দুই
হাওড়া স্টেশনে ট্রেন থেকে নামতেই শিব আর বেচুদা দেখল সামনে দেবু। দেবু হেসে বলল, —যাক, ঠিকই আন্দাজ করেছি, এই ট্রেনেই আসবে।
কী ব্যাপার? কিছু ব্যবস্থা হল? —উদ্বিগ্ন বেচুদা প্রশ্ন করেন।
খুব চান্স। ভরসা দেয় দেবু : তবে বেচুদা আপনাকে একটু অ্যাকটিং করতে হবে। ক্লাবের নাটকে তো পার্ট করেন। অসুবিধে কী?
অ্যাঁ—অ্যাকটিং? কী অ্যাকটিং?
সে আপনাকে বুঝিয়ে দেব। আমার ছোটমাসির বাড়িতে থাকবেন আজ। কাল যাব একজনের কাছে।
সকাল আটটা নাগাদ।
খ্যাতনামা সংগীত শিল্পী গোরাচাঁদ মল্লিক তাঁর বৈঠকখানায় নেমে এসে বসেছেন। জলযোগ হয়ে গেছে। এখন বৈঠকখানায় বসে তিনি খবরের কাগজ পড়েন। কেউ এলে কথাবার্তা হয়। এই ভাবে ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দোতলায় উঠে রেওয়াজে বসেন।
গোরাচাঁদ মাঝবয়সি। ফর্সা গোলগাল চেহারা। মানুষটি অমায়িক। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল, অতুলপ্রসাদের গান গেয়ে থাকেন। রেডিওতে অনেকদিন গাইছেন। সম্প্রতি টি.ভি.তেও গেয়েছেন।
খবরের কাগজে হেডিংয়ে চোখ বোলাচ্ছেন গোরাচাঁদ, এমন সময় দু’জন অচেনা লোক এসে হাজির হল দরজায়।
একজনের বয়স বছর পঁয়ত্রিশ হবে। পাতলা সুশ্রী মার্জিত চেহারা। পরনে পরিপাটি ধুতি পাঞ্জাবি। দ্বিতীয় জনের বয়স কম। বছর কুড়ির যুবক। ফুল প্যান্ট শার্ট পরা। বেশ স্মার্ট। চোখেমুখে বুদ্ধির ছাপ।
আগন্তুকরা মুখে বিনীত হাসি টেনে হাত জোড় করে নমস্কার জানায়। গোরাচাঁদ প্রতি নমস্কার করে কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে থাকেন।
বয়স্ক লোকটি বলেন, আজ্ঞে, আমরা এসেছি বীরভূম থেকে। আমার নাম বেচারাম ঘোষ। এর নাম দেবব্রত মজুমদার। আমরা থাকি ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে চন্দনা গ্রামে।
গোরাচাঁদ একটু অধীর ভাবে বললেন,—আচ্ছা আচ্ছা, কী ব্যাপার?
বেচারাম ওরফে বেচুদা বিগলিত ভাবে বললেন, আপনার কাছে একটা আর্জি নিয়ে এসেছি। তবে আগেই বলে রাখি আমি আপনার সংগীতের একজন পরম ভক্ত।
দেবু টপ করে গিয়ে গোরাচাঁদের পায়ের ধুলো নিল এবং একগাল হেসে বলল, আজ্ঞে আমিও।
বেশ বেশ। একটু বিব্রত হন গোরাচাঁদ। আন্দাজ করেন অত ভনিতা যখন নির্ঘাৎ কোনোও প্রোগ্রামের জন্য এসেছে। কিন্তু বীরভূম জেলা? আর সেখানে ময়ূরাক্ষী বা কোথায়? বীরভূমে একবার মাত্র গেছেন শান্তিনিকেতনে এবং জয়দেব-কেন্দুলি দেখতে। বীরভূম সম্বন্ধে তাঁর এর বেশি জানা নেই। মনে হচ্ছে দূর পাড়া গাঁ। উঁহু অতদূর যাওয়া পোষাবে না। অবশ্য পারিশ্রমিক কী দিতে চায় শুনি।
গোরাচাঁদ বললেন, বসুন।
বেচুদা ও দেবু গ্যাঁট হয়ে বসল সোফায়। গোরা মল্লিকের মুখোমুখি।
বেচুদা হাত কচলাতে কচলাতে লাজুক হাসি দিয়ে বললেন,
আপনার কাছে আমন্ত্রণের অনুরোধ নিয়ে এসেছি।
গোরাচাঁদ কথা বলেন না। উনি সেটা বুঝেছেন। এরকম পার্টি তাঁর কাছে হরদম আসে। কেসটা গ্রহণযোগ্য কিনা বুঝে তবে মুখ খুলবেন।
বেচুদা তেমনি বিনীত ভাবে বলে চলেন,—আজ্ঞে আমি আপনাকে গান গাওয়ার জন্যে বলতে আসিনি। আমি এসেছি আপনাকে আমার গ্রামে মাছ ধরার আমন্ত্রণ জানাতে।
মাছ ধরা? গোরাচাঁদের নির্বিকার মুখে নিমিষে প্রচণ্ড আগ্রহ ফোটে। তিনি খাড়া হয়ে বসেন।
আজ্ঞে হ্যাঁ, মাছ ধরা। ছিপ দিয়ে।—বেচুদা জানালেন।
তা মাছ ধরা, আমায় কেন? গোরাচাঁদ তল পান না।
আজ্ঞে তাহলে হিস্ট্রিটা বলি।—জানালেন বেচুদা : চন্দনা গ্রাম খুব ছোট নয়, মাঝারি। ওই গাঁয়ে আমার কয়েক পুরুষের বাস। একসময় আমরা জমিদার ছিলাম ওই অঞ্চলের। এখন অবশ্য জমিদারি নেই। অল্প কিছু জমি, বাগান আর পুকুর রয়েছে। এখন বংশের সবাই প্রায় চাকরি বা ব্যবসা করে সংসার চালায়। গ্রামেও থাকে না। মাঝে মধ্যে আসে। শুধু আমি পার্মানেন্টলি থাকি। ওখানে মাস্টারি করি।
আমার ঠাকুর্দার আমল থেকে আমাদের বাড়িতে একটা প্রথা চালু হয়। এক বিচিত্র প্রথা।
আমার ঠাকুর্দার গান বাজনার খুব শখ ছিল। নিজে ভালো ক্লাসিকাল গাইতেন। আবার ওই ঠাকুর্দারই ছিল ভীষণ মাছ ধরার নেশা।
প্রতি বছর ঠাকুর্দা দু একজন নামকরা গাইয়ে বাজিয়েকে নেমন্তন্ন করে নিয়ে আসতেন দেশের বাড়ি চন্দনায়। আমন্ত্রিতদের শুধু ওস্তাদ হলে চলবে না। তাঁর মাছ ধরার শখ থাকা চাই।
ওস্তাদরা আসতেন। দু চারদিন থাকতেন। মনের সুখে মাছ ধরতেন আমাদের পুকুরগুলোয়। ভালো খাওয়া দাওয়া হত। রাতে খানিক গান বাজনা হত। শাল দোশালা উপহার পেতেন অতিথিরা। তারপর বিদায় নিতেন। ফি বছরই ঠাকুর্দা নতুন নতুন ওস্তাদ খুঁজে আনতেন এই উপলক্ষে।
ঠাকুর্দার পর বাবাও কিছুদিন এই প্রথা চালু রাখেন। কিন্তু তিনিও চাকরি নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ার পর এই উৎসব বন্ধ হয়ে যায়।
আমার ইচ্ছে, প্রথাটি আবার চালু করি। অ্যাদ্দিন সুবিধে হয়নি। এই বছর থেকে আবার আরম্ভ করতে চাই। আমি আপনার গানের খুব ভক্ত। তাই আপনাকেই প্রথম নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে। যদি দয়া করে যান?
মাধ ধরার নামেই গোরাচাঁদের মনের ভিতর ছটপটানি শুরু হয়ে গেছে। মাছ ধরায় গোরাচাঁদের দারুণ নেশা। বছর চারেক এই রোগে ধরেছে। সময় বেশি পান না, তেমন পুকুরের সন্ধানও মেলে না বেশি। তবু সুযোগ পেলেই তিনি মাছ ধরতে ছোটেন। মাছ ধরার জন্য চার-পাঁচটি দামী ছিপ এবং নানান সরঞ্জামও মজুত আছে ঘরে।
দুঃখের বিষয় মাছ ধরার হাত তাঁর পাকেনি। ভাগ্যও বিশ্বাসঘাতকতা করছে। ফলে এ যাবৎ তাঁর ছিপে সবচেয়ে বড় যে মাছটি ধরা পড়েছে তার ওজন মাত্র সাতশ গ্রাম। লজ্জায় বলা যায় না লোককে।
গোরাচাঁদ জানেন যে আড়ালে লোকে ঠাট্টা-তামাশা করে তাঁর এই শখ নিয়ে। সারা দিন রোদে পুড়ে ঠায় ফাতনার দিকে নজর রেখে, লাল চোখে ঘর্মাক্ত দেহে যখন বাড়ি ফেরেন গৃহিণী কখনো খালি থলিতে একবার উঁকি দিয়ে, কখনো বা শিকারের পুরস্কারস্বরূপ একটি ক্ষুদ্র চারাপোনা হাতড়ে তুলে কৃপা দৃষ্টি হানে
গোরাচাঁদের ভারি শখ একটা মাছের মতো মাছ ছিপে গেঁথে তুলে, তাই নিয়ে ফোটো তোলাবেন। ফোটোটা বাঁধিয়ে টাঙিয়ে রাখবেন বৈঠকখানায়।
এমন অফার। গোরাচাঁদ পা বাড়িয়েই ফেলেছেন। তবু একটু বাজিয়ে নেওয়া যাক। যতটা সম্ভব নির্বিকার থেকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন বেচুদাকে, আপনি তো গানবাজনার ভক্ত?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
বেচুদা ঘাড় নাড়েন : তবে আমি ক্লাসিকালের তেমন ভক্ত নই, আমি ভালোবাসি রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল, অতুলপ্রসাদ।
গাইতে পারেন?
সামান্য।
আপনার মাছ ধরার শখ আছে?
আছে। তবে ঠাকুর্দার মতো পাকা হাত নয়।
—আপনার কেমন পুকুর? মাছ কেমন?
—ভালো স্যার। একখানা পুকুরের খুব নাম। বড় বড় মাছ। কত জজ ম্যাজিস্ট্রেট ওটায় মাছ ধরেছেন।
ধরতে পেরেছেন?
—পেরেছেন বইকি। এই তো বছর চারেক আগে এস. ডি. ও. সাহেব ধরলেন চার কিলো রুই একটা।
শুনেই গোরাচাঁদের হৃৎপিণ্ড ধড়াস ধড়াস করতে লাগল। কোনোরকমে গাম্ভীর্য বজায় রেখে বললেন,
দেখুন ওই গান-টান কিন্তু বেশিক্ষণ নয়। মাছ ধরার জন্যে যেতে পারি।—না না, গান তো মুডের ব্যাপার। ইচ্ছে হলে গাইবেন। নইলে গাইবেন না। কেউ জোর করবে না। আপনার সঙ্গ পেলেই মস্ত সম্মান। যদি দু একটা গান শোনান ধন্য হব। আর আমার সাধ্যমতো কিঞ্চিৎ দক্ষিণা দেব। দয়া করে গ্রহণ করবেন।
নাঃ, লোকটি নিতান্তই ভদ্র। এর মধ্যে সন্দেহজনক তো কিছু দেখছি না। ভাবেন গোরাচাঁদ। হঠাৎ খেয়াল হল। জিজ্ঞেস করলেন, আমার যে মাছ ধরার শখ, জানলেন কী করে?
হেঃ হেঃ। বেচুদা হাসেন : আমি স্যার রেডিও স্টেশনে গিয়ে খোঁজ করলাম। নামী গাইয়েদের মধ্যে কার মাছ ধরার শখ আছে? আপনার নামটা জেনে যেন স্বর্গ পেলাম হাতে।
কতক্ষণ লাগে যেতে? কীভাবে যাব?
বেচুদা বললেন, ভোরে স্টার্ট করে বিকেলের মধ্যে পৌঁছে যাব। সাঁইথিয়া অবধি ট্রেনে। তারপর মোটরে।
কবে নিয়ে যেতে চান?
অর্থাৎ রাজি। আনন্দে বেচুদা প্রায় লাফিয়ে ওঠেন আর কী। বললেন, আমার ইচ্ছে ১ বা ২রা মার্চ। আপনার কী সুবিধে হবে? ওইসময় মাছে টোপ খায় বেশি।
টেবিলে রাখা একটা ডায়েরির পাতা উল্টে দেখে গোরাচাঁদ বললেন, হবে। ছিপ চার টোপ কী কী নিয়ে যাব?
কোনো কিছু নেওয়ার দরকার নেই। ওখানে সব ব্যবস্থা থাকবে। গোরাচাঁদ বললেন, ঠিক আছে, তাই
ছিপটা নেব। নিজের ছিপ না হলে ঠিক জুত হয় না।
বেচুদা বললেন, আপনাকে এমন একজনের হেল্প দেব দেখবেন। ও অঞ্চলের সেরা মেছুরে। তার চারের টানে মাছ ছুটে এসে টোপ গেলে।
বাঃ!—গোরাচাঁদ উল্লসিত।
বেচুদা বললেন, ১ মার্চ যাব। ২রা গোটা দিন মাছ ধরব। ওরা ফিরবেন। আপনাকে আমরা কলকাতা থেকে নিয়ে যাব, পৌঁছে দেব।
দেবু এতক্ষণ চুপচাপ বসে তালমাফিক মাথা নাড়ছিল। সে বেচুদাকে ফিসফিস করে কী বলতেই, বেচুদা বললেন গোরাচাঁদকে,
ও হ্যাঁ। আচ্ছা মল্লিকমশাই, আপনি একা যাবেন? সঙ্গে বন্ধু কাউকে নিয়ে যেতে পারেন। গল্পগুজব করতে পারেন। তবে ওই সংগীত শিল্পী এবং মেছুরে হওয়া চাই।
তা মন্দ নয়।—বললেন গোরাচাঁদ। হুম্ কাকে নিই! তিনি ভাবেন। গানে সমান হলেও মাছ ধরায় আমার চেয়ে কম হতে হবে। নইলে হয়তো বড় মাছ ধরার ক্রেডিট সেই মেরে দেবে। হ্যাঁ মিন্টুকে পেলে হয়।
মিন্টু উঠতি গাইয়ে। রবীন্দ্রসংগীত গায়। রেডিওতে চান্স পেয়েছে। মাছ ধরার শখ আছে। তবে মেছুরে হিসেবে নেহাত কাঁচা। মিন্টুর ধরা সব চেয়ে বড় মাছের ওজন একশো গ্রামের কম। নেশাটা সদ্য ধরেছে। ওর ধারণা গোরাদা ভারি ওস্তাদ মেছুরে। ও সুযোগ পেলেই গোরাচাঁদের সঙ্গ ধরে মাছ ধরতে।
গোরাচাঁদ তখুনি টেলিফোন করল মিন্টুকে
—হ্যালো মিন্টু, আমি গোরাদা বলছি। শোন্, এক জায়গায় মাছ ধরতে যাবি? ফাসক্লাস পুকুর। প্রচুর বড় মাছ আছে। ওরা সব ব্যবস্থা করবে। বীরভূমে ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে। গ্রাম। চমৎকার জায়গা। থাকার ব্যবস্থা? জমিদারি বাড়িতে। ১ মার্চ ভোরে স্টার্ট। ৩রা ফিরব।
কী? তোর প্রোগ্রাম আছে? কোথায়? অ্যাঁ বজবজে, ভাবতী সংঘ? অ্যাডভান্স নিয়েছিস? নিনি। তবে ক্যানসেল করে দে। আমি জানি। গিছলাম একবার। খুব ভোগায়। ফেরার গাড়ি দেয় না। তাহলে ওই কথা রইল। ১ মার্চ।
টেলিফোন নামিয়ে খুশি মুখে গোরাচাঁদ বললেন,—যাক মিন্টুও যাবে। ভালোই হল। মিন্টু সাহা। রেডিওতে রবীন্দ্রসংগীত গাইছে বছর দুই। মাছ ধরার শখ আছে। যা চাইছেন।
গোরাচাঁদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে ফুটপাথেই এক পাক নেচে নিল দেবু, ও বেচুদা, কেল্লা ফতে। একজনের জায়গায় দু’জন মিল গিয়া।
বেচুদা দেবুর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, সত্যি তোর বুদ্ধির জবাব নেই।
দেবু বলল, আমি জানতাম। মেছরেকে মাছের টোপ দিলে ঠিক গাঁথবে।
বেচুদা বলল, কাল তাহলে ফিরছি?
দেবু বলল, বিকেলে একজনকে ট্রাই করব। যদি লেগে যায়, কাল থাকতে হবে।
—কাকে আবার ট্রাই করবি?
সে এখন বলব না। জানায় দেবু।
