উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

ফ্যাসাদ – ৭

সাত

দেবু আর শিব ঘণ্টা দেড়েক পথ চলল ধীর গতিতে। গত রাতের ভোগান্তির ফলে ক্লান্ত দেহ। রাস্তার ধারে এক গ্রামের কিনারে একটা পুকুর দেখে শিব বলল,—এখানে একটু জিরিয়ে নিই। খিদেও পেয়েছে।

দেবু রাজি হয়।

মস্ত পুকুরটি। চমৎকার টলটলে জল। বাঁধানো ঘাট। জলের ধার ঘেঁষে দুটো বিরাট বিরাট আম গাছ আর একটা তেঁতুল গাছ। গাছগুলির অনেক ডাল ঝুঁকে পড়েছে জলের ওপরে। ডালপালার সবুজ প্রতিবিম্ব থিরথিরিয়ে কাঁপছে জলের বুকে। পিছনে উঁচু পাড়ে একসারি লম্বা লম্বা তালগাছ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে।

গাছের ছায়ায় ঘাটের চাতালে বসল দুজনে।

দেবুর ব্যাগ থেকে বেরুল একখানা হাফ পাউন্ড পাউরুটি। শিবের ব্যাগ থেকে বেরল ছটা চাপা কলা। দেবু ব্যাগ হাতড়ে একটা ঠোঙা বের করে খুশি হয়ে বলল,– আরে দুটো মোয়া রয়েছে। গৌড়হরি বউদির উপহার, বাঃ।

শিবের নজর বারবার যাচ্ছিল জলের দিকে। সে বলে ফেলল,—একটা ডুব দিয়েনি। ফাসক্লাস জল বেশ ফ্রেস হয়ে খাওয়া যাবে। শ্মশানের নোংরা এখনও চিটচিট করছে গায়ে।

খাদ্যবস্তু ব্যাগে পুরে রেখে হাফপ্যান্ট পরে দুজনে নামল জলে।

আঃ ঠান্ডা জলে শরীর জুড়িয়ে গেল। দুই বন্ধু মহা ফূর্তিতে জল তোলপাড় করে সাঁতরাতে থাকে। পুকুর গভীর বেশ। তারা সাঁতরে অনেকখানি চলে যায়। ফের ঘাটে এসে খানিক জিরোয়। আবার ঝাঁপায়ে জলে।

ধপ্। শব্দটা শুনে একধারে তাকায় শিব। তারা তখন মাঝ পুকুরে। আবার ধপ্। কিছু পড়ল আমগাছের ওপর থেকে জলের ধারে। এ যে কয়েকটা জামা প্যান্ট। গাছের ডালে নড়াচড়া। কয়েকটা হনুমান যেন বসে আছে গাছে।

আমাদের ব্যাগ কই? চমকে বলে দেবু।

সত্যি তো ঘাটে রাখা দুটো ব্যাগই উধাও। হাঁসফাঁস করতে করতে দুজনে ঘাটে পৌঁছায়। নাঃ, কাছাকাছি কোথাও নেই তাদের ব্যাগ। শুধু স্নানের আগে ছাড়া জামা প্যান্টগুলি পড়ে আছে। তারা ছুটে যায় গাছ থেকে পড়া জামা-কাপড়গুলির কাছে। হুঁ, তাদের জিনিস। কাছেইপড়ে আছে। পাউরুটির মোড়ক কাগজটা ছেঁড়া অবস্থায়। ওপরে তাকিয়ে দেখে চারপাঁচটা ল্যাজ ঝোলা হনুমান, তাদেরই হ্যাভারস্যাক দুটো নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। হাতড়াচ্ছে ব্যাগ। জিনিস বের করে ছুড়ে ছুড়ে ফেলছে। কেউ কেউ খাচ্ছে কিছু। তাদেরই খাবারগুলি বুঝি?

মাথায় বজ্রাঘাত হয় দেবুদের। তারা চিৎকার করে ধমকাতে থাকে হনুমানগুলোকে। ফলে হনুমানগুলো আরও উঁচুতে উঠে গেল প্রায় চোখের আড়ালে। গাছ থেকে টুপটাপ পড়তে থাকে। দেবুদের জিনিসপত্র। কোনোটা বা মাঝ পথে আটকে যায়—গাছের ডালে। নিশ্চয়ই ওরা খাদ্যবস্তুর সন্ধানে হাতরাচ্ছে ব্যাগ। ওরা ঠিক উঁচু থেকে নজর করেছিল যে দেবুদের ব্যাগ থেকে বেরুল রুটি কলা। তারপর নিঃসাড়ে কখন নেমে এসে চুরি করে উঠে গেছে গাছে।

হায় হায়, সর্বনাশ হল। দেবু শিব পাগলের মতন চেঁচায়, ঢিল ছোড়ে হনুমানদের ভয় দেখাতে। হনুগুলি এডাল ওডাল লাফিয়ে বেড়ায়

ঝপ্ ঝপ্। দেবুদের আচরণে তিতিবিরক্ত হনুমানরা ব্যাগ দুটোই ছুঁড়ে ফেলল নিচে। দেবুর ব্যাগ পড়ল জলে। শিবেরটা জলের ধারে। দেবু শিব ফের জলে নামল তাদের জলে ভাসা জিনিস উদ্ধার করতে।

ইতিমধ্যে চেঁচামেচিতে কাছের গ্রামের কিছু লোক এসেছে ছুটে। তারা ব্যাপার দেখে চমৎকৃত। মহা উৎসাহে তারাও হনুমানদের ঢেলাতে লেগে যায়। বেগতিক দেখে হনুর দল গাছ থেকে নেমে ল্যাজ তুলে লম্বা লম্বা লাফে মাঠ পেরিয়ে ছুটল দুরে এক গ্রামের উদ্দেশে। দেবু শিব তখন প্রাণপণে তাদের হারানো সম্পত্তি খুঁজছে। গ্রামের ছেলের দল তাদের সাহায্যে লেগে যায়।

হনুগুলো বড্ড জ্বালাচ্ছে।—মন্তব্য করে গ্রামের লোক।

ঘণ্টাখানেক খোঁজাখুঁজিতে দেবুরা তাদের সব জিনিসই প্রায় উদ্ধার করতে পারল। তবে একটা ব্যাপারে খুব ক্ষতি হল। তাদের পরিচয়পত্রগুলির একটিও আর অক্ষত নেই হেডমাস্টার এবং পঞ্চায়েত প্রধানের সার্টিফিকেটের কপি দেবু আগেই খুইয়েছিল ব্রজখুড়োর গ্রামে। একই সার্টিফিকেটের কপি শিবেরও ছিল। তার মধ্যে শুধু প্রধানের পরিচয়পত্রটি মিলল, দলা পাকানো মোচড়ানো অবস্থায়। থানার দারোগার সই ও স্ট্যাম্প দেওয়া ফোটোসহ আইডেন্টিটি কার্ড দুটির ভিতর শিবেরটার পাত্তাই পাওয়া গেল না। আর দেবুরটা জলে পড়ায় ভিজে বিকৃত। রোদে শুকিয়েও ফোটোর রূপ বিশেষ ফিরল না, লেখাগুলিও আবছা হয়ে রইল। ভাগ্যি মানিব্যাগটা জলে পড়েনি।

এই আকস্মিক বিপর্যয়ে দুই পর্যটক যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল। পেট জ্বলছে খিদেয়। কাছে এক দোকানে মুড়ি ও আলুর চপ খেয়ে উঠে পড়ল তারা। খানিক বিশ্রাম নিলে ভালো হত।। শিবের ডান পায়ের গোছ মচকেছে হনুমানের পিছনে ছোটাছুটি করার সময় হোঁচট খেয়ে ব্যথা করছে পা। কিন্তু এখানে গ্রামের লোক তাদের নিয়ে যা ঠাট্টা তামাশা জুড়েছে, তাই এখন সরে পড়লে বাঁচে।

একটু বাদেই শিব বেশ খোঁড়াতে লাগল। দেবু বলল,—এখান থেকে বরং বোলপুর শহর অবধি বাসে যাই। ওখানে গিয়ে কোনো ডাক্তারকে দেখাব তোর চোট। এভাবে হাঁটা ঠিক নয়।

বাসে?—- বিরক্ত ভাবে বলল শিব আমরা হেঁটে যাচ্ছি। বাসে চড়লে নিয়মভঙ্গ হয় না?

তা বটে, তবে বিশেষ কারণে নিয়মভঙ্গ দোষের নয়। কে জানে ভেঙেটেঙেছে কিনা।

উঁহু—শিব মাথা নাড়ে : এমন কিছু লাগেনি। জলপটি দিলেই ঠিক হয়ে যাবে।

পথের ধারে ডোবার জলে ন্যাকড়া ভিজিয়ে লাগানো হল শিবের পায়ে চোটের জায়গায় খানিক বাদে শিব জানাল -ব্যথা মনে হচ্ছে কমেছে। এবার হাঁটতে পারব।

কিন্তু মাইল দুই হাঁটার পর শিবের পায়ে ফের ব্যথা চাগিয়ে উঠল। মুখে যন্ত্রণার ছাপ। খোঁড়াচ্ছে। দেবু দৃঢ়স্বরে বলল, তোর রেস্ট দরকার, এবার থামব।

তখন সবে দুপুর দুটো। আরও ঘন্টা দুই দিব্যি চলা যেত। শিবের সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছিল, তাই আর মুখে আপত্তি জোগাল না।

প্রথমেই যে গ্রামের দেখা পাওয়া গেল সেটা বাস রাস্তা থেকে আধ মাইলটাক ভিতরে। মেঠো পথ চলে গেছে গ্রামের দিকে। মনে হল গ্রামটা বড়। কয়েকটা দোতলা কোটা বাড়ির মাথা দেখা যাচ্ছিল গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে।

গ্রামে ঢুকতেই বিপত্তি। চারপাঁচটা নেড়িকুত্তা মহা-চিৎকার জুড়ল অচেনা লোক দেখে। এক বাড়ির দাওয়ায় বসে তাস খেলছিল পাঁচ ছয়জন শিবদের বয়সি ছেলে। তারা খেলা থামিয়ে তাকিয়ে রইল দেবুদের দিকে। দেবু শিব কাছে গিয়ে নমস্কার করল। দেবু যথারীতি জানাল নিজেদের পরিচয় এবং শেষে যোগ করল,– আজ আরও খানিক এগোনো যেত কিন্তু আমার ফ্রেন্ডের পা মচকেছে, ব্যথা করছে। তাই রেস্ট চাই। আজ রাতটা এখানে কাটিয়ে কাল ফের রওনা দেওয়ার ইচ্ছে আমাদের।

ছেলেগুলি সব শুনে নিজেদের মধ্যে চাওয়াচাউয়ি করল। তাদের হাবভাবে দেবুদের সম্পর্কে কোনো আগ্রহ ফুটল না। বরং কেমন বাঁকা চোখে নজর করছে আগন্তুকদের দেবু অনুরোধ করল,—একটু বসতে পারি কোথাও?

হ্যাঁ এসো।—অল্প দূরে উঁচু ভিতের পাকা ঘরের সামনে বারান্দা দেখিয়ে নির্দেশ হল : বসো ওখানে।

পিঠের ব্যাগ নামিয়ে, দেয়ালে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বারান্দায় বসল দেবু আর শিব। গ্রামের ছেলেরা কিছু তফাতে দাঁড়িয়ে ফিসফাস করছে। কানে এল একজনের কথা—জগুদাকে খবর দে।

শিব নিচু গলায় বলল দেবুকে,—এদের রকমসকম দেখছিস কেমন জানি?

দেবু নীরবে মাথা ঝাঁকায়।

এই গ্রামের নাম কী?

দেবু জিজ্ঞেস করে গ্রামের ছেলেদের।

কেন নাম জানো না?—উত্তর হয়।

না প্রথম আসছি যে।

ও! ঠেকাপুর।—জানায় একজন।

মিনিট পনেরো বাদে এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটল। হনহন করে এলেন। মাঝবয়সি। শ্যামবর্ণ। দশাসই গড়ন। পরনে খাটো ধুতি, হাফশার্ট ও চপ্পল। ভারিক্কি রাগী রাগী মুখে পুরুষ্ট গোঁফ। ঠেকাপুরের দর্শকদের ভিতর গুঞ্জন উঠল,—জগুদা জগুদা।

জগুদা শিব-দেবুকে এক নজর দেখেই বাজখাঁই কণ্ঠে আওয়াজ ছাড়লেন,—আরে এগুলো চ্যাংড়া ছোঁড়া!

হ্যাঁ, মানে ভাবলুম যদি কী জানি,—জগুদার এক শাকরেদ তোতলায়।

হুম্।—জগুদা কটমটিয়ে দেখেন দুই পর্যটককে। অতঃপর গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করেন, কোত্থেকে আসা হচ্ছে?

দেবু ফের তাদের নামধাম আগমনের কারণ জানাল।

প্রমাণ?—জগুদার হুঙ্কার।

প্রমাণ ছিল। পঞ্চায়েত প্রধান আর হেডমাস্টারের সার্টিফিকেট। আইডেন্টিটি কার্ড। কিন্তু সবপ্রায় নষ্ট করে দিয়েছে হনুমানে

হনুমান!—জগুদার ঝোঁপড়া ভুরু জট পাকায়।

আজ্ঞে হ্যাঁ, মানে হয়েছিল কী,—হনুমানের হাতে তাদের ব্যাগ চুরি ও হেনস্তার কাহিনি শোনায় দেবু।

ঠেকাপুরের শ্রোতাদের কারও মুখে অবিশ্বাস কারও মুখে মুচকি হাসি। বালবাচ্চারা হিহি করে হেসে উঠল।

এই চোপ।—জগুদা বাচ্চাদের ধমকে থামিয়ে বললেন; অর্থাৎ, প্রমাণ কিছু নেই।

হ্যাঁ আছে, এই যে—দেবু তার জলে ভেজা বিকৃত আইডেন্টিটি কার্ড এবং প্রধানের কুঁচকানো পরিচয়পত্রটি বের করে দেয়।

জগুদা প্রথমে আইডেন্টিটি কার্ডের ফোটোর সঙ্গে দেবুর মুখের মিল খোঁজার চেষ্টা করেন।

জগুদা বিরক্তভাবে মাথা নাড়লেন। মিল পছন্দসই হয়েছে বলে মালুম হল না। এরপর পঞ্চায়েত প্রধানের পরিচয়পত্রটি মেলে ধরলেন। অনেকক্ষণ তাঁর চোখ আটকে রইল কাগজটায়।

হুম্! মনে হয় সার্টিফিকেটখানা জগুদা পড়তে পেরেছেন। তিনি দুখানা প্রমাণই নিজের পকেটে পুরে বললেন,—ঠিক আছে খবর নিচ্ছি। পরে দেখা যাবে। থাক এখানে। তবে গ্রামে ঘোরাঘুরি চলবে না মোটে। বলেই গট গট করে চলে গেলেন।

হতভম্ব দেবু শিব ফের গিয়ে বসল বারান্দায়।

শিবের মুখ রাগে টকটকে। সে চাপা কন্ঠে ফুঁসে ওঠে,—কী ভেবেছে আমাদের, চোর জোচ্চোর? চ এখান থেকে।

গোঁয়ার শিব চটে হ্যাঙ্গামা না বাধায়! দেবু তাড়াতাড়ি সামাল দেয় তাকে,—না না এভাবে যাওয়া ঠিক হবে না। ওরা কিছু ভুল বুঝেছে। ও ঠিক হয়ে যাবে। উৎপাত তো আর করছে না।

শিব তবু গজগজ করে।

বারান্দায় একটা চাটাই রেখে গিছল গ্রামের কেউ। সেটা পেতে শুয়ে পড়ে শিব। ওর পায়ে ব্যথার জায়গা ফুলেছে। মাঝে মাঝে হাত বুলোচ্ছে সেখানে

শিব মন্তব্য করল,—আজ রাতেও বোধহয় খাওয়া জুটবে না।

দেখি।—দেবু একজনকে ডেকে বলল : দাদা এখানে ভাতের হোটেল আছে? মানে আমাদের রাতে খাওয়ার জন্যে।

আধঘণ্টাটাক বাদে একজন গুড়সহযোগে দু থালা মুড়ি নামিয়ে রেখে গেল তাদের সামনে।

যাব্বাবা। আজ মুড়ি খেয়েই কাটল,—শিবের তিক্ত মন্তব্য। উপায় কী, ওই গুড় মুড়িই কিছুটা গিলল দুজনে।

রাতে চাটাই পেতে ঘরে শুল দুজনে। ঘুম আর আসে না।

ধুতেরি চ, বারান্দায় বসি।- শিব উঠে পড়ে

বারান্দায় পা দেওয়া মাত্র তীব্র টর্চের আলো পড়ল তাদের গায়ে। ‘কী ব্যাপার?’ রুক্ষ স্বরে প্রশ্ন ভেসে আসে সামনের মাঠ থেকে। গ্রামের ছেলেরাই কেউ টর্চ ফেলেছে এবং প্রশ্ন করছে।

গরমে ঘুম আসছে না।—দেবু জানায়।

অপরপক্ষ আর উচ্চবাক্য করে না। তবে আবছা চাঁদের আলোয় বোঝা যায় ওদের সবারই নজর বারান্দায় দেবুদের ওপর। বসে ছিল দলটা। উঠে দাঁড়িয়েছে।

খানিক বাইরে বসে দেবুরা আবার ঘরে গিয়ে শোয়। শিব তার পায়ে জলপট্টি লাগায় একবার।

ফিরে ব্যথা কেমন?—উদ্বিগ্ন দেবুর প্রশ্ন।

রয়েছে।—সংক্ষিপ্ত জবাব। শিব শক্ত ধাতের ছেলে। নিজের কষ্ট মুখ ফুটে বেশি বলতে নারাজ।

ঘুম উবে গেছে দুই বন্ধুর। দুশ্চিন্তা পাক খায় মগজে। কী এদের মতলব? দেবু উঠে জানালায় উঁকি দেয়। দেখে, বাইরে পাহারা যথারীতি। একদল নতুন ছেলে এল।

.

সকালে দেবু আর শিবের ঘুম ভাঙল একটু বেলায়। চড়া রোদ ঢুকছে তখন জানলা দিয়ে। বাইরে জগুদার হাঁকডাক। ওঁনার কথার শব্দেই তাদের ঘুম ভেঙেছে।

এই যে উঠেছ। ভেরি সরি ভাই, ভেরি সরি। তোমাদের কথাই কারেক্ট। তোমরা খাঁটি পর্যটক। ভুল নেই। তোমাদের যাত্রা শুভ হোক।-বাজখাঁই গলায় কথাগুলি আওড়াতে আওড়াতে জগুদা ঘরে ঢুকে ধপাধপ্ দুই পর্যটকের পিঠ চাপড়ে দিলেন প্রবল উচ্ছ্বাসে।

ভ্যাবাচাকা দেবু শিবের মুখে কোনো কথা জোগায় না।

জগুদা বলে চলেন,– কী করব ভাই, সতর্ক থাকতেই হয়, যা দিনকাল। এই তো কাপাসডাঙায় ডাকাতি হল চারদিন আগে। তার আগের দিন এক বাউল এসে সারাদিন কাটায় ওখানে। ব্যস্, পরদিন ডাকাত পড়ল গাঁয়ে। পুলিশ বলেছে, ও বেটা মেকি বোষ্টম। আসলে ডাকাতের চর। গাঁয়ের সুলুকসন্ধান নিতে এসেছিল। তাই অচেনা লোক গাঁয়ে এলেই সাবধান হই।

আমরা আসল না নকল যাচাই করলেন কীভাবে?—গম্ভীরভাবে জানতে চায় দেবু।

হেঃ হেঃ, জগু ঘোষের সেসব বুদ্ধি খুব খেলে। সাধে আর আমায় ডিফেন্স-পার্টির লিডার করেছে! গতকাল বিকেলেই একজনকে বাসে করে পাঠিয়ে দিয়েছিলেম বোলপুর থানায়। বোলপুর থানা থেকে অমনি লাভপুর থানায় খবর নিল। জানা গেল, তোমাদের কথাই ঠিক। ব্যস সন্দেহের নিরসন।

তা খবরটা কাল দিলেন না কেন?—শিব তেতে বলে।

আরে আমিই তো জানলাম একটু আগে। হারামজাদা লখা ছোঁড়া মানে যাকে পাঠিয়েছিলাম থানায়, ও-ই ফিরেছে আজ সকালে। বলছে যে লাস্ট বাস মিস্ করেছিল তাই ফিরতে পারেনি। তবে বাপু আমার ধারণা, ও বেটা সিনেমা দেখার লোভে ইচ্ছে করেই থেকে গিছল। ওর কাকা থাকে বোলপুরে, তাই থাকার ভাবনা নেই। তা আমারই কি কম ভোগান্তি হল, আর ডিফেন্স পার্টির ছেলেগুলোর। গোটা রাত সজাগ থাকতে হয়েছে। ঘুমের দফা গয়া।

জগুদা পার্টির বিনিদ্র রজনী যাপনের সংবাদে শিব ও দেবুর মনের জ্বালাটা কিঞ্চিৎ কমে। দেবু বলল,—তাহলে এবার আমরা বিদায় নিতে পারি? অবশ্যই অবশ্যই। তবে যদি তাড়া না থাকে আজ দিনটা থেকে যেতে পার এখানে। ঘুরে ফিরে দেখ গ্রাম।

থাক, ঢের আদিখ্যেতা হয়েছে। বাইরে অবিশ্যি রাগ চেপে বলল দেবু,—নাঃ, আমরা এখুনি

যাত্রা শুরু করব। আহা একটু চা-টা খেয়ে যাও। নইলে পরে বদনাম করবে যে গাঁয়ের। ওরে বোঁদে ঠাকুরের দোকানে গিয়ে বল ফ্রেশ নোনতা মিষ্টি যা আছে দিয়ে যেতে। সব চারটে করে।

আর চা–।