এক গভীর ষড়যন্ত্রের আভাস
শিব মনমরা। এই পোড়া দেশে কী করতে যে লোকে বাস করে? কোথাও রহস্যের নামগন্ধ নেই।
দেবু যদিও আশ্বাস দেয়,—আছে আছে। তলে তলে অনেক কুকৰ্ম্ম হচ্ছে। কত রহস্যের জাল ছড়াচ্ছে। আরে হইচই করে খুন জখম মারপিট লাঠালাঠি করা পুলিশের ব্যাপার। ওসব মোটা দাগের কাজ। কিন্তু সূক্ষ্ম অপরাধ, যা সহজে চোখে পড়ে না, সেই রহস্য ভেদ করতে চায় তীক্ষ্ণ বুদ্ধি প্রাইভেট ডিটেকটিভ। স্রেফ চোখ কান খোলা রাখ।
দেবু ভরসা দিচ্ছে। শিব নজরও রাখছে। তবু সে হতাশ
রহস্যের সন্ধান পেয়েছে ভেবে দু-বার শিহরিত হয়ে শিব নিতান্ত নিরাশ হয়। একদিন এক অচেনা বাউল ঢুকেছিল গ্রামে। শিবের কেমন সন্দেহ হয় তাকে। ডাকাত দলের গুপ্তচর নয়তো?
বাউলটির ব্যবহার অমায়িক। গান গায়। ভিক্ষা নেয়। কিন্তু ওর তীক্ষ্ণ নজর ঘুরছিল চতুর্দিকে। ওইটে লক্ষ করে শিবের মনে সন্দেহের মেঘ জমে। সে পিছু নেয় লোকটির আড়ালে অনুসরণ করে। বাউল কিন্তু শেষমেষ তাকেই পাকড়ে অনেক প্রশ্ন করে। এই গ্রামে গত তিন-চার দিনের ভিতর বছর পনেরো ষোলোর কোনো নতুন ছেলে এসেছে কিনা? ফর্সা রোগা বড় বড় চোখ, কপালে কাটা দাগ, এই এতটা লম্বা।
প্রৌঢ় বাউলটি বিষণ্ণভাবে জানায়, ওই যে ছেলেটিকে খুঁজছে সে তার নাতি। বাউন্ডুলে স্বভাব। মাঝে মাঝে পালায় বাড়ি থেকে। ও ইস্কুলে পড়ে ক্লাস নাইনে। পড়াশুনোয় মন্দ নয়। গানের গলাও দিব্যি। অথচ ওই এক অদ্ভুত স্বভাব। বাড়িতে বেশি দিন মন টেকে না। খবর পেয়েছি এই দিকেই এসেছে। ওর মা দিদিমা বড্ড কান্নাকাটি করছে। পুলিশে খবর দিয়ে ধরে নিয়ে গেলে হয়তো জন্মের মতন উধাও হবে অভিমানে রাগে। তাই নিজেই খুঁজছি। পেলে বুঝিয়ে সুঝিয়ে নিয়ে যাব। আগেও এমনই একবার খুঁজে খুঁজে ধরে এনেছি।
ব্যাজার হয় শিব। গুপ্তচরই বটে। তবে ভিন্ন জাতের। বাউলের ভেজা চোখের আক্ষেপে মনটা তার ভারী হয়ে রইল অনেকক্ষণ।
আর একদিন নির্জন সকালে পশ্চিমপাড়া দিয়ে সাইকেলে যেতে যেতে হঠাৎ কানে কতগুলো কথা আসতে শিব চমকে ওঠে। কথাগুলির উৎসস্থল এক নিরালা বাড়ির দোতলায় একটি ঘর।
নারী কণ্ঠে চাপা আর্তস্বর ভেসে এসেছিল,—ক্ষমা কর। ক্ষমা কর।…
ওই কাতর অনুরোধের যেন উত্তর হিসেবেই গর্জে উঠেছিল এক পুরুষ কণ্ঠ। তবে পুরুষটির কথাগুলি সে বুঝতে পারেনি।
শিব থমকে যায়। ফের নারী কণ্ঠের চাপা করুণ আবেদন এবং পুরুষ কণ্ঠের ধমক ‘প্রতিশোধ’ এবং ‘বিশ্বাসঘাতক’ এই দুটি শব্দ সে স্পষ্ট শোনে পুরুষের গলায়।
অত্যন্ত অবাক হয় শিব। কারণ দোতলায় ওই ঘরে থাকেন নগেন দত্ত। তাদের স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক
নগেন স্যারের বয়স বছর তিরিশের কাছাকাছি। বোলপুরের লোক। এই বাড়িতে দুটি ঘর ভাড়া নিয়ে একা থাকেন। পরিবার থাকে বোলপুরে।
এই প্রকাণ্ড পাকাবাড়িটা অন্তত শখানেক বছরের পুরনো। এককালের বাঁড়ুজ্যেদের অবস্থা খুব ভালো ছিল। নিশ্চয় গমগম করত বাড়ি। এখন মাত্র একজন শরিক বাস করেন বাড়ির এক কোণে। বাকি অট্টালিকা খালিই থাকে প্রায় বারো মাস।
নগেনবাবুর ঘরে কারা? পুরুষ কণ্ঠ তো নগেন স্যারের বলে মনে হল না। শিব উৎকর্ণ হয়ে শোনে। ফের কিছু নারী কণ্ঠের অনুনয় মেশানো বিলাপ এবং তাকে থামিয়ে দিয়ে পুরুষ কণ্ঠের চাপা কর্কশ ধমক।
দুরন্ত কৌতূহলে শিব সাইকেল রেখে সামনে একটা ঝাঁকড়া জামগাছে চড়ে ধীরে ধীরে। এডাল ওডাল করে এমন জায়গায় হাজির হয় সেখান থেকে নগেন স্যারের ঘরের ভিতর দেখা যায়। খোলা জানলা পথে।
শিব দেখে, ঘরে তিনজন পুরুষ। কিন্তু মেয়ে কাউকে চোখে পড়ল না। ছেলেদের মধ্যে একজন স্বয়ং নগেন স্যার। অন্য দুজন এই গ্রামেরই যুবক। নগেন স্যার বসেছিলেন চেয়ারে। সামনে টেবিলে একখানা খোলা চটি বই। অন্য দুই ব্যক্তি মেঝেতে দাঁড়িয়ে। তিনজনে কী কথা হচ্ছে, শিবের কানে তা পৌঁছয় না।
সহসা দণ্ডায়মান দুই যুবকের একজন কেমন বিচিত্র ভঙ্গি করে মেয়েলি গলায় বলে উঠল, না না না। এ আমি কিছুতেই পারব না।
সঙ্গে সঙ্গে অন্য যুবকটি হাতমুখ নেড়ে চেঁচিয়ে উঠল,—পারবে না? আমার আদেশ। মনে রেখো—সে কথা থামিয়ে নগেন স্যারের মুখপানে থতমতভাবে চায়।
নগেনস্যার অমনি টেবিলে এক চাপড় মেরে বিরক্ত স্বরে বলে উঠলেন,– ব্যস, আটকে গেলে! আর কদিন পরে স্টেজ? এখনও পার্ট মুখস্থ হল না। হোপলেস! ডোবাবে দেখছি। তোমাদের সিনগুলো খুব ইম্পর্টেন্ট। রিহার্সালে ফাঁকি মারার এই ফল। কাল থেকে রোজ এখানে এসে প্র্যাকটিস করবে আলাদাভাবে। নইলে আমি তোমাদের এই হুজুগে নেই, বলে রাখছি। আর অত খেঁকিয়ে বলচ কেন এ জায়গায় একটু চাপা বিদ্রূপ মেশাও।
ধুত্তেরি। ওরা থিয়েটারের রিহার্সাল দিচ্ছে। শিব গাছ থেকে নামে। নগেনস্যারের থিয়েটারের শখ সবাই জানে। সরস্বতী পুজোর পরদিন ফুলডাঙা নাট্যসংঘ প্লে করবে, তারই মহড়া।
ছোঁক ছোঁক করতে করতে সত্যি এক রহস্যের সূত্র বুঝি মেলে।
দিনটা ছিল শনিবার। হাফ-ডে স্কুলের পর শিব এসে ঢুকেছিল ঘোষেদের বাগানে কুলের লোভে। তেমন বড় নয় বাগান। গ্রামের সীমানায় বিঘে দেড়েক জমিতে ছোট্ট পুকুর ঘিরে কটা আম নারকেল জাম পেয়ারা ইত্যাদি গাছ। তবে একটা কুলগাছ আছে অতি উৎকৃষ্ট।
শিব জামা প্যান্টের পকেট ভরে কুল নিল। তারপর ঝাল-নুন সহযোগে তারিয়ে তারিয়ে কুল খেতে লাগল মাটিতে বসে।
এ বাগানের তেমন কোনো রক্ষক নেই। বাগানের গায়েই সাধুচরণের কুঁড়ে। সাধুচরণই যেটুকু পাহারা দেয় বাগান। তবে আম আর নারকেল নিয়েই তার মাথা ব্যথা। অন্য ফল নিয়ে বিশেষ গা করে না।
সাধুচরণের বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। একহারা লম্বা গড়ন। মুখখানা হাসি হাসি। সে একা মানুষ। স্ত্রী গত হয়েছে বছর দুই। একটি মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে অনেককাল।
অল্প চাষের জমি আছে সাধুচরণের। তাই আবাদ করে তার পেট চলে। বাকি সময়টা আড্ডা দেয় আর গান বাজনা নিয়ে থাকে। গলাটি তার খাসা। বাউল কীর্তন সব গানেই সে ওস্তাদ। রসিক সাধুর সঙ্গে দুটো মজাদার কথা কইতে ভালোবাসে লোকে, গানও শোনে।
এখনকার সাধুর সঙ্গে বছর দশেক আগেকার সাধুর কিন্তু মিল নেই। এককালে সাধুচরণ ছিল নামজাদা চোর। গাঁয়ের লোক তার ভয়ে তটস্থ থাকত। বার কয়েক জেলও খেটেছে। তবে বেশিদিন মেয়াদ খাটতে হয়নি কখনো। পুলিশ কোনো দিনই জুৎসই কব্জা করতে পারেনি ধূর্ত সাধুচরণকে
সাধুচরণের হঠাৎ এই পরিবর্তনের হেতু কী?
নানা মুনির নানা মত। কেউ বলে, চোর বাপের নামে শ্বশুরবাড়িতে মেয়ের সম্মানহানি হচ্ছিল, তাই আদরের মেয়ের কান্নাকাটি অনুরোধে সাধুচরণ চৌর্যবৃত্তি ত্যাগ করে। কেউ বলে, এক সন্ন্যাসীর প্রভাবে সাধু চুরি ছেড়েছে। যাহোক, চোর সাধু সত্যি সাধু হওয়ায় গাঁয়ের লোক পরম স্বস্তি পেয়েছে।
সাধুচরণ লোকটিকে শিবের রহস্যময় ঠেকে, খানিক সমীহও করে। একবার এই বাগানে আম চুরি করতে এসে সে সাধুচরণের চোখে পড়ে যায়। সাধুচরণ তাকে ধমকে নামিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলেছিল,—ছ্যা ছ্যা, ঠিক মতন আম চুরি করতেও শেখনি বাছা? তা ধরা যখন পড়লে খেসারত দিতে হবে বইকি।
এই বলে শিবের পকেট থেকে সবকটা কাঁচা আম কেড়ে নিয়েছিল। আরও বলেছিল,—তোমার বাড়িতে নালিশ করব না। লঘু পাপে গুরুদণ্ড হয়ে যাবে।
শিব গাছ থেকে নেমে পালাবার চেষ্টা করতেই সাধু তড়িৎগতিতে তার হাত ধরে ফেলেছিল। ওর কঠিন মুঠির চাপে বুঝেছিল শিব লোকটির গায়ে কত জোর!
এরপর অবশ্য সাধুচরণ আর তাকে কিছু বলেনি। দেখা হলে হেসেছে বরং। একবার দুটো পাকা আমও দিয়েছিল নিজে থেকে। কুল খেতে খেতে কিছু দূরে সাধুচরণের কুটিরের দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখে শিব। সহসা সে দেখে, গাছপালার ভিতর দিয়ে আসছেন স্বয়ং ঘোষমশাই অর্থাৎ এই বাগানের মালিক বৃদ্ধ ক্ষমাপতি ঘোষ।
শিব চট করে একটা ঘন ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে বসল।
ঘোষমশাই সাধুচরণের কুটিরের সামনে গিয়ে নিচু স্বরে ডাকলেন।—সাধু।
সাধুচরণ মুখ বের করল দরজা দিয়ে। তারপর দ্রুত বেরিয়ে এসে বলল,–পেন্নাম হই বাবু আপনি আবার কেন কষ্ট করে এলেন?
ঘোষমশাই গম্ভীরভাবে বললেন,—সাধে কি আর এলাম। তোর পাত্তাই নেই। সেই ব্যাপারটা মনে আছে তো?
—আজ্ঞে তা কি ভুলি? কথা যখন দিইচি, কাজ ঠিক হাসিল করব। তবে বাবু এসব ঝঞ্ঝাটে জড়াতে আর মন চায় না। নেহাত আপনারা বলছেন তাই।
—কেন তোমার ভয় করছে?
ভয়?—নিঃশব্দে হাসে সাধু : স্বেচ্ছায় এ বৃত্তি ত্যাগ করেছি। আজ্ঞে ভয়ে নয়। ও বস্তুটি আমার নেই। তবে আবার বলছি মন চাইছে না। অন্য কাউকে এ ভার দিলে পারতেন।
না না।—বাধা দেন ঘোষমশাই : তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করতে ভরসা হয় না।
ঘোষ আরও কীসব বললেন চাপা গলায়, শিবের সব কানে আসে না। সে উৎকর্ণ হয়ে শোনে টুকরো টুকরো বাক্য। যেমন—
—সময় হাতে বেশি নেই। প্ল্যানটল্যান সব—
সে আজ্ঞে, হয়ে গেছে মোটামুটি। কাল সকালে যাব আর একবার দেখে আসতে।—সাধুচরণের গলা খাদে নামে।
নরহরির মেজ ছেলেটা কিন্তু খুব হুঁশিয়ার আর দুর্দান্ত।
—ঘোষমশাইয়ের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ।
জবাব হয়,—গরুর কৃপায় সাধুচরণ মানুষকে পরোয়া করে না। তার বেশি ডর বরং কুকুরকে। ভারি বেয়াড়া জানোয়ার।
—কুকুর থাকলে কি সে বাড়িতে চুরি করনি?
এ কেমন কথা বললেন বাবু?—সাধুচরণ ফের দাঁত বের করে নীরবে হাসে : বাঘা ডালকুত্তার পাহারা দেওয়া কত বাড়ির সিন্দুক সাফ করেছি। কুকুরকে বশ করার বিদ্যে না জানলে কি আর এ লাইনে উন্নতি করা যায়! আপনি আর দুশ্চিন্তা করবেন ন। এখন বিদায় নিন। আপনি আমার ঘরে এসে কথা কইছেন দেখলে কে না কি সন্দেহ করে বসবে?
ঘোষমশাই সন্ত্রস্ত চোখে চারপাশ একবার দেখে নিয়ে গুটিগুটি ফিরে চললেন। সাধুচরণ ঢুকে গেল তার ঘরে।
আরও মিনিট দশেক লুকিয়ে বসে থেকে শিব চুপিচুপি কেটে পড়ল সেখান থেকে। কোনো অভাবিত রহস্যের সম্ভাবনায় তখন সে উত্তেজনায় থরথর।
পরদিন রবিবার ছুটির দিন। তাই সুবিধাই হল। ভোরে গিয়ে শিব বসে রইল ঘোষেদের বাগানে ঝোপের আড়ালে। বেশিক্ষণ তাকে অপেক্ষা করতে হল না। আধঘণ্টাটাক বাদে বেরিয়ে এল সাধুচরণ তার কুটির থেকে। গায়ে তার পরিষ্কার জামা ধুতি। খালি পা। কাঁধে ঝুলছে দোতারাটি।
সাধুচরণ ধীরে ধীরে চলল গ্রামের ভিতরে। নিরাপদ দূরত্ব রেখে, যাতে ওর চোখে না পড়ে, শিব অনুসরণ করল তাকে।
সাধুচরণ পথে দু-চারটি গ্রামের লোকের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সামান্য আলাপ করল। একজনের বাড়ির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে কীর্তন গাইল কয়েক কলি। তারপর ফের হাঁটা দিল। সে গিয়ে ঢুকল এবার নরহরি বোসের বাড়ি। ওই বাড়িতে সে গেঁড়ে বসল।
মিনিট দশেক বাদে শিব বোসবাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার ছলে আড়চোখে দেখে নিল আধখোলা দরজা পথে ভেতরে।
বোসবাড়ির এলাকাটা বেশ বড়। প্রায় বিঘেখানেক জায়গা মানুষ সমান উঁচু মাটির পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। ভিতরে দোতলা পাকা বসতবাড়ি। রান্নাঘর, গোয়ালঘর ইত্যাদি আরও তিনটি বড় বড় ঘর রয়েছে লাগোয়া—সেগুলির দেওয়াল মাটির, খড়ের চাল। তকতকে উঠোন। উঠোনে যত্নে লাগানো কিছু ছোট ছোট ফল ও ফুলের গাছ। গাঁদা, গোলাপ, কুন্দ ফুলের বাহার। গাছে ঝুলছে নধর বেগুন, সবুজ লাল সতেজ লঙ্কার ঝাড় মাথা তুলে আছে। একটা পাতিলেবুর গাছ ভরে আছে ফলে। উঠোনের মাঝে তুলসী মঞ্চ। গোয়াল ঘরের চালে লতিয়ে উঠে ছেয়ে আছে মস্ত এক লাউ গাছ। বড় বড় লাউ ধরেছে তাতে।
শিব দেখল, বৃদ্ধ নরহরি বোসমশাই দাওয়ায় চেয়ারে বসে সমুখে উঠোনে নিচু জলচৌকিতে বসে হাসি মুখে কথা বলছে সাধুচরণ। একটু বাদে ভেসে আসে সাধুচরণের গান পরপর দুখানা সে গান গাইল দোতারা বাজিয়ে। দুটিই বাউল গান। বোসমশাই বাউল গানের ভক্ত।
মিনিট চল্লিশ বাদে শিব ফের ঘোষবাড়িতে উঁকি দিয়ে দেখল যে, সাধুচরণ তখন চা খাচ্ছে এবং গল্পও চলেছে বোসমশাইয়ের সঙ্গে। প্রায় সোয়াঘন্টা সেখানে কাটিয়ে সাধু ফের পথে বেরুল।
সাধুচরণ এপাড়া ওপাড়া কিছু ইতস্তত ঘুরে, কিছু গল্পগুজব করে ঢুকল ক্ষমাপতি ঘোষের বাড়ি। ঘোষ বাড়ির ধাঁচ প্রায় নরহরি বোসের বাড়ির মতনই। ঘেরা উঠোনের জায়গা বোধহয় সামান্য কম হবে। উঠোনে তেমনি কিছু ফল ফুলের গাছ। তুলসী মঞ্চ। তবে ঘোষ বাড়ির উঠোনের মাঝে উঠেছে একটি উত্তম জাতের কলমি আমের গাছ।
ঘোষ বাড়িতেও সাধুচরণ কাটাল ঘণ্টাখানেক। গানও গাইল একটি। শিব বাড়ির সামনে দিয়ে যাবার সময় লক্ষ করল যে আমগাছের ছায়ায় দড়ির খাটিয়ায় বসে ক্ষমাপতি ঘোষ। কাছেই সামনে টুলে বসে সাধুচরণ। দুজনে কথা হচ্ছে নিচু সুরে।
ঘোষবাড়ি থেকে বেরিয়ে সাধুচরণ সোজা ফিরে গেল তার নিজের কুটিরে।
সেদিন বিকেলে শিব গিয়ে দেবুকে রিপোর্ট করল সাধুচরণ বৃত্তান্ত। তার ভয় ছিল দেবু বুঝি বা ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেয় কোনো রহস্যের সম্ভাবনা। কিন্তু দেবু সে ভাব দেখাল না। সব শুনে চিন্তিতভাবে চুপ করে রইল খানিক। অতঃপর জিজ্ঞেস করল,—তুই কি শুনেছিস ঘোষমশাই নরহরিবাবুর মেজ ছেলের কথা বললেন?
—হুঁ স্পষ্ট শুনেছি। তাছাড়া—কাজ হাসিল। গোপন ব্যাপার। প্ল্যানটল্যান। এসবের অর্থ কী। একবার নরহরি নামটাও শুনেছি। আমার মনে হচ্ছে ক্ষমাপতি ঘোষ সাধুচরণকে দিয়ে নরহরি বোসমশাইয়ের বাড়ি থেকে কিছু চুরি করাতে চায়। দু বাড়ির যা সম্পর্ক? হয়তো সাধারণ চুরি নয়। কোনো দলিল টলিল বা দরকারি কোনো কাগজপত্র সরাতে চায় বোসদের জব্দ করতে। কাজটা খুবই কঠিন। তাই সাধুচরণকে বলে কয়ে রাজি করিয়েছে।
দেবু বলল,—হতে পারে।
এই প্রসঙ্গে ক্ষমাপতি ঘোষ এবং নরহরি বোসের দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্কটা কেমন তা একটু বলা দরকার।
নরহরি ও ক্ষমাপতি পরস্পরের দূর সম্পর্কের ভাই অর্থাৎ আত্মীয়। দুই বাড়ির মধ্যে এক সময় যথেষ্ট সৌহার্দ্য ছিল। নরহরি ও ক্ষমাপতি দুজনে কাছাকাছি বয়সি। বছর সত্তর ছুঁয়েছে। ঘোষমশাই তখন প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় বোস বাড়িতে যেতেন নরহরি বোসের সঙ্গে দাবা খেলতে।
দুই পরিবারই বেশ অবস্থাপন্ন। চাষবাস ছাড়াও ছোটখাটো ব্যবসা আছে তাদের। ক্ষমাপতির দুই ছেলের মধ্যে ছোটজন চাকরি করে বাইরে। বড় ছেলে দেশে থাকে। আর নরহরির তিন ছেলের মধ্যে বড়টি রেলের চাকুরে। বাইরে বাইরে ঘোরে। মেজ ও ছোট দেশে জমি জায়গা দেখে, লাভপুরে আটাভাঙার কল চালায়।
বছর চারেক আগে দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠতায় হঠাৎ চিড় খায়। কারণটা অতি তুচ্ছ। ঘোষদের বড় এবং বোসবাড়ির মেজ ছেলে দুজনেই চায় ফুলডাঙা ক্লাবের দুর্গাপুজো উপলক্ষে যাত্রায় সেনাপতির পার্ট। তাই থেকেই মন কষাকষি। সেনাপতি হওয়া অবশ্য দুজনের কারোর ভাগ্যেই ঘটেনি শেষমেষ। কিন্তু সম্পর্কটা খারাপ হয়ে গেল। এরপর থেকেই খুচখাচ্ ঝগড়া লেগেই অঅছে। একখণ্ড জমি নিয়েও দুপক্ষে মামলা চলছে।
ক্ষমাপতি আর বোসবাড়িতে যান না দাবা খেলতে। তবে দাবার নেশা দুজনেরই। তাই যান সন্ধ্যায় দত্ত বাড়িতে দাবার আসরে। যদিও ঘোষ বোস কর্তার মধ্যে সোজাসুজি বিবাদের কারণ যদিও ঘটেনি। তবু পারিবারিক টানেই পাঁচজনের আসরেও দুজনে পরস্পরকে এড়িয়ে চলেন। কথাবার্তাও বলেন না। সুতরাং সাধুচরণের সাহায্যে ক্ষমাপতি যে নরহরিকে জব্দ করতে ষড়যন্ত্র করতে পারে তা অস্বাভাবিক নয়।
দেবুর সমর্থন পেয়ে শিব উৎসাহিত হয়ে বলে,—সাধুচরণ নির্ঘাৎ বোস বাড়িতে গিয়েছিল কিছু ওয়াচ করতে, পরে কোনো দুষ্কর্মের মতলবে।
হুঁ।—দেবু ভাবিত : শিগগিরি হয়তো কিছু একটা ঘটবে। তবে এখনি তা আঁচ করা যাচ্ছে না। সাধুচরণের ওপর নজর রাখতে হবে। তুই আমি পালা করে ডিউটি দেব।
পুলিশকে ওয়ার্নিং দিয়ে রাখলে কমেন হয়?—শিবের প্রস্তাব : থানার ছোটবাবু আমার কাকার বন্ধু। আমায় চেনেন।
প্রমাণ ছাড়া শুধু তোর কথায় পুলিশ আমাদের পাত্তাই দেবে না। জানাল দেবু : তাছাড়া আমাদের গোয়েন্দাগিরির কী হবে? কোনো রহস্য ভেদ হলে পুরো ক্রেডিট নেবে পুলিশই। বরং অঘটন কিছু ঘটলে তখন সমস্ত জানানো যাবে পুলিশকে। আমাদের ইনফর্মেশন হয়তো সাহায্য করবে ওদের। কিঞ্চিৎ প্রশংসাও মিলবে। আগেভাগে পুলিশকে জানানোর দরকার কী? দেবুর প্রস্তাব মনে ধরে শিবের। বলে,—তবে ভাই, সাধুচরণের ওপর তেমন নজর রাখার সুযোগ কই আমাদের? সকাল সন্ধ্যায় পড়া। দুপুরে ক্লাস। বিকেলে যেটুকু সময় পাব।
তাছাড়া উপায় কী!—দেবুর জবাব : তবে ছুটির দিনগুলো কাজে লাগাতে হবে। অবশ্য খুব বেশিদিন সবুর করতে হবে বলে মনে হয় না।
