উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

ফ্যাসাদ – ৬

ছয়

বন্ধুর কবল থেকে নিস্তার পাওয়ার পর আধঘণ্টা কেটেছে। খোশমেজাজে হাঁটছে শিব ও দেবু। মনে বাজছে হলুদডাঙার অভ্যর্থনার রেশ সহসা-ক্রিং ক্রিং। পিছনে সাইকেলের ঘণ্টির আওয়াজ। বেজেই চলেছে।

দেবুরা ফিরে দেখল দুটি ছেলে আসছে সাইকেলে। অবাক ব্যাপার, এরা তো চেনা ছেলে! তাদের কাছের গ্রাম মথুরাপুরের বাসিন্দা নন্তু আর সন্তু। ওরাও দেবুদের মতন এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে, তবে অন্য স্কুল থেকে।

দুই সাইকেল আরোহী কাছে আসতে দেবুরা থ। ওদের প্রত্যেকের সাইকেলের সামনে ঝুলছে একখানা করে ছোট টিনের বোর্ড, লাল রং করা। তাতে সবুজ রঙের বড় বড় হরফে লেখা- ভূপর্যটক। এবং নিচে ওদের ভালো নাম।

সন্তু নন্তুর সাইকেলের মাঝের রডে এবং ক্যারিয়ারে আটকানো পেট মোটা ব্যাগ। চন্দনার চিরকেলে প্রতিদ্বন্দ্বী এই মথুরাপুরের দেশ ভ্রমণের সঙ্কল্প চাড়া দিচ্ছে জেনেই দেবুরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গ্রাম ছাড়ে। তবু মথুরাপুরকে রোখা যায়নি। ওরাও বেরিয়েছে। তবে সাইকেলে।

চন্দনা গ্রামের অভিযাত্রীদের পাশ কাটাবার সময় মথুরাপুরের গতি কমে। নন্তু ঘাড় ফিরিয়ে বলল,– আরে শিব দেবু তোমরা? কোথায় যাচ্ছ?

তারপর নিজেই উত্তর দেয়, ও বুঝেছি। তা মাত্র এইটুকু এসেছ অ্যাদ্দিনে! আমরা তো ভাবলাম তোমরা বোধহয় দিল্লি পৌঁছে গেছ। চটপট পা চালাও ভাই, নাহয় দৌড়ও মাঝে মাঝে। আচ্ছা ফির মিলেঙ্গা।

শিবদের মনে জ্বালা ধরাতেই মথুরাপুরের দল হাত নেড়ে ঘণ্টি বাজাতে বাজাতে এগিয়ে যায় এবং বেসুরো গলায় গান জোড়ে—চল চল চল। ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল…

গুম হয়ে যাওয়া দেবু বা শিবের মুখে অনেকক্ষণ কোন কথা ফুটল না। আগের ফূর্তি উবে গেছে। শিব ফোঁস করল,—হুঁঃ ভূপর্যটক। প্রচারের বহর দেখলি প্ল্যাকার্ড লাগিয়েছে।

আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া পাশুটে মেঘ ক্রমে একজায়গায় জড়ো হতে থাকে। মেঘের রং গাঢ় কালো হচ্ছে। সূর্যের আলো ম্লান। থমথমে আকাশ। মাঝে মাঝে ঝিলিক দিচ্ছে বিদ্যুৎ। বাজের গুড়গুড়ুনি ক্রমে এগিয়ে আসছে কাছে। দেবু বলল,—ঝড় জল আসবে। আর এগুবি? না থামবি পাশের গ্রামে?

নাঃ, এখন থামা নয়। যতক্ষণ পারি এগোই। নামুক বৃষ্টি, তখন যেখানে পারি ঢুকে পড়ব। ঢের সময় নষ্ট হয়েছে।—জোরে জবাব দেয় শিব। বোঝা গেল মথুরাপুর পার্টি ওর মেজাজ বিগড়ে দিয়েছে। রোখ চেপে গেছে ওর।

মিনিট কুড়ি বাদে বৃষ্টি নামল। কাছে কোনো গ্রাম নেই। দুধারে মাঠ। দেবুরা রাস্তার পাশে একটা ঝাঁকড়া গাছের তলায় আশ্রয় নিল।

ছাঁটের তোড় বাড়ে। পাতার আচ্ছাদনে আর জল আটকায় না। ক্রমেই ভিজে যাচ্ছে তারা। এই সঙ্গে ঘন ঘন চোখ ধাঁধানো বিজলির ঝলক এবং পিলে চমকানো বজ্রগর্জন।

মাঠের ভিতরে শ খানেক হাত দূরে একটা ছোট্ট চালাঘর দেখা যাচ্ছিল। দেবু বলল,—চল্‌, এক ছুটে ওখানে যাই। এখানে থাকা অসম্ভব।

দুজনে মারল দৌড়।

চালাটার নিচে পৌঁছে গা মুখ মুছে একটু ধাতস্থ হয়ে চারপাশ দেখে তারা, এটা ঘর নয়। তিন দিকে মাটির দেওয়াল। এক দিক খোলা। মাথায় খড়ের ছাউনি। কোন উদ্দেশ্যে তৈরি এটা?

চারধার নজর করে দেবু সভয়ে বলল,—ওরে শিব এ জায়গাটা যে শ্মশান! ওই দেখ। পোড়া কাঠ। হাড়গোড় ভাঙা কলসি ছড়িয়ে পড়ে আছে।

ছাউনির খানিক পিছনে একটা ইটের দেওয়াল, মানুষের বুক সমান উঁচু, হাত দশেক লম্বা তারই গায়ে চিতা জ্বালানোর চিহ্ন স্পষ্ট। আরও একটু দূরে উঁচু পাড় দেখে ঠাহর হয় ওখানে কোনো পুকুর আছে। পুকুরের ওপাড়ে একটা বড় গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে। ধারে কাছে কোনো বাড়ি বা বসতি দেখা গেল না। এই ছাউনির নিচে বোধহয় শববাহকরা বিশ্রাম নেয়। মেঝেতে পোড়া বিড়ির টুকরো। খালি সিগারেটের প্যাকেট, মাটির খুরি ইতাদি ছড়ানো। একটা জীর্ণ ছাতা ঝুলছে চালায়, কেউ ফেলে গেছে হয়তো।

বৃষ্টি কমবার লক্ষণ নেই। সমান ধারায় চলছে। দেখতে দেখতে দিনের আলো মুছে আসে। বৃষ্টি যখন ধরল তখন ঘোর অন্ধকার নেমেছে। শ্মশানের দিক থেকে নানারকম আওয়াজ আসে—‘খড়মড় খসখস’। শিয়াল কুকুরের তর্জন গর্জন।

দেবু শিব যথেষ্ট সাহসী। তবু এই নিরালা প্রান্তরে শ্মশানের এত কাছে তাদের গা ছমছম করে। সারা রাত কি কাটাতে হবে এখানে? তাদের সঙ্গে টর্চ আছে। টর্চ জ্বেলে মাঠ পেরিয়ে রাস্তা ধরে কাছের কোনো গ্রামে হাজির হওয়া যায়। কিন্তু এমন অসময়ে অচেনা গ্রামে ঢুকলে কী অভ্যর্থনা জুটবে কে জানে? চোর ডাকাত ভেবে আচমকা তির বা বন্দুক ছুড়ে বসে যদি গ্রামের লোক?

টিপটিপ বৃষ্টি চলছে। শ্মশান ঘিরে অপার্থিব আওয়াজ বাড়ে। বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ, যেন অশরীরীর দীর্ঘশ্বাস। শিব আর থাকতে পারে না। বলে,—চ এখানে আর নয়। এই ভূতের আস্তানায় সারা রাত ইম্‌পসিবল। কাছে কোনও গ্রামে যাই।

দেবুও সায় দেয় তার প্রস্তাবে।

ছাউনিতে ফেলে যাওয়া ছাতাটা খুলল দেবু। কাপড়ে অজস্র ফুটো, কয়েকটা শিক ভাঙা। তবু বৃষ্টির হাত থেকে যতটুকু মাথা বাঁচে, তাই খোলার নিচে ঘেঁষাঘেষি করে দুজনে বেরিয়ে পড়ল ছাউনি থেকে। শিবের হাতে টর্চ। মাটিতে আলো ফেলে ধীরে ধীরে এগোয় তারা। অল্প যেতেই তাদের নজরে এল দূরে কয়েকটি আলোর বিন্দু। ছায়া ছায়া মূর্তি কয়েকজনের। এদিকেই আসছে। কারা? ডাকাত নাকি?

বল হরি, হরিবোল। বল হরি-

হাঁকটা কানে আসতেই শিবরা হাঁফ ছাড়ল। শবদাহের দল। ওরা কাছে আসুক। ওদের থেকে জেনে নেবে কাছে কোন গ্রামে আশ্রয় পাওয়া যাবে? মাথায় ছাতা মুড়ি দিয়ে দুজনে অপেক্ষা করে।

শববাহকের দল এগিয়ে আসে। হ্যাজাক ও লন্ঠনের আলোয় তাদের চেহারাগুলি স্পষ্ট হয়। ওদের কেউ টর্চ ফেলল ছাউনি লক্ষ্য করে। আলোর রশ্মি ততদূর পৌঁছল না, তবে দেবুদের গায়ে সেই আলোর ক্ষীণ আভা স্পর্শ করে।

সঙ্গে সঙ্গে থমকে যায় আগুয়ান দলটি। উত্তেজিত চেঁচামেচির আওয়াজ। তারপরই দলটা পেছুতে থাকে। কী ব্যাপার?

‘অ্যাঁ-ই-ই’–পিছনে খোনা গলায় কাঁপা সুরে ডাক শুনে ভীষণ চমকে ফিরে তাকায় দেবু শিব। দেখে, পুকুরের উঁচু পাড়ে আবির্ভূত হয়েছে এক দীর্ঘ মূর্তি, যেন জমাট আঁধারে গড়া।

বাপরে।—শিব জড়িয়ে ধরে দেবুকে।

দেবুও ভয় পেয়েছিল। তবে তার মাথা ঠান্ডা। কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল,– কে?

পাল্টা প্রশ্ন হল—কেউ তোরা?

সঙ্গে সঙ্গে টর্চের আলো পড়ল তাদের গায়ে। তারপরই উঁচু পাড় থেকে সেই মূর্তি লম্বা লম্বা পা ফেলে নেমে এসে দাঁড়াল তাদের সামনে।

শিব টর্চ ফেলল। দেখল, অদ্ভুত চেহারার এক পুরুষ। রং মিশকালো। পাকানো দীর্ঘ শীর্ণ দেহ। ঝাঁকড়া চুল। পরনে কেবল মালকোঁচা মারা খাটো গামছা। আগন্তুক ফের টর্চ ফেলে দেবুদের দেখে নিয়ে কর্কশ স্বরে বলল,—কে তোমরা? কী কচ্চ এখানে?

দেবু বলল,– আমরা দেশ ভ্রমণে বেরিয়েছি। হঠাৎ জল আসাতে এই ছাউনিতে আশ্রয় নিয়েছিলুম। এখন ভাবছিলুম চলে যাই। ওই যে দলটা আসছে মরা পোড়াতে, ওদের অপেক্ষায় ছিলাম। ভাবলাম, জিজ্ঞেস করেনি কাছে কোন্ গ্রামে আশ্রয় পাওয়া যাবে এখন। তা ওরা কেন চলে যাচ্ছে বুঝছি না?

পালাবে না?—রেগে বলল লোকটি : তোমাদের দানো পিশাচ ভেবেছে কিছু। আমি হারু ডোম, শ্মশানে বাস করি, আমারই কাঁপুনি লেগে গিছল দেখে। ওদের দোষ কী? ছাতাখানা অমন মেলেছ কেন? দূর থেকে ঠাহর হচ্ছে কিম্ভূত মাথাগুলো কোনো জীব বটে।

বলতে বলতে সে খপ্ করে ছাতাটা কেড়ে নিয়ে ধমকাল,—হেই আমার ছাতা বটেক। বাগালে কেমনে?

ছাউনিতে ছিল।—জানায় দেবু : ভাবলাম ব্যবহারযোগ্য নয় ভেবে কেউ ফেলে গেছে।

হ ভুলে ফেলে গেছলেম। খানিক সারিয়ে নিলে দিব্যি চলবে।—হারু সযত্নে ছাতাটি বগলদাবা করে। তারপর দূরে কিংকর্তব্যবিমূঢ় থমকে যাওয়া শববাহকদের দল লক্ষ করে বিকট এক হাঁক ছাড়ে,—হুই-ই, কোন্ গাঁ বটে-এ?

হারুর গলা বোধহয় ওই দলের চেনা। তাই সেদিক থেকেও চিৎকার আসে, নন্দপুর বটে-এ! কে হারু-উ?

হ-অ। আসেন গো।—হারু ডাক দেয়।

হারুর সাড়ায়ভরসা পেয়ে নন্দপুরের দল পৌঁছল শ্মশানে। তারা এসেই খোঁজ নিল,—ইখানে কী যেন একটা দেখলেম?

হো হো করে হেসে ওঠে হারু। ছাউনির পাশে দেবু ও শিবকে দেখিয়ে বলল,—ওই খোকাবাবুদের কাণ্ড মশায়। ছাতা মাথায় এমনই খাড়া ছিল আঁধারে যে আপুনারা ঘাবড়ে গেছেন।

হাসতে হাসতে সে দেবুদের পরিচয় বলল এবং এখানে আগমনের কারণ জানাল। কিন্তু সে নিজেও যে ঘাবড়েছিল সেকথা বেমালুম চেপে গেল।

এই হয়রানির জন্য দায়ী ছেলেদুটোকে কটমট করে দেখে নিয়ে এবং আর এক দফা তাদের পরিচয় যাচাই করে নন্দপুরের দল শবদাহের তোড়জোড় শুরু করে হারুর সাহায্যে। অপ্রস্তুত শিব দেবু ফের ছাউনিতে গিয়ে বসে এক কোণে। কাছাকাছি কোথায় যে আশ্রয় মিলবে, সে বিষয়ে এদেরকে আর প্রশ্ন করতে ভরসা হয় না তাদের

দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে ঝিমুতে ঝিমুতে কখন দেবুরা ঘুমিয়ে পড়েছিল শ্রান্তিতে। ভোরে যখন ঘুম ভাঙল শ্মশান ভোঁ ভাঁ। নন্দপুরের দল বা হারু কারোর পাত্তা নেই। শিব দেবুর ঘাড় কোমর টনটন করছে। পুকুরের ওপাড়ে হারুর ঘরে গিয়ে একটু জল-টল খাব? নাঃ থাক। এই বিশ্রী জায়গায় আর এক মুহূর্ত নয়। তৎক্ষণাৎ তারা রওনা দিল পিচ রাস্তার দিকে।

পথের ধারে প্রথম যে চায়ের দোকান পেল, সেখানে গরম চা মুড়ি পেঁয়াজি খেয়ে অনেকটা তাজা বোধ করল। তাদের কানে এল কয়েকজন খদ্দেরের উত্তেজিত আলোচনা ও হাসাহাসি। বিষয়—গত রাতে নন্দপুরের এক মড়া পোড়ানো পার্টি নাকি ফলস্ ভূত দেখে এমনই ভয় পেয়েছিল যে মৃতদেহ ফেলেই পালাচ্ছিল। হারু ডোম তাদের ভরসা দিয়ে অনেক কষ্টে ডেকে আনে।

শিব ফিসফিসিয়ে বলল দেবুকে, নির্ঘাৎ হারুর রটনা।