উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

যাত্রা বিভ্ৰাট – ২

দুই

শিব ফের দেবুর কাছে এল দিন পাঁচেক বাদে। গরগর করছে রাগে,—তুই তো নিশ্চিন্ত। ওদিকে ঢোলক কি শুরু করেছে জানিস? এবার চন্দনা স্পোর্টিংয়ের যাত্রা নির্ঘাৎ ডাউন হবে। সবাই যাবে নিউ চন্দনার পালা দেখতে।

আহা হয়েছেটা কী?—দেবু ঠান্ডা করে।

—প্রচুর পয়সা খরচ করছে ঢোলক সা। ভাড়া করবে ফাস-ক্লাস ড্রেস। বাইরের কিছু আর্টিস্টও ভাড়া করে আনবে। সব টপ আর্টিস্ট।

—কাদের ভাড়া করছে খবর পেলি?

—এখনও সব খবর পাইনি। তবে শুনছি, বিবেক আনবে গানে। জনা দুই আসল ফিমেল আর্টিস্ট। আমাদের মতো শুধু মেল ফিমেল দিয়ে কাজ চালাবে না। এছাড়া ভালো পুরুষ অভিনেতাও আনবে। আর মিউজিক পার্টি হায়ার করছে মথুরাপুর থেকে। দুর্ধর্ষ একজন ফুলুট আনাচ্ছে বাইরে থেকে। বোলপুরের তানসেন আলি।

—তুই এসব খবর পেলি কোত্থেকে?

—রামুর থেকে। রিহার্সালে ওদের চা সাপ্লাই করে। রামু আমার চেলা। অনেক ফল চুরির অভিযানে আমার সঙ্গে গেছে। ওর বাবার চায়ের দোকান। সেখান থেকে চা নিয়ে আসে রামু। ঘনঘন। তখন যতটা পারে শোনে। ওই লুকিয়ে বলে যাচ্ছে আমায়। তবে ও তো বেশিক্ষণ থাকে না রিহার্সালে। দোকানে ফিরতে হয়।

গোলক সা কী পার্ট নিয়েছেন? ডিরেকশন কি উনিই দিচ্ছেন?—জিজ্ঞেস করে দেবু।

শিব বলল,—সেদিকে মহা ঘুঘু। পার্ট নিয়েছেন যুধিষ্ঠিরের। আহামরি অভিনয় দরকার নেই। কোনোরকমে চালিয়ে দিলেই হল। তবে ইম্পর্টেন্ট ফিগার। আর নির্দেশনার জন্য ডেকে এনেছেন মথুরাপুরের অনঙ্গ ঘোষকে। মোটা টাকার চুক্তিতে। রোজ সন্ধেবেলা আসছেন। মথুরাপুর তো কাছেই। পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে লোক দিয়ে। তবে রামু বলছিল, নির্দেশক হিসেবে নাকি নাম থাকবে গোলকপতি সাহারই। অনঙ্গবাবু সহনির্দেশক! অর্থাৎ ঢোলকপতির মানটা বাঁচবে। কাজও উদ্ধার হবে।

—অনঙ্গ ঘোষ রাজি হয়েছেন এই শর্তে?

—হয়েছেন। তাই তো শুনলাম। টাকার লোভে।

হুম্। গরিব শিল্পীকে ভাঙিয়ে এমনি কত বড়লোক যে নাম কেনে।

—রাগে থমথম করে দেবুর মুখ। বলে : পড়াশুনাতেও এমনই জোচ্চুরি চলে। জানিস তো আমরা স্কুলে যে ইতিহাসের বইটা পড়তাম, ওটা আদতে ওই বিখ্যাত প্রফেসরের লেখা নয়। তাঁর এক ছাত্র, খুব মেধাবী গরিব ছাত্র, সেই লিখে দিয়েছে, টাকার প্রয়োজনে। আর বাজারে চলছে ওই প্রফেসরের নামে। আমি খুব ভালো জায়গা থেকে শুনেছি কেসটা। টাকার জোরে কত অন্যায়ই না হয়।

দেবু খানিক গুম্ মেরে থেকে বলল—ওরা পালার ডেট্‌ ঠিক করে ফেলেছে?

শিব বলল—সেটা নাকি এখনও ঠিক হয়নি।

—তোদের রিহার্সাল চলছে?

—চলছে। তবে সবাই বেশ দমে গেছে।

—রিহার্সাল শেষ হয় কখন?

—সে তো রাত আটটা বেজে যায়। আমি অবশ্য অতক্ষণ থাকি না। আগেই চলে যাই বাড়ি। নইলে পড়ার ক্ষতি হবে। বাবার হুকুম। তবে শেষ কটা দিন ছাড় পাব।

হুম্।—দেবু কিছু ভেবে নিয়ে শিবের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল : ঘাবড়াসনি। দেখবি শেষে ওদের খিচিমিচি লেগে যাবে। ভালো গান, ভালো অভিনেতা আনলেও তাদের সঙ্গে লোকালদের মিশ খাবে না। বাইরের আর্টিস্টরা তো বড়জোর দু-একদিন এসে রিহার্সাল দেবে।

তবু নামে কাটে। বলল শিব।

—তা খানিক কাটে—তবে গোটা পালা অখাদ্য হলে কি আর দেখবে লোকে? অন্তত পাতে দেওয়ার মতো হতে হয়। হ্যাঁরে, হরলালদা কি ভীম করছে নিউ চন্দনায়?

—হ্যাঁ করছে ভীম। শুনলাম যে ওর ডায়ালগ প্রায় একদম ছেঁটে দেওয়া হয়েছে। শুধু গদা আস্ফালন। আর থেকে থেকে যুদ্ধ।

মুচকি হেসে দেবু বলল ঠিক আছে এখন যা। বেশি মাথা গরম করিসনি। খবরাখবর দিবি। আমাদের এতকালের ক্লাবকে ডাউন করা অত সহজ নয়।

তিন দিন বাদে শিব এসে ফেটে পড়ল দেবুর কাছে।

—ঢোলক সাহাটা একটা শয়তান। জানিস কী ঠিক করেছে। চন্দনা স্পোর্টিং যেদিন পালা করবে নিউ চন্দনাও সেদিন ডেট্‌ ফেলবে। মতলব, লোকে আমাদের পালা দেখবে না। সবাই নিউ চন্দনারটা দেখতে যাবে। ওকে আমি দেখাচ্ছি মজা।

দেবু জানে যে শিব রেগে গেলে ভয়ংকর। সে শঙ্কিত ভাবে জিজ্ঞেস করে—কেন কী করবি?

সেটা এখনও ঠিক করিনি। তবে ছাড়ব না। ওদের পালা ভন্ডুল করবই। হয় ওদের প্যান্ডেলে আগুন লাগাব। নয় ওদের দর্শকদের মাঝে জ্যান্ত সাপ ছেড়ে দেব। কিংবা ঘোষদের খ্যাপা ষাঁড়টাকে এনে ঢুকিয়ে দেব ওদের আসরে। কিংবা

বাপরে। চমকায় দেবু। এগুলোও সত্যি সত্যিই করে বসতে পারে। তাহলে থানা পুলিশ হয়ে যাবে ধরা পড়লে।

দেব ঠান্ডা করে—আরে দেখ না। শেষ পর্যন্ত কী হয়? যদি একই দিনে করে তাতেই বা কী? উল্টোটাও তো হতে পারে।

—উল্টো মানে?

মানে সেদিন ওরাই মোটে দর্শক পেল না। সব চলে এল তোদের পালা দেখতে। ওদের প্যাচে ওরাই কাবু।—

দেবু মিটিমিটি হাসে। শিবের কথা শুনতে শুনতে একটা মতলব চকিতে তার মাথায় খেলে গেছে। কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে দেবু বলল : বেচুদা কী ভাবছে ডেট্‌ নিয়ে?

বেচুদা খুব মুশকিলে পড়ে গেছে। অনেক জায়গায় বায়না দেওয়া হয়ে গেছে দিন জানিয়ে। তার চেয়েও বড় কথা দিন চেঞ্জ করতে প্রেস্টিজে লাগছে।

—ওরা বাইরের আর্টিস্ট কাকে কাকে আনছে খবর পেলি?

এখনও পাইনি।——বলেই সে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল : দেখ দেবু। ভুতোকে সাবধান করে দিস। ও যেন আমার সামনে না পড়ে।

কেন? ভুতো কী করল?—দেবু অবাক। ভুতো ওরফে ভূতনাথ ওদের বন্ধু। একই ক্লাসে পড়ে। এই গ্রামেরই ছেলে।

শিব বলল—ভুতোটা বিশ্বাসঘাতক। ও ঢোলকপতির ক্যাম্পে জয়েন করেছে। দু-দিন ধরে ওখানে যাচ্ছে।

—কেন হঠাৎ?

—নির্ঘাৎ বড় পার্টের লোভে। একবার নাকি বেচুদার কাছে গাঁইগুই করেছিল দিন দুই আগে বড় পার্ট কি আমার ভাগ্যে জুটবে না কোনোদিন? বেচুদা অবশ্য ওকে একদম নিরাশ করেনি। বলেছিল যে এবার তো সব পার্ট বুকড় হয়ে গেছে। আমি তো ভাবলাম তোকে বেশি বড় রোল দিলে নিবি না। এই যেমন শিব। গোটা সন্ধেটা নষ্ট করতে চায় না। লেখাপড়া আছে। তাই খুব ছোট পার্ট নেয়। আচ্ছা, দেখি চেষ্টা করে। তা ও বেটার আর তর সইল না। পরদিনই শত্রুপক্ষে ভিড়ল। ওকে সামনে পেলে আমি দু’ঘা কষিয়ে দেব বলে রাখচি।

—ভুতো কি নিউ চন্দনায় বড় রোল পেয়েছে?

—পেয়েছে। তবে এমন কিছু প্রোমোশন নয়। এখানে ছিল সাধারণ সৈনিক। ওখানে হচ্ছে সেনাপতি। তবে কেউকেটা গোছের কেউ নয়। নেহাতই ছোট মাপের। নামটি কী ভুলে গেছি। ওই ভুতোই নাকি প্ল্যানটা গোলক সাহাকে দিয়েছে, চন্দনার সঙ্গে একই দিনে পালা করতে।

দেবু চিন্তিত ভাবে চুপ করে থাকে। তারপর বলে—দেখ, ওরা যদি বাইরের থেকে ভালো ভালো লোক আনায়, আমাদেরও কয়েকজনকে আনাতে হবে। নইলে টক্কর দেওয়া যাবে না। এই নিয়ে আমি বেচুদার সঙ্গে কথা বলব।