উপন্যাস
গল্প
ছোটো গল্প

নীলকুঠির জঙ্গলে – ৫

পাঁচ

সোমবার। সকাল প্রায় সাতটা।

শিব ও দেবু নীলকুঠির জঙ্গলে একটা মস্ত বটগাছে চড়ল। অনেকটা উঠে মোটা ডালের খাঁজে পাতার আড়ালে বসল জুত করে। ওখান থেকে পুকুরের চারধার পরিষ্কার দেখা যায়। দেবু পকেট থেকে এক টুকরো আমসত্ত্ব বের করে আধখানা নিজের মুখে পুরল, বাকিটুকু শিবের হাতে দিয়ে বলল—নে। দেখি কতক্ষণে আসে।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। মিনিট পনেরো বাদেই শোনা গেল পায়ের শব্দ। জঙ্গল থেকে সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে পুকুর ধারে এসে হাজির হলেন ভোলানাথ সাধুখাঁ এবং নিমাই মান্না। ভোলানাথ একবার চারপাশটা দেখে নিয়ে খুশির সুরে বললেন,—বাঃ, চমৎকার নিরিবিলি। হুঁ আজ চার আর টোপ যা এনেছি বাছাধনকে এক্কেবারে পাঁচ মিনিটের মধ্যে টেনে আনব বঁড়শির ডগায়।

ভোলানাথ দেখেশুনে পুব ধারের ঘাটের গায়ে বসলেন। প্রথমে তিনি কৌটো থেকে চার বের করে জলে ছাড়লেন। একটু অপেক্ষা করে বড়শিতে টোপ গেঁথে সুতো দুলিয়ে ছিপ ফেললেন জলে। অতঃপর গম্ভীর মুখে ফাতনার ওপর নজর রেখে স্থির হলেন। তাঁর পিছনে বসে উদ্বিগ্ন মুখে বিড়ি টানতে লাগল নিমাইচরণ।

দশ মিনিটও কাটেনি। জঙ্গলের ভিতর পায়ের শব্দ।

ভোলানাথ এবং নিমাইচরণ স্তম্ভিত হয়ে দেখলেন, উল্টোদিকের গাছপালা ভেদ করে, সরু পথ দিয়ে বেরিয়ে এল দুটি লোক—হরি মোড়ল এবং পিছনে হরি মোড়লের বন্ধু বৈকুণ্ঠ সরকার। হরি মোড়লের হাতে হুইল ছিপ, কাঁধে থলে। সরকারমশায়ের দুই বগলে দুটি বেঁটে সাইজের মোড়া।

ভোলানাথদের দেখে হরি মোড়লের দলও কম অবাক হয়নি। বোকার মতন দুই পার্টি দু’দলের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর দুদলই বিড়বিড় করে নিজেদের মধ্যে কী সব পরামর্শ করল। তাদের চোখমুখের ভঙ্গি দেখে বোধ হচ্ছিল দু’দলই বেজায় বিরক্ত এবং অস্বস্তিতে পড়েছে।

হরি মোড়লই প্রথমে সামলে নিলে। ভুরু কুঁচকে চারধারটা দেখে নিয়ে, হেঁটে গিয়ে পুকুরের দক্ষিণ ধারে একটু পুব দিক ঘেঁষে একটা জায়গা বেছে নিয়ে দাঁড়ালেন। পুকুরের এই দিকটায় বড় গাছ বা ঝোপ খুব কম। সরকারমশাই তৎক্ষণাৎ সেখানে মাটিতে একটা খোঁটা পুঁতে তাতে একখানা খোলা ছাতা বাঁধলেন। তার নিচে রাখলেন একখানা মোড়া।

হরি মোড়ল জলে চার ফেললেন। কিছুক্ষণ পরে ফেললেন ছিপ। তারপর ছাতার নিচে মোড়ায় বসে ফাতনার দিকে নজর আটকালেন। সরকারমশাই একটু দূরে গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে মোড়ায় বসে মুখে দু-খিলি পান ঠুসে দিলেন।

হরি মোড়ল এবং ভোলানাথ দুজনেই নট নড়নচড়ন হাঁড়িমুখ। তবে বোঝা যায় আড় চোখে পরস্পরের দিকে নজর রাখছেন। শুধু প্রতিদ্বন্দ্বী মেছুরের ওপর নয়, তার ফাতনার ওপরেও খর দৃষ্টি।

এইভাবে আধঘণ্টা কাটল। সহসা জঙ্গলের মধ্যে আবার পায়ের শব্দ। শব্দ ক্রমে কাছে আসে। গুরুভার পায়ের চাপে শুকনো পাতা ও কাঠির আর্তনাদ। হেঁড়ে গলায় গানের আওয়াজ। এরপরই ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বিপুলবপু বেজোদার আবির্ভাব। পিছনে পিছনে একটি মাথায় খাটো রোগা ব্যক্তি—ডাবুদা। সবাই জানে এই ডাবুদা হচ্ছেন বেজোদার ‘ফ্রেন্ড ফিলসফার অ্যান্ড গাইড। শুধু মাছ ধরা নয়, প্রায় সব ব্যাপারেই ডাবুদার পরামর্শ ছাড়া বেজোদা অচল। অন্যদের ওপর বেজোদা যতই দাপট দেখাক না কেন ডাবুদার কাছে এক্কেবারে কেঁচো। নানান ভুলের জন্য বেজোদাকে ডাবুদার কাছে হরদম বকুনি খেতে হয়।

অ্যাঁক! পুকুরে ধারে ছিপ ফেলা দু দলের দিকে চেয়ে বেজোদার গান আচমকা আটকে গেল।

একী! কী ব্যাপার!—গ্যাঁক গ্যাঁক করে ওঠেন বেজোদা।

হরি মোড়ল ভোলানাথ ইত্যাদিরা চারজন হাঁ হয়ে বেজোদাকে দেখতে থাকে।

আরে হরিদা, তোমরা কী কচ্চ এখানে?—বেজোদার প্রশ্নের গমকে একঝাঁপ ছাতারে পাখি ঊর্ধ্বশ্বাসে উড়ে পালাল।

দেখছই তো ভাই মাছ ধরছি।—হরি মোড়ল মিষ্টি হেসে জবাব দিলেন।

—হুম্। তা এখানে মাছ আছে?

—কে জানে। তোমার কী মনে হয়?

আমার? হুম্।—বেজোদা আর কথা খুঁজে না পেয়ে ডাবুদার মুখের দিকে তাকালেন।

ডাবুদা ভুরু কুঁচকে দেখছিলেন ব্যাপার। কথা না বলে একটু ঘাড় নাড়লেন কেবল।

বেজোদা হাতির মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দুলতে লাগলেন। বোধহয় ভেবে পাচ্ছিলেন না, এবার কী কর্তব্য। নিচু সুরে ডাবুদা কী জানি বলতেই চলমান হলেন।

ধুপধাপ করে পা ফেলে এদিক সেদিক বেড়িয়ে তিনি পুকুরের দক্ষিণ দিকে হরি মোড়লের কাছ থেকে হাত পঁচিশ-তিরিশ তফাতে একটা জায়গা বেছে নিয়ে দাঁড়িয়ে ডাবুদার দিকে তাকালেন। ডাবুদা ঘাড় নেড়ে ইঙ্গিতে বোঝালেন, হুঁ চলবে।

ব্যস্, সেখানেই তোড়জোড় করে ছিপ ফেললেন বেজোদা। ডাবুদা একটিপ নস্যি নিয়ে, একখানা জোরে হাঁচি দিয়ে, বেজোদার কাছে বসে পড়ে, পকেট থেকে একটা চটি বই বের করে পড়তে শুরু করলেন।

তিন মাছ মরা পার্টি স্থির গম্ভীর। প্রত্যেকের নজর ঘুরছে তিন তিনটে ফাতনার ওপর। কার ভাগ্যে শিকে ছেঁড়ে কে জানে?

নিমাই মান্না একবার কাশল। অমনি বেজোদার হেঁড়ে গলা,—আঃ আস্তে।

নিমাইচরণ কটমটিয়ে তাকাল। নেহাত অশান্তি হলে মাছ ধরা নষ্ট হবে, তাই আর কথা বাড়াল না।

হরি মোড়লের ছিপের ফাতনা ডুব দিল। অমনি টান হয়ে বসলেন মোড়ল। তাক বুঝে মারলেন খোঁচ। বঁড়শি গেঁথেছে। কারণ হুইল ঘর্ঘরিয়ে সুতো টেনে ছুটে চলল জলের নিচের জীব। জীবটি বৃহৎ সন্দেহ নেই—যা জোর টান।

হরি মোড়ল এবং তাঁর সঙ্গীর মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত আর অন্য দুই শিকারির মুখ যেন চিরতা গেলা।

হুইল কষে সুতোর টান রুখতেই জলের ওপর ভুস করে ভেসে উঠল শিকার। ওমা এ যে একটা কচ্ছপ।—ছোটখাটো কড়াইয়ের সাইজ।

হোঃ হোঃ হেঃ হেঃ হোয়াক্ হোয়াক্—বেজোদার অট্টহাসিতে ভড়কে গিয়ে একঝাঁক টিয়া ট্যাঁ ট্যাঁ করতে করতে উড়ল আকাশে।

দেবু শিব কোনোরকমে হাসি চাপল।

অপ্রস্তুত হরি মোড়ল মহা খাপ্পা হয়ে হুইল ঘোরাতে লাগলেন। হোক কচ্ছপ, ওটাকেই তুলব। কিন্তু হাত চারেক টেনে আনার পরই ফুস। কচ্ছপের দাঁতে যা ধার। কেটে নিয়েছে বড়শি সুদ্ধ সুতো।

হেঃ হেঃ হোঃ হোঃ!—বেজোদার আরেক দফা হাসি।

হরি মোড়ল খানিক গুম্ হয়ে থেকে ফের একটা বঁড়শি জুড়ে টোপ লাগিয়ে ছিপ ফেললেন জলে। তবে তাঁর মাছ ধরার উৎসাহ উবে গেছে। যেন পালাতে পারলে বাঁচেন। ভাবছেন বোধহয়, এই বঁড়শিটিও না গচ্চা যায়।

প্রায় এক ঘণ্টা কাটল।

তিন ফাতনাই মাঝে মাঝেই ডুব মারল। খোঁচা মারা হল বার কয়েক। কিন্তু কোথায় সেই বিশাল রুই! কেবল ভোলানাথ আড়াইশো গ্রাম মতো একটা চারা পোনা তুললেন। বাকিদের বরাতে তাও জুটল না।

ফের আওয়াজ। গাছপালার ভিতর দিয়ে পুকুরের দিকে আসছে কেউ। আবার কে!

সবুজরঙা চেক লুঙ্গির ওপর চিকনের কাজ করা আদ্দির পাঞ্জাবি, মাথায় নকশা তোলা সাদা টুপি—আকবর আলি পুকুর পাড়ে হাজির হলেন। তাঁর পিছনে একটি বছর পনেরোর ছেলের হাতে একটা লম্বা ছিপ ও একটা ঝোলা। ছেলেটা আলিসাহেবের ভাগনে।

হায় খোদা, এ যে মেলা বসে গেছে। আলিসাহেব হতবাক।

যা বলেছে। মেলাই বটে। গাছের ওপর ফিসফিস করল শিব : কারও আর তর সয়নি। শুনেই এসে গেছে।

ইস্ ভুল হয়ে গেল।—বলল দেবু : নন্দ জেলেক খবরটা দিলে আর দেখতে হত না। এক্কেবারে জাল কাঁধে হাজির হত। তাহলেই সোনায় সোহাগা

আকবর আলির ভাগনে একখানা কাপড়ের আসন বের করে বিছিয়ে দিল ঘাসের ওপর। আলিসাহেব বাবু হয়ে বসলেন তাতে। তারপর তিন ছিপধারীর দিকে চেয়ে চিন্তিত মুখে দাড়িতে হাত বোলাতে লাগলেন। গতিক বুঝছেন। বোধহয় ভাবছেন, এখানে ছিপ ফেলা উচিত হবে কিনা? ভাগনে পিছনে ছিপ হাতে খাড়া।

দেবু খোঁচা দিল শিবকে। শিব ফিরে চাইল। দেবু আঙুল তুলে দেখাল, বাঁ ধারে নিচের দিকে।

পুব দিকে ঝোপজঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে চার হাত পায়ে গুড়ি মেরে পুকুরের দিকে এগোচ্ছে একটা ছেলে। তার বয়স হবে সতেরো আঠারো। কালো রোগা মাঝারি লম্বা, পরনে মাত্র একখানা মালকোঁচা মারা গামছা। ছেলেটা এগোয়। থামে। বকের মতো ঘাড় বাড়িয়ে দেখে। আবার এগোয়।

এ আবার কে? দেবুরা থ।

নতুন ছেলেটা একটা বড় গাছের আড়ালে হাঁটু গেড়ে বসল। তারপর কোমরে গোঁজা কিছু একটা হাতে নিল। শিবরা দেখল—গুলতি! গুলতিটা বাগিয়ে ধরে, রবার টেনে টিপ করে সে গুলি ছাড়ল। ফট্ করে শব্দ হল। মেছুরেদের তখন পরস্পরের দিকেই সমস্ত মনোযোগ, তাই শব্দটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাল না।

ফের একবার গুলতি ছুড়ল ছেলেটা। ফট্! কী জানি সে দেখল মন দিয়ে। নিঃশব্দে হাসল একবার। কালো মুখে ধবধবে দাঁতের সারি ঝিলিক দিল। তারপর সে যেমনি ভাবে এসেছিল, তেমনি করে সরে পড়ল নিঃসাড়ে। মিলিয়ে গেল ঝোপের ভিতর।

উরি বাস্, দেখ।—দেবু আঙুল দেখাল।

পুকুরের পুব ধারে ঘাটের কাছে আম গাছের মৌচাকটা থেকে গাদা গাদা মৌমাছি উড়তে শুরু করেছে। বোঁ-ও-ও আওয়াজ হচ্ছে।

বেটা গুলতি মেরেছে মৌচাকে—বলল শিব।

আধ মিনিটের মধ্যেই ক্ষিপ্ত মৌমাছির দল সার বেঁধে ধেয়ে চলল, জমাট ধোঁয়ার মতন। তাদের লক্ষ্যে ভোলানাথ ও নিমাই মান্না। ওই দুজনেই সব থেকে কাছে। মৌমাছিদের নিশ্চয়ই ধারণা হল যে এরাই তাদের খুঁচিয়েছে। অতএব এই জঘন্য আচরণের জন্য মানুষগুলোকে কিঞ্চিৎ শিক্ষা দেওয়া দরকার।

—বাপরে।

আর্তনাদ এবং এরপরেই—ঝপাং ঝপাং। মাথার ওপর হঠাৎ ক্রুদ্ধ মৌমাছির ঝাঁক দেখে জলে লাফ দিলেন ভোলানাথ। নিমাইচরণও বুদ্ধিমানের মতো তাঁর দৃষ্টান্ত অনুসরণ করল। দুজনেই ডুব দিলেন জলে।

শিকার হাতছাড়া হওয়ায় আরও খাপ্পা মৌমাছিরা এবার ছুটল হরি মোড়লকে তাগ করে। মোটা মানুষ হরি মোড়ল যে এমন দৌড়াতে পারেন, না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। মুহূর্তে তিনি গা ঢাকা দিলেন ঝোপের ভিতরে। তাঁর সঙ্গী বৈকুণ্ঠ সরকার আগেই উধাও। ছিপ-টিপ রইল পড়ে।

ইয়া আল্লা!—ব্যাপার বুঝেই আলিসাহেব লাফিয়ে উঠে ভাগনের হাত ধরে পিছনের জঙ্গলে অদৃশ্য হলেন।

বেজোদার চট করে কোনো বুদ্ধি খেলেনা। কোন দিকে পালানো যায়, ভাবতে ভাবতে তিনি ছিপ গুটোতে লাগলেন। মৌমাছিরা তখন ভোলানাথ ও নিমাইচরণের মাথার ওপর পাক খাচ্ছে। ফলে ভোলানাথেরা কোনো রকম একদম নিশ্বাস নিয়েই পলকে ডুব মারছেন জলে। মৌমাছিরাও অমনি তাদের নাকের ডগা তাক করে ছোঁ মারছে। বেজোদার হাত ঘোরানোয় আকৃষ্ট হয়ে এবার তারা বেজোদাকে লক্ষ্য করে তেড়ে এল।

—হাঁদারাম, পালাও শিগগির।

পিছন থেকে ডাবুদার ধমক শুনে বেজোদার চৈতন্য হল। ভারী শরীর জোরে দু কদম গিয়েই হোঁচট খেয়ে চিৎপটাং। কোনোরকমে উঠেই আবার মারলেন দৌড়। কিন্তু ততক্ষণে দু-একটি মৌমাছি তাঁর নাগাল ধরে ফেলেছে।

ওরে বাবারে, গেছিরে!—বলে চেঁচাতে চেঁচাতে বেজোদা ঝোপঝাড় ভেঙে ঢুকে গেলেন জঙ্গলে—যেন একটা গন্ডার ছুটছে।

ব্যস্, পুকুর পাড় সাফ্। গাছের ওপর দেবু ও শিব তখন পেট চেপে, ডাল আঁকড়ে কোনোরকমে হাসি চাপছে। অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে ফের তারা খাড়া হসে বসল।

মৌমাছির দল মিনিট পনেরো পুকুর ধারে, জলের ওপরে শত্রুর সন্ধানে টহল দিয়ে আবার চাকে গিয়ে আস্তে আস্তে থিতু হল। আরও অন্তত মিনিট দশেক কাটল। কারও দেখা নেই। এরপর জল থেকে উঠলেন ভোলানাথ এবং নিমাইচরণ।

দুজনেরই জামা কাপড় ভিজে সপসপ্ করছে। সর্বাঙ্গ দিয়ে জল ঝরছে। ওই অবস্থাতেই তারা চটপট মাটি থেকে ছিপটিপ কুড়িয়ে নিলেন। একখানা চোখ কিন্তু ঠায় মৌচাকের দিকে। অর্থাৎ বিপদ বুঝলেই মারব ঝাঁপ। তারপর দুজনে গুটি গুটি চললেন পুকুরের একেবারে অন্য ধারে।

পশ্চিম ধারের ঘাটে পৌঁছেই নিমাইচরণ গোটা কয়েক প্রচণ্ড হাঁচলেন। এতক্ষণ প্ৰাণপণে চেপে রেখেছিলেন। ভোলানাথ প্রথমেই জামার পকেট থেকে একটা ভিজে নোট বের করে সন্তর্পণে শুকতে দিলেন। থলি থেকে একটা গামছা বের করে সন্তর্পণে শুকতে দিলেন ঘাসের ওপর। এরপর তারা জামা খুলে জল নিংড়োলেন। ধুতি নিংড়োলেন। থলি থেকে একটা গামছা বের করে গা মাথা মুছলেন। থেকে থেকেই তাদের ভীত চাউনি যাচ্ছে মৌচাকের দিকে। নাঃ অ্যাদ্দুরে ভয় নেই।

নিরিবিলি। এঃ নিরিবিলি!—ভোলানাথ গজরাচ্ছিলেন। এবার ফেটে পড়লেন,—তোমার  হারু ঠিক বলে বেড়িয়েছে। নইলে এতগুলো লোক জুটল কী করে?

কক্ষনো না। হারু আর কাউকে বলেনি। হারু শ্বশুরবাড়ি গেছে পরদিনই।—নিমাইচরণ চাপা গর্জন ছাড়েন। এতক্ষণে জলে থেকেও তাঁর মেজাজ নরম হওয়ার বদলে বরং চড়েছে। এই সময় জঙ্গল থেকে হরি মোড়ল ও বৈকুণ্ঠ সরকারের পুকুর ধারে আগমনে ভোলানাথদের তর্কে বাধা পড়ল।

মোড়ল ও সরকারমশাই মানে গা হাত চুলকোচ্ছেন। বোধহয় বিছুটি পাতার ছোঁয়া পেয়েছেন। মোড়লমশাই ধুতির কষি আটতে আটতে এলেন। বেজায় হাঁপাচ্ছেন দুজন। খুব সাবধানে তাঁরা খুঁটি থেকে ছাতা খুললেন। ছিপ কুড়িয়ে নিলেন এবং মোড়া দুটো বগদলদাবা করলেন। অতঃপর পা টিপে টিপে চললেন পুকুরের পশ্চিম পাড়ে। ঘাটের কাছে পৌঁছে মোড়লমশাই ধপ্ করে মাটিতে বসে পড়লেন, মুখ দিয়ে আর কথা সরছে না।

মিনিট পাঁচেক জিরিয়ে হরি মোড়ল ফোস্ করে উঠলেন,—ছ্যা ছ্যা, এই পুকুরে মাছ ধরে। কচ্ছপের আড্ডা। আমার বঁড়শিটা গেল।

তুমিই তো নিয়ে এলে,—খিঁচিয়ে উঠলেন বৈকুণ্ঠ সরকার : ওফ্ এই বয়সে কী ভোগান্তি! হাঁপের টানটা না বাড়ে আজ!

এইবার আবির্ভূত হলেন বেজোদা, পিছনে গজগজ করতে করতে ডাবুদা। বেজোদা তাঁর ঘাড়ে এবং হাতের এক জায়গায় সমানে হাত বুলুচ্ছেন, আর উঃ আঃ’, করছেন। তাঁর ধুতি ছেঁড়া, চুল খাড়া। নিজেদের জিনিসপত্র কুড়িয়ে দিল বেজোদা এদিক সেদিক ঘুরছেন দেখে ডাবুদার এক তাড়া,—আবার কী হল?

আমার এক পাটি চটি—কোথায় যে গেল খুঁজে পাচ্ছি না।

—থাক আর চটির মায়া করতে হবে না, প্রাণে বেঁচে গেছ এই ঢের। কী জায়গারে বাপ্! আজ মৌমাছি হুল ফুটিয়েছে এরপর এলে সাপে কাটবে। খোঁজ নেই, খবর নেই—কে এক চ্যাংড়ার মুখে কী শুনলে, আর নাচতে নাচতে চলে এলে। বলি, তোমার কাণ্ডজ্ঞান হবে কবে? চল চল, ওই কামড়ের জায়গায় তাড়াতাড়ি চুন-টুন না লাগালে পরে বুঝবে ঠেলা ।

বেজোদা একবার কটমটিয়ে ভোলানাথ এবং হরি মোড়ল পার্টিকে দেখে নিলেন। ভাবখানা যেন তাঁর এই দুর্ভোগের জন্য এরাই দায়ী। তারপর গটগটিয়ে ফেরার পথ ধরলেন। পিছনে বকবক করতে করতে চললেন ডাবুদা।

হরি মোড়ল ফিরে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছেন। ভোলানাথ বললেন,—আচ্ছা হরিদা এখানে মাছ আছে আপনাদের কে বলেছে?

মোড়লমশাই মুখ ভেটকে জবাব দিলেন, ওই যে দত্ত বাড়ির শিব, তোমাদের গাঁয়ের। ওর বন্ধু নাকি নিজের চোখে দেখেছে। এখানে এসেছিল গাব না কচু পাড়তে, তখন। ভোলানাথ ও নিমাইচরণের চোখে চোখে কথা হয়। হুঁ ঠিক। সেদিন এখানে এসেছিল বটে ছেলে দুটো।

হরি মোড়লরা চলে গেলেন। ভিজে জামা কাঁধে ফেলে, ভিজে নোটখানা হাতে নিয়ে ভোলানাথও রওনা দিলেন নিমাইচরণের সঙ্গে। যেতে যেতে নিমাইচরণ বলল, ওঃ ছেলে দুটো কী শয়তান! আরও কত লোককে যে বলে বেড়িয়েছে কে জানে? বুঝলে তো ভোলাদা, এ হারুর কাজ নয়। তোমার গাঁয়ের ওই গুণধর ছোঁড়া দুটোর কীর্তি! নাঃ এখানে আর নয়।

আলিসাহেব আর মোটেই ফিরলেন না। তার ভাগনে একবার ভয়ে ভয়ে দেখা দিয়ে, টুক করে আসনটা তুলে নিয়েই এক ছুটে পালাল।

পুকুর পাড় ভোঁ ভোঁ। শিব নামছে যাচ্ছিল। দেবু বারণ করল—দাঁড়া, সেই ছেলেটা গেল কোথায়?

উঃ বড্ড কাঠ পিঁপড়ে কামড়াচ্ছে রে।—শিব কাতরায়।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না তাদের। দেখতে পেল, পুব দিকের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসছে দু-জন। সেই কালো রোগা ছেলেটা এবং একজন মাঝবয়সি পুরুষ। বয়স্ক লোকটির চেহারা দড়ির মতো পাকানো, লম্বা, রং ঘোর কালো। তার পরনে শুধু মালকোঁচা দেওয়া ধুতি। মৌচাকটার বেশ খানিকটা তফাত দিয়ে ঘুরে দুজনে পুবদিকের ঘাটে গিয়ে দাঁড়াল।

ছেলেটা দাঁত বের করে হেসে বলল,—ইঃ পেতোদা, জব্বর বুদ্ধিখানা বের করেছিলে বটে। লোকগুলো আচ্ছা নাকাল হয়েছে।

পেতো নামধারী লোকটি ফস্ করে একটা বিড়ি ধরিয়ে এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে বলল,—আরে আমি তো ভয়ে মরি। ছালায় বঁড়শি এটকে গেলেই হত আর কী! এ কী উৎপাত রে বাপ? এত কষ্টে এনে লুকিয়ে রাখলেম, না আজ সব কটা মেছুরে এসে এখানে জুটেছে! দেখি সক্কাল থেকে একটার পর একটা এসে ঢুকছে জঙ্গলে। বলি হলটা কী? এ পুকুরে তো কস্মিনকালে কেউ ছিপ ফেলে না। কেউ এর জলেও নামে না। কেন রে বাপু আর কি কোথাও মাছ নেই? এই গুটে তোল ছালাটা। এ পুকুরে রাখা আর নিরাপদ নয়। আবার কে এসে ছিপ ফেলবে। কিংবা হয়তো জলে ঝাঁপাই জুড়ে দেবে!—যা সব অলুক্ষুণে কাণ্ড দেখছি।

গুটে সিঁড়ি বেয়ে জলে নেমে কোমর জল অবধি গিয়ে ডুব দিল। উঠল যখন হাতে একটা বড় চটের বস্তার মাথা। সে বস্তাটা টানতে টানতে ঘাট অবধি এনে হেঁচকা টানে সিঁড়িতে তুলে ফেলল। ঝনাৎ করে শব্দ হল। বস্তায় ভারী কিছু রয়েছে।

হাঁ হাঁ করে উঠল পেতো,—মারব এক থাবড়া। বেটা বেআক্কেলে কোথাকার। অত জোরে ফেললি যে? ভাঙে যদি বাসনগুলো।

পেতো বস্তার দড়ি বাঁধা মুখটা খুলে ভিতরে হাত ঢুকিয়ে একখানা মস্ত পেতলের থালা বের করে আনল। তারপর আরও কয়েকখানা থালা বাটি বের হল। কোনোটা পেতলের, কোনোটা বা স্টিলের। সব নতুন ঝকঝকে

পেতো বাসনগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল। তারপর বলল,—চ গুটে, এগুলো পুঁতে রাখি। শাবলটা নিয়ে আয় গাছের ফোকর থেকে।

পেতো বাসন ভর্তি বস্তাটা কাঁধে ঝুলিয়ে জঙ্গলের ভিতর হাঁটা দিল, পিছনে চলল গুটে।

এর একটু বাদেই খপ্ খপ্ শব্দ ভেসে এল কুঠিবাড়ির দিক থেকে দেবু ফিসফিস করে বলল,—পেতোর নাম শুনেছি আমি। দাগি চোর।

মাটি খোঁড়ার আওয়াজ থামল। পেতো গুটে ফের এল পুকুর ধারে। জলে হাত পা ধুল। পেতো বলল,—গুটে তুই বাড়ি চলে যা। আমিও গাঁয়ে ফিরব। ঘুর পথে যাবি। এখানে এসেছিলি কেউ যেন টের না পায়। খদ্দের ঠিক করে মালটা তুলব। তখন খবর দেব তোকে।

গুটে বলল,—পেতোদা আজ রেতে এসে তোমার দানোর হাসিটা দাও একবার। কদিন আর ভয়ে লোক ঘেঁষবে না ইখানে।

পেতো বলল, ঠিক বলেছিস। আসব আজ সন্ধ্যায়। লোকের বড় বাড় বেড়েছে।

খুব সাবধানে গাছ থেকে নামল দেবু ও শিব। পা টিপে টিপে পৌঁছাল কুঠিবাড়ির কাছে। সদ্য বোজানো গর্তটা খুঁজে বের করতে তাদের বেশি সময় লাগল না। গর্তের ওপর কিছু শুকনো ডালপালা এবং দুটো ভাঙা ইট বসিয়ে চিহ্ন করা। ওরা কাঠ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আলগা মাটি তুলতে তুলতে দেখতে পেল বস্তাটা। দেবু বলল ওটা তুলিসনি। বাসনগুলো নির্ঘাৎ চোরাই মাল। হাত দেওয়া উচিত হবে না।

তাহলে?—শিবের প্রশ্ন :এমনি পড়ে থাকবে?

—না। পুলিশে খবর দিই। ওরাই এসে তুলুক।

—পুলিশ? মানে থানায় গিয়ে? ওরে বাবা আমার ভয় করে।

দেবু বলল,,—দূর, ভয় কী। আমাদের থানার ছোটবাবু আমার মেজমামার বন্ধু। মেজমামার সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ত ইস্কুলে। আমাদের বাড়ি এসেছেন দুদিন। আমায় চেনে। খুব ভালো লোক। চ শিগগির।

পুকুরপাড় দিয়ে চলেছে দেবুরা। এখন আবার সব কেমন অন্যরকম। একদল ছাতারে পাখি কিচিরমিচির করতে করতে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘুরছে গাছের তলায়। জলে ডুব মারছে একটা পানকৌড়ি। কয়েকটি নিরীহদর্শন মৌমাছি উড়ছে খোস মেজাজে। একটা বক এসে পুকুর ধারে দাঁড়িয়ে গেছে এক ঠ্যাঙে। জলে আলো-ছায়ার কাঁপন। প্রকৃতি রাজ্য আবার যেন তার ছন্দ ফিরে পেয়েছে।

হঠাৎ ঝপাং! বিরাট এক আওয়াজ।

পুকুরের মাঝখানে জল থেকে আধহাতখানেক লাফিয়ে উঠে ফের জলে আছড়ে পড়ল প্রকাণ্ড এক মাছ। যেন তাকে ধরতে লোভী মানুষগুলোর এত আয়োজন পণ্ড হতে দেখে মহা ফূর্তিতে একটা ডিগবাজি খেয়ে নিল।

খানিকক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে দেবু বলল,—যাক, দেখলাম তাহলে নিজের চোখে। আর কেউ বলতে পারবে না মিছে কথা বলেছি।

শিব বলল,—আহা কী ওর রং দেখলি। আর কী তেজ! ওকে কেউ ধরতে পারেনি, ভালোই হয়েছে। কী বল্‌?

ঠিক বলেছিস,—বলল দেবু : ও নিশ্চিন্তে থাকুক এখানে। ও কী কম ধুরন্ধর! মুখুজ্যেদের জালে পড়েনি। আজ একঘণ্টা ধরে চেষ্টা করল, কারও টোপই ছোঁয়নি। ওকে ধরবে কে?

থানার ছোটবাবু অফিসে বসে চা খাচ্ছিলেন। এক সেপাইয়ের পিছনে পিছনে এসে তাঁর সামনে হাজির হল দেবু ও শিব।

ছোটবাবু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,—কী ব্যাপার দেবু?

দেবু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,—ওই নীলকুঠির জঙ্গলে এক বস্তা বাসন পুঁতে রেখেছে পেতো।

ছোটবাবু তড়াক করে লাফিয়ে উঠলেন,—অ্যাঁ, বাসন। পেতো! তা তোমরা জানলে কী করে? ইটি কে?

আমার বন্ধু শিব। আমরা আম পাড়তে গিছলাম ওখানে, তখন দেখলাম যে লুকিয়ে—বলল দেবু।

নীলকুঠিতে মেছুরেদের আগমন। তারা চলে যাওয়ার পর পেতো ও গুটের জল থেকে বাসন তোলা ইত্যাদি ঘটনার মোটামুটি বর্ণনা দিল দেবু। তবে মাছ শিকারিদের বা তাদের দুজনের নীলকুঠিতে যাওয়ার আসল উদ্দেশ্যটুকু চেপে গেল। সেই বিশাল মাছটির প্রসঙ্গ ঘুণাক্ষরেও তুলল না।

নির্ঘাৎ সাহাদের দোকানের বাসন। ছোটবাবু উত্তেজিত : পরশু চুরি হয়েছে ওদের দোকানে। চল চল শিগগির দেখিয়ে দেব। ড্রাইভার গাড়ি বের কর, কুইক।

শিব মাথা চুলকে আমতা আমতা করল,—আজ্ঞে, আমরা দেখেছি, যদি না কাউকে বলেন?

কেন?—ছোটবাবু হাঁ।

মানে নীলকুঠিতে গিছলাম জানলে বাড়িতে বকবে।—শিব কাঁচুমাচুভাবে জানাল।

ও!—শিবের মুখ দেখে কোনোরকমে হাসি চেপে ছোটবাবু বললেন : বেশ। তা না হয় বলব না। আর তোমাদের বাড়িতে জেনে ফেললেও যাতে বকুনি না খাও সে ব্যবস্থা করা যাবে। অবশ্য খবরটা যদি সত্যি হয়।

[১৯৮৪, কিশোর ভারতী শারদীয়া ]