চার
গ্রামের সীমানায় ঘোষবাগানের গায়ে সাধুচরণের কুটির। জায়গাটা খুব নিরালা। একটা পুকুর ঘিরে কিছু আম লিচু নারকেল ইত্যাদির গাছ। সাধুচরণ এই বাগানের পাহারাদার। একা থাকে। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। একহারা লম্বা গড়ন। হাসি হাসি মুখ। স্ত্রী গত হয়েছে কয়েক বছর। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে অনেককাল।
অল্প চাষের জমি আছে সাধুর। তার ফসলে পেট চলে যায়। আর সে গান বাজনা নিয়ে দিন কাটায়।
এখনকার সাধুর সঙ্গে বছর দশেক আগের সাধুর মিল নেই। এককালে সাধুচরণ ছিল নামজাদা চোর। জেলও খেটেছে কয়েকবার। তবে বেশি মেয়াদ খাটতে হয়নি কখনো। ধূর্ত সাধুকে তেমন কব্জা করতে পারেনি পুলিশ।
তো সাধু চুরি ছাড়ল কেন?
শোনা যায় যে, চোর বাপের নামে শ্বশুর বাড়িতে মেয়ের সম্মানহানি হচ্ছিল। তাই আদরের মেয়ের কান্নাকাটি অনুরোধে সাধু চুরি ছাড়ে।
শিব আর দেবুর সঙ্গে সাধুচরণের বেশ পরিচয় আছে। ঘোষবাগানের কুল আম মাঝে মাঝে ওদের খাওয়ায় সাধুচরণ। নানান গল্প বলে। নিজের বাসার সামনে বসে সাধু চাটাই বুনছিল একা। দেবু সামনে হাজির হতে হেসে বলল—কীগো অনেক দিন দেখা নেই?
সাধুকাকা একটা সমস্যায় পড়ে এলাম। তুমি যদি একটু
দেবু কাছে বসে মৃদু কণ্ঠে বলে সাহায্য কর? আর কাউকে তো ভরসা নেই?
কী ব্যাপার? সাধুর চোখ তীক্ষ্ণ হয় : শুনি সমস্যাটা।
দেবু ধীরে ধীরে সংক্ষেপে বলে, যাত্রা নিয়ে চন্দনা গ্রামে গন্ডগোলের ইতিহাস। নবাগত গোলকপতির দন্ত। নিউ চন্দনার সৃষ্টি। কী বিশ্রী রেষারেষিতে নষ্ট হতে চলেছে গাঁয়ের সদ্ভাব।
দেবুর কথা শেষ হতেই দপ্ করে জ্বলে ওঠে সাধু।
—কী! মিত্তির মশাইকে টেক্কা দিতে চায়। এত বড় আস্পর্ধা? মিত্তিরমশাইয়ের অ্যাকটিং আমি কত দেখেছি। আহা কী পার্ট! ওঁর সেই শাজাহান, চাণক্য, এখনও চোখে ভাসে, অমনটি আর দেখলাম না। ভারি সজ্জন মানুষ। ওঁর পরিচালনাও দেখেছি। কী শেখাবার কায়দা! অপূর্ব! আর ওই গোলকপতিকে আমি বিলক্ষণ জানি। একটি অকাল কুষ্মাণ্ড ছিল ছোকরা।
একটু গুম মেরে থেকে সাধু ফের ফুঁসে ওঠে, —পয়সার গরম হয়েছে তাই না? এখন রিটায়ার করেছি বটে, তবু যদি ইচ্ছে করি? দেব নাকি গোলকপতির বাড়িটা ফাঁক করে?
দেবু বলল—না না সাধুকাকা, তোমায় ওসব কাজ করতে হবে না। আমার একটা প্ল্যান আছে। সেটা কেমন হবে বুঝে দেখ।
দেবু তার পরিকল্পনাটি পেশ করে।
শুনে সাধু উচ্ছ্বসিত, —খাসা বুদ্ধি। তোমার দাদা মাথা আছে। সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না। এ কাজ তো আমার কাছে নস্যি। তবে কাজটা একা হবে না। গুটেকে সঙ্গে চাই। ঠিক আছে। ওকে আমি বুঝিয়ে দেব।
গুটে পাকা চোর। সিড়িঙ্গে চেহারা। চন্দনা গ্রামে বাস। গুটের একটা মহৎ গুণ, সে নিজের গাঁয়ে চুরি করে না। সাধুচরণের কাছেই তার চুরি বিদ্যায় হাতেখড়ি।
—গুটে আবার ঝামেলায় পড়বে নাতো?
—আরে না না। কেউ ওকে সন্দেহই করতে পারবে না। সাধুচরণের কাজ অত কাঁচা নয়। তুমি নির্ভয়ে থাক। শুধু জিনিসপত্রগুলোর খবরাখবর আমায় জানিয়ে দিক ঠিক সময়ে। ব্যস, কেল্লা ফতে।
দেবু বেশ নিশ্চিন্ত হয়ে ঘরে ফেরে।
পরের দিন। কীর্ণাহার। সকাল ন’টা নাগাদ
—গুরুদাসবাবু আছেন?
দু’বার কর্কশ গলায় জোরালো ডাক শুনে গুরুদাস হাজরা সদর দরজা খুলে বাইরে মুখ বাড়ালেন। দেখলেন যে সামনে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটি মাস্তান টাইপের অপরিচিত যুবক। লম্বা শক্ত গড়ন। চোখে কালো গগলস্। ঝুলো মোটা গোঁফ। বাহারি ফাঁপানো চুল। গায়ে হলুদ স্পোর্টস গেঞ্জি ও চাপা নীলরঙা ফুল-প্যান্ট।
কী চাই?—অবাক হয়ে বলেন গুরুদাস।
আপনিই স্যার, সুধাকণ্ঠ গুরুদাস হাজরা?—যুবক প্রশ্ন করে।
—হ্যাঁ।
নোমোস্কার।—যুবক ডান হাতখানা একবার কপালে ঠেকায়। আপনার সঙ্গে একটা জরুরি দরকার আছে।
মধ্যবয়সি গুরুদাস সঙ্কুচিত ভাবে বাইরে আসেন। ভদ্রলোকের চেহারা ছোটখাটো। গৌড়বর্ণ। অতি নিরীহ মানুষ। পরনে ধুতি। গায়ে একটি উড়ুনি জড়ানো। খালি পা।
—আমি স্যার চন্দনা গ্রাম থেকে আসচি। লাভপুরের কাছে। ময়ূরাক্ষীর ধারে। আপনাকে স্যার আমাদের ক্লাবের যাত্রায় গান গাইতে হবে। আজ অ্যাডভান্স করে যাব। আপনার কী রেট বলুন?
—চন্দনা। ও! তা বাবা তোমাদের পালার দিনটি কবে?
—কালীপুজোর দুদিন আগে।
—অ্যাঁ! তোমাদের ক্লাবের নামটা কী?
—চন্দনা স্পোর্টিং ক্লাব।
—কিন্তু বাবা আমি যে ওই দিনেই তোমাদেরই গ্রামে আর একটা ক্লাব—কী জানি নাম, হ্যাঁ নিউ চন্দনা ড্রামা ক্লাব—তাদের যাত্রায় গাইব বলে বায়না নিয়ে ফেলেছি।
ওদেরটা ক্যানসেল করে দিন।— যুবক প্রায় হুকুম করে।
—না বাবা তা হয় না।
ওদের চেয়ে আমরা পঞ্চাশ টাকা বেশি দেব।—যুবক মুঠো পাকায়।
না বাবা পারব না। গুরুদাস হাজরার কথার নাম আছে। বায়না নিয়ে ফেললে সে যাবেই। টাকার লোভে কথা ফেরায় না।—বিনীত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে নিবেদন করলেন গুরুদাস। যদিও এই গুন্ডা টাইপের যুবকটির হাবভাবে তাঁর বুকের ভিতর গুরগুর করছে ভয়ে।
আপনি তাহলে আমাদের পালায় গান করবেন না? বেশ ধমকের সুরে বলে যুবক : ওই নিউ চন্দনা একটা বোগাস্ পার্টি। আচ্ছা, ঠিক আছে।
যুবক অ্যাবাউট টার্ন হয়ে গটগট করে চলে গেল। গুরুদাস হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। কিন্তু ব্যাপার কী? মনে তাঁর ভয় শিরশির করতে থাকে।
চন্দনায় ঘোষ বাগানের নির্জনে শিবের জন্য অপেক্ষা করছিল দেবু। শিব কালো চশমা আর গোঁফ খুলে ফেলে একগাল হেসে বলল, ও : সুধাকণ্ঠকে যা ঘাবড়ে দিয়েছি। একদম ফ্যাকাসে মেরে গিছল।
—হুম্। প্রথম ডোজটা দেওয়া রইল।
