উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

দশক পূর্তি উপাখ্যান – ১

এক

ফাল্গুনের সকাল। ন’টা নাগাদ।

দেবু দোতলায় নিজের ঘরে বসে একখানা গল্পের বই পড়ছে। মাঝে মাঝে জানলা দিয়ে তাকাচ্ছে বাইরে। শিবের আসার কথা।

একটু বাদে এল শিব। হনহনিয়ে। এসেই বিনা বাক্যব্যয়ে দেবুর হজমিগুলির শিশি থেকে দুটো গুলি বের করে মুখে ফেলে বসল চেয়ারে। মুখ থমথমে।

কীরে? মিটিংয়ে কী হল?—জিজ্ঞেস করে দেবু

ওই যা যা আগে আলোচনা হয়েছিল সবই হবে। বাড়তিও যোগ হয়েছে। বহুৎ ঝামেলা। কত আবদার। আরে জোগাড় করা কী অত সহজ! এখন হ্যাপা সামলাও। রাত আটটা অবধি মিটিং হয়েছে।

বলিস কী? বিকেল তিনটে থেকে আটটা!

টিফিন দিয়েছিল তো?–দেবু অবাক :

তা দিয়েছিল। তবে কান ভালোাপালা হয়ে গেছে। উঃ কী তক্কাতক্কি!

তা আইটেম কী কী হল?

ওই সাধারণ সভায় যা যা ঠিক হয়েছিল মোটামুটি সবই থাকল। গান, নাচ, আবৃত্তি, মুকাভিনয়। গরম গরম, দু তিনখানা বক্তৃতা। এইসব। আবার একটা আইটেম বেড়েছে।

কী আইটেম?

কবিতা লেখার প্রতিযোগিতা। গ্রামের ছেলেমেয়েদের মধ্যে। উনিশ বছরের নিচেরা যোগ দিতে পারবে। আন্ডার নাইন্টিন এজ গ্রুপ। ওই বেটা নদীর কীর্তি।

মানে?

ননীগোপাল আবদার ধরল, একটা কবিতা লেখার প্রতিযোগিতা চাই। মধুরাপুর করেনি। অতএব এটা হবে একদম নতুন জিনিস। চন্দনার প্রেস্টিজ বাড়বে। আরে ওর মতলবটা যে কী তা কী আর কেউ বোঝেনি? আমরা অত বোকা?

কী মতলব?

কী আবার? ওই ননীটা যে একটু আধটু পদ্য লিখতে পারে। কলেজ ম্যাগাজিনে এবার ওর পদ্য বেরিয়েছে। তাই ভারি ডাট্। ভাবল, এই মওকায় ওর একটা এলেম দেখাবে।

কীন্তু শুধু কবিতা কেন? দেবু বলে : তবে তো গান আবৃত্তি অনেক কীছুরই কম্পিটিশন করতে হয়।

তাই হওয়া উচিত।—সায় দেয় শিব : কীন্তু তাহলে যে প্রোগ্রাম বিরাট হয়ে যাবে। অনুষ্ঠান তো একদিনের। সে সব কম্পিটিশনের কথা উঠেছিল। কীন্তু বাদ গেছে। শুধু ননীরটাই রয়ে গেল।

কেন?

—কেন আবার? শিব ফুঁসে ওঠে : ননীগোপালের বাবা যে ক্লাবে মোটা চাঁদা দেন। আবার ভাইচ্ পেছিডেন্। ওর আবদার ফেলা যায়? বেচুদা বারকয়েক না-না করেও শেষে রাজি হল।

ননীর বাবা কী বললেন?

উনি চুপ করেছিলেন। তবে যেরকম ঘাড় নাড়ছিলেন, মনে হচ্ছিল, ছেলের কথাতেই ওঁর সাপোর্ট।

এটা উচিত নয়।

ননী কী সোজা চিজ!–শিব মুখ ভেংচে বলে : ও নিজে মোটেই লিখবে না। ওর লেখা আমি দেখেছি, কেমন স্ট্যান্ডার্ড। কলেজ ম্যাগাজিনে যেটা দিয়েছিল ওটা মোটেই ওর নিজের লেখা নয়। নির্ঘাৎ ওর ছোটমামার লেখা। বর্ধমানে যিনি থাকেন।

কী করে জানলি?—দেবু কৌতূহলী।

কী করে? তবে শোন। ম্যাগাজিনে লেখা দেবার ক’দিন আগে আমি বর্ধমানে গেছি বুট কীনতে। স্টেশনে ননীর সঙ্গে দেখা। ওর হাতে একটা বই ছিল। হঠাৎ বইটা হাত ফসকে পড়ে যায় প্ল্যাটফর্মে। বইয়ের ভিতর থেকে কয়েকটা লেখা কাগজ ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে। আমিও কুড়োচ্ছি। একটা লেখা কাগজ, মনে হল কবিতা। যেই পড়তে গেছি, ননী হাঁ হাঁ করে কেড়ে নিল। ওর নিজের হাতের লেখা নয়। আমি ততক্ষণে দুলাইন পড়ে ফেলেছি। পরে ম্যাগাজিনে ওর লেখা ছাপা হতে অবাক হয়ে দেখি, ওই দুলাইন রয়েছে কবিতাটায়। সন্দেহ হল। জানতাম যে ননীর এক মামা থাকে বর্ধমানে। কবি হিসেবে বেশ নাম করেছেন।

একটু দম নিয়ে শিব আবার বলতে থাকে, একটু ডিটেকটিভগিরি করলাম। আমাদের ম্যাগাজিনের সহ সম্পাদক দীপঙ্করকে পটিয়ে পাণ্ডুলিপির ফাইলটা চেয়ে উল্টে দেখলাম ননীর কবিতাটার হাতের লেখা ননীর অরিজিনাল হস্তাক্ষরে। এরপর একদিন ননীর বাড়ি গিয়ে কথায় কথায় ওর মামা ওকে যে একখানা নিজের লেখা কবিতার বই প্রেজেন্ট করেছে সেটা দেখতে চাইলাম। ননী গর্ব ভরে বইটা দেখাল। দেখলাম ওর মামার হাতের লেখা। সেই যে স্টেশনে দুটো লাইন পড়ে ফেলেছিলাম, অবিকল সেই ধাঁচের হস্তাক্ষর।

এবার একদিন, শিবের চোখের তারা উত্তেজনায় ঘুরতে থাকে : ঝপ্ করে ননীকে বললাম, ম্যাগাজিনে তোর কবিতাটা দারুণ। প্রথম লাইন দুটো যেন কী? ইঃ একদম ভুলে গেছি! বেটা আমতা আমতা করে যা বলল, মোটেই মিলল না। বল তুই। নিজের লেখা প্রথম ছাপা কবিতার প্রথম দু লাইন কেউ ভুলে যায়? তাও দিন দশেকের মধ্যে!

তাই বলছি, শিব এবার দাঁড়ি টানে : এবারও ওর মামার কাছ থেকে লিখিয়ে নিয়ে কম্পিটিশনে ফার্স্ট প্রাইজ মারবে, এই তাল করেছে ননী। ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড তিনটে–

প্রাইজ থাকছে।

হুম্! দেবু ঠোঁট চাপে। মুখে রাগের আঁচ। বলে : কী বিষয়ে লিখতে হবে কবিতাটা?

আমার গ্রাম। একটাই বিষয়।

ক’লাইন?

বারো থেকে চোদ্দো লাইন। ছোট কবিতা।

কবের মধ্যে দিতে হবে?

আজ থেকে পনেরো দিনের মধ্যে।–জানায় শির।

জাজ্‌ কে হবে? মানে ফার্স্ট সেকেন্ড থার্ড বিচার করবেন কে?

তাও ঠিক হয়েছে। লাভপুরের সত্যসাধন দাস কবিশেখর। উনি রাজি না হলে মগরা স্কুলের বাংলার টিচার কীরীটিবাবুকে বলা হবে। তিনিও কবি।

দেবু বলল, গানে কী সব লোকাল আর্টিস্ট?

হ্যাঁ, বেশিরভাগই তাই। ধারে কাছে যাদের পাওয়া যাবে। আমাদের ফান্ড তো বেশি নয়। তবে কলকাতা থেকে দু একজন নামকরা শিল্পী আনার চেষ্টা হবে। নইলে প্রেস্টিজ থাকে না। গতবছর মথুরাপুর কলকাতার একজন বেশ নামকরা রেডিও আর্টিস্ট এনেছিল।

সভাপতি? প্রধান অতিথি?—জিজ্ঞেস করে দেবু।

সভাপতি হবেন পঞ্চায়েত প্রধান। আর প্রধান অতিথি চাই কোনো নামী সাহিত্যিককে। মথুরাপুর একজন বেশ নামকরা সাহিত্যিক এনেছিল। গাঁয়ের মাতব্বরদের বলা হবে গাইয়ে আর সাহিত্যিক জোগাড়ে সাহায্য করতে।

গ্রামের কেউ চান্স পাবে না গানে? দেবু জানতে চায়।

শিব বলে,—আলবাত পাবে। গাঁয়ের ক্লাবের ফাংশন। গাঁয়ের ছেলেমেয়েরা চান্স পাবে না, তা কী হয়? তবে গাঁয়ে একা গাইবার মতো তো শুধু বৈকুণ্ঠ ঠাকুর। আর সব কোরাস। হরিহরের মুকাভিনয় থাকবে। ও দারুণ দেখায়। অনেক দূরে দূরে ডাক পায়। হরিহর আমাদের গ্রামের গৌরব। মোট ঘণ্টা তিনেকের প্রোগ্রাম।

তোর কী ডিউটি?—দেবু জানতে চায়।

শিব বলল–যত খাটাখাটনি ছোটাছুটি এই শম্মার ঘাড়ে। প্যান্ডেল বাঁধা, স্টেজ তৈরি, আর্টিস্ট আনা, রিহার্সালের বন্দোবস্ত করা কত কী।

তাহলে তোর আর টিকী দেখা যাবে না একমাস, কী বলিস?

যাঃ। শিব লজ্জা পায়, ঠিক দেখা পাবি। সব কেমন এগুচ্ছে রিপোর্ট করে যাব তোমাকে। তুই তো কমিটিতে এলি না কীছুতেই। বেচুদা দুঃখ করছিল।

দেবু বলল, নারে ভাই, অত হইচই আমার পোষায় না। তবে দরকার পড়লে ডাকীস। যতটা পারি হেল্প করব। বলিস বেচুদাকে।

কীসের প্রোগ্রাম? কীসের অনুষ্ঠান? ব্যাপারটা খুলে বলা যাক।

বীরভূম জেলায় ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে চন্দনা গ্রাম। গ্রামের ক্লাব চন্দনা স্পোর্টিং এই বছর তাদের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে একটা জব্বর অনুষ্ঠান করবে ঠিক করেছে। লোকে পঁচিশ বছর, পঞ্চাশ বছর, পঁচাত্তর বা একশো বছরে পা দিলে উৎসব করে। দশ বছরে পৌঁছে আবার কী উৎসব?

কারণটা মথুরাপুর। তাদের পাশের গ্রাম। দু-গ্রামে খুব রেষারেষি। গত বছর মথুরাপুর স্পোর্টিং তাদের দশ বৎসর পূর্তি উপলক্ষে মহা সমারোহে এক অনুষ্ঠান করে। তাইতে চন্দনারও জেদ চেপেছে যে দশক জয়ন্তী পালন করতে হবে। হইচই করে। মথুরাপুরকে ডাউন দেওয়া চাই।

চন্দনা স্পোর্টিংয়ের সেক্রেটারি বেচুদা গ্রামের লোকজনকে ডেকে বেশ বড় একটা সভা করে প্রস্তাব পেশ করেন। সবাই সমর্থন জানায়। একটা অনুষ্ঠান কমিটি হয়। তারাই আসল ব্যবস্থা করবে।

শিবকে নেওয়া হয়েছে ওই কমিটিতে। কিন্তু দেবু ঢোকেনি।

শিব দেবু পরম বন্ধু। দু’জনেই পড়ে কলেজে, সেকেন্ড ইয়ারে।

তেঁতুলতলায় একটা উঁচু শিকড়ে বসে গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে আকাশ পানে উদাস নয়নে চেয়ে বসেছিল বটকৃষ্ণ। বটকৃষ্ণ স্কুলে পড়ে ক্লাস টেন-এ।

দেবু গুটিগুটি তার কাছে গিয়ে ডাকল, বট, একা বসে বসে কী ভাবছিস?

বট চমকে অপ্রতিভ হেসে বলল,—ও দেবুদা! এই বসে আছি।

দেবু তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে বলে মনে হচ্ছে কবিতা ভাবছিস?

বট ভারি লাজুক হেসে ঘাড় নামিয়ে বলল,—হে তাই। ঠিকই বলেচ। একটা যেন কবিতা আসছে মনে। ঠিক ধরতে পারছি না। বুঝলে দেবুদা, কাব্য সরস্বতীর সাধনা যে কী কঠিন!

দেবু জানে বট ঘোর কবি। কত পত্রিকায় বট অজস্র কবিতা পাঠায়। দুঃখের বিষয় একটা কবিতাও এ পর্যন্ত কোথাও ছাপা হয়নি।

নাঃ ভুল বলা হল। বেরিয়েছে একটা। ওর যখন বারো বছর বয়স। ওর কাকার সম্পাদনায় বের করা হাতে লেখা পত্রিকায়। দুষ্টু জনে বলে, আদরের ভাইপোকে উৎসাহ দিতে রচনাটায় নিজে কিঞ্চিৎ কলম চালিয়ে বের করেছিলেন বটর কাকা।

ব্যস, ওতেই কাল হল। এরপর থেকে বটর কলমে অবিরাম কাব্য স্রোত উৎসারিত হচ্ছে। দেবু বলল,—চন্দনার দশক পূর্তি কবিতা কম্পিটিশনের লেখা ভাবছিলি বুঝি?

বটকেষ্টর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ঠিক বলেছ দেবুদা। ভাবছি একটা কবিতা দেব প্রতিযোগিতায়।

দেবু বটর পাশে বসল। তারপর বলল, দেখ বট, আমার মনে হয়, তোর লাকটা খারাপ যাচ্ছে। মানে পত্রিকায় লেখা ছাপার ব্যাপারে। যা বলেছ দেবুদা। বট দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

দেবু বলল, আবার দেখবি দু একটা লেখা বেরুলে পত্রিকায়, কিংবা দু একটা প্রাইজ পেয়ে গেলেই ওই সব বাতিল লেখাগুলোই পাঠালে টপাটপ্ ছেপে দেবে সম্পাদকরা।

বট ভারি খুশি হয়ে বলল, যা বলেছ দেবুদা। এমনই হয় শুনেছি বটে।

দেবু গলা নামিয়ে সহানুভূতির সুরে বলল,—এই কবিতা কম্পিটিশনে একটা প্রাইজ পেলেই দেখবি তোর বরাত খুলে যাবে।

প্রাইজ কি আর পাব? বট হতাশ।

কেন পাবি না? বলল দেবু : ধর্, এমন লেখা দিলি, ফার্স্ট ক্লাস। যার প্রাইজ পাওয়ার খুব চান্স।

বলচ?

দেবু গম্ভীরভাবে বলল, দেখ সাফ কথা বলছি। তুই নিজে লিখলে চান্স কম। তোর দ্বারা আর কতটা উন্নতি হতে পারে? তোর মতো লেখা এখানে আরও পাঁচজন লেখে। খুব একটা পাকা হাতের লেখা চাই। বিচারকের নজর কাড়ার মতন।

দেবু কী বলতে চাইছে বুঝতে না পেরে বট হাঁ করে চেয়ে থাকে।

দেবু ষড়যন্ত্রের ভঙ্গিতে বলে, চেনাশোনা কবি কেউ আছে? বেশ পাকা হাত। তাকে দিয়ে লিখিয়ে জমা দিতে পারিস তোর নামে। দেখবি হয়তো কাজ হয়ে যাবে। তবে সে কবি যেন না ফাঁস করে দেয় ব্যাপারটা। তাহলেই কেলেঙ্কারি।

কই? সেরকম তো কেউ জানা নেই, হতাশ ভাবে ঘাড় নাড়ে বট।

দেবু ভুরু কুঁচবে ভেবে বলে, আচ্ছা দেখি, আমি একবার ট্রাই করে। একটা সোর্স আছে আমার। যদি রাজি হয়!

ও দেবুদা প্লিজ। একটু দেখ না চেষ্টা করে। বট দেবুর হাত চেপে ধরে।

ভোমলা ওরফে ভোম্বলকে পথে ধরল দেবু। ভোম্বল একাই ফিরছিল মাঠে ফুটবল খেলে। দেবু পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে বলে, কীরে ভোমলা কবিতা দিচ্ছিস নাকি?

ভোম্বল আনমনে ছিল। অবাক হয়ে বলল,

কেন, ক্লাবের দশক পূর্তি কম্পিটিশনে।

কবিতা? কোথায়?

ও ননীর প্যাঁচ। ভোম্বলের কণ্ঠে চাপা ক্ষোভ।

দেবু বলল, হ্যাঁ শুনলাম। ননীর উৎসাহেই কম্পিটিশন। ও নাকি দারুণ কবিতা লেখে। ঘোড়ার ডিম লেখে!—ঝাঁজিয়ে ওঠে ভোম্বল : চর্চা রাখলে আমি কিছু খারাপ লিখতুম না। জানিস তেরো বছর বয়সে, ক্লাস সেভেনে যখন পড়ি, তখনই আমার কবিতা বেরিয়েছিল স্কুল ম্যাগাজিনে। ননীর তো অ্যাদ্দিনে একটা ছাপা হল।

তা ঠিক। তুই বেশ লিখতিস। কেন যে ছাড়লি?

এই ফুটবলের জন্য। এখন আর মুড আসে না।

তা ভালোই হয়েছে। কবির অভাব নেই গ্রামে। কিন্তু কলেজ টিমে তোর মতো একটা দারুণ ফরোয়ার্ড তো পেয়েছি। তবে তুই চর্চা রাখলে ননীকে ছাড়াতিস। এটা ঠিক।

বলছিস?—ভোম্বলের মুখে খুশির ছাপ। বলল : ননীটার অ্যাইসা চাল হয়েছে যে সেদিন এমন ভাবে কথা বলল যেন আমি কবিতা-টবিতা কিস্সু বুঝি না। ও একাই বোঝে। এমন রাগ হচ্ছিল যে দিই এক চড়

একখানা কবিতা লিখে জমা দিয়ে দে না। পুরনো চাল ভাতে বাড়ে। বলা যায় না ননীকে হয়তো টপকে যাবি। দেবু উস্কোয়।

নারে মুড আসবে না। সামনে দুটো ম্যাচ। হেভি প্র্যাকটিস চলছে। এর মাঝে কি কবিতা বেরয়। সেদিন অবশ্য সত্যি ইচ্ছে হচ্ছিল, একখানা দারুণ কবিতা লিখে ওর থোতা মুখ ভোঁতা করে দিই।

দেবু মিচকে হেসে বলল, তোর মুড না থাকলে অন্য উপায় আছে ননীকে ডাউন দেওয়ার।

কী?

আর কাউকে দিয়ে লেখা। তারপর নিজের নামে জমা দে কম্পিটিশনে। বেশ পাকা লেখা হওয়া চাই। তবে ব্যাপারটা যেন একদম গোপন থাকে।

ভোম্বল মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, তা মন্দ বলিস নি। তবে ভাই, আমার যে তেমন কবি চেনা নেই। তোর কেউ আছে?

দেবু একটু ভেবে নিয়ে বলল, আছে একজন। দেখব ট্রাই করি। তা আমার আনা কবিতা যদি তোর নামে প্রাইজ মেরে দেয়, খাওয়াবি তো?

ভোম্বল দেবুর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, আলবাত!

দেবু হেসে ফেলে বলল, ঠিক আছে। দেখি কী করতে পারি। একদম বলিসনি কাউকে প্ল্যানটা।

দেবু পরদিন ধরল সিরাজুলকে। গোপনে।

হ্যাঁরে সিরাজ, ক্লাবের উৎসবে কবিতা কম্পিটিশন হচ্ছে, তা আবৃত্তি প্রতিযোগিতা নয় কেন? তাহলে তুই ঠিক একটা প্রাইজ পেতিস। স্কুলে প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশনে তোর আবৃত্তি শুনে গতবার স্বয়ং ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব প্রশংসা করে গেলেন।

সিরাজ শুকনো মুখে বলল, কমিটির মেম্বারদের বললাম তো আবৃত্তি প্রতিযোগিতা করতে। রাজি হল না।

তবে যে ননীর কথায় রাজী হল, কবিতার বেলায়?

ননীর বাবা যে মোটা চাঁদা দেবেন জয়ন্তী উৎসবে। আর আমরা তো গরীব। আমাদের কথায় কান দেবে কেন?

দেবু বলল,—তুই তো একসময় কবিতা লিখতিস!

সিরাজ বলল, লিখেছি বইকি। তিনবছর আগে অবধি প্রায়ই লিখেছি। সেই যে লাভপুর থেকে বেরুত ছোটদের পত্রিকা “ছোটদের লেখা”, তাতে আমার চার-পাঁচটা কবিতা ছাপা হয়েছিল।

তা একবার চেষ্টা করে দেখ না। একখানা ভালো কবিতা যদি লিখে ফেলতে পারিস! দেবু উৎসাহ দেয় সিরাজকে।

সিরাজ ঘাড় নাড়ে, এত তাড়াতাড়ি পারব না। অনেক দিন চর্চা নেই। বাজে লেখা হবে। ননী দেখলে খেপাবে।

ধর্, কাউকে দিয়ে যদি লিখিয়ে নিস। তারপর তুই ঘষামাজা করে প্রতিযোগিতায় জমা দিস। তাহলে? কথাগুলো বলে দেবু মিটমিট করে তাকিয়ে থাকে সিরাজের দিকে।

তা মন্দ নয়! আইডিয়াটা সিরাজের পছন্দ হয় : মোটামুটি একটা কিছু হাতে পেলে ঘষামাজা করে হয়তো দাঁড় করিয়ে দেব।

দেবু বলল,—তবে লেখাটা একটু পাকা হাতের হওয়া চাই। নইলে কত আর ঘষবি? আর ব্যাপারটা যেন একদম গোপন থাকে। জানাজানি হলে ওই ঘষামাজার কেউ দাম দেবে না। বলবে যে গোটাটাই অন্যের লেখা। স্রেফ জালিয়াতি কেস। এখানকার লোক হলে রিস্কি। বাইরে দূরে থাকে, গ্রামের লোকের সঙ্গে মোটে পরিচয় নেই, তেমন কাউকে দিয়ে লেখা।

সিরাজ বিমর্ষ ভাবে বলে, আমার হাতে তেমন কবি কোথায়? তোমার জানা আছে কেউ?

দেবু ভুরু কুঁচকোয়। মাথা চুলকোয়। মুখ গম্ভীর। হাতড়াচ্ছে মনে মনে। শেষে বলে, একজন কে মনে পড়ছে। মন্দ লেখে না। ঠিক আছে দেখব চেষ্টা করে।

দেবুদা প্লিজ। একখানা মোটামুটি লিখিয়ে আনো, তারপর আমি দেখছি।

আচ্ছা আচ্ছা। দেবু ভরসা দেয় : খবরদার প্ল্যানটা যেন কাউকে ফাঁস করিসনি।

এরপর দেবুকে দেখা গেল গ্রামের আরও কয়েকটি ছেলের সঙ্গে ফিসফাস করছে গোপনে। পাঠকরা আন্দাজ করতে পারেন যে বিষয়টা কী? সেই একই কবিতা প্রতিযোগিতা প্রসঙ্গে।

শিবের দেখা মেলা সত্যি ভার হয়ে গেছে।

মাঝে মাঝে সে ঝড়ের মতো আসে দেবুর কাছে। হুড়হুড় করে রিপোর্ট করে চন্দনা ক্লাবের দশক পূর্তি অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি কেমন হচ্ছে।

শিবের কত শত যে দায়িত্ব! সে সেক্রেটারি বেচুদার ডান হাত বলা যায়। গ্রামের একদল ছেলের সে লিডার। শিব নিজে তো বটেই ওই ছেলেরা ছোটাছুটি করছে নানান কাজে।।

শিবের মুখে শোনা যায়, কত যে ঝামেলা পাকাচ্ছে।

গ্রামের ছেলে-মেয়েদের কোরাস গানের দলের আয়তন না কি কেবলই বাড়ছে। নতুন নতুন সংগীত প্রতিভা আবিষ্কারের কারণে নয়। অনুষ্ঠান উপলক্ষে যারা মোটা চাঁদা দেবেন তাদের অনেকেই সোজাসুজি বা ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাদের বাড়ির ছেলেমেয়ে কেউ না কেউ যেন স্টেজে উঠতে পায়।

শিব বলল, —কোরাসে এমন কয়েকটা কেস ঢুকেছে যাদের গলায় সুরের বালাই নেই। স্রেফ কাকের মতো রা। মহা মুশকিল। এদের গলা শুনে কোরাস গানের শিক্ষক বৈকুণ্ঠ মাস্টার মাঝে মাঝে ক্ষেপে আগুন হয়ে যান। একদিন কী কাণ্ড—

ক্লাবের ট্রেজারার মদন ঘোষের বারো চোদ্দো বছরের ছেলে বদন তার মায়ের নির্দেশে গুটিগুটি এসে বসে পড়েছিল গানের দলে, পিছনের দিকে। তাকে কিন্তু ডাকা হয়নি।

বৈকুণ্ঠ মাস্টার হারমোনিয়ামে সুর তুলে ইঙ্গিত করতেই ছেলের দল সমস্বরে গেয়ে উঠেছে,—হারে রেরে রেরে, আমায় ছেড়ে দে রে, দে রে

দু লাইন গান হতে না হতেই মাস্টার হুংকার ছাড়লেন।

—স্টপ।

ব্যস্, গান বন্ধ।

কে রে এমন বেসুরো চেঁচাচ্ছিস পেছনে? গায়করা চুপ।

কর্, সা কব্ দিকি।

বৈকুণ্ঠ মাস্টারের হুকুমে পেছনের ছেলেরা একে একে সা তান তোলে।

মদন ঘোষের বেটা বদন যেই সা গেয়েছে উরি বাপ! যেন ফাটা বাঁশির আওয়াজ ছাড়ল। মাস্টার কানে হাত দিয়ে আঁতকে উঠে বললেন, ওফ্! তারপর গর্জন ছাড়লেন তোকে তো আগে দেখিনি। কে ডেকেছে? চলবে না। গেট আউট।

বাইরে বেচুদা বদনকে প্রশ্ন করে জেনে নিলেন কে তাকে গানের দলে ঢুকে পড়তে বলেছে। অতঃপর বদনকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে বৈকুণ্ঠবাবুকে আড়ালে হাতজোড় করে অনুরোধ জানান, দোহাই দাদা, যাহোক করে ম্যানেজ করে নিন। মদন ঘোষ বিগড়োলে ঢের অসুবিধে। মদনবাবুর স্ত্রী ভারি দজ্জাল। মদনবাবু খুব ভয় পায় স্ত্রীকে।

বৈকুণ্ঠমাস্টার মেজাজি লোক। কাউকে পরোয়া করেন না। কিছুতেই ওই হাঁড়িচাচাকে ঢোকাবেন না দলে। শেষমেশ বেচুদার মুখ চেয়েই রফা করলেন, ঠিক আছে, বসে থাকুক দলে, পিছনের দিকে তবে গলা দিয়ে আওয়াজ বের করা চলবে না।

গানের দলে কেউ স্রেফ মুখ বুজে থাকলে পাবলিক হাসবে। সমাধানটা বেচুদাই দিল শোন বদন, অন্যদের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে ঠোট নাড়বে শুধু। গানের কথা আওড়াবে মনে মনে। খবরদার আওয়াজ বের করবি না। মনে থাকে যেন।

উৎফুল্ল বদন তাতেই রাজি।

এমনি কত যে টুকরো টুকরো ঝামেলা। তবে বেচুদার মাথা খুব ঠান্ডা। ধৈর্য হারান না।

শিব শুনিয়ে গেল, জানিস দেবু, গানে এখনও কোনও নামকরা আর্টিস্ট জোগাড় হয়নি। আশপাশ থেকে কয়েকজন গানের লোক পাওয়া গেছে। সিউড়ির একজন রেডিওতে গেয়েছে বটে। তবে মাত্র একবার। যুববাণীতে। গতবছর মথুরাপুর একজন বি গ্রেড রেডিও আর্টিস্ট এনেছিল। অন্তত ওর স্ট্যান্ডার্ডে একজন কাউকে না পেলে আমাদের প্রেস্টিজ পাংচার হয়ে যাবে।

কলকাতায় চেষ্টা করা হচ্ছে?—জিজ্ঞেস করে দেবু।

বেচুদা বলেছে, হচ্ছে। কিন্তু নামী কেউ এদ্দুর আসতে চাইছে না। পাড়া গাঁ শুনেই পেছচ্ছে। আমরা তো টাকাকড়িও বেশি দিতে পারব না।

হুম!—দেবু চিন্তিত হয়। বলে : একবার ট্রাই করে দেখব নাকি?

করবি? তুই করলে ঠিক পেয়ে যাবি। দেবুর ওপর শিবের অগাধ আস্থা।

কী কী গানের শিল্পী খোঁজা হচ্ছে? জানতে চায় দেবু।

রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলগীতি, অতুলপ্রসাদ এই ধরনের। লোকসংগীতও চলবে।

দেবু বলল, আমি কাল দু’তিন দিনের জন্য পিসির বাড়ি যাচ্ছি। চন্দননগরে। অনেক দিন ধরে যেতে লিখছে। এখন ফুরসৎ আছে। ঘুরে আসি।

বেশিদিন থাকবি না তো?

না না। দু’তিন দিন।

দেবু ফিরতেই শিব হাজির।

অনেক কিছু রিপোর্ট করল।

এই যেমন, —এখনও তেমন কোনো নামকরা গানের শিল্পী পাওয়া যায়নি।

গ্রামে অনুষ্ঠানের জোগাড়যন্ত্র রিহার্সাল ভালোই চলছে।

গদাই মণ্ডল ওর দুই মেয়ের একটি যৌথ নৃত্য দিতে পেড়াপীড়ি করছিল। বেচুদা রাজী হয়নি। তাই গদাইবাবু কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন।

তা দিল না কেন নাচ?—দেবু কৌতূহলী।

শিব বলল, —একদিন ডেমনেস্ট্রেশন দিয়েছিল। আমি দেখিনি। কী জানি রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে নেচেছিল দুজনে। যারা দেখেছে, বলছিল যেন দুই বোন গানের তালে তালে এক্কাদোক্কা খেলছিল।

দেবু হেসে ফেলে, তবে না দিয়ে ভালোই করেছে। বদনাম হত।

দেবু ভোম্বলকে ডেকে বলল,—কাল দুপুরে আমার বাড়ি আয়। দোতলায় আমার ঘরে থাকব। টুক করে লুকিয়ে আসবি। যেন কেউ দেখে না ফেলে।

নির্জন খাঁ খাঁ দুপুর। গ্রামের পথে তখন লোকজন খুব কম। ভোম্বল তাক বুঝে সোজা চলে গেল দেবুর কাছে দোতলায়।

ভোম্বল যাওয়া মাত্র দেবু তার হাতে একপাতা লেখা ধরিয়ে দিয়ে বলল, এই নে তোর কবিতা।

বাঃ।—ভোম্বল নেচে ওঠে ফূর্তিতে।

দেবু বলল,—শোন ভোমলা, লেখাটা বাড়ি নিয়ে গিয়ে চটপট দুটো কপি করবি নিজের হাতে। নিচে নিজের নাম ঠিকানা লিখবি। তারিখ দিবি। তারপর আমার দেওয়া লেখাটা ছিঁড়ে ফেলে পুড়িয়ে দিবি। কবিতাটা মুখস্থ করে ফেলবি। এক কপি জমা দিবি কম্পিটিশনে। আর এক কপি নিজের কাছে রাখবি। সাবধান! নকলের ব্যাপারটা যেন কেউ টের না পায়।

দেবু সিরাজকে ধরল রাতের অন্ধকারে, ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছটার নিচে। প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ে ফিরছিল সিরাজ। হঠাৎ গাছের আড়াল থেকে কে একজনকে বেরিয়ে আসতে দেখে আঁতকে ওঠে। ভূত নাকি? সে চিৎকার দেওয়ার আগেই শোনে দেবুর চাপা গলা, এই, তোকেই খুঁজছিলাম।

দেবু একখানা ভাঁজ করা কাগজ সিরাজের হাতে গুঁজে দিয়ে বলল, পকেটে রেখে দে। তোর অর্ডারি কবিতা। বাড়ি গিয়ে কপি করবি। আমার লেখাটা পুড়িয়ে ফেলবি। ঘষেমেজে দুটো কপি করবি। এক কপি প্রতিযোগিতায় জমা দিবি। অন্যটা কাছে রাখবি। মুখস্থ করে ফেলবি কবিতাটা। কেউ না টের পায়।

দেবু ফের স্যাৎ করে মিলিয়ে যায় অন্ধকারে।

এরপর দেবুকে দেখা গেল আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলছে। প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদা আলাদা ভাবে একান্ত গোপনে। তাদের প্রত্যেককেই সে লুকিয়ে সরবরাহ করে প্রতিযোগিতার অর্ডারি কবিতা। প্রতি জনকে সেই একই নির্দেশ দেয়!

শিব ক’দিন বাদে দেবুকে বলল, উঃ গ্রামে যে অতগুলো নবীন কবি আছে কে জানত?

তুই কী করে জানলি?—পাল্টা প্রশ্ন করে দেবু।

বেচুদা বলছিল, কবিতা কম্পিটিশনে মোট বত্রিশটা কবিতা জমা পড়েছে। একটা গ্রামে এতগুলো কবি, ভাবা যায়!

দেবু মুচকি হেসে বলল, সব ছাইচাপা আগুন। ননীর মতো জাহির করে না। পত্রিকায়—দিতেও সংকোচ। কিন্তু ভিতরে ভিতরে অনেকেই কাব্যচর্চা করে। কেউ কেউ হয়তো ভালোই লেখে। একটু উৎসাহ পেলেই প্রতিভা বেরিয়ে আসে।

বাধা দিয়ে বলে শিব, তা বলে ক্যাংলা। দু পাতা রচনা লিখতে পারে না বাংলায়। সে অবধি কবিতা দিয়েছে!

অ্যাঁ, ক্যাংলা!—এবার দেবুও চমকায় : সত্যি কার প্রাণে যে কী শখ লুকোনো থাকে!

এবার প্রসঙ্গ ঘোরাতেই বুঝি দেবু প্রশ্ন করে,—হ্যাঁরে, প্রধান অতিথি আর নাম করা গায়ক মিলল?

শিব জিভ কেটে বলল, এই যাঃ, আসল কথাটাই বলিনি। এটা বলতেই এসেছিলুম। হ্যাঁ, প্রধান অতিথি মিলেছে। কলকাতায় থাকেন। কালীকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ফেমাস্ সাহিত্যিক।

হুঁ! কালীকিঙ্করের লেখা পড়েছি। কী করে পাকড়ালি? দেবু কৌতূহলী ।

ননীর এক দূর সম্পর্কের কাকা আর কালীকিঙ্করের ছোট ভাই একই অফিসে চাকরি করেন। ননী নাকি লিখেছিল ওর সেই কাকাকে কালীকিঙ্করকে ধরতে তাঁর ভাইকে দিয়ে। ওই ভাবেই রাজি হয়েছেন কালীকিঙ্কর। অনেক ধরাধরির পর। কাকা মারফত কথাবার্তা হয়ে যাওয়ার পর ননী অবশ্য গিছল কলকাতায় বেচুদাকে নিয়ে ফাইনাল করতে। যাহোক এটা একটা উপকার করল ননী।

সংগীত শিল্পীর কী হল?

শিব ম্লান মুখে বলে,—এখনও নামকরা কাউকে পাওয়া যায়নি। খোঁজ চলছে। একজন রাজি হয়েছিলেন কিন্তু যা মোটা টাকা চাইল। অত দেওয়ার সামর্থ্য নেই রে চন্দনার।

দেবু বলল, আর কয়েক দিন দেখ। যদি তেমন কাউকে না পাওয়া যায় বলিস আমায়। তিন দিন পর শিব ফুঁসতে ফুঁসতে এল। দেবুর কাছে পৌঁছে ফেটে পড়ল–উঃ ননীটা কী শয়তান!

কেন কী করল আবার? দেবু জিজ্ঞেস করে।

—ও কী আবদার ধরেছে জানিস। ও সভাপতি প্রধান অতিথি দু’জনকে মাল দেওয়ার সময় স্টেজে উঠবে। অর্থাৎ রাণু বাদ।

মালা দেওয়ার সময় স্টেজে ওঠার মানে? —দেবু ধরতে পারে না।

—মানে, ঠিক হয়েছিল যে সভা আরম্ভে ওই দু’জনকে স্টেজে চন্দনের ফোঁটা আর মালা দিয়ে বরণ করবে একটি ছোট্ট মেয়ে। মস্ত একটা নকশা কাটা কাঁসার থালায় যাবে ফুলের মালা আর চন্দনের বাটি। বাচ্চা মেয়েটা তো ওই মস্ত থালা বইতে পারবে না। তাই ওই থালাটা বয়ে নিয়ে যাবে রাণু। সঙ্গে নিয়ে যাবে বাচ্চাটাকে। মালা চন্দন ধরিয়ে দেবে ওর হাতে। বরণ হয়ে গেলে বাচ্চাটিকে নিয়ে ফিরে আসবে। এই আর কী।

দেবু বলল,—রাণু মানে পারুল মাসির মেয়ে। নাইনে পড়ে?

হ্যাঁ। সুন্দর দেখতে। স্মার্ট। চমৎকার মানাত। আর ননীটা থপথপে। হাত পায়ের ঠিক নেই বেমানান।

বেচুদা পাল্টাতে রাজি হয়েছে?

হয়েছে। বাধ্য হয়ে।

বাধ্য হয়ে কেন?

শিব বলল, বেচুদা প্রথমে না করে দিয়েছিল। পাজি ননীটা তখন তারকের কাছে বলেছে সাহিত্যিক জুটিয়ে দিলুম কাকাকে লিখে, আর আমার এটুকু ফেভার করবেন না বেচুদা? ঠিক আছে। কালীকিঙ্কর মহা খুঁতখুঁতে খেয়ালি মানুষ। কলকাতার বাইরে মোটে যেতে চান না। নেহাত কাকার বন্ধুর খাতিরে রাজি হয়েছেন। এরপর যদি হঠাৎ ওঁর মত বদলায়, আসতে না চান, আমি আর কাকাকে রিকোয়েস্ট করব না।

বেচুদার কানে পৌঁছেছে কথাগুলো। ননী জানত, তারক ওকে ঠিক বলবে। শুনে বেচুদা ঘাবড়ে গেছে। যদি ননী চটে গিয়ে গোপনে বিগড়ে দেয় কালীকিঙ্করকে। তখন? আর তো কোনো নামকরা সাহিত্যিক পাওয়ার আশা নেই। তাই ননীকেই বলেছে, মালা চন্দন আর বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে স্টেজে উঠতে। রাণু বেচারি খুব দুঃখ পেয়েছে। ওর তো আর খুঁটির জোর নেই।

আমি বলেছিলাম বেচুদাকে, এই অন্যায়ের প্রতিবাদে কমিটি থেকে রিজাইন করব। কোনোও কাজ করব না। বেচুদা আমার হাত ধরে রিকোয়েস্ট করল এখন এসব না করতে। বলল, পরে ননীর ব্যবস্থা হবে। ওর খুব বাড় বেড়েছে। আপাতত উতরে দে অনুষ্ঠানটা নামকরা সাহিত্যিক না পেলে মথুরাপুরের কাছে আমাদের ইজ্জত থাকবে না।

শুনতে শুনতে দেবুর মুখ কঠিন হয়ে উঠল। সে বলল, বেচুদা ঠিক বলেছে। এখন নিজেদের মধ্যে ঝগড়া নয়। তুই এখন মাথা গরম করিসনি। ননীকে টাইট দেওয়া হবে ঠিক। হ্যাঁ, কাল আমি কলকাতা যাব দেখি কোনোও ভালো গায়ক জোগাড় হয় কিনা? আমার চিঠি বা টেলিগ্রাম পেলেই তুই কলকাতা চলে যাবি। ছোটমাসির কাছে উঠব। ঠিকানাটা লিখে নে।

পরদিন ভোরে দেবু কলকাতা গেল।

চারদিন বাদে তার টেলিগ্রাম এল শিবের কাছে– বেচুদাকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতা আয়। যত শীঘ্র সম্ভব।