে মারাও হল। দেখা গেল বিরাট গর্ত এবং সেই গর্তে আবিষ্কার হল কী জানিস? পিন্টুর বাবার আংটিসমেত গত কয়েক মাসে হালদার বাড়ি থেকে খোওয়া যাওয়া হরেক রকম জিনিস—পিন্টুর দিদির ঘড়ি। রুমালে বাঁধা ক্যাশ বাক্সের চাবি। টফি নেই তবে রাংতাটা রয়েছে। মশলার ঠোঙা। ডিম। এক টাকার কুচিকুচি নোট—এমনই কত কী! খাবার জিনিসগুলো অবিশ্যি মেলেনি। অর্থাৎ ইঁদুরের পেটে গেছে। কিছু জিনিস আবার পাওয়া গেল যেগুলো হারিয়েছে বলে খেয়ালই করেনি বাড়ি লোকে। ব্যাপার দেখে সব্বার চক্ষু চড়কগাছ।

শিব ফের একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মন্তব্য ছাড়ে,—গোয়েন্দাগিরিতে ঘেন্না ধরে গেল। এত মাথা ঘামাবার পর এই কালপ্রিট! কাল রাতে ভালো ঘুমই হয়নি ভেবেভেবে। পিন্টুর মা নাকি রসিকতা করে বলেছেন যে ইঁদুরটার মানুষ হওয়ার শখ হয়েছিল।

দেবু হেসে ফেলে। তারপর বলে,—আমাদের একটা সিদ্ধান্ত কারেক্ট।—কোটা?

—চোর বাড়িরই কেউ।

হুম্।—শিবের মুখে মোটেই খুশির ছাপ ফোটে না।

দেবু বলে,– এ কেসটা থেকে আমাদের একটা শিক্ষা হল বলতে পারিস।

—কী শিক্ষা?

—শুধু মানুষকেই অপরাধী সন্দেহ করা উচিত নয়। তা হরেক রকম জীবই হতে পারে। হুঁ। হজমিগুলি দে তো একটা।—নিরাশ শিব আপাতত সান্ত্বনা খোঁজে।